খিলাফাহ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
খিলাফাহ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১২

ইসলামী রাষ্ট্র - ক্রুসেডারদের বিদ্বেষ

[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

১৮৯৬ সালে একজন প্রখ্যাত ফরাসী লেখক, কাউন্ট হেনরি দ্যোকাস্ত্রি তার রচিত ইসলামশীর্ষক গ্রন্থে লিখেছে,

আমি কল্পনা করতে পারিনা মুসলিমরা কি ভাববে যদি তারা মধ্যযুগীয় উপকথা গুলো শুনতে পেত এবং জানতে পারত যে, খৃষ্টানরা তাদের নিয়ে কি ধরণের ছড়াগান (স্তোত্রগীত) রচনা করত! আমাদের সকল ছড়াগান, এমনকি ১২শ শতকের পূর্বের ছড়াগানগুলোও একটিমাত্র ধারণা থেকে বিকশিত হয়েছিল এবং ক্রুসেডের পিছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। এসকল স্তোত্রগীতগুলো ইসলাম ধর্মের প্রতি সম্পূর্ণ অজ্ঞতা ও মুসলিমদের প্রতি চরম বিদ্বেষে পরিপূর্ণ ছিল। এ সকল ছড়াগানগুলোর সুবাদে ইউরোপের মানুষের অন্তরে ইসলাম ধর্মের প্রতি তীব্র ঘৃণা গেঁথে গিয়েছিল। একধরণের বিধ্বংসী ধারণা তাদের অন্তরের গভীরের প্রোথিত হয়েছিল এবং যা আজো তাদের মাঝে বিদ্যমান। প্রত্যেকেই মুসলিমদের মুশরিক, অবিশ্বাসী, মূর্তিপুজারী ও ধর্মত্যাগকারী (মুরতাদ) হিসাবে বিবেচনা করত।

এভাবেই খৃষ্টান ধর্মগুরুরা ইউরোপে মুসলিম ও তাদের দ্বীন সম্পর্কে প্রচারণা চালাত। মধ্যযুগের অভিযোগগুলো ছিল ভয়ঙ্কর এবং তা মুসলিমদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও শত্রুতার আগুন প্রজ্জ্বলনে ব্যবহৃত হত। এর প্রভাবে গোটা ইউরোপ আচ্ছন্ন হয়েছিল এবং এর ফলেই ক্রুসেডার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। খৃষ্টানদের হাতে চরমভাবে পরাজিত ও অপদস্থ হবার প্রায় দুইশত বছর পর মুসলিমরা আবার ১৫শ শতাব্দীতে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে জিততে শুরু করেছিল এবং ইসলামী রাষ্ট্র কন্সটান্টিনোপোল জয় করতে সক্ষম হয়। এরপর ১৬শ শতাব্দীতে মুসলিমরা দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপ জয় করে নেয় এবং সেখানকার মানুষের কাছে ইসলামকে নিয়ে যায়। আলবেনিয়া, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া ও অন্যান্য দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলাম গ্রহন করে। ক্রুসেডারদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা পূনরায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠে এবং ওরিয়েন্টালিস্ট ধারণা বিকশিত হতে শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল মুসলিম সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করা, ইসলামের অগ্রযাত্রা রহিত করা এবং মুসলিমদের হুমকি খর্ব করা।

ইউরোপীয়ানদের অন্তরের গভীরে প্রোথিত এই শত্রুতা, ইউরোপের সকল খৃষ্টানদের মুসলিম ভূখন্ডে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির নামে মিশনারীদের পাঠানোর ব্যাপারে করিৎকর্মা করে তুলেছিল। এ মিশনগুলো স্কুল, ক্লিনিক, সংঘ ও ক্লাব গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। ইউরোপীয়ানরা তাদের সমস্ত সম্পদ ও সমগ্র প্রচেষ্টা মিশনারীদের পিছনে ব্যয় করতে শুরু করল। তাদের কর্মপন্থা (পলিসি) ও লক্ষ্যের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও কর্মপদ্ধতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। যেহেতু এগুলো তাদের কনসাল, রাষ্ট্রদূত (এম্বাসাডার), প্রতিনিধি ও মিশনারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তাই মিশনারী কার্যক্রমের পিছনে রাষ্ট্র ও জনগণ এক হয়ে গিয়েছিল।

