বৃহষ্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৩

ইসলাম কি সাম্প্রদায়িক?

সাম্প্রদায়িকতাশব্দের ব্যবহারিক অর্থ হলো রাষ্ট্রের কোন সাম্প্রদায়ের উপর বিশেষ করে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের উপর কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা দল (কতৃক) জুলুম, নির্যাতন ইত্যাদি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতর সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমরা সচরাচর হিন্দু সাম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার-নির্যাতনকে বুঝে থাকি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে হিন্দুদের জমি ও ঘর বাড়ী দখল, ব্যবসা বা সম্পত্তি থেকে উৎখাতের প্রক্রিয়া কাদের দ্বারা সূচিত হয়েছিলো তা আমরা সকলেই জানি। আওয়ামী দাঙ্গাবাজদের দ্বারা শুধু যে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিলো তাই নয়, পার্বত্য চট্রগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে জোর করে বাঙ্গালী বানানোর প্রক্রিয়ায় তাদের উপরও বৈষম্যের সূচনা হয়েছিলো। ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতির ভারতে যেভাবে কংগ্রেস মুসলমানের উপর বছরের পর বছর অত্যাচার চালিয়ে এসেছে সেই একই চেতনায় বাংলাদেশেও কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় বন্ধু আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের উপর জুলুম করেছে। আর এই স্বার্থান্বেষী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের পর যত দল ক্ষমতায় এসেছে জাতীয় পার্টি, বি.এন.পি সকলেই সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চালিয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে ৯০ এর পর থেকে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগ-বি,এন,পি এর হাতে একই ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। পরিহাসের বিষয় হলো এই যে, বি.এন.পি আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের অত্যাচারে ভিটে-বাড়ী থেকে উচ্ছেদ হওয়া থেকে শুরু করে, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আর এর দোষ চাপানো হয়েছে ইসলামী শক্তি আর ইসলাম পছন্দ মানুষদের উপর। অথচ আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি গত ৩০ বছরে ইসলামি শক্তির দ্ধারা কোন হিন্দু নির্যাতিত হয়েছেন এমন উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবেন না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে বি,এন,পি আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা একের পর এক হিন্দুদের বাড়ী দখল করেছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছেদ করেছে। নারী নির্যাতন করেছে অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হয়েছে ইসলাম ও ইসলামী শক্তিগুলোকে। অথচ ইসলামী শক্তিগুলো উল্টো কাজটাই নিরলসভাবে করে গিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদ ভেঙ্গে যখন শত শত হিন্দু ছাত্র মৃত্যুর সাথে লড়ছিলো, তখন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছেলেরা প্রথম ছুটে গিয়েছিলো তাদেরকে রক্ত দিয়ে বাচাঁনোর জন্য। ভারতে যখন বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিলো আর গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমানকে পুঁড়িয়ে মারা হয়েছিলো তখন এদেশের সাধারণ ইমাম ও ইসলামি নেতৃবৃন্দ জনগণকে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার, ও হিন্দুদের মন্দিররে নিরাপত্তা রক্ষার আহবান জানিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয়ে হলো এই যে আওয়ামী লীগ- বি,এন,পির স্বার্থের রাজনীতির বলির পাঠা হয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়, অথচ তাদেরকে বুঝানো হয়েছে এর জন্য দায়ী ইসলাম ও ইসলামি শক্তি সমূহ। কিন্তু মিথ্যার এই বেসাতি বেশীদিন টিকবেনা। বামপন্থীরা এবং আওয়ামী লীগ মিলে যখনই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন নামে ইসলামি শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করুকনা কেন জনগণ ঠিকই জানে এই দেশে সাম্প্রদায়িক সস্প্রীতি রক্ষা করার সবচেয়ে বড় ঢাল হিসাবে হাজার বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে ইসলামি ধারণা ও মূল্যবোধ। ব্রিটিশ আসার পূর্বে এই অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমানরা শত শত বছর ধরে পাশাপাশি শান্তি শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করেছে ইসলামের সহনশীলতা ও সহমর্মিতার শিক্ষার কারণেই। ভারতবর্ষে মুঘলদের ৮০০ বছর শাসন আমলে একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেনি। ব্রিটিশরা তাদের নিজেদর স্বার্থ সিদ্ধির জন্য যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কৌশল শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে তা গত ৫০ বছর ধরেই ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসকরা সময় সুযোগ মত ব্যবহার করেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। এই ধর্মনিরপেক্ষ স্বার্থান্বেষী রাজনীতি ও রাষ্ট্রের বিপরীতে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের ব্যাপারে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও শরীয়ার অদেশ নির্দেশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামী হুকুমত বা রাষ্ট্রই একমাত্র স্থান যেখানে সকল সাম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের জান-মাল হিফাযতের অধিকার এবং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার স্বীকৃত। অমুসলিমদের অধিকার সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তাদের জীবন রক্ষার অধিকার।

রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

যদি কোন ব্যক্তি কোন মুআহিদ (যিম্মী)-কে হত্যা করে তবে জান্নাতের ঘ্রাণ তার নসীবে হবে না। অথচ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। এমন কি যিম্মীদের প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) ইরশাদ করেন: সাবধান! কেউ যদি কোন মুআহিদ প্রতি জুলুম করে অথবা তাকে তার অধিকার থেকে কম দেয় কিংবা ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ তার উপর চাপিয়ে দেয় বা জোরপূর্বক তার থেকে কোন মালামাল নিয়ে যায় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ অবলম্বন করবো। যিম্মী হত্যা করা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি কোন যিম্মীকে হত্যা করে তবে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে।

এতে এ কথা প্রতীয়মাণ হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে একজন অমুসলিম নাগরিকের প্রাণের মর্যাদা একজন মুসলিমের সমান। এ কারণেই একজন অমুসলিম নাগরিকের রক্তপণ একজন মুসলিম নাগরিকের রক্তপণের সমান ধার্য করা হয়েছে। ইসলামের অমুসলিম যিম্মীদের সম্পদের অধিকার স্বীকৃত। এ কারণেই যিম্মীদের সম্পদের (আত্বস্বাতকারীর) প্রতি রাসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন।

ইসলাম মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম যিম্মীদেরকে তাদের ধর্ম ও কৃষ্টি-কালচার রক্ষার ব্যাপারেও পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছে। ইসলামের স্বর্ণ যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে সকল বিজিত দেশে অমুসলিম লোকদেরকে বসবাসের অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সে সকল দেশে তাদের ধর্ম পালন এবং কৃষ্টি রক্ষার অধিকারও দেওয়া হয়েছিল। আবূ উবায়দ (রঃ) কিতাবুল আমওয়ালগ্রন্থে পরাজিত কয়েক দেশের নাম উল্লেখ করে বলেন, এ সকল দেশের অধিবাসীগণ মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। অথচ এ সকল দেশের অমুসলিম অধিবাসীদেরকে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ববৎ বহাল রাখা হয়েছে। ভারতবর্ষ এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহারণ, যেখানে মুসলিম শাসন আমলে হিন্দুদের সকল প্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিলো।

অমুসলিম ব্যক্তির সামাজিক ও নাগরিক অধিকারও ইসলামী রাষ্ট্রে স্বীকৃত। ইসলামী রাষ্ট্রের যেসব অমুসলিম অধিবাসী জীবিকা উপার্যনে অক্ষম তাদেরকে ভাতা দানের ব্যবস্থা ইসলামে রয়েছে। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-খিলাফতের কালে সেনাপতি খালিদ (রা) হিরার অধিবাসীদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, তাতে ছিল: তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে কর্মে অক্ষম হয়ে যাবে অথবা অন্য কোন কারণে বিপদগ্রস্ত হবে অথবা দরিদ্র হয়ে যাবে তাদের জিযি্য়া মওকূফ করে দেয়া হবে। অধিকন্তু বায়তুল মাল হতে তাদেরকে এবং তাদের পরিবারবর্গকে ভাতা প্রদান করা হবে। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা) একদা এক বৃদ্ধ ইয়াহুদীকে ভিক্ষা করতে দেখে তাকে বায়তুল মালের খাযাঞ্চির নিকট পাঠিয়ে আদেশ দিলেন, তাকে এবং তার মত অন্যান্য ব্যক্তিদের জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করে দাও। যৌবনে তাদের থেকে জিযি্য়া উসূল করে বার্ধক্যে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেয়া ন্যায় বিচার নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের চাকুরী লাভ করারও অধিকার রয়েছে। খুলাফায়ে রাশিদীনের যমানায় এর বহু উদাহারণ পাওয়া যায়।

সুতরাং আজকের বাংলাদেশের স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের দ্ধারা হিন্দু ও পাহাড়ী সাম্প্রদায়ের উপর যে অত্যাচার সংঘঠিত হচ্ছে তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো ইসলামের হুকুম তথা রাষ্ট্রের অধীনে এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই পারে এদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানদের শারিরীক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কারণ আল্লাহ্‌ তৈরী এই পৃথিবীতে তার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই বিশ্বে কোন ধর্ম বা সাম্প্রদায়ের মানুষকেই যেমন তিনি আলো, বাতাস, পানি ও রিযিক থেকে বঞ্চিত করেন না বা কারো ব্যাপারে বৈষম্য করেন না। ঠিক সেই একই আল্লাহ্‌র দেয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রও ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে নিরলস ভাবে কাজকরে যায়। আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সকল মানুষের মুক্তির অবলম্বন সেই রাষ্ট্র ফেরৎ নিয়ে আসার তৌফিক দান করুন। (আমিন)।


শেখ তৌফিক
২৬ সফর ১৪২৬, ৬ এপ্রিল ২০০৫, ২৩ চৈত্র ১৪১১

মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

বিশ্বাসের একটি ভাষা আছে


পাকিস্তানের একজন ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক অফিসিয়াল ট্যুরে ভ্যাটিকান গিয়েছিলেন। তারা সেখানে উচ্চতর একদল পাদ্রীর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন।

ওই শিক্ষক একজন পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলেন: "তোমাদের কি এমন কোন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন তাতে নিশ্চিত?"

