শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কিছু উপায়

بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله

ইসলামী জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতিশক্তির গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে যখন সহীহ হাদীস সংকলনে তা একটি মানদন্ড। তথাপি কুরআন হিফজ করা, হাদীস বর্ণনা করা এবং দ্বীনের প্রয়োজনীয় আরকান-আহকাম ধারন করার জন্য স্মৃতিশক্তির প্রখরতা অতীব প্রয়োজনীয়।

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কিছু করণীয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১। পরিপূর্ণ ইখলাস (اخلاص) অর্থ্যাৎ জ্ঞানর্জনের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্ধারণ করা। দুনিয়াবী কোন মোহ্ কিংবা জাহির করা যেনো একে কলুষিত না করে; তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিনিয়ত নিজের নিষ্ঠাকে প্রশ্ন করা।

২। গুনাহ্ থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে কবীরা গুণাহ্সমূহ থেকে। কেননা, দ্বীনী ইলম আল্লাহ্র এক অশেষ অনুগ্রহ। আর, আল্লাহর অনুগ্রহ সীমালঙ্গনকারীদের জন্য নয়।

৩। যা শিখা হয়েছে তার উপর আমল করা। কারণ, ইলমের (علم) দাবী আমল (عمل)

৪। শিখা পাঠসমূহ পুনরাবৃত্তি করা। অত্যন্ত পুরনো হলেও এই পদ্ধতি বেশ কার্যকরী।

৫। অন্যকে শিক্ষাদান করা এবং দাওয়ার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌছে দেয়া।

৬। মধু, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৭। এছাড়া ও সুন্নাহ্ভিত্তিক আরো পদ্ধতি রয়েছে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য।

কিছু দোয়া আমরা সবসময় পাঠ করতে পারি। নিম্নে কিছু দোয়া উল্লেখ করা হলো:

-رب زدني علما–‘হে আল্লাহ্1 আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও [১]

-“رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
  
হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও।আমার কাজকে সহজ করে দাও। আমার জিহ্বার জড়তা (বচনের ত্রুটি) দূর করে দাও।যাতে তারা আমার বলা কথা বুঝতে পারে[]
  
আল্লাহ্ তাআলা আমাদের আমল করার তৌফিক দিন।
سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك

امين
সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী


তথ্যসূত্র:

[১] সূরা ত্ব-হা: ১১৪
[২] সূরা ত্ব-হা: ২৫-২৮


মূলঃ ইসলামের ফিরে আসা

বুধবার, ২৮ মার্চ, ২০১২

খিলাফত ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর টিকে ছিল? পর্ব-১

খিলাফাহ জার্নালের একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে ভাষান্তরিত

একথা সর্বজন স্বীকৃত যাতে কোন সন্দেহ নেই যে, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে সারা বিশ্বের নেতা রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা) এর হাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ বিশ্বাসঘাতক কামাল আতাতুর্কের হাতে তা ধ্বংস হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বা খিলাফত ব্যবস্থা যে ধারাবাহিকভাবে টিকেছিল তা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এ ব্যবস্থার ধারাবাহিক অস্তিত্ব বুঝতে চাই, তাহলে দেখতে হবে প্রথমতঃ এ ব্যবস্থার কাঠামো কি ইতিহাস জুড়ে টিকেছিল কিনা। দ্বিতীয়তঃ এ কাঠামোতে সময়ের আবর্তে কি কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা। রাসুল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়ের ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো হলঃ

১। খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান
২। খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মুওয়ায়ীন আত তাফউয়ীদ)
৩। খলীফার নির্বাহী সহকারী (মুওয়ায়ীন আত তানফীদ)
৪। গভর্ণরবৃন্দ (উলাহ্)
৫। আমীর-উল-জিহাদ
৬। বিচার বিভাগ
৭। প্রশাসনিক বিভাগ
৮। উম্মাহ্ কাউন্সিল (মাজলিস আল-উম্মাহ্)

তাই আমরা যদি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১৩০০ বছরের ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই পরামর্শ সভা মাজলিস আল উম্মাহটাই শুধু বিভিন্ন সময়ে উপেক্ষিত বা অবহেলিত ছিল। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর মাজলিস আল উম্মাহর প্রতি কিছু সংখ্যক খলীফার উদাসীনতার অর্থ এই নয় যে, পরামর্শ সভা না থাকলেই ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফতের অবসান হয়ে গেল। অন্য সব স্তম্ভ টিকে থাকলে মাজলিসুল উম্মাহ বা শুরা ছাড়াও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে, যদিও শুরা উম্মাহর অধিকার। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ ও বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঘটলেও এমন কখনো হয় নি যে, মুসলিমরা খলিফা বিহীন ছিল।

