প্রশ্ন ও উত্তর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রশ্ন ও উত্তর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১২

হিকমত

নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি শেখ ওমর রাসেল অনুদিত "এটাই আমার পথ" এর একাংশ হতে গৃহীত।

হিকমতশব্দটি আরবি হাকামাশব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো শাসন করা বা রায় দেয়া। এই শব্দটি কুরআনে বিশবার ব্যবহার হয়েছে। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ নবুয়্যত, কুরআন, সুন্নাহ, বাস্তবজ্ঞান এবং বাস্তবজ্ঞানের আলোকে কাজ করা।

বিভিন্ন আয়াতে হিকমতশব্দের কিছু প্রয়োগ নিম্নরূপঃ

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنتَ العَزِيزُ الحَكِيمُ

হে রব, তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসূল প্রেরণ করুন যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী। [সূরা বাকারাঃ ১২৯]

এই আয়াতে হিকমতশব্দের অর্থ হলো ওহীর তিলাওয়াত ও সুন্নাহ দ্বারা রাসূল (সা) কর্তৃক প্রদত্ত ওহীর ব্যাখ্যা।

يُؤتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاء وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلاَّ أُوْلُواْ الأَلْبَابِ

তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন এবং যাকে হিকমত দান করা হয়, সে প্রভূত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়। কিন্তু উপদেশ শুধু তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান। [সূরা বাকারাঃ ২৬৯]

এই আয়াতে হিকমতশব্দের অর্থ হলো কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ও বোধগম্যতা এবং বিশুদ্ধ ও সঠিক পদ্ধতিতে কথা ও কাজ করার সক্ষমতা। ইবনে আব্বাসের মতে, এই আয়াতে হিকমত শব্দের অর্থ কোরআনের জ্ঞান। [তাফসীরে ইবনে কাসীর]

لَقَدْ مَنَّ اللّهُ عَلَى الْمُؤمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبْلُ لَفِي ضَلالٍ مُّبِينٍ

আল্লাহ ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ [কুরআন] পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। বস্তুত তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট। [আলে-ইমরানঃ ১৬৪]

এই আয়াতে হিকমতশব্দের অর্থ হলো সুন্নাহ।

রাজনীতি বা দাওয়ার ক্ষেত্রে হিকমতব্যবহার করতে বলা হয়েছে যে আয়াতে সেখানে নির্দেশ হলোঃ

ادْعُ إِلِى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

আপনার পালনকর্তার পথের দিকে আহবান করুন হিকমত সহকারে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন পছন্দনীয় পন্থায়। [সূরা নাহলঃ ১২৫]

এই আয়াতে হিকমতের অর্থ কোনো কোনো তাফসিরবিদ কুরআন, কেউ কেউ কুরআন-সুন্নাহ এবং কেউ কেউ অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ স্থির করেছেন। [তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১২]

রুহুল মাআনিতে আল্লামা আলুসী (রহ) আল-বাহরুল মুহীতের সূত্রে বলেছেনঃ

أَنَهَا الْكَلام الصواب الواقع مِن النفس أجمع موقع

এমন বিশুদ্ধ বাক্যকে হিকমত বলা হয় যা মানুষের মনে আসন করে নেয়।

সুতরাং দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে হিকমতশব্দটি বহুবিধ অর্থে ব্যবহৃত হলেও প্রতিটি অর্থই কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংশ্লিষ্ট। উপরিউক্ত কোনো একটি আয়াতেও হিকমতশব্দটি কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত কাজের লাইসেন্স অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বরং যেসব কাজের পক্ষে কুরআন-সুন্নাহতে অকাট্য প্রমাণ আছে, সেসব কাজ করার মধ্যেই হিকমত নিহিত। আর যেসব কাজ হারাম হওয়ার পক্ষে কুরআন-সুন্নাহতে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, সেসব কাজ বর্জন করার মধ্যে হিকমত নিহিত। তাই কুরআন-সুন্নাহতে অকাট্যভাবে হারাম প্রমাণিত কোনো কাজ বা মতবাদ গ্রহণ করার মধ্যে হিকমত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র বা জাতীয়তাবাদের মতো কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে হারাম প্রমাণিত মতবাদের মধ্যে হিকমত খোঁজেন কিংবা যারা ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী শক্তি বা নারী নেতৃত্বের সাথে জোট করার জন্য হিকমতের দোহাই দেন, তারা সুসস্পষ্টভাবে ভুল পথে আছেন।

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

একুশ শতকে ইসলাম - জন্মপূর্বে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণঃ ইসলামী শারী’আহর হুকুম

খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্নভাবে তার কাঙ্খিত সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়েছে এবং অনাকাঙ্খিত সন্তানের জন্ম নিরোধ ও বর্জনের জন্য অতীতে প্রচলিত বহুবিদ উপায়ও অবলম্বন করেছে। আইয়্যামে জাহিলিয়ার যুগে, ছেলে সন্তান খুবই কাঙ্খিত ছিল কেননা সে যুদ্ধ-বিগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং তাদের গোত্রকে উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে পরিচালিত করবে। অপরদিকে, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পথিত করে ধ্বংস করা হতো। যেমনঃ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

আর যখন কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো।” [সূরা আত-তাকবীরঃ ৯]

যখন অনাকাঙ্খিত সন্তান নষ্ট করার অন্যান্য পদ্ধতি উদ্ভাবিত হলো, যেমনঃ মায়ের গর্ভাশয় পর্যবেক্ষণ করে সন্তানটির লিঙ্গের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, মানুষ তখন সন্তানটি অযাচিত লিঙ্গের হলে গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তানটিকে ধ্বংস করার উপায় অবলম্বন করে।

পরবর্তীকালে যখন আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি হলো এবং সেই সাথে গর্ভাশয়ে অবস্থিত ভ্রুনটি  সহজেই পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতি সহজতর হলো তখন তারা উদ্ভাবন করলো যে, জিনের এসিডিক প্রবণতা চূড়ান্তভাবে কন্যা সন্তানের দিকে ধাবিত হয়, অপরদিকে এলকেলিন জিন পুত্র সন্তানের দিকে ধাবিত হয়। ফলে তারা সঙ্গমের পূর্বে নারীর যোনিপথে উপযুক্ত একটি ক্ষারযুক্ত (এলকেলিন) পরিবেশ তৈরীর চেষ্টা করলো। আর এভাবেই তার এলকেলিন ডুশ (Douch) নামে এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করল যা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করবে।

পরবর্তীতে তারা খাদ্যভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অবলম্বন করলো যা নারীর দেহে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরীতে সহায়তা করবে। এই গবেষণার মাধ্যমে তারা অনুধাবন করতে পারল যে, খাদ্য প্রক্রিয়া গর্ভাশয়ে অবস্থিত ডিম্বকোষের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রবণতাকে দুইভাবে প্রভাবিত করে।

প্রথমতঃ এই প্রক্রিয়া নারীর যোনিপথে ও গর্ভাশয়ে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরী করে। তারা দেখতে পেল যে, পটাশিয়াম ও সোডিয়াম গর্ভাশয়ের মৌলিক অবস্থাকে এলকেলিনে রূপান্তর করে যা পরবর্তীতে একটি পুত্র সন্তান জন্মের দিকে ধাবিত হয়। অপরদিকে ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালশিয়াম এমন একটি এসিডিক পরিবেশ তৈরী করে যা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।

দ্বিতীয়তঃ খাদ্য প্রক্রিয়া ডিম্বাণু প্রাচীরকে প্রভাবিত করে এবং একে নারী বা পুরুষ যেকোন শুক্রাণু গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। আর এভাবেই তারা দম্পতিদেরকে বিশেষ করে নারীদেরকে পুত্র সন্তান লাভের জন্য বিশেষ এক ধরনের ডায়েট (খাদ্যাভ্যাস) গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করে। যে ডায়েট এলকেলিনের পরিবেশ নিশ্চিত করে যেমনঃ লবনাক্ত গোশত খাওয়া, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করা, মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ করা, ফলমূল খাওয়া এবং পটাশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। এরূপ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এলকেলিন পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

অপরদিকে যখন কন্যা সন্তানের আকাঙ্খা করা হয় তখন তারা এমন খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেয় যা শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করবে যেমনঃ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ, কম লবন খাওয়া, গোশত পরিহার করা বিশেষ করে লবনাক্ত গোশত, ফলমূল, মসলাযুক্ত ও সুগন্ধিযুক্ত খাবার পরিহার করা এবং  ক্যালশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। ঐ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করে।

পরবর্তীতে তারা অন্য এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করল যেখানে তারা দেখলো যে, যদি গর্ভাশয়ে নারীর ডিম্বাণুটি পুরুষের শুক্রাণুর আগে প্রবেশ করে অর্থাৎ যখন নারীর ডিম্বাণুটি নির্গত হয় এবং পুরুষের শুক্রাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন আশা করা যায় যে, সন্তানটি পুত্র সন্তান হবে। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে নির্গত হয় এবং নারীর ডিম্বাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন সন্তানটি কন্যা সন্তান হবে বলে ধরে নেয় যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পরপরই সঙ্গম করা হয় তবে সন্তানটি খুব সম্ভব পুত্র সন্তান হবে। অন্যাথায় কন্যা সন্তান হবে। অর্থাৎ গর্ভাশয়ে ডিম্বাণু অবস্থানকালে যদি সঙ্গম করা হয় (ডিম্বাশয় থেকে ডিম্ব নির্গত হওয়ার একদিনের মধ্যে) তখন পুত্র সন্তান হবে। আর যদি ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বেই সঙ্গম করা হয় তবে কন্যা সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ফলে তারা পরামর্শ দেন যে, যদি নিষিক্ত ডিম্বাণুতে অনাকাঙ্খিত সন্তান জন্মের সম্ভাবনা থাকে তবে বীর্যপাতের ঠিক পূর্বমুহুর্তে সঙ্গমের বিরতি টানা বা আজলকরা (অথবা Contraception ব্যবহার করা) উচিৎ।

আর যদি কাঙ্খিত সন্তানের সম্ভাবনা থাকে তবে সঙ্গম চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। ফলে আজল বা সঙ্গমে বিরতি এবং Contraception সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের একটি মাধ্যমে পরিণত হলো।

এপদ্ধতি কার্যকর করার জন্য নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার সময়ের উপর দৃষ্টি রাখতে হয় যাতে করে যদি পুত্র সন্তান কাঙ্খিত হয় তাহলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বে যেন সঙ্গম না করা হয় অর্থাৎ গর্ভাশয়ে পুরুষের শুক্রাণু প্রবেশের পর যেন স্ত্রীর ডিম্বাণু নির্গত না হয়। আর এজন্য এসময়ে আজল অথবা Contraception ব্যবহার করা হয় এবং পুরুষকে তার সঙ্গম নিয়ন্ত্রণ করতে হয় যেন গর্ভাশয়ে স্ত্রীর ডিম্বাণু বিদ্যমান থাকাবস্থায় পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হয়।

অপরদিকে, কন্যা সন্তান কাঙ্খিত হলে স্ত্রীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার মুহুর্তে কিংবা তার ঠিক পরপরই যেন সঙ্গম না করা হয় বরং ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহুতেই যেন সঙ্গম করা হয়। কেননা যদি ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়ের অতি পূর্বেই সঙ্গম হয় তবে ডিম্বাণুটি নিষিক্ত হওয়ার পূবেই পুরুষের শুক্রাণুটি মারা যাবে।

এ সম্পর্কে রাসূলের (সাঃ) একটি হাদীস আছে। রাসূল (সাঃ) বলেন, পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে পুরুষের বীর্যের পূর্বে নারীর বীর্য নির্গত হয় এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে নারীর বীর্যের পূর্বে পুরুষের বীর্য নির্গত হয়।” [বোখারী]