পশ্চিমাদের অন্তরের ক্রুসেডারদের বিদ্বেষ ও ঘৃণা সযত্নে লালিত হচ্ছিল, বিশেষত ইউরোপ ও বৃটেন বাসীদের অন্তরে। তাদের মনের গভীর লালিত ভয়াবহ শত্রুতা ও নোংরা চিন্তাধারার আমাদের মাতৃভূমিতে আমাদের চরম লাঞ্ছনার মূল কারণ হিসাবে কাজ করেছিল। ১৯১৭ সালে জেনারেল এলেনবি আল-কুদস এ প্রবেশ করে ঘোষণা করল,

শুধুমাত্র আজই ক্রুসেডের পরিসমাপ্তি ঘটল।

এটি ছিল তার অনুভূতির এক সাধারণ বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এ থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার এবং প্রতিটি ইউরোপীয়ানের অন্তরে লালিত ঘৃণা ও দুষ্টবুদ্ধি স্পষ্ট হয়ে যায়। এটি তাদের প্রতিটি যুদ্ধের - সাংস্কৃতিক কিংবা সামরিক- মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছে। আল্লাহ সুবহানুওয়াতালা বলেছেন,

তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায় এবং তাদের হৃদয় যা গোপন রাখে তা আরো গুরুতর।” [আলি-ইমরান, ৩ঃ১১৮]

সন্দেহাতীত ভাবেই এলেনবি যা বলেছিল তা দুঃখজনক এবং তার দেশ বৃটেন যা লালন করছিল তা আরো গুরুতর। প্রতিটি ইউরোপীয়ানের জন্যই একথা প্রযোজ্য।

ক্রুসেডের দিনগুলো থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ঘৃণা ও বিদ্বেষ বিরাজ করেছে এবং আজো তাদের চক্রান্ত অব্যহত আছে। আমরা আজ রাজনৈতিক দিকগুলোর সাথে সাথে অত্যাচার, অপমান, উপনিবেশ ও শোষণের যে রূপ প্রত্যক্ষ করছি তা অদ্যাবধি মুসলিমদের প্রতি তাদের নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণেরই অংশ। অবশ্যই এটি বিশেষভাবে মুসলিমদের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত।

লিওপোল্ড ওয়েইস, “ইসলাম এট দ্য ক্রসরোডসবইতে লিখেছে, “নিশ্চয়ই রেনেসাঁ বা বিজ্ঞান ও ইউরোপীয় শিল্পের পূণর্জাগরণ, ইসলাম ও আরব উৎসের নিকট ঋণী। এটি পশ্চিম ও পূর্বের মাঝে একটি বস্তুগত সংযোগ তৈরী করেছিল। বাস্তবিকই ইউরোপ ইসলামী বিশ্বের কাছ থেকে ব্যাপক উপকৃত হয়েছিল, কিন্তু তারা কখনোই এই উপকারের কথা স্মরণ রাখেনি কিংবা স্বীকৃতিও দেয়নি; তারা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষের মাত্রা কমিয়ে কোনরূপ কৃতজ্ঞতাও দেখায়নি। বস্তুতঃ দিন দিন তাদের এই ঘৃণার মাত্রা গভীর ও তীব্র হয়েছে এবং এক সময় তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাদের মধ্যে এই ঘৃণা জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং প্রতিবার মুসলিম শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে তা তাদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বংশ পরম্পরায় এই ঘৃণা প্রতিটি ইউরোপীয় নারী পুরুষের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, এবং তাদের মন ও মগজের গভীরে প্রোথিত হয়ে গেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, সব ধরণের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের পরও তা তাদের মাঝে আজো জীবিত রয়েছে। এরপর ধর্মীয় সংস্কারের একটি সময় এসেছিল যখন ইউরোপ বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে গেল। তারা থাকত পরস্পরের বিরুদ্ধে রণ সাজে সজ্জিত, লড়াইয়ে উন্মুখ। কিন্তু তখনো প্রতিটি গোত্রের মাঝে ইসলামের প্রতি একই মাত্রার তীব্র বিদ্বেষ ও শত্রুতা পরিলক্ষিত হতে লাগল। সময়ের পরিক্রমায় দ্রুত ধর্মীয় উন্মাদনা ম্লান হয়ে গেল কিন্তু ইসলামের প্রতি তাদের একই রকম তীব্র ঘৃণা বজায় রইল। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে ফরাসী দার্শনিক ও কবি, ভলটেয়ার। যদিও সে খৃষ্টীয় বিশ্বাস ও গীর্জার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল, কিন্তু একই সাথে সে ইসলাম ও ইসলামের রাসুলের প্রতি অনুরূপ ঘৃণা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করত। এর কয়েক দশক পর পশ্চিমা বুদ্ধিজীবিরা বিদেশী সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করল এবং তাদের মাঝে একধরণের উদারমনস্ক ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু যখনই ইসলামের কথা আসত তখনই তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পুরনো ক্ষোভ ও সঙ্কীর্ণতা প্রবেশ করত। ইউরোপ ও ইসলামী বিশ্বের মাঝে ইতিহাসের যে ব্যবধান রচিত হয়েছিল তা আর কখনোই জোড়া লাগেনি এবং ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ইউরোপীয় চিন্তা চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।” 