নিজের পুত্রকে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়া বা বংশীয় শাসনের অভিযোগ খানিকটা সত্য এবং এটাও সত্য যে, খলীফা নিয়োগের বায়াতের পদ্ধতিতেও কখনো কখনো অনিয়ম দেখা যায়। কিন্তু এটা খিলাফতের ধারাবাহিকতাকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। অনেক সময় এমনও ঘটেছে যে, খলীফা তার ছেলেকে যোগ্য মনে করলে তার মৃত্যুর আগেই জনগণের কাছ থেকে ছেলের জন্য বায়াতের শপথ আদায় করেছিলেন। পরবর্তীতে তা আবার নবায়ন করেছেন। এ বায়াত মূলত প্রভাবশালী লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করত।

খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফত টিকে থাকার কথা ইসলামী পণ্ডিতরাও স্বীকার করেছেন। যদিও এদের মধ্যে দু একজন তিরমিযী শরীফের একটি হাদিসের কারণে প্রথম চার খলীফার পর পরবর্তী খলিফাদের ক্ষেত্রে খলীফাশব্দটি ব্যবহার করতে অপছন্দ করতেন। সে হাদিসটি হলঃ রাসুল (সা) বলেছেন, “আমার পর আমার উম্মাহর মধ্যে ৩০ বছর পর্যন্ত খিলাফত থাকবে তারপর শুরু হবে বংশীয় শাসন (মুলকান আদ্দুদান) [একই বর্ণনা-সুনানে আবু দাউদ (২/২৬৪) এবং মুসনাদে আহমদ (১/১৬৯) থেকেও পাওয়া যায়।] ইসলামী বিশারদগণ  ব্যাখ্যা করেন যে, যেহেতু এ হাদিসটি এ বিষয়ক অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে আপাত দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মত প্রদান করে তাই এই হাদিসের গূঢ় অর্থ ৩০ বছর পর খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবে বোঝাচ্ছে না।

জাবির বিন সামুরাহ (রা) বর্ণনা করেন, “রাসুল (সা) বলেন, দীন ইসলাম ততদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে যতদিন না আল্লাহর নির্ধারিত ক্ষণ উপস্থিত হয় অথবা কুরাইশ বংশীয় বারজন খলীফা তোমাদেরকে শাসন না করে।[সহিহ মুসলিম] এ হাদিস থেকে বোঝা যায় মুসলমানদের চার পাঁচ জন নয় বরং একাধিক সংখ্যক খলীফা শাসন করবেন। এ হাদিস অনুসারে খিলাফত ব্যবস্থা শুধু ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাস্তব সম্মত নয়। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কাজী আইয়াদ বলেন, “এই হাদিসটিতে যেখানে বলা হয়েছে আমার পর খিলাফত ৩০ বছর টিকে থাকবে, এর পর শুরু হবে বংশীয় শাসনযা পুর্ববর্তী এই হাদিসটির সাথে সাংঘর্ষিক- যত দিন না কুরাইশ বার জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করে, ইসলামী দ্বীন ততদিন টিকে থাকবে। [সহিহ মুসলিম] এ সাংঘর্ষিক মনে হওয়া বিবৃতির সমাধান হল-৩০ বছর খিলাফত টিকে থাকবে নবুয়্যতের আদলে অর্থাৎ সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফত ব্যবস্থার আদলে। বাস্তবে এই ত্রিশ বছর হযরত আবু বকর (রা) থেকে হাসান বিন আলী (রা) এর শাসনকালকেই বোঝায়। [এভাবেই অ্যান নববী তার সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখ করেছেন পৃষ্ঠা-৮২১। পাঠক লক্ষ্য করুন এ ত্রিশ বছরে চার জন নয় বরং পাঁচ জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রাসুল (সা) বলেন, “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, যখন এক মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোন নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তারা (রা) (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন, তখন আপনি আমাদের কি করতে আদেশ দেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা তাদের একজনের পর একজনের বায়আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। (বুখারী, মুসলিম)

উল্লিখিত হাদিস থেকে বোঝা যায় রাসুল (সা) এর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী না আসায় কার তত্ত্বাবধানে মুসলমানদের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হবে সেটা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন এবং সেটা হচ্ছে খিলাফত ব্যবস্থা ও খলীফার তত্ত্বাবধানে।

১২ জন খলীফার বিষয়টিও কাযী আইয়াদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন সম্ভবত হাদিসটিতে যে ১২ জন খলিফার কথা বলা হয়েছে তারা হল এমন ১২ জন খলিফা যাদের শাসনকালে ইসলামের শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি পেয়েছিল-উম্মাহ ঐ সকল নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং সর্বোপরি খলীফা হিসেবে উম্মাহর দেখাশুনাও তারা ঠিকভাবে করেছিলেন। [আস সুয়্যুতি তারিখ আল খুলাফা, পৃষ্ঠাঃ ১৪]

ইবনে হাজার বলেন, “এই হাদিসটি সম্পর্কে যে কয়েকজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার মধ্যে কাযী আইয়াদের যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ রাসুল (সা) এর কিছু সংশ্লিষ্ট সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েই তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেমনঃ এ সম্পর্কে রাসুল (সা) বলেন, লোকেরা তাদেরকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে......। (ফাতহুল বারী) এর পাশাপাশি ইবনে হাজার কয়েকজন খলিফার উদাহরণসহ ঐতিহাসিক সত্যতা তুলে ধরেন।

চলবে .........