এই হাদীসটি ইমাম মুসলিমও তার সহিহ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন।

এই হাদীস ব্যাখ্যায় ইমাম মুসলিম (রহ.) হযরত ছাওবান (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস বর্ণনা করেন। বর্ণনাকারী বলেন, একবার এক ইহুদী ধর্মযাজক রাসূলের (সাঃ) এর নিকট এসে কিছু প্রশ্ন করল। একপর্যায়ে সে পুত্র সন্তানের প্রসঙ্গে আসলো তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, “যখন তারা (স্বামী/স্ত্রী) যৌনমিলন করে এবং পুরুষের সারবস্তু (শুক্র) নারীর সারবস্তুর (ডিম্ব) উপর বিজয়ী হয়, তখন তা পুত্র সন্তান হয় আর তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশেই সৃষ্টি হয়। আর যখন নারীর সারবস্তু পুরুষের সারবস্তুর উপর বিজয়ী হয় তখন তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশেই কন্যা সন্তান হয়।

পুরুষের শুক্র নারীর ডিম্বের উপর বিজয়ী হওয়ার অর্থ হলো নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পর পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হওয়া। আর এজন্য গর্ভাশয়ে এ দুটি উপাদানের (শুক্র ও ডিম্ব) মধ্যে যে কোন একটিকে আগে থেকেই বিদ্যমান থাকতে হবে। আর তখনই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্দেশে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে অথবা বিপরীতে কন্যা সন্তান জন্ম নিবে। অর্থাৎ নারীর ডিম্ব পুরুষের শুক্রের উপর বিজয়ী হবে অর্থাৎ তা পুরুষের শুক্রের পরে ও তার উপর বর্তিত হবে।

অতঃপর তারা এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অবতারণা করল, তা হলো সিলেক্টিভ স্পার্ম ভ্যাকসিনেশন। এই পদ্ধতিতে পুরুষের শুক্রের Y ক্রোমোজোম থেকে X ক্রোমোজোমকে পৃথক করে গর্ভাশয়ের বাইরে একটি টেস্টটিউবে রাখতে হয় এবং পরবর্তীতে তা গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় উপনীত হয়েছেন যে, পুরুষের শুক্রাণুতে Y এবং X উভয় ক্রোমোজোমই বিদ্যমান থাকে (Y পুরুষ ক্রোমোজোম আর X স্ত্রী ক্রোমোজোম) আর নারীর ডিম্বাণুতে শুধু XX ক্রোমোজোম থাকে। তারা উদ্ভাবন করলেন যখন পুরুষের শুক্রাণুর Y ক্রোমোজোমটি নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন YX জিন গঠিত হয় যা পরবর্তীতে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রোমোজোম নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন একটি XX জিন গঠিত হয় যার ফলে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সে অনুযায়ী X Y ক্রোমোজোমকে পৃথক করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কেউ যদি পুত্র সন্তান চান তাহলে তারা নারীর ডিম্বাণুর সাথে পুরুষের Y ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে একটি টেস্টটিউবে স্থাপন করেন। আর কন্যা সন্তান চাইলে নারীর ডিম্বাণুর সাথে X ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে টেস্টটিউবে স্থাপন করেন।

এছাড়া আরও একটি পদ্ধতি আছে যা কিছুটা ভিন্ন মাত্রার। এই পদ্ধতিতে টেস্ট টিউবে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণুর সাথে YY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় কন্যা সন্তান আর XY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় পুত্র সন্তান। অতএব, পুত্র সন্তান চাইলে তার (স্ত্রী) গর্ভাশয়ে XY ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়। অপরদিকে কেউ কন্যা সন্তান চাইলে তার মধ্যে XX ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়।

উভয় পদ্ধতির উদ্দেশ্যই এক, তথাপি প্রথম পদ্ধতিতে নিষিক্ত করার পূর্বে পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে পরীক্ষা করে X Y ক্রোমোজোম পৃথক করা হয় আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে নিষিক্ত ডিম্বাণু পরীক্ষা করে XX (স্ত্রী) বা XY (পুরুষ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের উপরোক্ত বাস্তবতা উপলদ্ধির পর নিম্নে ইসলামী শারীআহ্র হুকুম বর্ণনা করা হলোঃ

(ক) গর্ভাবস্থায় কোন সন্তান হত্যা করা হারাম কেননা তা উদ্দেশ্যমূলক ও ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয় যার শাস্তি হলো পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া। আর পৃথিবীতে এর শাস্তি হলো নিহতের অভিভাবক যদি ক্ষমা না করেন তবে কিসাস কার্যকর করতে হবে আর নিহতের অভিভাবক ক্ষমা করে দিলে মুক্তিপন প্রদান করতে হবে।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, “আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুসলমানকে হত্যা করে তার পরিণাম হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তার উপর আল্লাহ্র ক্ষোভ ও অভিশাপ আর তার জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।” [সূরা নিসাঃ ৯৪]

(খ) যদি পিতামাতা গর্ভাশয়ে অবস্থিত কোন ভ্রুনকে অনাকাঙ্খিত মনে করে হত্যা করে অর্থাৎ ভ্রুনটি হলো কন্যা আর পিতা পুত্র সন্তান কামনা করছেন অতঃপর তিনি ভ্রুনটি হত্যা করলেন। এটা সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং শাস্তিযোগ্য পাপ।

বুখারী ও মুসলিম থেকে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার হুযাইল গোত্রের দুই মহিলার মধ্যে ঝগড়া বাধলো তখন একজন অপরজনকে লক্ষ্য করে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো এতে সে মহিলার গর্ভপাত হয়ে গেল। তখন রাসূল (সাঃ) বিচারের রায় দিলেন যে, ভ্রুন হত্যাকারীকে মুক্তিপন হিসেবে একজন পুরুষ বা স্ত্রী দাস/দাসী মুক্ত করতে হবে।

(গ) সাময়িকভাবে যৌন মিলন থেকে বিরত থাকা বা যৌনলিমন করার সময় বীর্যপাতের পূর্বে আজল করা, নির্দিষ্ট কোন খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ করা, এসিডিক বা এলকেলিন যেকোন ধরনের ঢুশ ব্যবহার করা বা যোনিপথ ধৌত বা পরিস্কার করা এইসব কিছুই জায়েয। এতে কোন ত্রুটি নেই।

স্ত্রীর যোনিপথের বাইরে বীর্যপাত বা আজল করা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহ.) আতা কর্তৃক যাবির এর রেওয়াতে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সময়ে যখন কুরআন নাযিল হতো তখন আজল করতাম। ইমাম মুসলিম কর্তৃক এরূপ আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়, আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সময়ে আজল করতাম, তিনি (সাঃ) তা জানতেন এবং আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেননি।

খাদ্য বা ঢুশ গ্রহণের ক্ষেত্রে এগুলো খাদ্য, পানীয় ও গোসলের দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত।

(ঘ) পুরুষের শুক্রাণু থেকে পুরুষ ক্রোমোজোম ও স্ত্রী ক্রোমোজোম আলাদা করা অতঃপর স্ত্রীর ডিম্বাণুকে পুরুষের Y ক্রোমোজোমে রসাথে নিষিক্ত করা (পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে) অথবা X ক্রোমোজোমের সাথে নিষিক্ত করা (কন্যার ক্ষেত্রে) অথবা পুরুষ ও স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে কাঙ্খিত লিঙ্গের ক্রোমোজোমকে গর্ভাশয়ে স্থাপন করা এসকল প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি জায়েয নাই। কেননা এগুলো গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে চিকিৎসা বা গর্ভধারণের উপযোগী করার কোন প্রক্রিয়া নয়। এবং এ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবে কোন পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা স্ত্রীর ডিম্বাশয়কে টেস্টটিউবে নিষিক্ত করণের চিকিৎসা পদ্ধতি বলেও বিবেচিত নয়। এটা বরং নারী ও পুরুষ জিনকে পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া, এটা এমন কোন প্রক্রিয়া নয় যা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে গর্ভধারণে সক্ষমতা দিবে। সংক্ষেপে এটা কোন চিকিৎসা বা বন্ধাত্ব দূরীকরণের কোন উপায়ও নয়।

এ প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন কারো গুপ্তাঙ্গ প্রদর্শন ব্যতিত সম্ভবপর নয়। কেননা স্ত্রী ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে ও তা প্রতিস্থাপন করতে অবশ্যই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে হবে। এরূপ প্রদর্শন সম্পূর্ণ হারাম এবং শুধুমাত্র চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন অনুমোদিত অন্য কোন কারণে নয়। যেহেতু উপরোক্ত শুক্রাণু ও ডিম্বাণু পৃথকীকরণ ও নির্ধারণের বিষয়টি চিকিৎসা সংক্রান্ত কোন বিষয় নয় সেহেতু এই উদ্দেশ্যে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন জায়েয নেই এবং তা হারাম।

পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা উচিৎ যা মূলতঃ ইসলামের আকীদা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ এসকল পদ্ধতি ও গবেষণার মানে এই না যে মানুষের সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে, মানুষ শুধু নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এবং নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষ্ণ করতে পারে, যেগুলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্ধারিত এবং তিনি নারী-পুরুষের মধ্যে এই বৈশিষ্টগুলো সন্নিবিহিত করেছেন। মানুষ শুধু এই মহিমান্বিত সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতির ব্যাখ্যা প্রদান ও পর্যালোচনা করতে পারে, সে তার তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বিশেষ কোন খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারে। সে হয়তো পুরুষ ক্রোমোজোম থেকে স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে স্ত্রীর গর্ভাশয়ের বাইরে নিষিক্ত করে তা গর্ভাশয়ে পুনঃস্থাপন করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সকল প্রক্রিয়া কোন আত্মা বা রুহ সৃষ্টি করতে পারবেনা কেননা তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআলা যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে মনস্থ হন শুধুমাত্র তখনই সে বস্তুটি অস্তিত্বে আসে আরআল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যদি ইচ্ছা পোষণ না করেন তবে মানুষের সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা সত্বেও কোন কিছুই সৃষ্টি হতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহ্ তাআলা যাকে অস্তিত্বে আনতে চান তাই আসে আর যাকে চান না তা অস্তিত্বে আসতে পারেনা।

অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং একমাত্র তিনিই নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেন যা পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত; তন্মধ্যে কতিপয় হলোঃ

তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক, তিনি ব্যতিত অন্য কোন ইলাহ নেই। তিনি সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর তিনি সকল বিষয়ের উপর অভিভাবক।” [সূরা আল-আনআমঃ ১০২]

হে মানবজাতি! একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং সতর্কভাবে তা শ্রবণ কর। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ ব্যতিত অন্য কোন উপাস্যের দিকে আহ্বান করে, যদি তারা সকলে একটি উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় তবুও তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না। আর যদি মাছিটি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয় তাদের কোন ক্ষমতা নেই তারা মাছির কাছ থেকে তা উদ্ধার করবে। অনুসন্ধানকারী ও অনুসন্ধানের বস্তু উভয়ই দুর্বল।” [সূরা হজ্জ্বঃ ৭৩]

নিশ্চয়ই আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সর্বময় মালিক আল্লাহ্ তাআলা, তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা যাকে ইচ্ছা পুত্র কন্যা উভয়ই দান করেন, যাকে ইচ্ছা বন্ধা করেন, নিশ্চয়ই তিনি মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান।” [সূরা আশ-শূরাঃ ৪৯-৫০]

নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তা।” [সূরা হজ্জ্বঃ ৮৬]