পাদ্রী ঈষৎ লজ্জিত বোধ করলেন কিন্তু সততার সাথে উত্তর দিলেন যে, "এমন কোন উক্তি জানা নেই যা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যায়- কেননা তিনি যে ভাষায় কথা বলতেন তা হারিয়ে গেছে।"

এরপর পাদ্রী জিজ্ঞেস করলেন, "মুসলিমদের আছে কি"?

"তোমাদের কি এমন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ মুহাম্মাদ [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন নিশ্চিত?"

ওই শিক্ষক মৃদু হাসলেন। আর বললেন, "আমাদের কেবল আমাদের নবীর [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] সুনিশ্চিত আর সন্দেহাতীত কথা সম্বলিত বইয়ের সংগ্রহশালাই রয়েছে তা নয়, আমাদের একটি বিজ্ঞান [science] রয়েছে, যার নাম 'তাজওয়ীদ' [Tazweed]"। তাজওয়ীদ এর পড়াশুনা হচ্ছে, প্রত্যেকটি ধ্বনি আর বর্ণ যেভাবে নবী [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] উচ্চারণ করতেন তদানুযায়ী শিক্ষা দেয়া!”

 সকল প্রশংসা আল্লাহ্ তা'আলার, যিনি আমাদের দ্বীনকে এভাবে হিফাজত করেছেন।

কিন্তু, ভাই ও বোনেরা আমরা কি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীকে হিফাজত করায় আমাদের করণীয়টুকু করছি? রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "প্রচার করো! একটি আয়াহ্ হলেও।" কিভাবে আমরা তা করতে সমর্থ হবো যদি আমরা নিজেরাই অবতীর্ণ আয়াহ্'টি না বুঝি? কিভাবে আমরা তা জানি এমন ধারনা করতে পারি যখন আমরা যে ভাষায় তা অবতীর্ণ হয়েছে সে ভাষাটিই বুঝি না। আর আল্লাহ্ আর তার রাসূল (সা) এর মিশনকে সফল করতে হলে আমাদের উপর ইসলামের ভাষা [আরবী] শিখা আবশ্যক।

অন্যদের ইসলাম শিক্ষা দেয়া- একটি আয়াহ্ হলেও পৌছানোর পাশাপাশি আমাদের মাথায় রাখতে হবে; আমরা যেনো আরও একটি প্রজন্ম এই বিপাকে ধ্বংস না করি। দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষার হার বাড়ানো আর দ্বীনের শিক্ষাব্যবস্থা উভয়ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগোষ্ঠীগুলো যেনো এগিয়ে আসে তা নিশ্চিত করতে হবে; যাতে আমরা সঠিক পথপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারি।

কুরআন হলো আল্লাহ্’র সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম; যাতে এর মাধ্যমে তিনি আমাদের তার নির্দেশিত পথের দিশা দান করতে পারেন। কিন্তু এই যোগাযোগ [communication] কি সত্যিই ঘটছে? যোগাযোগের উপর যে কোন পাঠ্য দেখলে আমরা দেখতে পাব, যোগাযোগ [communication] হচ্ছে প্রেরিত বার্তা প্রাপকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছা আর তা সঠিকভাবে গ্রহণ করা তেমন অর্থবহভাবে; যেমন প্রেরকের উদ্দীষ্ট ছিলো। কিন্তু তা যদি শ্রবণের সমস্যার কারণে কিংবা অমনযোগিতার কারণে কিংবা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে যথার্থভাবে না পৌঁছে তবে সত্যিকার যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না। এই ব্যাপারটি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীর ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য। আমরা কি সত্যিই আল্লাহ্’র সাথে যোগাযোগের অবকাশ রেখেছি যখন আমরা তার বাণীর মর্মার্থই উপলব্ধি করতে পারি না?