সোমবার, ২৬ মার্চ, ২০১২

গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত নয়

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)


প্রায় সব গবেষণায় ধরে নেয়া হয় যে, গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত - হোক সেটা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত কিংবা বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির জগৎবিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যানকার ওলসেন তার পুরষ্কারপ্রাপ্ত ‘Power and Prosperity’ (2000) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, অন্যান্য যে কোন সরকার ব্যবস্থার চেয়ে গণতন্ত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতি বেশী হয়ে থাকে। ওলসেন যুক্তি প্রদান করেন যে সাংঘর্ষিক পরিবেশ সবসময় ধ্বংসপ্রবণতা ও দুর্নীতিকে উষ্কে দেয়, অন্যদিকে একনায়কতন্ত্রে শাসককে বেশী সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে লুটপাটের প্রবনতা দেখা যায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনি পর্যবেক্ষণ করেন,ব্যক্তি এবং তার উন্নয়নকে এ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়-কেননা শাসককে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। ওলসেন গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রার মধ্যে সভ্যতার উম্মেষ দেখতে পান যা অগ্রগতির পথকে সুগম করে। এর ফলে জনগণের ইচ্ছার সাথে আরও নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে সুশাসন ফলপ্রসু হয়ে উঠতে পারে।

অন্যান্য গবেষণায়ও এটা বেরিয়ে এসেছে যে, গণতন্ত্র হল উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এমনকি ইলিয়নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইভান রডরিক যুক্তি প্রদান করেন যে, “বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান (মেটা ইনস্টিটিউশন) হিসেবে গণতন্ত্র অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং গণতন্ত্রই হল সাফল্যের একমাত্র পূর্বশর্ত


গণতন্ত্রে প্রবেশ
(সার্বজনীন ভোটাধিকার অর্জনের বছর)
নিউজিল্যান্ড
১৯০৭
ডেনমার্ক
১৯১৫
সুইডেন
১৯১৮
যুক্তরাজ্য
১৯২৮
ফ্রান্স
১৯৪৬
জার্মানী
১৯৪৬
ইতালী
১৯৪৬
বেলজিয়াম
১৯৪৮
যুক্তরাষ্ট্র
১৯৬৫


যদিও গণতন্ত্রের কোন সর্বসম্মত সংজ্ঞা নেই; তারপরও গণতন্ত্রের যে কোন সংজ্ঞায় দুটি মৌলিক নীতি থাকতে হবে। প্রথম নীতিটি হল ক্ষমতায় সমাজের সকলের সমান অধিকার থাকতে হবে এবং সকলে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তি ভোগ করবে।
      
যেসব রাষ্ট্র গণতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিস্তার চায় তাদেরকে উপরের উপাত্তের সাথে মিলিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় যে, গণতন্ত্রের পক্ষে উপরে উল্লেখিত যুক্তিসমূহ মেলে না। অধিকাংশ উন্নত দেশসমূহে উন্নয়ন সুনিশ্চিত হয়েছে অগণতান্ত্রিক নীতিমালার কারণে এবং গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিই  উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। পশ্চিমে যখন সর্বপ্রথম ভোটকে কার্যকরী করা হয়-তখন এ সুযোগ কেবলমাত্র কিছু ধনী ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং ভোটের গুরুত্বের দিক থেকে সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রভৃতিকে প্রাধান্য দেয়া হত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পর ভোটাধিকার আইন ১৯৬৫ এর মাধ্যমে শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭০ সালে মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের ভোটের অধিকার সংরক্ষণ করা হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা দক্ষিণের রাজ্যসমূহ ভোট কর প্রদানের মাধ্যমে বৈষম্যের স্বীকার হয়।

ফ্রান্স ১৮৩০ সালে ত্রিশোর্ধ ব্যক্তিদের ৩০০ ফ্রাঙ্ক প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুবিধা প্রদান করে - যারা ৩২ মিলিয়ন জনসংখ্যার মাত্র ০.০২% ছিল। ১৮৪৮ সালে পুরুষদের ভোট প্রদান সার্বজনীন হয় এবং শিল্পায়ন হওয়ার পর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। জাপান ব্যাপক সামরিক শক্তি অর্জনের পর যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারে চাপ দেয় তখনই ভোটদানকে সার্বজনীন করে। মার্কিনীরা জাপানকে ১৯৫২ সালে ভোট প্রদানের ক্ষমতা দিতে সম্মত হলেও তার নিজের দেশের জনগণকে পুরোপুরিভাবে তা দিতে আরও ১৩ বছর সময় নেয়।