যে সৃষ্টি করে আর যে সৃষ্টি করে না উভয়ই কি সমান? তবুও কি তোমরা বুঝো না।” [সূরা নাহলঃ ১৭]

ইহাই আল্লাহ্র সৃষ্টি। সুতরাং আমাকে দেখাও যে, তারা (আল্লহ্ ব্যতিত তোমাদের অন্য উপাস্যগণ) কি সৃষ্টি করেছে? বরং জালিমরা (মুশরিক, পাপাচারী, আল্লাহ্র একত্ববাদে অবিশ্বাসী) স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।” [সূরা লোকমানঃ ১১]

হে মানবজাতি! যদি তোমরা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দিহান থাকো তবে ভেবে দেখ যে নিশ্চয় আমরাই তো তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর অপবিত্র পানি (শুক্র) থেকে, অতঃপর জমাট রক্ত থেকে, অতঃপর পূর্ণ ও অপূর্ণ মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের নিকট আমাদের কুদরত ব্যক্ত করার জন্য এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামত জরায়ুতে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রাখি, অতঃপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদার্পন কর, অতঃপর তোমাদের কারো মৃত্যু হয় যৌবনের পূর্বেই আবার তোমাদের কেউ দুর্দশাগ্রস্থ বার্ধক্যে পৌঁছাও ফলে যে বিষয় তার জানা ছিল তাও সে ভুলে যায়, তোমরা ভূমিকে শুষ্কাবস্থায় দেখতে পাও অতঃপর যখন আমরা তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা শস্য-শ্যামল হয় এবং আমরা তাতে নানাবিধ সুন্দর উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে থাকি।” [সূরা হজ্জ্বঃ ৫]

আর নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে মাটির সারবস্তু থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাকে শুক্রাণুরূপে নিরাপদ স্থানে রাখি, অতঃপর শুক্রবিন্দুকে জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত করি, অতঃপর সেই জমাটবাঁধা রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করি, অতঃপর সেই মাংসপিন্ডকে অস্থিতে রূপান্তর করি, পরে অস্থিকে গোশত দ্বারা ঢেকে দেই, অতঃপর তাকে আমরা স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে পরিণত করি। অতএব আল্লাহ্ মহান, উত্তম স্রষ্টা।” [সূরা মুমিনুনঃ ১২-১৪]

হে মানবজাতি! কিসে তোমাদেরকে মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে বিরত রেখেছে? যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করে সুঠাম স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য দান করেছেন। এবং তিনি যে আকৃতি চেয়েছেন সেই আকৃতিই দিয়েছেন।” [সূরা ইনফিতারঃ ৬-৮]

তিনিই তার ইচ্ছানুযায়ী গর্ভাশয়ে তোমাদের আকৃতি দান করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আলি-ইমরানঃ ৬]

আকীদা ও বিশ্বাস সংক্রান্ত এ বিষয়গুলো প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিৎ যেন সে হেদায়েত ও সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই পৃথিবীকে বহুবিধ জ্ঞান ও চিন্তার উপকরণ দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছেন যা মানুষ জানত না, আর আল্লাহ্ তাআলা মানুষকেও বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাশক্তি ও কোন বিষয় অনুধাবনের ক্ষমতা দান করেছেন যেন যারা আল্লাহ্কে বিশ্বাস করে, তারা তাঁর নিকট থেকে উন্নত মর্যাদা লাভ করতে পারে আর যারা আল্লাহ্কে অস্বীকার করে তারা এ পৃথিবীতে লাঞ্ছনা ও পরকালে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে।

সবশেষে, সকল প্রসংশা বিশ্বজগতের মহান প্রতিপালন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য।

বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১২

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির বিশ্লেষণ

তাহরীর ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ

প্রশ্ন: ১লা জুন, ২০১২ তারিখে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন পেনেট্টা সিঙ্গাপুরে একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে ঘোষণা করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার ৬ টি এয়ারক্রাফট  ক্যারিয়ার রাখবে এবং ২০২০ সালের মধ্যে সামনের বছরগুলোতে যুদ্ধ জাহাজসমূহের ৬০ ভাগ এ অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে আসবে। সে ব্যাখ্যা করে যে, নতুন মার্কিন কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে ফ্লিটগুলো স্থানান্তর করা হচ্ছে। সুতরাং এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধ জাহাজ স্থানান্তরের কারণ কি? আমেরিকা কি বর্তমান বা ভবিষ্যত চীনকে ভয় পাচ্ছে? এবং কখন চীন এ অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তার করার জন্য চেষ্টা করবে?

উত্তর: এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের নিচের বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করা দরকার:

১. এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট  বিষয়ে বিরোধ রয়েছে:

ক. যেমন: জাপান, চীন, তাইওয়ান, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পূর্ব চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব, কিছু দ্বীপের মালিকানা, নৌ চলাচল ও মৎস শিকারের স্বাধীনতা  নিয়ে রয়েছে বিরোধ।

খ. একই রকম হল: ফিলিপিনস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া। এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব, কিছু দ্বীপের মালিকানা ও মালাক্কা প্রণালী নিয়ে পারস্পরিক সমস্যা, নৌ চলাচল ও মৎস শিকারের স্বাধীনতা নিয়ে রয়েছে বিরোধ।

গ. এবং এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভারত মহাসাগরের বর্ধিত অংশ, যার উপকূলে রয়েছে উত্তর বার্মা, বাংলাদেশ, ভারত, এবং পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত যা আরব সাগরের নিকটবর্তী (যা ভারত মহাসাগরের বর্ধিত একটি অংশ) এবং অতঃপর ওমান উপসাগর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল, এডেন উপসাগর ও বাব আল মানদিব প্রণালী হয়ে লোহিত সাগর (যা ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার একটি রাস্তা) পর্যন্ত বিস্তৃত।

ঘ. এছাড়াও এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ ভারত মহাসাগরের উত্তর উপকূল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং যাদের অধিকাংশই মুসলিম। এ অঞ্চলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং মোট মুসলিম উম্মাহ্র অর্ধেকের বসবাস।

২. সমুদ্র পথসমূহকে স্থলপথের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়, কেননা এসব পথ দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হয়। এতে খরচ কম হয় এবং কোন নির্দিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে থাকা প্রণালী বা সমুদ্রপথ দিয়ে যাওয়া ব্যাতিরেকে জাহাজগুলো বিভিন্ন দেশের সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় তল্লাশি এড়িয়ে চলে যেতে পারে। স্থলপথের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিশালাকারের লরি উৎপাদিত হওয়া এবং আকাশপথের প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হওয়া সত্ত্বেও আজকের দিনে ৯০ ভাগেরও বেশী পণ্য জলপথে জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। কেননা স্থল ও আকাশপথে পণ্য পরিবহন ব্যায়বহুল ও জলপথের মত এত বেশী পণ্য পরিবহন করাও সম্ভব নয়। পাইপলাইনের উন্নতি সাধনের পরও জলপথে জাহাজের মাধ্যমে মোট তেলের শতকরা ৬৫ ভাগ পরিবহন করা হয়। সুতরাং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়েই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে মোট তেল ও গ্যাসের শতকরা ৭০ ভাগ পরিবহন করা হয়। তাছাড়া এ অঞ্চলে আগামী দশকের মধ্যে তেলের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যাবে, বিশেষ করে চীন ও ভারতে। দু মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের পথ হলো মালাক্কা প্রণালী যা মালয়েশিয়া উপদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যে প্রায় ৮০০ কিঃমিঃ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। পৃথিবীর মোট পণ্যের ৪০ ভাগ এবং তেল ও গ্যসের প্রায় অর্ধেক এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এটি চীন ও ভারত এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে পণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সমুদ্রপথের বিবেচনায় এ অঞ্চলের গুরুত্ব অত্যাধিক।

৩. তাছাড়া কৌশলগত কারণেও এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করছে। কেননা ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক কারণে এটিকে সে তার অঞ্চল মনে করে। এছাড়া এ অঞ্চলে রয়েছে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ©| এ অঞ্চলে চীন একটি প্রধান রাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলে প্রভাবশালী হওয়ার জন্য সে কাজ করছে। কিন্তু এখনও সে এটি করতে সমর্থ্য হয়নি। মার্কিন আধিপত্য এ অঞ্চলে খুব প্রভাবশালী। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকির কারণে এ অঞ্চলের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। কেননা রাশিয়ার রয়েছে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে নিজস্ব উপকূলীয় সীমারেখা। আমেরিকা সে সময় এ অঞ্চলে ৬০০ যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল। যখন ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল, সমাজতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটল ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঁঙ্গে গেল এবং আমেরিকার জন্য হুমকি হ্রাস পেল তখন যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশী হ্রাস করা হল, যার সংখ্যা ২৭৯। ২০০৮ এ যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ছিল ২৮৫। এ অঞ্চলে তার কোন প্রতিদ্বন্দী বা হুমকির অস্তিত্ব না থাকায় এ সংখ্যায় আমেরিকা সন্তুষ্ট ছিল।

তাছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাঘাটিতে আমেরিকার স্থায়ী সেনা উপস্থিতি রয়েছে-উভয়টিই পূর্ব চীন সাগরে অবস্থিত। এছাড়াও ফিলিপাইনে সেনাঘাটি রয়েছে যা দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত। এখানে তার অর্ধমিলিয়ন সৈন্য রয়েছে। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে এ অঞ্চলে তার অব্যাহত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

৪. ইরাক ও আফগানিন্তানে মুসলিমদের হাতে পরাজয় বরণ ও ২০০৮ এ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের পর আমেরিকার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার পর চীন উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর জন্য এ অঞ্চলে তার প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে শক্তি বাড়ানোর জন্য কাজ শুরু করেছে। হয়ত আমেরিকার পুরোপুরি পতন হতে পারে, অথবা ইতোমধ্যে যেরকম প্রকম্পন শুরু হয়েছে হয়তো তার চেয়ে আরও ভয়াবহভাবে প্রকম্পিত হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় নাও থাকতে পারে অথবা মুসলিমগণ এ অঞ্চল থেকে আমেরিকাকে বিতাড়িত করতে পারে এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না...