কেবল সরলীকৃত আর দুর্বল ইংরেজীতে অনূদিত কুরআন পড়ে আমরা কখনোই কুরআন পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবো না। প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আর নিগূঢ়তা রয়েছে যা কখনোই অনুবাদ করা সম্ভবপর নয় আর কুরআনের আরবীর ক্ষেত্রে তা অকল্পনীয়। এ প্রসঙ্গে জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহিমাহুল্লাহ্’র একটি উক্তির ভাবার্থ উল্লেখ করতে চাই। তিনি যা বলেন তার ভাবার্থ অনেকটা এমন: “কেউ যদি আল্লাহ্’র সাথে তার সৃষ্টির দুরত্ব উপলব্ধি করতে পারে, তবে কুরআনের সাথে কুরআনের অনুবাদের পার্থক্য ও উপলব্ধি করতে পারবে।“

আজ যদি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো সাথে সরাসরি কথা বলতেন- আর স্বভাবতঃই তিনি তা আরবীতে বলতেন-তবে কি সে তা বুঝতে সমর্থ হতো? কিংবা তার কি অনুবাদক এর প্রয়োজন পড়তো? অথচ সে চাইতো প্রতিটি মুহুর্ত, প্রতিটি উপদেশ বুঝতে, ধরে রাখতে কিন্তু পারতঃপক্ষে তাকে অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থাকতে হতো, তার সাথে যোগাযোগ করা কিংবা তার প্রজ্ঞা বুঝা সম্ভবপর হতো না; আরবী না জানার কারণে।

আর যারা তার সংস্পর্শ পেয়েছিলো তারা এর [কুরআন] ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছিলো। হাবশায় মুসলিমদের প্রথম হিজরতের পরপরই রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার নিকটে সুরা নাজম তিলাওয়াত করেছিলেন আর তা মুসলিম-কাফির সকলেই তা সমবেতভাবে শুনেছিলো আর তাতে বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলো।

আর তিনি যখন চুড়ান্ত এই আয়াহ্’য় পৌঁছলেন:

"তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ-ক্রন্দন করছ না? তোমরা ক্রীড়া-কৌতুক করছ, অতএব আল্লাহকে সেজদা কর এবং তাঁর ইবাদত কর।"[সুরা নাজম: ৫৯-৬২]

তৎক্ষনাৎ, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় লুঠিয়ে পড়লেন আর উপস্থিত মুসলিমরা সকলেও তার অনুসরনে আল্লাহ্’র নিকট সিজদায় পড়ে গেলেন।

এখন, এ ব্যাপারখানি একটু ভাবুন যা তৎপরবর্তীতে ঘটেছিলো! সকল উপস্থিত কাফিররাও আল্লাহ্’র সামনে সিজদারত হলো। তারা কুরআনের সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলো এতে অন্তর্নিহিত সত্যকে অস্বীকার করতে পারে নি!

"আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।" [সুরা ইউসুফ:০২]

এখানে, কেবল একটি উদাহরণ দেয়া হলো যাতে এই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হয় যে, কুরআনের অনুবাদ অসম্ভব।

সুরা আবাসায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইয়ামুল কিয়ামাহ্’র কথা বলেছেন এভাবে:

"অতঃপর যেদিন কর্ণবিদারক নাদ আসবে," [সুরা আবাসা:৩৩]

এখানে, বিকট শব্দের [কর্ণবিদারক নাদ] জন্য ব্যবহৃত আরবী শব্দ হলো “সাখখাহ্” [الصَّاخَّةُ]- শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া-যা পুনরুত্থানের ঘোষনা দিবে আর মানবসকলের দুনিয়ার সকল কাজের প্রতিদানের; যার ফলে অবিশ্বাস্য রকমের মোহাচ্ছন্নতার  অবতারনা ঘটাবে।

 الصَّاخَّةُ এই শব্দটি দেখে কেউ ভাবতে পারে এটিকে দুটি দ্বিরুক্তি কিংবা ধ্বনির মাধ্যমে উচ্চারণ করা হবে। কিন্তু আরবীতে الصَّاخَّةُ শব্দটি ছয় পর্যন্ত টেনে পড়া হয়। এর তিলাওয়াত শুনলেই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হবে। এই শব্দের তিলাওয়াত এমন যে শব্দটিই যেনো শিঙ্গায় ফুঁকদানের বিষয়টিকে প্রাণবন্ততা দেয়। কিন্তু ইংরেজীতে ‘deafening noise/deafening Blast’ [বিকট শব্দ] কে টেনে পড়ার কোন সুযোগ নেই; সুতরাং আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল যে শক্তিশালী অর্থ এখানে উদ্দেশ্য করেছেন তা আমরা কখনোই পাব না। কেবল যে আরবী ভাষা বুঝে সেই আল্লাহ্’র বাণীর সত্যিকার ক্ষমতা উপলব্ধিতে সমর্থ হবে; যা অত্যন্ত সতর্কতা আর সুগভীরতার সাথে তিনি আমাদের জন্য নির্বাচন করেছেন।

আরেকটি উদাহরণ, ধরুন আপনি একজন ইংরেজীভাষী আর একজন মনিব তার ভৃত্যকে বলছে “আমাকে পানি দাও”; আপনি বুঝে নিবেন যে মনিব স্বত্বরই পানি চেয়েছেন, দুই ঘন্টা পরে চান নি। এখানে তা বলা নেই কিন্তু নিহিত রয়েছে। আর এটাই ভাষার সূক্ষ্ন তারতম্য।