উপরে উল্লেখিত বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই মিশনারী সংগঠনগুলো গঠিত হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খৃষ্টধর্মের প্রচার এবং মুসলিমদের মাঝে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা; এর মাধ্যমে তাদের অন্তরে সঙ্কীর্ণতার জন্ম দেয়া ও তাদের ব্যর্থতার জন্য ইসলামকেই দায়ী করা।

অন্যদিকে এসকল সংগঠনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। উভয়দিক থেকে এর ফলাফল ছিল অসমানুপাতিক ও ভয়াবহ। মিশনারী আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কুৎসা রটনার মাধ্যমে ইসলামকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে। এর সাথে যোগ হয়েছিল সমস্যা সৃষ্টি করে ইসলাম ও ইসলামের বিধান সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার অবতারণা করা, মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে বাধার সৃষ্টি করা এবং মুসলিমদের তাদের দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। মিশনারী আন্দোলনের পর এল ওরিয়েন্টালিস্ট আন্দোলন, যাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল এক ও অভিন্ন।

সমগ্র ইউরোপব্যাপী তাদের প্রচেষ্টা ও সম্পদ ঐক্যবদ্ধ করে তারা দ্বিতীয়বারের মত ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেছিল। এটি ছিল একধরণের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। এটি পরিচালিত হয়েছিল ইতিমধ্যেই ইসলামী বিধান, মূল্যবোধ ও মুসলিমদের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মুসলিমদের মনকে কলুষিত করার উদ্দেশ্যে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতার দোহাই দিয়ে তারা ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস বিকৃত করে মুসলিম যুবকদের মস্তিষ্ককে বিষাক্ত করে তুলেছিল। প্রকৃতপক্ষে অপসংস্কৃতির এই বিষাক্ত ছোবল ক্রুসেডারদের যুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল। মিশনারীরা বিজ্ঞান ও মানবতার নামে তাদের বিষাক্ত পুঁতিগন্ধময় আবর্জনা ছড়িয়ে দিতে লাগল। তারা এ কাজগুলো করত ওরিয়েন্টালিজম এর নামে। ওয়েইস বলেছে,

বাস্তবতা হচ্ছে, আধুনিক যুগের প্রথম ওরিয়েন্টালিস্ট ছিল খৃষ্টান মিশনারী, যারা মুসলিম দেশগুলোতে কাজ করছিল। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ইসলামী শিক্ষা ও ইতিহাসকে বিকৃত করেছিল, দক্ষতার সাথে ইউরোপীয়দের মাঝে মুসলিমদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। তাদের ভাষায় মুসলিমরা ছিল মুর্তিপূজারী। মিশনারীদের প্রভাব থেকে ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষণা পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে গেলেও তাদের এই বিকৃত ধারণা অব্যহত ছিল। যদিও বা ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষণাকে যেকোন ধর্মীয় ও অজ্ঞতার কুসংস্কার থেকে মুক্ত দাবী করা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলামের প্রতি ওরিয়েন্টালিস্টদের বৈরিতা তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সহজাত প্রবৃত্তিরই অংশ এবং এটি উদ্ভূত হয়েছে ক্রুসেডারদের যুদ্ধের প্রভাব থেকে।