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করে যে, চীন বৃহৎ বিশ্বশক্তির অন্তর্ভূক্ত নয় এবং এটি নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকার অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কাজ করছে না, তবে চীন এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি প্রধান আঞ্চলিক দেশ। সেকারণে চীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। পূর্ব চীন সাগরে চীন সার্বভৌম হওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং এতে যদি সে সফল হয় তাহলে সে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে তার করায়ত্ত্বে আনতে পারবে এবং উত্তর কোরিয়াকেও, যেখানে ইতোমধ্যে চীনা প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে। চীন, দক্ষিণ চীন সাগরের উপরও তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং এর মাধ্যমে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়াকে তার প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে এসে মালাক্কা প্রণালীকে নিয়ন্ত্রন করা যাবে, যা তার জন্য জীবনসম একটি পথ। যদি চীন এ অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে অথবা তার প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে এবং মার্কিন প্রভাবকে দারুণভাবে হুমকির সম্মুখীন করতে পারবে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ইস্যু এবং যে কোন মূল্যে কখনওই সে এটিকে হতে দিবে না।

৫. আমেরিকা দুদিক থেকে তার ভূমিকে সুরক্ষা দেয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, অর্থাৎ তাকে ঘিরে থাকা আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে। আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে বর্তমান আমেরিকার জন্য কোন হুমকি নেই। কারণ ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ আটলান্টিকে বা পশ্চিম আটলান্টিকের পরের দক্ষিণ আমেরিকায় এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ কোন কিছুই করছে না। আমেরিকা আটলান্টিক বা তার পরের অংশে ইউরোপ থেকে অনতিদূর ভবিষ্যতে কোন হুমকি আশা করে না। সুতরাং আমেরিকা অন্যান্য অংশে বেশী গুরুত্ব প্রদান করছে, যেমন: প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগর, উপসাগর ও বাব আল মানদিব প্রণালী। একারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি বৃদ্ধির জন্য সে আটলান্টিকে শক্তি হ্রাস করেছে। প্যানেট্টা এ ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে বলে যে, ২০২০ সালের মধ্যে ৬টি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, অধিকাংশ আমেরিকান ক্রুজার, ডেসট্রয়ার, কম্ব্যাট  শীপ ও সাবমেরিনসহ নৌ শক্তির ৬০ ভাগ এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হবে। সে চীন ও এ অঞ্চলের দেশসমূহের মধ্যে বিরোধের ব্যাপারে উল্লেখ করে এবং বলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন পরিষ্কার। আমরা সংযম অবলম্বন  করা ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান করছি এবং যে কোন ধরণের উসকানিমূলক আচরণ ও শক্তি প্রয়োগের বিরোধী।” সে দাবি করে যে, তার দেশ একটি দেশের স্বার্থে  অন্য একটি দেশের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করে না। (ইউএস ইউপিআই এজেন্সি, ২রা জুন ২০১২) ইউপিআই উল্লেখ করে যে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নভেম্বরে  বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সর্বাধিক প্রাধান্যযোগ্য।”এবং ইউপিআই আরও উল্লেখ করে যে, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সময়ে এ অঞ্চলে দৃষ্টিপাত করেছে যখন ভারত ও চীন বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে এবং ইরাক থেকে আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহার ও আফগানিস্তান থেকে আসন্ন আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার করা হচ্ছে।”তাছাড়া এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি তাকে এ অঞ্চলে আগামী বছরগুলোতে মহড়ার সংখ্যা বাড়াতে এবং সাথে সাথে ভারত মহাসাগরসহ প্রশান্ত মহাসাগরের ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে তার নৌশক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করবে। প্যানেট্টা উল্লেখ করে যে, “গতবছর মার্কিন সেনাবাহিনী এ অঞ্চলের ২৪টি দেশে ১৭২ টি প্রশিক্ষণমূলক মহড়ায় অংশ গ্রহণ করেছে।”(বিবিসি ২রা জুন, ২০১২)

৬. মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কৌশল ১লা জুন, ২০১২ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা কর্তৃক ঘোষিত নতুন আমেরিকান সামরিক কৌশলের অন্তর্গত, যা তিনটি প্রধান আলোচ্য বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে; প্রমতঃ ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করা, দ্বিতীয়তঃ গুণগত মান বজায় রেখে সামরিক ব্যয় হ্রাস করা, তৃতীয়তঃ চীনের ক্রমবর্ধমান  শক্তিকে খর্ব করার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াকে গুরুত্ব প্রদান করা। যেহেতু ইউরোপ থেকে আমেরিকার জন্য কোন বিপদ বা হুমকি নেই, সেহেতু সেখানে ব্যাপক মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতির কোন কারণ নেই। এটি সামরিক ব্যয় হ্রাস পরিকল্পনার অংশ। কেননা আমেরিকা এখনও অর্থনৈতিক মন্দায় জর্জরিত এবং তা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। সে কারণে সে আগামী ১০ বছরে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সামরিক ব্যয় হ্রাস করার এবং এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সুতরাং এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌ শক্তি বৃদ্ধির প্রধান লক্ষ্য হল চীন এবং এ অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত হুমকি।

৭. কিন্তু আমেরিকান নৌবাহিনী মোতায়েন ও মালাক্কা প্রণালী হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর পর্যন্ত তার ঘাঁটি বিস্তৃত করার পেছনে আরও কোন কারণ রয়েছে...। এই সৈন্য মোতায়েন কেবলমাত্র চীনের উপকূল ও এর সাগরসমূহে নয়...। আমেরিকা এ অঞ্চলে ইসলামিক শক্তি, “খিলাফত”- এর প্রত্যাশিত উত্থানের ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। আমেরিকা সে কারণে চীন ও আসন্ন ইসলামিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশিত ক্ষমতাকে বিবেচনায় এনে সে তার ঘাঁটি বিস্তৃতকরছে ও ইসলামিক অঞ্চলসমূহের উপকূল জুড়ে সৈন্য মোতায়েন করছে... সে আগামী বছরগুলোতে ও দশকে পরিবর্তনের সম্ভাবনার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে, অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বে ইসলামিক পরাশক্তির উত্থানকে, বিশেষ করে যখন মুসলিম জনসংখ্যার অর্ধেক এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ভারত মহাসাগরের উত্তর উপকূল জুড়ে বসবাস করে, যা পারস্য উপসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলিম জনগোষ্ঠির একটি বর্ধিত অংশ। আল্লাহর ইচ্ছায় ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি প্রধান কৌশলগত অঞ্চল হয়ে দাঁড়াবে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পূর্বে ইসলামিক রাষ্ট্র তার সূচনালগ্নে এসব ভূমির দ্বারপ্রান্তে কল্যাণ ছড়িয়ে দিতে এসব অঞ্চলে প্রবেশের জন্য কাজ করেছে। তিন শতাব্দী আগে পূর্বদিক থেকে মুসলিমদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার উদ্দেশ্যে উপনিবেশ স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা এ অঞ্চলে অকল্যাণের বীজ বপন শুরু করার আগে এটি প্রায় একটি সম্পূর্ণ মুসলিম ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। এই একই সময়ে তারা মুসলিমদের রাষ্ট্র খিলাফতকে ধ্বংস করে ফেলা ও এর ইসলামিক ব্যবস্থাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পশ্চিম অংশেও উপনিবেশবাদী যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্র করছিল... এবং এতে তারা সফলও হয়েছিল। এখন তারা এর প্রত্যাবর্তনকে ভয় পাচ্ছে... এবং আল্লাহর ইচ্ছায় এটি ফিরে আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

খিলাফত ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর টিকে ছিল? পর্ব-২

পূর্ব প্রকাশের পরঃ


খিলাফাহ জার্নালের একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে ভাষান্তরিত

ইমাম শাফি (র) এর অনুসারী ফিকাহ বিশেষজ্ঞ সাইফ আল দিন আল আমিদি তার বইয়ের মধ্যে (আল ইমামা মিন আবকার আল আফকার ফি উসুল আদ দিন, পৃ-৩০৬) সংশ্লিষ্ট হাদিসটির ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, এ হাদিসটিতে বলা হয়েছে আমার খিলাফত থাকবে ৩০ বছর তারপর এতে বংশীয় শাসনের রীতি আসবে। এ হাদিসটিতে চার খলীফা [আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা)] পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা টিকে থাকবে তা বোঝায়নি।এবং এই হাদিসটি দিয়ে শুধু এ কথাও বোঝায়নি যে, চার খলীফার সময় পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং রাসুল (সা) বুঝিয়েছেন-তাঁর পর কোন প্রকার বিচ্যুতি ছাড়া তাঁর নেতৃত্বের ধরণ (সুন্নাহ অনুসারে) ইমাম বা খলীফারা উল্লেখিত সময় পর্যন্ত নেতৃত্ব দেবেন। এর পর বেশীর ভাগ শাসকরাই উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ অলংকৃত করে শাসন করবেন। তা সত্ত্বেও যে খিলাফত ব্যবস্থা টিকে ছিল তা নিচের দুটি বিষয় থেকে বোঝা যায়।

প্রথমতঃ পরবর্তী সকল সময়ে উম্মাহর মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্যমত ছিল যে তাদের একজন ইমাম বা খলীফা থাকতে হবে এবং তাকে মানা আবশ্যক।

দ্বিতীয়তঃ তিনি (সা) বলেছেন, ‘তারপর আসবে (তাসির) মুলকান। এখানে যে সর্বনামটি ব্যবহার করা হয়েছে সে তসিরু মিলকানদিয়ে খিলাফতকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। উল্লিখিত ক্রিয়াটি (তাসিরু) খিলাফতকে ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই বোঝায় না। এ দিয়ে আরও প্রতিপন্ন হয় যে খিলাফতই মুলকেপরিণত হবে। কেননা একটি বিষয় অন্য বিষয়ে পরিণত হতে গেলে প্রথম বিষয়টির অস্তিত্বে থাকা অবশ্যই জরুরী। এখানে প্রথম উল্লিখিত বিষয়ে ইমাম আমিদি ব্যাখ্যা করেন, দলিল অনুসারে উম্মাহকে অবশ্যই সে যুগের ইমামকে (খলীফাকে) মানতে হবে। এটা দিয়ে অবশ্যই এক খলীফার পর আরেক খলীফা আসার বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা হয় নি। আমিদির দ্বিতীয় যুক্তি হল ভাষাতাত্ত্বিক। উক্ত হাদিসটির বক্তব্য হল- খিলাফতের চরিত্র বা প্রেক্ষিত পরিবর্তিত হয়েছে; খিলাফত ব্যবস্থা নিজে নয়। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে যেমনঃ তারপর তারেক রেগে গেলএখানে তারেকের অবস্থান বা গুণগত অবস্থার পরিবর্তন বুঝিয়েছে। অর্থাৎ তারেক রেগে গিয়ে আলী বা উমরে পরিণত হতে পারে না। একইভাবে হাদিসটিতে যখন বলা হয়েছে সুম্মা তাসিরু মুলকানএর অর্থ হল এবং এরপর আসবে বংশীয় শাসনএ বাক্যাংশ দিয়ে কখনো বোঝা যায় না যে খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেল। বরং ঐ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আসাকে বোঝায়।

৯০৩ হিজরিতে খলীফা মুতাওয়াক্কিল আবুল আইজ মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থানে তার ছেলে আল মুসতামসিক বিল্লাহ খলীফা নিযুক্ত হন। এ সময়ে বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইমাম জালাল আল-দিন সুয়ুতি তার আল খোলাফা (খলীফাদের ইতিহাস) বইয়ে তখন পর্যন্ত খলীফা হসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি এ বইয়ের সূচনায় বলেন, “আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত যত খলীফা শাসন করেছেন এখানে সংক্ষেপে সে সব খলীফাদের জীবনী তুলে ধরলাম। যারা ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা (আমীর উল মুমিনিন) যারা উম্মাহর সকল বিষয় নিয়ে দেখাশুনা করতেন। তার এই বই লেখার সময়টা ছিল হিজরতের ৯০০ বছর পর। সমস্ত খিলাফতের সময়কাল জুড়েই তৎকালীন খলীফাদের সাথে ইসলামী পণ্ডিতদের যোগাযোগ ছিল। কেউ কেউ খলীফাদের বিভিন্ন কাজের কৈফিয়ত বা ইসলামী ব্যাখ্যা চাইতেন। আবার কেউ কেউ তাদের শাসন কাজে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়-ইমাম আবু হানিফা খলীফা আল মানসুরের এক সিদ্ধান্তের কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। কাজি আবু ইউসুফ খলীফা হারুন অর রশিদের শাসন আমলে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুসতানসির বিল্লাহ তাতারদের পরাজিত করার পর আইজ বিন আব্দুস সালাম তার নিকট বায়আত গ্রহণ করেছিলেন।