কেউ যখন বলে, “আরবী আমার নিকট ভিনদেশী ভাষা” যার ভাবার্থ হবে এমন, “কুরআনের উপলব্ধি আমার নিকট প্রকৃতিবিরুদ্ধ।” আর আরবী যখন কারো নিকট ভিনদেশী ভাষা হিসেবে পরিগনিত হয় তার অর্থ দাঁড়ায়: “রাসুলুল্লাহ্’র সুন্নাহ তার নিকট অপরিচিত।”

যে আল্লাহ্’কে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সুত্রে অবশ্যই রাসুলুল্লাহ্’কে ভালবাসে। আর যে আল্লাহ্ আর তার রাসূলকে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সূত্রে অবশ্যই ভালবাসবে আরবী ভাষাকে; যা আল্লাহ্ পছন্দ করেছেন।

এই সে ভাষা যাতে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বই’ কথা বলেছে। এই সে ভাষা যাতে পৃথিবীর সর্বশ্রষ্ঠ মানুষ কথা বলেছেন। আর এটি অন্যান্য ইসলামী বিষয়াদি উপলব্ধির জন্য প্রবেশদ্বার। আর যে কখনো আরবী শিখবে না সে কখনো কুরআন আর সুন্নাহ্ পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবে না।

আরবী শিখা আমাদের কি উপকারে আসবে?

এক: এটি আমাদের চরিত্রকে নমনীয় করবে।

ইবনে তাইমিয়াহ্ বলেন: “একটি ভাষার ব্যবহার একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় যথার্থই প্রভাব ফেলে। এটি উম্মাহ্’র প্রথমদিকের প্রজন্ম: সাহাবী আর তাবিয়ুনদের সাদৃশ্যমান অনুকরণের ক্ষেত্রেও একজনের উপর প্রভাব ফেলে। তাদের অনুকরণের প্রচেষ্টা একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় বিশুদ্ধতার ছাপ ফেলে।”

দুই: আর এটি ইসলামী সংস্কৃতির সাথে আমাদের যোগসূত্র। নিঃসন্দেহে, ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি; যে ভাষা শিখা হয় তার সংস্কৃতি চিন্তা আর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। আর আরবী ভাষার মাধ্যমে ইসলামী পরিশুদ্ধ সংস্কৃতির নিকট আসতে পারা বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

যারা ভাবে ইংরেজী শিখা দুনিয়াতে সাফল্য নিয়ে আসবে তাদের জন্য বলি, আরবী শিখা তোমার পরকালের সাফল্যের পূর্বশর্ত। আর মুসলিমরা যখন বিশ্বশাসণ করছিলো তখন অমুসলিমদের আরবী জানাটা ছিলো শিক্ষিত হওয়ার লক্ষন। আবার ও বিশ্ব ফিরে যাবে সেই গৌরবময় ইসলামী ইতিহাসে, ইনশা’আল্লাহ্।

কোন মুসলিমেরই এই ভাবনা ভাবার অবকাশ নেই যে, আরবী তার মাতৃভাষা নয়। বরং তা আমাদের দ্বীনের ভাষা, বিশ্বাসের ভাষা। আর লোকজনকে এই ভাষার দিকে আহবান করায় জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা নাই; বরং এই আহবানে একজন মুসলিম মাথা উচিয়ে বলবে, “আমার বিশ্বাসের একটি স্বকীয় ভাষা আছে আর তা হলো আরবী!”

কৃতজ্ঞতা: 'Kalamullah' এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে।


সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যধারণ করা


“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমাদের অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সুরা মায়েদা-০৩)

ইসলাম একটা সম্পূর্ণ ও সত্য জীবন ব্যবস্থা যা অন্যান্য সকল বিশ্বাস ব্যবস্থা বা মতবাদ থেকে পৃথক একজন ব্যক্তি যখনই লা-ইলাহা ইল্লালাহ সাক্ষ্য দেয় তখনই মৌখিকভাবে অন্যান্য সকল ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে একজন ব্যাক্তি নামাযের জন্য কিভাবে পবিত্র হবে সেটি যেমন ইসলাম বলে তেমনি তার আকীদাকে ভ্রান্ত আকিদা থেকে কি ভাবে রক্ষা করবে সেটা ইসলাম বলে দেয় তেমনি একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি কিভাবে পরিলক্ষিত হয় তাও বলে দেয়। তেমনি কোন শাসক সমাজ পরিচালনা করবে বা শাসকের জবাবদীহিতা কি রকম হবে বা জনগণের সাথে শাসকের সম্পর্ক কি হবে বা ইসলামের প্রচারকার্য কিভাবে হবে সবই ইসলামে বলা রয়েছে। তাই কোন ব্যক্তি যখন নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে তখন তাকে ইসলামের সব হুকুম আহাকাম মেনে চলতে হবে এখানে কিছু মানব, কিছু মানব না বা সহজগুলো নিব কঠিনগুলো নিব না, এরকমটা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