এই উত্তারাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত বৈরিতাই পশ্চিমাদের অন্তরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ জিইয়ে রেখেছে। এটিই ইসলামকে এমনকি মুসলিম দেশ গুলোতেও মুসলিম বা অমুসলিম সবার নিকট জুজু হিসাবে চিত্রিত করে রেখেছে। তাদের দৃষ্টিতে ইসলাম মানবতার অগ্রযাত্রাকে ধ্বংসকারী এক অশুভ শক্তি। প্রকৃতপক্ষে এটি ইসলাম সম্পর্কে তাদের প্রকৃত আশঙ্কাকে গোপন করার প্রয়াসমাত্র। তারা জানে যে সত্যিই ইসলাম যদি মানুষের অন্তরে ও চিন্তায় গভীরে প্রোথিত হয় তবে তা অবিশ্বাসী উপনিবেশবাদী শক্তির পতনের ডঙ্কা বাজিয়ে দেবে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন পূনরায় বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত বয়ে নিয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ, অবশ্যই এটি পূনরায় ফিরে আসবে, এবং তা হবে মানবতা ও পশ্চিমের মঙ্গলার্থেই। মিশনারীদের কাজ অবশেষে তাদের দুঃখ ও বেদনার কারণ হয়ে দাড়াবে। আল্লাহ সুবহানুওয়া তালা বলেছেন,

আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত্ত করার জন্য কাফিররা ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তারা ধন-সম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে; অতঃপর তা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে,” [আল আনফালঃ ৩৬]

উত্তারাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বৈরীতা ইসলাম বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সহায়ক। আপনারা দেখবেন, পশ্চিমা পন্ডিতগণ কোনরূপ বিদ্বেষ ও সঙ্কীর্ণতা ছাড়াই তাওবাদ, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম কিংবা সমাজতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করে। কিন্তু তারা যখন ইসলাম নিয়ে গবেষণা করে, তখন তাদের মাঝে নোংরামি, ঘৃণা, এবং সঙ্কীর্ণতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। অথচ মুসলিমগণ অবিশ্বাসী উপনিবেশবাদীদের নিকট ইতিমধ্যেই পরাজিত হয়েছে। উপনিবেশবাদীদের সহায়তায়, পশ্চিমা ধর্মযাজকশ্রেণী এখনো সক্রিয়ভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে এবং তারা কখনোই ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে কুৎসা রটনা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তার সাহাবীদের অবমাননা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসকে বিকৃত করা থেকে বিরত হবেনা। নির্মম প্রতিশোধ গ্রহন ও উপনিবেশবাদীদের থাবাকে আরো দৃঢ় করতে তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টা অব্যহত থেকেছে এবং থাকবে।

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১২

ইসলামী রাষ্ট্র - পর্ব ৩ (সাহাবাদের গঠন পর্যায়)

নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে

দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসুল (সাঃ) যাদের মাঝেই ইসলাম গ্রহণ করার মতো মনমানসিকতা লক্ষ্য করতেন, জাতি, বর্ণ, বয়স, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ভেদাভেদে তাদের কাছেই তাঁর এ আহবান পৌঁছে দিতেন। তিনি কখনো তাঁর নির্বাচিত কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে দ্বীনের আহবান পৌঁছে দেননি বরং সকল শ্রেনীর মানুষকে তিনি সমান ভাবে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন এবং তারপর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনমানসিকতা বিচারে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ঈমান আনে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।