উসমানীয় খিলাফতের শেষের দিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিমদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিল দেয়ার ষড়যন্ত্রে মগ্ন ছিল তখন মাওলানা কাশিম নুতভি (র) এর সরাসরি ছাত্র ও দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ হাসান (র) ১৯২০ সালে ইসলামের শত্রুদের সাম্রাজ্যবাদী ছোবল থেকে উসমানীয় খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য মুসলিমদের উদ্দেশ্যে এক ফতোয়া জারি করেন। সম্মানিত মাওলানা হাসান বলেন ইসলামের শত্রুরা ইসলামের সম্মান ও প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে চেষ্টার ত্রুটি করছে। ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়ার উপর তাদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়ছে। মুসলমানদের খলীফা যিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেন, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি, ইসলামের সার্বজনীন আইন বাস্তবায়নকারী; যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করেন এবং সৃষ্টিকর্তার সম্মানিত বাণী পৃথিবীর বুকে রক্ষা ও বাস্তবায়নকারী, সেই খলীফারা আজ শত্রু বেষ্টিত ……… [মাওলানা সাইদ মুহাম্মদ মিয়ার দ্যা প্রিজনার অফ মাল্টাবইয়ে ২৯ অক্টোবর ১৯২০ সালে জারিকৃত ফতোয়াটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, পৃষ্ঠা ৭৮]

খিলাফত আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলি যোহার খিলাফত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “তুরস্কের খলীফারা হল রাসুল (সা) এর উত্তরাধিকারী। মুমিনদের নেতা বা বিশ্বাসীদের প্রধান। যার অস্তিত্বের কথা কুরআন ও রাসুলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। (মোহাম্মদ আলী যোহার, মাই লাইফ এ ফ্রাগমেন্ট)। এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলান আবুল কালাম আজাদের ১৯২০ সালে খিলাফত নিয়ে লেখা দ্যা ইস্যু অব খিলাফতবইয়ের শুরুতেই লিখেন, খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ইন্ডিয়ার মুসলমানদের উচিত তাদের সর্বোশক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে খিলাফত রক্ষা করার জন্য কাজ করা। বইটির মধ্যে আবু বকর (রা) থেকে শুরু করে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সকল খলীফার একটি তালিকাও তিনি সংযোজন করেন। খিলাফতের শেষ পর্যায়ে এসেও তাই আমরা দেখতে পাই খিলাফত টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে উলামারা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফতের ধারাবাহিকতা থাকাটা আহলে আল সুন্নাতের বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রসঙ্গে শাফি মাযহাবের ইমাম আত-তাফ তাজানী হানাফী মাযহাবের ইমাম অ্যান নাসাফির চিন্তার সঙ্গে সম্পুর্ণ একমত পোষণ করেন। এ বিষয়ে আত-তাফ তাজানী বলেন, উম্মাহর জন্য একজন ইমাম নিয়োগ করা যে বাধ্যতামূলক সে বিষয়ে সকল ইমামের মধ্যে মতৈক্য আছে। কারণ রাসুল (সা) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়আত (আনুগত্যের শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)। আত তাফ তাজানী আরও বলেন, “মুসলিমদের একজন ইমাম থাকা বাধ্যতামূলক যিনি মুসলমানদের প্রশাসন পরিচালনা করবেন। যিনি মুসলিমদের জন্য নির্দেশিত ডিক্রিগুলো রক্ষা করবেন, মুসলিমদের ভৌগলিক সীমানা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করবেন, মুসলিম সেনাবাহিনীকে যথাযথ সামরিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত রাখবেন, জনগণের দানের অর্থ গচ্ছিত রাখবেন, জুম্মাহর নামাজ ও প্রধান প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিবেন, সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করবেন, বৈধ অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি এভিডেঞ্চ গ্রহণ করবেন। অভিভাবকহীন যুবক যুবতীদের নিজ অভিভাবকত্বে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন।[আকিদাত অ্যান নাসাফিয়া পৃঃ ১৪৭]

ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও দলীলের নিরীখে ইমাম তাফ-তাজানী বক্তব্য যে ঠিক তা বোঝা যায়। একজন খলীফা নিয়োগ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক যা রাসুল (সা) এর সুন্নাহেরই প্রতিফলন। তাই উল্লেখিত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় আমাদের সমাজে খিলাফতের কাল ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধছিল তা নিতান্তই অবাস্তবিক, অযৌক্তিক ও অলীক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। খিলাফত ব্যবস্থা উম্মাহকে দেখাশুনার ব্যবস্থা হিসেবে রাসুল (সা) এর ওফাতের পর উসমানীয় খিলাফতের আমল পর্যন্ত টিকেছিল।

রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১২

খাদ্যের অপ্রতুলতাই কি তৃতীয় বিশ্বে দারিদ্র্যের কারণ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সম্পদের অপ্রতুলতা এবং গণতন্ত্রের অভাব দারিদ্র্যের সাধারণ কারণসমূহের মধ্যে প্রধান। সমাজবিজ্ঞানী ও অন্যান্য থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মধ্যে যদিও এ ব্যাপারে কোন ঐক্যমত্য নেই। এ ব্যাপারে খুব প্রাধান্য বিস্তারকারী ধারণা হচ্ছে মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে পুঁজিবাদের বিকাশই হল এ সমস্যার একমাত্র সমাধান। কিন্তু খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, খাদ্যের অপ্রতুলতা নয়, বরং অন্যান্য কিছু বাস্তবতা শুধুমাত্র মুসলিম বিশ্ব নয় পুরো তৃতীয় বিশ্বে দরিদ্রতার জন্য দায়ী।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক এবং এদের কাঠামোগত পরিবর্তন নীতি (Structural Adjustment Policy) মিশর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের বিবিধ অর্থনৈতিক সংকট তৈরির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্রতা মুক্তির উপর তাদের নিজস্ব প্রেসক্রিপশন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রয় করে থাকে। এসব সংস্থা প্রদত্ত নীতিসমূহের মধ্যে রয়েছে শস্যের মজুদ না রাখা বা কমিয়ে আনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত খাবারের উপর কর হ্রাস, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে নেয়া প্রভৃতি। অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহ থেকে আমদানির বদলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে তারা। বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করা ও একে দারিদ্রতা বিমোচনের পথ হিসেবে দেখানো হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার জন্য পাকিস্তানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন দরকার। এসময় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পাকিস্তানকে এসব খাতে সরকারী বিনিয়োগ কমিয়ে বরং রপ্তানীর দিকে আগে মনোযোগী হতে পরামর্শ দিয়েছে। তারা এমন সব খাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় যেতে বলে যেগুলোতে পাকিস্তান অনগ্রসর। আর এভাবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে।

দারিদ্র্যের অপর কারণগুলোর মধ্যে একটি হল ঋণ। আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিক সময়ের ঋণ পরিশোধ করবার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। এ ধরণের দেনার কারণ হচ্ছে অসদুপায়ে উচ্চ সুদে ঔপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহের ঋণ গ্রহণ। আবার অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসকদের বিলাসিতায় অপচয়ের জন্য ধনী দেশসমূহ ঋণ দিয়েছে যা 'ঘৃন্য ঋন' হিসাবে পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮ বিলিয়ন ডলারের (যা বর্তমানে ৪৬ বিলিয়ন) "বর্নবাদ জনিত ঋন" এ জর্জরিত। বর্নবাদ পরবর্তি আফ্রিকার উপর বর্নবাদ শাসনামলের ঋন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এ.সি.টি.এস.এ (এ.সি.টি.এস.এ: অ্যাকশন ফর সাউদার্ন আফ্রিকা) হিসেব করে দেখেছে যে, বর্নবাদ বজায় রাখবার জন্য ১১ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ১৮ বিলিয়ন ডলার) ধার করেছে। আর প্রতিবেশী দেশসমুহও এ জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন) ঋণ গ্রহণ করেছে। শতকরা ৭৪ ভাগের উপরে আফ্রিকান ঋণে জর্জরিত থাকায় পুরো মহাদেশ জুড়ে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বজায় আছে।

ঔপনিবেশিকতা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতার অন্যতম কারণ। উপনিবেশবাদ পশ্চিমাদের প্রতি নির্ভরশীলতাকে প্রলম্বিত করেছে। এ কারণে খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অংশের উপর পশ্চিমা আধিপত্য ও হস্তক্ষেপ বজায় ছিল। ঔপনিবেশিক আমল থেকে আফ্রিকার শ্রম পশ্চিমাদের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এবং সেদেশের জনগণকে পশ্চিমে উৎপাদিত পণ্য সাধ্যের অতীত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রাথমিক সময়ের মত কেবলমাত্র কৃষকের নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিচালিত হয় না। ১৯৬০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহ এ ধরণের ব্যবস্থা এবং সরকারকে খাদ্য সরবরাহের উপর হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে বের হয়ে আসবার জন্য কৌশল প্রণয়ন করেছে। লাভের অঙ্কটাকে বাড়িয়ে নেবার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলো এ সুযোগে এগিয়ে এসেছে। পণ্যদ্রব্যের মূল্যের ব্যাপক হ্রাসবৃদ্ধিতে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ এখন আর নেই। সেকারণে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের জনগণ কে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কর্তৃক বেধে দেয়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হয়। বিশ্ব মন্দা চলাকালীন সময়ে কিংবা তার আগে অনুমাননির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। শুরু থেকেই বিলাসজাত পণ্যদ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি ছিল বৈশ্বিক ব্যবসা। কিন্তু ১৯৬০ সাল থেকে খাদ্য দ্রব্য উৎপাদন আঞ্চলিক পরিমন্ডল থেকে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে রূপান্তরিত হয়।

কেবলমাত্র নিজস্ব চাহিদা পূরণের জন্য যারা খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করে তাদের চেয়ে যারা রপ্তানীর জন্য উৎপাদন করে তাদেরকে বিশ্ব বাণিজ্যিক নীতিসমূহ উৎসাহিত করে। যদিও গ্রীষ্মকালে বৃটিশ কলম্বিয়া এবং ক্যালিফোর্ণিয়া উভয় অঞ্চলের কৃষকেরা টমেটো উৎপাদন করে, তারপরও তাদের জন্য লাভজনক হচ্ছে এগুলো নিজ এলাকায় বিক্রয়ের চেয়ে রপ্তানী করা। অথচ ক্রমবর্ধমান পরিবহন ব্যয় পণ্যসমূহের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণে এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু কিছু অংশে প্রান্তিক চাষীদের দেখা যায় না বললেই চলে। মনোক্রপিং, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার মাধ্যমে কৃষির ব্যাপক শিল্পায়নের কারণে প্রান্তিক চাষীরা সফল হতে পারছে না। জেনেটিক রূপান্তরের জন্য গড়ে উঠা মনসান্তো, আরচার ড্যানিয়েলস,মিডল্যান্ড এবং কারগিল এর মত কোম্পানিসমূহ বিশাল অঙ্কের মুনাফা করছে।

উন্নত বিশ্ব দাবী করছে যে, অধিক জনসংখ্যার কারণে খাদ্যে অপ্রতুলতার দরুণ খাদ্য সংকট তীব্রতর হচ্ছে। খাদ্যের অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমুল্যের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়। তবে এরকম উচ্চফলনশীল ও দক্ষ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রায় এক বিলিয়ন লোক ক্ষুধার্ত থাকে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সমস্যা আসলে আন্তর্জাতিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই: বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্য বন্টন ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার একচেটিয়া কর্তৃত্বেও (মনোপলি) মধ্যে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরিদ্র দেশসমূহে ধনী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর অশুভ পদচারণার মাধ্যমে উপার্জনের ক্ষেত্রস্থল বানানোয় সেসব দেশের কৃষির উপর কুপ্রভাব পড়েছে। অসম বানিজ্য চুক্তি; প্রধান ফসলসমূহের উৎপাদনের উপর অতি খবরদারি; বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতি সংস্থার নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য দরিদ্র দেশসমূহের কৃষির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে।