“হে ঈমানদারগণ তোমরা পুর্নাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ কর” (সুরা বাকারা-২০৮)

অর্থাৎ তোমরা পরিপূর্ণভাবে মুহাম্মাদ(সাঃ) এর দ্বীনের সমস্ত আইনের আনুগত্য কর এবং সেখান থেকে কোন কিছু পরিত্যাগ কর না।

ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্রবিহীন একজন মুসলিম চাইলেও সম্পূর্ণ ইসলাম পালন করতে পারবে না কার ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু বিশ্বাস বা বৈশিষ্ট্যের নাম নয়। বরঞ্চ ইসলামের ইসলামের হুকুম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিব্যপ্ত। তাই একজন মুসলিম আন্তরিকভাবে চাইলেও অর্থনীতি, সমাজনীতি, পররাস্ট্র বা প্রতিরক্ষানীতি ইসলাম হুকুম অনুযায়ী পালন করতে পারে না।

“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়আত নেই তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)

একজন মুসলিমকে অবশ্যই খিলাফত ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হবে কারণ খিলাফত না থাকলে খলিফা থাকে না খলিফা না থাকলে বায়আতের প্রশ্নও আসে না। কিন্তু বায়আতবিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু, অর্থাৎ ইসলাম পূর্ববর্তী সময়ের মৃত্যু যা কোন মুসলিমের কাম্য নয়। এমতাবস্থায় একজন মুসলিমের একমাত্র কাজ হল সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। যে ব্যবস্থা মুসলিমদের জীবন, সম্পদ ও বিশ্বাসের নিরাপত্তা দিবে।

একজন মুসলিম যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রত্যাখান করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে, তখন তার উপর নেমে আসবে সীমাহীন নির্যাতন। তাকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ কাঁটাযুক্ত পথ, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। এটাই ছিল পূর্ববর্তীদের সুন্নাহ যার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা হক থেকে বাতিলকে পৃথক করে দেন। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ও একনষ্ঠভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেনঃ

“ঐসব লোকেরা কি ধারণা করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি, একথা বললেই তারা অব্যাহতি পাবে আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? আর আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যারা পূর্বে অতীত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ সেই লোকদেরকে জেনে নিবেন যারা সত্যবাদী ছিল এবং জেনে নিবেন মিথ্যাবাদীদেরও।” (সূরা আনকাবুতঃ ২-৩)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেনঃ

“তোমরা কি মনে কর যে, (বিনাশ্রমে) জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেনি যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তাদের উপর এমন এমন অভাব ও বিপদ-আপদ এসেছিল এবং তারা এমন প্রকম্পিত হয়েছিল যে, স্বয়ং রাসূল ও তার মুমিন সাথীরাও বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? স্মরণ রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য নিকটেই।” (আল বাকারাঃ ১৪০)

পূর্ববর্তীদের সকল নবী রাসূল তাদের অনুসারীরা ও এই পরীক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক মুসলমানকেই এই পরীক্ষা করেন এবং সত্য থেকে মিথ্যা আলাদা করে দেন।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে (পরীক্ষায়) ফেলেন, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন,

রাসূল (সাঃ) বলেছেন ইমানদার নর-নারীর জান মাল সন্তানাদির উপর বিপদ আপদ আস্তেই থাকে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সমীপে উপস্থীত হয় এমন অবস্থায় যে তার আর কোন গুনাহ থাকে না। বিশ্বাস বা কার্যের দৃঢ়তার উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা করা হয় যুগে যুগে নবী রাসূলদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে দাউদ, ইউসুফ, ইউনুস, ইব্রাহীম প্রত্যেককে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

“আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয় কিছুটা ক্ষুধা কিছুটা জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে আপনি ধর্য্যশীলদের সুসংবাদ দিন” (বাকারা-১৫৫)  

“যদি তোমাদের পিতারা, তোমাদের পুত্ররা, তোমাদের ভাইয়েরা, তোমাদের স্ত্রীরা, আর তোমাদের ঐসব সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো আর ঐ ব্যবসায় যাতে তোমরা মন্দা পড়ার আশংকা করছো অথবা ঐ গৃহসমুহ যেখানে অতি আনন্দে বসবাস করছো, (এসব কিছু যদি) আল্লাহ ও তার রাসুলের চেয়ে এবং তার পথে সংগ্রাম করার চেয়ে তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার (শাস্তির) নির্দেশ পাঠিয়ে দেন”। (সুরা তাওবা-২৪)