১৮০০ সালে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদের স্বর্ণযুগ-তখন সেখানে মাত্র ৩ ভাগ জনগণ ভোটের অধিকার পায়। মধ্যযুগ থেকে প্রতি জেলায় বড় বড় ভূস্বামীরা কেবলমাত্র হাউস অব কমনসের সদস্য নির্বাচিত করতে পারত। এই ব্যবস্থা ভূমিহীন ব্যবসায়ী এবং দক্ষ শ্রমিকদের ভোটদানকে অস্বীকার করত। শত শত বছর ধরে সমৃদ্ধ অঞ্চলসমূহকে সংসদে বারংবার গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হত। অথচ নতুন গড়ে উঠা শহরসমূহ সেভাবে উল্লেখ করা হত না। সংসদের কিছু কিছু আসন কিছু ব্যক্তির জন্য সবসময় সংরক্ষিত থাকত। ১৮৬৭ সালে জনসংখ্যার শতকরা ১৩ ভাগ লোক ভোট দিতে পারত। ৬১বছর পর ১৯২৮ সালে পুরুষ মহিলা উভয়ের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত হয়। সুতরাং গণতন্ত্র এসেছে উন্নয়নের পর এবং বৃটেনের উন্নয়নে এর কোন ভূমিকা ছিল না।

উন্নত বিশ্বকে অনুসরণ করে বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক বেশী পরিমাণে জনগণকে ভোটার অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। অথচ গণতন্ত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে-এ ধারণা গ্রহণ করার আগে সতর্কতা অবলমম্বন করা উচিত।

চীন, রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং জার্মানী কার্যতই প্রমাণ করেছে যে, গণতন্ত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত নয়। রাশিয়া এবং চীন পশ্চিমা উদারপন্থী গণতন্ত্রকে অনুসরণ না করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ এগিয়ে গেছে। সেকারণে এখন প্রশ্ন করার সময় এসেছে, গণতন্ত্রের সাথে অর্থনৈতিক অগ্রগতির আদৌ কি কোন সম্পর্ক আছে?

অর্থনৈতিক অগ্রগতি বলতে একটি দেশের নিজস্ব স্বার্থে জনগণকে সাথে নিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে শিল্পোন্নত হওয়াকে বুঝায়। এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দরকার যা পুরো দেশকে একটি লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবে। আর না হয় তা হবে দ্বান্দ্বিক। ব্রিটেনের মূল প্রণোদনা আসে গীর্জার আধিপত্য খর্ব করে উদার মূল্যবোধ গ্রহণ করার মাধ্যমে। মূলত: এর ভিত্তিতে তারা একত্রিতও হয়েছিল। অভিজাত শ্রেনী কর্তৃক সম্পদ ও ভূমির মালিক হবার সুযোগ লাভ এবং এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিকতার গতিপথ নির্ধারনের ক্ষমতা তাদের উন্নতি সুনিশ্চিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জারদের ব্যর্থতা থেকে প্রণোদনা লাভ করে এবং পরবর্তীতে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে একত্রিত হয়। পরবর্তীতে তাদের অর্থনীতিবিদেরা সমাজতান্ত্রিক জীবনদর্শন থেকে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে। মার্কিনীরা ব্রিটেনের কাছ থেকে মুক্ত হবার পর একত্রিত হয়ে কাজ শুরু করে। আর জাপানীরা যখন বুঝতে পারল তারা উন্নত বিশ্বব্যবস্থা থেকে কতটা পিছিয়ে আছে, তখনই অর্থনীতিকে উন্নত করার যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ল। চীন একমাত্র দেশ-যার উন্নয়ন কেবলমাত্র আদর্শিক নয়। তবে সেদেশের নীতি নির্ধারকরা জনগণের ভেতর চীনারা একটি মহান জাতি এ চেতনাবোধ জাগ্রত করতে সমর্থ হয়েছে। জার্মানীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এমনকি তারা বর্ণবাদকে উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করে।

প্রকৃত প্রস্তাবে গণতন্ত্র উন্নয়নের জন্য কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। সেকারণে উপরে উল্লেখিত দেশসমূহ কখনই জনগণের রায়ের জন্য অপেক্ষমান থাকেনি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক খুবই দুর্বল। বর্তমানে যারা গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলে তারা গণতান্ত্রিক হয়েছে উন্নত হবার পর। আর চীন প্রমাণ করে উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র কোন বিষয়ই নয়।