কাঠামোগত পরিবর্তনের (Structural Adjustment) মত নীতির মাধ্যমে বিশ্বসংস্থাসমূহ উন্নয়নশীল দেশসমূহকে দরিদ্র মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থই শুধু নয়, বরং কৃষিখাতে বরাদ্দকৃত অর্থও সংকোচনে বাধ্য করে। দেশজ শিল্পের জন্য বিদেশী পণ্যের উপর বাণিজ্য বাধা দুরীকরণসহ অন্যান্য গৃহীত সুবিধার বিলোপসাধন ও বিদেশী কোম্পানীগুলোকে সহজে ব্যবসা করবার মত পরিবেশ তৈরির ব্যবস্থা করতেও বাধ্য করে (যদিও ধনী দেশসমূহ সে তুলনায় বিদেশী পণ্যের প্রবেশের পথ সুগম করে না)। এছাড়াও দরিদ্র দেশসমুহকে ঋণের ব্যয়ভার বহনের জন্য খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির মাধ্যমে ডলার উপার্জনের দিকে উৎসাহিত করা হয়। সেকারণে একই ধরণের ফসল বছরের পর বছর উৎপাদনের জন্য ফসলের বৈচিত্র ব্যাহত হয় এবং ফলে ইকোসিস্টেমে ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বিনষ্ট হয় ও রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়তে থাকে।

ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা ও অসমতা দরিদ্র দেশসমূহে দুর্নীতিকে বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও প্রতিকূল করছে। দরিদ্রদেশকে ধনীদেশের খাদ্য সহায়তা প্রদানের নামে অতিরিক্ত খাদ্য বিক্রি করা; উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান, প্রভৃতি তৃতীয় বিশ্বের খাদ্য সংকট ও দরিদ্রতাকে ঘনীভূত করছে।

পশ্চিমাদের নীতির কারণেই তৃতীয় বিশ্ব দরিদ্র এবং খাদ্যশস্যের অপ্রতুলতা নয় বরং উন্নত বিশ্বের অপব্যয়ের কারণেই সৃষ্ট খাদ্যসংকটের ফলে তারা দরিদ্রই থাকবে:

- বিশ্বের জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর মোট কৃষি উৎপাদনের ৮০ ভাগ পশ্চিমারা ভোগ করে
- মোট পণ্যদ্রব্যের শতকরা ৮৬ ভাগ ভোগ করে
- মোট দুধের ৭৫ ভাগ ভোগ করে
- মোট কাঠের ৭০ ভাগ ভোগ করে
- মোট পানির ৬২ ভাগ ভোগ করে
- মোট জ্বালানীর ৪৮ ভাগ ভোগ করে
- মোট মাছ এবং মাংসের ৪৫ ভাগ ভোগ করে

পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য রয়েছে; পশ্চিমারাই যার সিংহভাগ ভোগ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব কি আসল?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ব্যাপক সম্পদরাজি, ভূ-রাজনৈতিক গুরত্ব ও অপরিশোধিত তেলের সর্ববৃহৎ উৎসের কারণে গত একশত বছর ধরে বিভিন্ন শক্তির সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর এখানে ইরান অবশ্যই একটি গুরত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিগণিত। এ কারণে যে শক্তি ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করবে এই অঞ্চলের আধিপত্য তারই।

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের পর থেকেই বিভিন্ন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তাদের সমালোচনার শিকার হয়েছে ইরান এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের যুদ্ধের হুমকির মুখে পড়েছে। ২০০২ সালে বুশের স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে শয়তানের অক্ষশক্তি ঘোষণার পর থেকে জর্জ বুশ ইরানের সাথে যে কোন সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। ইরাকে জঙ্গীবাদ উস্কে দেয়া, হিজবুল্লাহকে সমর্থন প্রদান ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। তাদের লক্ষ্য ভিন্ন হওয়ায় এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের জন্য ইরান বড় হুমকি। সেকারণে ইরানকে নিরস্ত্র করা দরকার, বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ এবং এর ইসলামিক ভাবমূর্তিকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।

১৯৭৯ সালে তথাকথিত 'ইসলামিক বিপ্লব'-এর পর আসা ধারাবাহিক সরকারগুলোর মধ্যে রাফসানজানি ও খাতামির শাসনামল থেকে ইউরোপ ও ইরানের সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে ইরানের কট্টর রক্ষণশীল ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণে বেশ কিছু জায়গায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে মার্কিনীদের কাছ থেকে অস্ত্র ক্রয়ের মাধ্যমে ইরানের আসল চেহারা বের হয়ে আসে। আমেরিকা তার স্বঘোষিত শত্রুদেরকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অর্থায়ন করতে থাকে, যেমন: নিকারাগুয়ায় একটি কমিউনিষ্ট- বিরোধী দলকে তারা সহায়তা দেয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মাধ্যমে ইরানের কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মিসাইল ও ভূমি থেকে শূন্যে নিক্ষেপনযোগ্য মিসাইল বিক্রয় করে।

মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ইরানের বিষোদগার করলেও ইরানী সরকারে অবস্থানরত সংস্কারপন্থীরা ইরান, আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সংরক্ষণ করে আসছে। ইরাকে এস সি আই আর নেতা আয়াতুল্লাহ হাকিম ও বদর ব্রিগেডের প্রতি তেহরান সমর্থন অব্যাহত রেখেছে-যারা দক্ষিণ ইরাকে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান সূত্র হিসেবে কাজ করছে। আফগানিস্তানে কাবুল, হেরাত ও কান্দাহারে ইরান ব্যাপক হারে পূনর্গঠন ও প্রশিক্ষণ কাজে অংশ নিচ্ছে। উত্তর আফগানিস্তানে পশতুন প্রতিরোধ ঠেকানোর জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাকের-হ্যামিল্টনের রিপোর্টে এ ধরণের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়, "...ইরাক ও অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুতে ইতিবাচক নীতির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষভাবে ইরান ও সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। ইরান ও সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হবার সময় ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেয়া ও ছাড় না দেয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে.....বিশেষ করে মাকির্ন-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানকে সম্পৃক্ত করা সমস্যাপূর্ণ। এখন আফগানিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের সহযোগী এবং উভয় পক্ষকেই চিন্তা করে দেখতে হবে ইরাকেও একই ধরণের সহযোগিতার মডেল অনুসরণ করা যায় কিনা?"

অপরদিকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার প্রচেষ্টাকে মার্কিনীরা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে সবসময়ই ইরানকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। ইসরাইল একমাত্র দেশ যারা মনে করে মাসখানেকের মধ্যে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলভান সেলম নিউইয়র্কে ইহুদী নেতাদের এক বৈঠকে বলেন, "আমাদের জনবল, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর খুব, খুব কাছাকাছি চলে এসেছে- হয়ত বা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তারা এ ব্যাপারে পুরো জ্ঞান লাভ করবে।"

২০০৫ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিতব্য ইন্টারন্যাশনাল এটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আই.এ.ই.এ) এর বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী নিউক্লিয়ার অস্ত্র সংরক্ষণ, উৎপাদন এবং ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি ফতোয়া জারি করেন। এই সর্বোচ্চ নেতা ২০০৩ সালে ইসরাইলের সাথে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেন।

অর্ধশতাব্দীরও বেশী সময়কাল ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরান ও মার্কিন সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে আমরা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে একধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। যখন কোথাও কোথাও আমরা দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক দেখতে পাই। আবার অন্যদিকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি ও ইসলামিক ভাবমূর্তির জন্য প্রকাশ্যে ইরানকে তারা তিরষ্কার করে থাকে।

ইসলামিক বিপ্লবের পেছনে মার্কিন সহযোগিতা ইরানকে আমেরিকার ক্রীড়ানক হিসেবে ব্যবহারের পথকে সুগম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সচেতনভাবে উদ্দেশ্য হাসিল হবার পর ইসলামিক বিপ্লবকে থামিয়ে দেবার প্রচেষ্টা চালিয়েছে যেরকমভাবে পাকিস্তানে জিহাদীদেরকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের ব্যাপারে উস্কে দিয়ে পরে থামানোর চেষ্টা করেছে।

১৯৭৯ সালে বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে যাওয়া শাহকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা। সেক্ষেত্রে আমেরিকার কৌশলগত প্রাধান্য ছিল ইরানী জনগণের কাছে জনপ্রিয় বিকল্পকে দিয়ে শাহকে সরিয়ে দেয়া। সুদানি নেতা সাদেক আল মেহেদীর মধ্যস্ততায় বিপ্লবকে কার্যকরী করবার জন্য খোমেনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও এখানে প্রাক্তন অ্যাটর্নী জেনারেল রামসে ক্লার্ক ১৯৭৯ সালে খোমেনীর সাথে এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলেন। খোমেনীর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের মাধ্যমে রক্ষণশীলেরা কার্যকরভাবে সামরিকবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মার্কিন বিরোধী সকল প্রচারণার পরও ইরান কখনওই আমেরিকাকে তেল সরবরাহ করা বন্ধ করেনি কিংবা এ সম্পর্কিত কোন চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। কট্টরপন্থীদের অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিপ্লবকে বিপরীত খাতে প্রবাহিত করতে সমর্থ্য হয়নি। এই কট্টরপন্থীরাই তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় এবং স্পর্শকাতর অস্ত্র সংগ্রহ করতে চায়।

ইরানের জনগনের ৭০ ভাগেরই বয়স ৩০ এর নীচে। তার মানে সেদেশের জনগনের অধিকাংশই ইসলামী বিপ্লবের সময় জন্মই নেয়নি। এই তরুণ জনগনের বিপ্লব সম্পর্কে কোন স্বচ্ছ ধারণা নেই। আর তারা এমন একটি অংশ দ্বারা শাসিত হচ্ছে যারা বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। মার্কিনীরা সরাসরি ইরানী সরকারের সংস্কারপন্থী অংশ এবং ছাত্রদের সাথে সম্পৃক্ত এবং তাদেরকে এই ধারণা প্রদান করে যে, আমেরিকার স্বার্থ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে তারা সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।

যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে নিশ্চিত নয়, কিভাবে তারা ইরানের বিরুদ্ধে লক্ষ্য অর্জন করবে- কূটনৈতিকভাবে নাকি সামরিকভাবে? জর্জ বুশ দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে এ ব্যাপারটি বেশ তোলপাড় তুলে এবং ওয়াশিংটন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে।

ইরানের ব্যাপারে সঠিক সমাধান কি হবে এ ব্যাপারে দ্বন্দ্বের মধ্যে আছে বাস্তববাদী (realists) এবং নব্য রক্ষণশীলদের (neoconservatives) মতবাদ। আমেরিকান সরকারের সকল অংশ এবং বিভিন্ন সংস্থা, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগণ এবং সিআইএ যুদ্ধের ব্যাপারে একমত পোষণ করে। কিন্তু মতানৈক্য দেখা দেয় ২০০৪ সালে যখন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড জিবিংনিউ ব্রেজিনস্কির তত্ত্বাবধানে কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স (সি.এফ.আর) সংস্থাটি 'ইরানঃ টাইম ফর অ্যা নিউ এপ্রোচ'-নামক রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ রিপোর্ট দাবী করে যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় সম্পর্কে নব্য রক্ষণশীলদের বর্তমান ধারণা মোটেও সঠিক নয়। রিপোর্টের মতে, "রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি ও অসন্তোষ সত্ত্বেও ইরান আরেকটি বিপ্লবের সম্মুখীন নয়। যারা বর্তমান ব্যবস্থার পুরোধা তারা পুরো পরিস্থিতি এখনও ভালভাবেই নিয়ন্ত্রণ করছে।" রিপোর্টে জোর দিয়ে বলা হয় সকল সমস্যা সমাধানের জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার তুমুল বিতর্ক অবাস্তব; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিউক্লিয়ার শক্তি হবার উচ্চাকাংখা থেকে ইরানকে বিরত রাখার জন্য প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডের নিকটবর্তী নব্য রক্ষণশীলেরা এই রিপোর্টের মতামতকে মুহূর্তের মধ্যে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। নব্য রক্ষণশীল মাইকেল লেডেন, ন্যাশনাল রিভিউ অনলাইন-এ লিখেন যে, তেহরান হল ইসলামিক সন্ত্রাসীদের রাজধানী এবং সি এফ আর সুপারিশকে অপমানজনক ও আপোষকামী বলে উল্লেখ করেন।