আল্লাহ সুবানাহু ওয়া তাআলা তার দাসদের পরিশুদ্ধ করার জন্য পরীক্ষা নিবেন এবং পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি হবে সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন যাতে তার দাসেরা পরীক্ষা কৃতকার্য হতে পারে।
বর্তমানে আমাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ তো আছেই সেই সাথে আরো আছে হক পন্থী ব্যক্তিদের জীবন ইতিহাস যা থেকে আমরা জানতে পারি কি রকমের পরীক্ষা তাদের উপর আপতিত হয়েছে। মৌলিকতার দিক থেকে পরীক্ষাসমমূহ একই, যা অপরিবর্তনীয় কিন্তু যুগের ব্যবধানে পরীক্ষার উপায় উপকরনে শুধু পরিবর্তন আসছে।

একজন মুসলিম যখন ইসলাম পালন করবে এবং সেই দাওয়াত সমাজে নিয়ে যাবে সর্বপ্রথম তার বাধা আস্তে পারে পরিবার পরিজন নিকট আত্মীয় থেকে সাহাবীদের ক্ষেত্রে ও ঠিক এমনটা ঘটেছিলো উসায়েত বিন উমায়ের এর মা তাকে বেধে রেখেছিলেন, যাদের মা মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে তাকে দ্বীন ত্যাগ করতে বলেছিলেন, ইসলাম পালন প্রচারে আমাদের পরিবারও বাধার প্রাচীর হিসেবে দাড়াতে পারে। দাওয়ার কাজের জন্য হয়ত তার পার্থিব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষতি হতে পারে। তার চাকুরি চলে যেতে পারে বা হারাম চাকুরির সুযোগ আসতে পারে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইসলামের ডাকে হিজরতের কারনে সাহাবীরদের ব্যবসা, বাড়ীঘর, আত্তীয়-স্বজন ছেড়ে, মক্কা থেকে মদীনায় চলে যেতে হয়েছিল। দা’ওয়ার কারণে সামাজিক কিছু বাধার মুখে তাকে পড়তে হবে। তাকে সমাজে জঙ্গী, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতে পারে।

দা’ওয়াকারীকে রাস্ট্রীয় কিছু বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। দা’ওয়াহে প্রচার যাতে প্রসারিত না হয় তাই পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে পারে। পুলিশী হয়রানী, মামলা, হামলা ইত্যাদির মোকাবেলা করতে পারে। মানসিকভাবে দা’ওয়াহকারীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে। তার পরিবারের ক্ষতি, তার ক্ষতি, ক্যারিয়ার নষ্ট ইত্যাদি আসতে পারে।

দা’ওয়াহকারীর কাছে প্রলোভনও আসতে পারেএতা সাধারণত হতে পারে পরিবার ও সমাজ থেকে। দা’ওয়াহ ছেড়ে দিলে ভালো চাকরি অথবা পছন্দ অনুযায়ী মেয়ের সাথে বিয়ে অথবা দেশের বাইরে পাঠানোর স্বপ্ন। সবকিছুর পিছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দা’ওয়াহকারী যেন দা’ওয়াহর পথ থেকে ফিরে আসে।

দা’ওয়াহকারীর উপর আসতে পারে হামলা, রিমান্ড, জেল, হাজতবাস, নির্যাতন ইত্যাদি। তাকে ভীতিকরভাবে মিডিয়াতে উপস্থাপন, মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন ও এলাকায় নিয়ে আসার মাধ্যমেওন্যান্য দা’ওয়াহকারীদের ওপরও মানসিক নির্যাতন আসতে পারে। এই সবকিছুই রাসূল (সা) ও সাহাবা (রা)-দের উপরও এসেছিল। উনারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন ও সাফল্য লাভ করেছেন। ইসলামের প্রথম শহীদ আম্মার ও সুমাইয়াকে মক্কী জীবনে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র দা’ওয়াহর কারণে।

এসকল পরীক্ষাসমূহ যে একজ দা’ওয়াকারীর উপরই আসবে এমন না, বিভিন্ন পরীক্ষা বা একাধিক পরীক্ষা একসাথে আসতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দেন এসব পরীক্ষার সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করার।

“তোমরা ধৈর্য্য ও নামাজের সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন কাজ।” (সূরা বাকারাঃ ৪৫)

যখন রাসূল(সা)-কে কোন কাজ চিন্তার মধ্যে নিক্ষেপ করত তখন তিনি নামায আরম্ভ করে দিতেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি আমরাও পড়ি যেটা আমাদের অনুকূলে নয় তখন আমরা ধৈর্য্য ধারণ করব এবং নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ’র সাহায্য প্রার্থনা করব, নিশ্চয়ই আমাদের জন্য একটা উত্তম পথ বের করে দিবেন।

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের চিন্তা করো যখন তোমরা সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ’র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে” (সূরা মায়িদাঃ ১০৫)

সুতরাং, এই আয়াত থেকে অনেকে এই সিদ্ধান্তে পৌছে যে, মুসলিমগণ কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দা’ওয়াহ বহন না করলেও চলবে।