নও মুসলিমদের পরিপূর্ণ ভাবে দ্বীন এবং কুরআন শিক্ষা দেবার ব্যাপারে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন থাকতেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্য হতে একটি দল তৈরী করেন যারা পরবর্তীতে দাওয়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ দলে নারী-পুরুষ সহ মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চল্লিশ জনে উন্নীত হয়। যদিও এরা ছিল বিভিন্ন বয়সের কিন্তু এদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এদের মধ্যে ছিল ধনী, গরীব, সবল এবং দূর্বল সবধরনের মানুষ।

মুসলিমদের এদলটি আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভাবে ঈমান এনেছিল এবং এরাই মূলতঃ দাওয়াতের কার্য পরিচালনা করেছিল। এরা হলো:

১. 'আলী ইবন আবু তালিব (৮ বছর)
২. যুবাইর ইবন আল 'আওওয়াম ( ৮ বছর)
৩. তালহাহ্‌ ইবন আল 'উবাইদুল্লাহ্‌ (১১ বছর)
৪. আল আরকাম ইবন আবি আল আরকাম (১২ বছর)
৫. 'আব্দুল্লাহ্‌ বিন মাস'উদ (১৪ বছর)
৬. সাঈদ ইবন যায়িদ (বিশ বছরের নীচে)
৭. সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (১৭ বছর)
৮. সা'উদ ইবন রবি'য়াহ্‌ (১৭ বছর)
৯. জা'ফর ইবন আবি তালিব (১৮ বছর)
১০. শুহাইব আল রুমি (বিশ বছরের নীচে )
১১. যায়িদ ইবন হারিছা (প্রায় বিশ)
১২. 'উছমান বিন 'আফফান (প্রায় বিশ)
১৩. তুলাইব বিন 'উমায়ির (প্রায় বিশ)
১৪. খাব্বাব ইবন আল আরাত (প্রায় বিশ)
১৫. 'আমির ইবন ফুহাইরাহ (২৩ বছর)
১৬. মুসআব ইবন উমায়ির (২৪ বছর)
১৭. আল মিকদাদ ইবন আল আসওয়াদ (২৪ বছর)
১৮. 'আব্দুলাহ ইবন জাহস (২৫ বছর)
১৯. 'উমর ইবন আল খাত্তাব (২৬ বছর)
২০. আবু উবাইদাহ ইবন আল জাররাহ (২৭ বছর)
২১. 'উতবাহ ইবন গাজওয়ান (২৭ বছর)
২২. আবু হুদাইফাহ ইবন 'উতবাহ (৩০ বছর)
২৩. বিলাল ইবন রাবাহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৪. 'আইইয়াস ইবন রাবি'আহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৫. 'আমির ইবন রাবি'আহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৬. না'ইম ইবন 'আব্দুলাহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৭. 'উছমান (৩০ বছর) এবং
২৮. 'আব্দুলাহ (১৭ বছর) এবং
২৯. কুদামাহ্‌ (১৯ বছর) এবং
৩০. আল সাইব (প্রায় ২০, এরা সবাই মাজ'য়ুন ইবন হাবিব এর চার ছেলে)
৩১. আবু সালামাহ 'আব্দুলাহ ইবন 'আবদ আল আসাদ আল মাখযুমি (প্রায় ৩০ বছর)
৩২. 'আবদ আর রাহমান ইবন 'আওফ (প্রায় ৩০ বছর)
৩৩. 'আম্মার ইবন ইয়াসির (৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে)
৩৪. আবু বকর আল সিদ্দিক (৩৭ বছর)
৩৫. হামজাহ্‌ ইবন 'আবদ আল মুত্তালিব (৪২ বছর)
৩৬. 'উবাইদাহ ইবন আল হারিছ (৫০বছর)

কিছু সংখ্যক মহিলাও এদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করে।

তিন বছর পর এ সকল সাহাবাদের হৃদয় এবং অন্তর যখন পুরোপুরি ইসলামের আদর্শ এবং ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতে পরিপূর্ণতা লাভ করে তখন মুহাম্মদ (সাঃ) আশ্বস্ত বোধ করেন। তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে, তাদের হৃদয়ে ইসলাম গভীর ভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং ইসলামি আকীদার ভিত্তিতে তারা উচ্চমান সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, এই দলের অর্ন্তভূক্ত মুসলিমরা যখন সমাজের মানুষকে মুকাবিলা করার জন্য যথাযথ যোগ্যতা এবং দৃঢ়তা অর্জন করে তখন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) দুশ্চিন্তা মুক্ত হন এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী কুরাইশদের মুকাবিলায় মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন।