বুশের দ্বিতীয়বারের শাসনামলে নব্য রক্ষণশীলদের প্রভাব ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। নব্য রক্ষণশীলদের মধ্যে পল উলফোভিচ, জন বোল্টন প্রমুখ ব্যক্তিদেরকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের নীতি বাস্তবায়নের কাজে নিযুক্ত করা হয়। অন্যদের মধ্যে ডগলাস ফেইথকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। নব্য রক্ষণশীলদের বিদায়ের মাধ্যমে বুশ প্রশাসনে বাস্তববাদীরা (Realists) সুযোগ পায়। পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ব্যাপারগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও পেন্টাগনের ভেতর সামঞ্জস্য বিধান করা হয়। অন্যান্য সহযোগী দেশকে সম্পৃক্ত করে পূর্ববতী মার্কিন প্রশাসন যৌথভাবে সুদান, লেবানন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের ব্যাপারে বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে বাস্তবাদীদের উপস্থিতি ইরানের ব্যাপারে নব্য রক্ষণশীলদের ভূমিকাকে পুরোপুরি স্তদ্ধ করতে পারেনি। নব্য রক্ষণশীলতাবাদের কট্টর সমর্থক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ইরানের তেল ও গ্যাসের উপর মার্কিন আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য সেদেশের উপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে, ইরান এবং মার্কিনীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সত্যিকার অর্থেই রয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেসব দ্বন্দ্বের উর্ধ্বে উঠে গিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। বুশ প্রশাসনের বাস্তবাদীরা এখন এগিয়ে আছে এবং তাদের নীতি হল একক প্রচেষ্টা বা সামরিক হস্তক্ষেপকে আপাত পরিহার করে বহুজাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের সাথে বিতর্কিত নিউক্লিয়ার সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এগিয়ে যাওয়া। তবে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর ব্যাপারে যারা চাপ প্রয়োগ করছিল তাদের দমানোর ব্যাপারে বুশ প্রশাসনের ব্যর্থতা বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবে।

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

ইসলাম ও বিজ্ঞান কি পরস্পর সাংঘর্ষিক ?

বিজ্ঞানের উত্থানকে সাধারণভাবে কয়েক শতকের একটি বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। ধরে নেয়া হয়, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মীয় আধিপত্যবাদের যুগ অবসানের পরই বিজ্ঞানের অগ্রগতির সূচনা। বিজ্ঞান, পার্থিব উন্নতি ও ধর্মকে পৃথক করে দেখার এ মানসিকতার উদ্ভব হয়েছে আজকের পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের অগভীর ধারণা থেকে। কারণ এ সভ্যতা গড়ে উঠেছে ধর্মীয় কাঠামো ও প্রভাবের সম্পুর্ণ বাইরে। তাই পশ্চিমা প্রচারণার ডামাডোলে বিজ্ঞান ও ইসলামের সম্পর্ক বিষয়ক অসংখ্য প্রশ্নের সমাধান আমাদের মনে অজানা রয়ে গেছে। যেমনঃ

১। ইসলাম আধ্যাত্মিক জগত নিয়ে কাজ করে যেখানে বিজ্ঞান কাজ করে বস্তুজগৎ নিয়ে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন কিভাবে সম্ভব?

২। কিছু বৈজ্ঞানিক মতবাদ রয়েছে যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। কিভাবে এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য হবে?

৩। ইসলাম মূলত পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে কিভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রেরণা পাওয়া সম্ভব?

৪। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে এমন কোন উদাহরণ নেই যারা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অগ্রগণ্য। এটা কি সম্ভব যে শুধুমাত্র ইসলামের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কোন দেশ শিল্প ও বিজ্ঞানে উন্নতি করতে পারে?

ইউরোপের পুরো ইতিহাস জুড়ে দেখা যায় সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে বিজ্ঞানী ও চার্চের মতবাদের বিরোধী চিন্তাশীল ব্যাক্তি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা স্থবির হয়ে গিয়েছিল এবং ফলাফলস্বরূপ ধর্ম মানব সভ্যতার উন্নতির পথে অনুপযুক্ত বলে গণ্য হল। ধর্মকে দেখা হল অবাস্তব, অনমনীয় ও স্ববিরোধী এক প্রতিপক্ষ হিসেবে। কিন্তু শুধু ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের এ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই কি এ সরলীকৃত সিদ্বান্তে আসা যায় যে উন্নতির একমাত্র সোপান হচ্ছে মানুষের নিজেদের তৈরী করা শাসন ব্যবস্থা এবং সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং ত্রুটিপূর্ণ?

অথচ ইসলামের সাথে খৃষ্টবাদ ও ইহুদীবাদের চরম বৈপরীত্য হচ্ছে যে, ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয় বরং ইসলাম সেই মহান বাণী যা একক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে রাসুল (সা) এর প্রতি প্রেরিত হয়েছে। ইসলাম হচ্ছে এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা যা মানুষের জীবনের সমস্ত বিষয় তথা জাগতিক, বুদ্ধিভিত্তিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রতি দিক নির্দেশনা দেয়। ইসলামের শক্তিশালী বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তাভাবনা মুসলিমদের জীবনকে দারুণভাবে গতিশীল করে তোলে। ইসলাম কোন সনাতন অন্ধবিশ্বাস নয় কিংবা অনুকরণের উপর গড়ে উঠেনি বরং তা মানবজাতিকে তার নিজের অস্তিত্ব ও তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনার দিকে আহবান করে।

নিঃসন্দেহে আসমান জমীনের সৃষ্টির মাঝে, রাত দিনের এই আবর্তনের মাঝে, মহাসাগরে ভাসমান জাহাজসমূহে যা মানুষের জন্য কল্যাণকর দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ( এসবকটিতে) আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন মজুদ রয়েছে, (আরও রয়েছে) আল্লাহ তায়ালা আকাশ থেকে (বৃষ্টি আকারে) যা কিছু নাজিল করেন সেই বৃষ্টির পানির মাঝে, ভূমির নির্জীব হওয়ার পর তিনি এ পানি দ্বারা তাতে নতুন জীবন দান করেন, অতঃপর তিনি এ ভূখণ্ডে সব ধরণের প্রাণীর আবির্ভাব ঘটান, অবশ্যই বাতাসের প্রবাহ সৃষ্টি করার মাঝে এবং সে মেঘমালা যা আসমান জমীনের মাঝে বশীভূত করে রাখা হয়েছে, তার মাঝে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। [সুরা বাকারাহ, ২:১৬৪]

আর এ সবই আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ব্যাপারে সুনিশ্চিত প্রমাণ দেয়। ইসলাম মানুষকে এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনার দিকে উদাত্ত আহবান জানায় এবং একক সৃষ্টিকর্তার সত্যতার ব্যাপারে স্বাক্ষ্য প্রদান করে।

ইসলাম অতীত ও বর্তমানের অন্যান্য ধর্মযাজকদের মত মানুষকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয় নিয়ে চিন্তা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না বরং চিন্তা করাকে তার জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসলাম মানুষের কোন প্রবৃত্তিকে, চাহিদা ও আকাংখাকে অস্বীকার করে না বরং তা সুশৃঙ্খল করে যা মানুষকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বৈষয়িক উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান হচ্ছে বাস্তব বিষয়ের পর্যবেক্ষণ। বিজ্ঞান আমাদের অক্সিজেনের গঠন পদ্ধতি বলে দেয়  কিন্তু এটা বলে না যে, অক্সিজেন কে তৈরী করেছে। তাই বিজ্ঞান ও ইসলাম নিয়ে সংঘাতের কোন সুযোগ নেই। নিরেট বিজ্ঞান মানুষের জীবন দর্শন নিয়ে মাথা ঘামায় না, হোক তা পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র বা ইসলামী জীবনাদর্শ। নিরেট বিজ্ঞান সকল মানুষের কাছে একইভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই প্রথম যুগের মুসলিম বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের সকল শাখায় প্রভূত উন্নতি লাভ করেছিল এবং নতুন নতুন শাখায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।

মুসলিমরা ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই ইসলাম সম্প্রচার, হজ্জ ও ব্যবসায়িক কারণে দুনিয়াব্যাপী ব্যাপকভাবে পরিভ্রমণ করেছে। তারা যেখানে গিয়েছে ও অধিবাসী হয়েছে সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও কৃষিজাত সহ অন্যান্য সকল বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করেছে। বিদেশী ভাষায় বৈজ্ঞানিক কাজগুলো সহজে বোঝার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুবাদের জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। আব্বাসিয় খিলাফতের সময় বিশেষ করে খলীফা আল মানসুর ও খলীফা আল মামুনের সময় বৈজ্ঞানিক কাজের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনুবাদ ও প্রস্তুতির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা যায়। দশম শতাব্দীর শেষাংশে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। অনুবাদকরা ছিলেন বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের। উদাহরণস্বরূপ নওবখত ছিলেন পারস্যের অধিবাসী, মোহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আল ফাজারী ছিলেন একজন আরব এবং হুমায়ুন ইবনে ইসহাক ছিলেন হিরার একজন নেষ্টোরিয়ান খ্রিষ্টান।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অন্যদের বৈজ্ঞানিক সমাধানগুলো গ্রহণ করেন এবং নতুনভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যেমনঃ দামাস্কাস, বাগদাদ ও নিশাপুরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য পর্যবেক্ষন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ বিদ্যার বাস্তব জ্ঞানের জন্য মৃতদেহের সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হতো। খলীফা মুহতাসিম এ কারণে চিকিৎসকদের বানর সরবরাহ করতেন। হাসপাতালগুলোতে ছাত্রদের বাস্তব শিক্ষার জন্য শল্যচিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হতো। একাদশ ও দ্বাদশ শতকের মধ্যে মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষার এক উঁচুমান স্থাপিত হয়েছিল। সে যুগের বৈজ্ঞানিক চেতনা শিহাব আল দীন আল কিরাফীর দৃষ্টি সংক্রান্ত কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় যিনি একাধারে ছিলেন কায়রোর একজন ইসলামী আইন ও বিচার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং তিনি দৃষ্টি সংক্রান্ত পঞ্চাশটির মত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইবনে খুরদাদবে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের অক্ষাংশ্ ও দ্রাগিমাংশ নির্ণয় করেন। আল বিরুনী বিভিন্ন বস্তুর সুনির্দিষ্ট ভর নিরূপণ করেন।

ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনে থাকার সময় বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেরই আবিষ্কার করেনি বরং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তারা গ্রহ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নৌ চলাচলের জন্য তারকা মানচিত্র তৈরী করেছেন। ইবনে ইউনুস সময় পরিমাপের জন্য পেন্ডুলাম তৈরী করেন, ইবনে সিনা বাতাসের তাপমাত্রা মাপার জন্য বায়ুমাপক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। কাগজ, কম্পাস, বন্দুক, গান পাউডার, অজৈব অম্ল ও ক্ষারীয় পদার্থের আবিষ্কার হচ্ছে মুসলিম বিজ্ঞানীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কার যেগুলো মানব সভ্যতায় অসামান্য অবদান রেখেছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীরা এলজেবরা আবিষ্কার করেন যেটা গণিতের একটি স্থায়ী শাখায় পরিণত হয়। এলজেবরা শব্দটি উৎসারিত হয়েছে আরবী শব্দ জাবর থেকে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সমতল এবং গোলাকর ভূমির জন্য ত্রিকোণমিতি আবিষ্কার করেন এবং তা জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রয়োগ করা হয়। তারা জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আলাদা করেন কারণ ইসলামে মানুষের ভাগ্যের উপর তারকাদের প্রভাব জাতীয় বিশ্বাসকে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। ফলে জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্ধ-বিশ্বাস থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে নিরেট বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত করা হয়।