হুযায়ফা বিন ইয়ামান(রা) হতে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেছেনঃ “আমি বললাম যদি কোন মুসলিমের জামা’আত বা ইমাম না থাকে তাহলে কি হবে? তখন তিনি(সা) বললেন, অতঃপর তুমি এসমস্ত দলগুলিকে পরিত্যাগ করবে, যদিওবা তোমাকে কোন গাছের গুঁড়ি কামড়ে ধরে রাখতে হয় যতক্ষণ না তোমার মৃত্যু এসে যায়”।

লোকেরা এটি ধারণা করেছে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয় বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

এ আয়াত ও হাদীসগুলো ভুলভাবে বুঝার কারণে সবর সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণাটি ভুল। যার কারণে আমরা দেখি বর্তমান শাসকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা, সৎ কাজের আদেশ এবং অস কাজের নিষেধ, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহ’র আনুগত্য করে যাওয়া ইত্যাদি সবর হিসেবে গণ্য হয়না। বরঞ্চ ব্যক্তিগত কিছু আমল আখলাক পালন করা, সামাজিক বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করা, শাসকের বিরোধীতা না করা এবং বর্তমান কুফর ব্যবস্থায় অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে জীবনযাপন করাই সবর হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোনটাই সবর নয়। সবরের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের নিতে হবে নবী-রাসূল ও সাহাবা এবং পূর্ববর্তী দা’ওয়াহকারীদের থেকে।

সবর হল আল্লাহ’র প্রত্যেকটি হুকুম পালন করা এবং হুকুম পালনের ক্ষেত্রেকোন প্রতিবন্ধকতা আসলে ধৈর্য্য ধারণ করা ও কাজ চালিয়ে যাওয়া। বিলাল, মুস’আব, আম্মার, খাব্বাব ও অন্যান্য সকল সাহাবী থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই।

সবর হল আনসার ও মুহাজিরদের মত সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যে এক ইলাহ’র সাক্ষ্য দেওয়া ও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া। সবর হল বিলাল(রা)-এর মত সমস্ত বাঁধার মুখেও বিশ্বাসে উপর অটল থাকা। সবর হল আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদের(রা) কাফের শাসকগোষ্ঠীর সামনে কুর’আন তিলাওয়াত করা ও এর পরিণতি ভোগ করা। সবর হল আবদুল্লাহ বিন হুযায়ফার(রা) অত্যাচারী-অবিশ্বাসী শাসকের সামনে আল্লাহ’র মর্যাদাকে উর্ধে তুলে ধরা।

আমরা ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে দেখি সবর মানে আল্লাহ’র পথে দা’ওয়াত দিয়ে যাওয়া এবং কোন বাধা এলে ধৈর্য্যধারণের মাধ্যমে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করা, কখনোই আনুগত্য প্রদর্শন থেকে সরে যাওয়া নয় বা ইসলাম প্রচারের কাজ বন্ধ রাখা সবর নয়।

সবরকারীদের মর্যাদা আল্লাহ’র নিকট অত্যন্ত উঁচুতে। সবরকারীদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিনা হিসেবে জান্নাত দান করবেন। ইমাম যায়নুল আবেদীন(র) বলেনঃ কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেন- ধৈর্য্যশীলগণ কোথায়? আপনারা উঠুন এবং বিনা হিসেবে বেহেস্তে প্রবেশ করুন। একথা শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবেন এবং বেহেস্তের দিকে অগ্রসর হবেন, ফেরেশতাগণ তাদের দেখে জিজ্ঞেস করবেন কোথায় যাচ্ছেন? তাঁরা বলবেন, ‘বেহেস্তে’। ফেরেশতাগণ বলবেন, এখনো তো হিসেব দেয়াই হয়নি। তাঁরা বলবেন, ‘হা, হিসেব দেয়ার পূর্বেই’। ফেরেশতারা বলবেন , আপনারা কিরকম লোক? তাঁরা বলবেন আমরা ধৈর্য্যশীল লোক, আমরা সর্বদা আল্লাহ’র নির্দেশ পালনে লেগে ছিলাম, তাঁর অবাধ্যতা এবং বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকতাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমরা তাঁর উপর ধৈর্য্যধারণ করেছি এবং অটল থেকেছি। তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, বেশ, ঠিক আছে। আপনাদের প্রতিদান অবশ্যই এটাই এবং আপনারা র যোগ্য। যান, বেহেশতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন।

হযরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইর ইবনে সিনান(রা) বর্ণনা করেন, রাসূল(সা) বলেছেনঃ “মুমিনদের ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর।(কেননা)তার সকল কাজই কল্যাণপ্রদ। মুমিন ছাড়া অন্যের ব্যাপারগুলি এরকম নয়। তার আনন্দের কিছু ঘটলে সে আল্লাহ’ শোকরগুজারী করে, তাতে তার মঙ্গল সাধিত হয়। পক্ষান্তরে ক্ষতিকর কিছু ঘটলে সে ধৈর্য্য অবলম্বন করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকরই প্রমাণিত হয়”। (মুসলিম)

জুবায়ের