সহস্র বছরের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পরেও মুসলিম বিশ্ব আজ চিহ্নিত হয়েছে ব্যর্থতা ও অনৈক্যের প্রতীক হিসেবে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। মুসলিমদের প্রচুর ধন সম্পদ থাকার পরও তারা বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা তদোপরি শিল্পায়নে পিছিয়ে আছে। এ দুঃখজনক পরিণতির কারণ ইসলামের অনুসরণ না করার প্রত্যক্ষ্য ফলাফল, ইসলাম বোঝার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের শৈথিল্য। কোন জাতির বৈজ্ঞানিক বা অন্য কোন ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারেনা যতক্ষণ না সে কোন মতাদর্শকে আঁকড়ে ধরে, মুসলিমরাও এই নিয়মের বাইরে নয়। পশ্চিমা বিশ্ব পুঁজিবাদকে তাদের আদর্শকে ধারণ করেছে এবং তার ফলে জীবনের নানা ক্ষেত্রে তারা উন্নতি লাভ করেছে। প্রাচ্যে সমাজতন্ত্র জোর করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারাও বৈষয়িক কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বল্পসময়ে উন্নতি লাভ করেছিল। মুসলিমরাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আবারো চালকের আসনে ফিরে আসতে পারে যদি তারা ইসলামকে জীবনাদর্শ তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সুমহান বাণীকে সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিমদের নেতৃত্ব অবশ্যই প্রয়োজনীয়। ইসলাম দ্বারা পরিচালিত একটি রাষ্ট্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উন্নয়ন সহায়ক পরিবেশ তৈরী হবে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ করা হবে। সে রাষ্ট্রের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য হবে যান্ত্রিক বিষয়ের সমাধান, শিল্প পদ্ধতি উন্নয়ন সাধন, রোগ প্রতিরোধের উপায় এবং যতদূর সম্ভব জীবনকে সমৃদ্ধ করার পদ্ধতি ও উপায়-উপকরণ অনুসন্ধান করা। জীবনব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন চিন্তা ভাবনাকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য উৎসাহিত করা হবে। প্রকৃতপক্ষে শিল্পায়ন হবে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম উদ্দেশ্য এবং এ বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই যে ইসলামী রাষ্ট্র অতিদ্রুত সময়ে শিল্প ও বিজ্ঞানে বিশ্বে আবারো নেতৃস্থানীয় অবস্থান তৈরী করে নেবে এবং সে রাষ্ট্র পরিণত হবে তথ্য প্রযুক্তি গবেষণা, চিকিৎসা, প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ, মহাশূন্য ও জিন গবেষণাসহ মানুষের জীবনের সকল প্রয়োজনীয় সমস্যার সমাধানের এক আকর্ষণীয় কেন্দ্রবিন্দু।

তাই এ ধারণা ঠিক নয় যে ইসলাম বৈজ্ঞানিক উন্নতির সাথে অসামঞ্জস্যশীল। ইসলামের প্রথম যুগে বিজ্ঞান উন্নতি লাভ করেছিল এবং একটি সত্যিকার ইসলামী রাষ্ট্রে বিজ্ঞান আবারো উন্নতি লাভ করবে। ইউরোপের খ্রিষ্টবাদ ও বিজ্ঞানের মধ্যকার তিক্ত অভিজ্ঞতা মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য করে তোলার প্রয়াস সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিষ্কের নয়। তাই ইসলামকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার করার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। তাহলে আমরাও প্রথম যুগের মুসলিমদের মত সত্যিকার ইসলামের অনুসারী হতে পারবো যারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি লাভ করেছিল।

বুধবার, ২৮ মার্চ, ২০১২

খিলাফত ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর টিকে ছিল? পর্ব-১

খিলাফাহ জার্নালের একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে ভাষান্তরিত

একথা সর্বজন স্বীকৃত যাতে কোন সন্দেহ নেই যে, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে সারা বিশ্বের নেতা রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা) এর হাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ বিশ্বাসঘাতক কামাল আতাতুর্কের হাতে তা ধ্বংস হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বা খিলাফত ব্যবস্থা যে ধারাবাহিকভাবে টিকেছিল তা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এ ব্যবস্থার ধারাবাহিক অস্তিত্ব বুঝতে চাই, তাহলে দেখতে হবে প্রথমতঃ এ ব্যবস্থার কাঠামো কি ইতিহাস জুড়ে টিকেছিল কিনা। দ্বিতীয়তঃ এ কাঠামোতে সময়ের আবর্তে কি কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা। রাসুল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়ের ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো হলঃ

১। খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান
২। খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মুওয়ায়ীন আত তাফউয়ীদ)
৩। খলীফার নির্বাহী সহকারী (মুওয়ায়ীন আত তানফীদ)
৪। গভর্ণরবৃন্দ (উলাহ্)
৫। আমীর-উল-জিহাদ
৬। বিচার বিভাগ
৭। প্রশাসনিক বিভাগ
৮। উম্মাহ্ কাউন্সিল (মাজলিস আল-উম্মাহ্)

তাই আমরা যদি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১৩০০ বছরের ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই পরামর্শ সভা মাজলিস আল উম্মাহটাই শুধু বিভিন্ন সময়ে উপেক্ষিত বা অবহেলিত ছিল। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর মাজলিস আল উম্মাহর প্রতি কিছু সংখ্যক খলীফার উদাসীনতার অর্থ এই নয় যে, পরামর্শ সভা না থাকলেই ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফতের অবসান হয়ে গেল। অন্য সব স্তম্ভ টিকে থাকলে মাজলিসুল উম্মাহ বা শুরা ছাড়াও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে, যদিও শুরা উম্মাহর অধিকার। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ ও বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঘটলেও এমন কখনো হয় নি যে, মুসলিমরা খলিফা বিহীন ছিল।

নিজের পুত্রকে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়া বা বংশীয় শাসনের অভিযোগ খানিকটা সত্য এবং এটাও সত্য যে, খলীফা নিয়োগের বায়াতের পদ্ধতিতেও কখনো কখনো অনিয়ম দেখা যায়। কিন্তু এটা খিলাফতের ধারাবাহিকতাকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। অনেক সময় এমনও ঘটেছে যে, খলীফা তার ছেলেকে যোগ্য মনে করলে তার মৃত্যুর আগেই জনগণের কাছ থেকে ছেলের জন্য বায়াতের শপথ আদায় করেছিলেন। পরবর্তীতে তা আবার নবায়ন করেছেন। এ বায়াত মূলত প্রভাবশালী লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করত।

খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফত টিকে থাকার কথা ইসলামী পণ্ডিতরাও স্বীকার করেছেন। যদিও এদের মধ্যে দু একজন তিরমিযী শরীফের একটি হাদিসের কারণে প্রথম চার খলীফার পর পরবর্তী খলিফাদের ক্ষেত্রে খলীফাশব্দটি ব্যবহার করতে অপছন্দ করতেন। সে হাদিসটি হলঃ রাসুল (সা) বলেছেন, “আমার পর আমার উম্মাহর মধ্যে ৩০ বছর পর্যন্ত খিলাফত থাকবে তারপর শুরু হবে বংশীয় শাসন (মুলকান আদ্দুদান) [একই বর্ণনা-সুনানে আবু দাউদ (২/২৬৪) এবং মুসনাদে আহমদ (১/১৬৯) থেকেও পাওয়া যায়।] ইসলামী বিশারদগণ  ব্যাখ্যা করেন যে, যেহেতু এ হাদিসটি এ বিষয়ক অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে আপাত দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মত প্রদান করে তাই এই হাদিসের গূঢ় অর্থ ৩০ বছর পর খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবে বোঝাচ্ছে না।

জাবির বিন সামুরাহ (রা) বর্ণনা করেন, “রাসুল (সা) বলেন, দীন ইসলাম ততদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে যতদিন না আল্লাহর নির্ধারিত ক্ষণ উপস্থিত হয় অথবা কুরাইশ বংশীয় বারজন খলীফা তোমাদেরকে শাসন না করে।[সহিহ মুসলিম] এ হাদিস থেকে বোঝা যায় মুসলমানদের চার পাঁচ জন নয় বরং একাধিক সংখ্যক খলীফা শাসন করবেন। এ হাদিস অনুসারে খিলাফত ব্যবস্থা শুধু ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাস্তব সম্মত নয়। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কাজী আইয়াদ বলেন, “এই হাদিসটিতে যেখানে বলা হয়েছে আমার পর খিলাফত ৩০ বছর টিকে থাকবে, এর পর শুরু হবে বংশীয় শাসনযা পুর্ববর্তী এই হাদিসটির সাথে সাংঘর্ষিক- যত দিন না কুরাইশ বার জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করে, ইসলামী দ্বীন ততদিন টিকে থাকবে। [সহিহ মুসলিম] এ সাংঘর্ষিক মনে হওয়া বিবৃতির সমাধান হল-৩০ বছর খিলাফত টিকে থাকবে নবুয়্যতের আদলে অর্থাৎ সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফত ব্যবস্থার আদলে। বাস্তবে এই ত্রিশ বছর হযরত আবু বকর (রা) থেকে হাসান বিন আলী (রা) এর শাসনকালকেই বোঝায়। [এভাবেই অ্যান নববী তার সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখ করেছেন পৃষ্ঠা-৮২১। পাঠক লক্ষ্য করুন এ ত্রিশ বছরে চার জন নয় বরং পাঁচ জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রাসুল (সা) বলেন, “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, যখন এক মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোন নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তারা (রা) (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন, তখন আপনি আমাদের কি করতে আদেশ দেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা তাদের একজনের পর একজনের বায়আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। (বুখারী, মুসলিম)

উল্লিখিত হাদিস থেকে বোঝা যায় রাসুল (সা) এর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী না আসায় কার তত্ত্বাবধানে মুসলমানদের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হবে সেটা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন এবং সেটা হচ্ছে খিলাফত ব্যবস্থা ও খলীফার তত্ত্বাবধানে।

১২ জন খলীফার বিষয়টিও কাযী আইয়াদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন সম্ভবত হাদিসটিতে যে ১২ জন খলিফার কথা বলা হয়েছে তারা হল এমন ১২ জন খলিফা যাদের শাসনকালে ইসলামের শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি পেয়েছিল-উম্মাহ ঐ সকল নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং সর্বোপরি খলীফা হিসেবে উম্মাহর দেখাশুনাও তারা ঠিকভাবে করেছিলেন। [আস সুয়্যুতি তারিখ আল খুলাফা, পৃষ্ঠাঃ ১৪]

ইবনে হাজার বলেন, “এই হাদিসটি সম্পর্কে যে কয়েকজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার মধ্যে কাযী আইয়াদের যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ রাসুল (সা) এর কিছু সংশ্লিষ্ট সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েই তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেমনঃ এ সম্পর্কে রাসুল (সা) বলেন, লোকেরা তাদেরকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে......। (ফাতহুল বারী) এর পাশাপাশি ইবনে হাজার কয়েকজন খলিফার উদাহরণসহ ঐতিহাসিক সত্যতা তুলে ধরেন।

চলবে .........