Link for English translation of the book The Islamic State

বাই'আতের প্রক্রিয়া

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতা কর্তৃক লিখিত ‘আজহিজাতু দাওলাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একাংশ হতে গৃহীত)

পূর্বের আলোচনায় আমরা খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাই'আত-ই যে একমাত্র ইসলাম সম্মত প্রক্রিয়া সে ব্যাপারে দলীলপ্রমাণ উপস্থাপন করেছি। বাস্তবে বাই'আত প্রদান প্রক্রিয়াটি হাতে হাত মিলানো কিংবা লেখার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে।

আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে দীনার থেকে বর্ণিত আছে যে, "যখন জনসাধারণ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে খলীফা নির্বাচনের বিষয়ে সম্মত হল তখন আমি ইবনে উমরকে এটি লিখতে দেখেছি যে, 'আমি এই মর্মে লিখছি যে, আল্লাহ্‌'র কিতাব,

রাসূলের (সাঃ) সুন্নাহ এবং আমার সাধ্যনুসারে আমি আমীর উল মু'মিনীন আবদুল মালিকের নির্দেশ শুনতে ও মানতে রাজী আছি।" অন্য যে উপায়েও বাই'আত দেয়া যেতে পারে।

তবে, কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্করাই বাই'আত দিতে পারবে। কারণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাই'আত গ্রহণযোগ্য নয়। আবু আকীল জাহ্‌রাহ ইবনে মা'বাদ তাঁর দাদা আবদুল্লাহ বিন হিশাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যিনি (ইবনে হিশাম) রাসূল (সাঃ) এর সময় জীবিত ছিলেন; তাঁর মা যয়নাব ইবনাতু হামিদ তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, 'হে আল্লাহ্‌'র রাসূল! তাঁর কাছ থেকে বাই'আত গ্রহণ করুন।' তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, 'সে তো ছোট'। অতঃপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে হিশামের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং দোয়া করলেন। (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭২১০)

বাই'আতে উচ্চারিত শব্দ সমূহের ব্যাপারে কোন সীমাবদ্ধতা নেই; তবে খলীফা যে আল্লাহ্‌'র কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহ্‌ দ্বারা শাসন করবেন এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি থাকা উচিত এবং যে ব্যক্তি বাই'আত দেবে সে যে সুসময়ে ও দুঃসময়ে এবং ভাল-মন্দ উভয় অবস্থাতেই খলীফার আনুগত্য করবে তাও উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। উপরে উল্লেখিত বিষয়বস্তু অনুসারে বাই'আতে উচ্চারিত শব্দসমূহের ব্যাপারে পরবর্তীতে একটি আইন পাশ করা হবে।

কোন ব্যক্তি যখন খলীফাকে বাই'আত দেবে তখন প্রদত্ত বাই'আত উক্ত ব্যক্তির উপর আমানত হয়ে যাবে এবং সে চাইলেই এ বাই'আত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কারণ, খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাই'আত প্রদান পর্যন্ত অন্যসব মুসলিমদের মতোই এটি তার অধিকার। কিন্তু, একবার বাই'আত প্রদান করলে সেখান থেকে হাত উঠিয়ে নেবার কোন অধিকার তার নেই। এমনকি সে চাইলেও তাকে অনুমতি দেয়া হবে না। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, একজন বেদুইন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) কে ইসলামের ব্যাপারে বাই'আত দিল। কিন্তু তারপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। এরপর সে রাসূল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে বলল,

"আমাকে বাই'আত থেকে মুক্ত করে দিন।' তিনি (সাঃ) তা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর ঐ ব্যক্তি আবার আসল এবং একই দাবি করল কিন্তু রাসূল (সাঃ) আবারও তাকে প্রত্যাখান করলেন। তারপর সে ব্যক্তি শহর ছেড়ে চলে গেল। [এ পরিপ্রেক্ষিতে] রাসূল (সাঃ) বললেন, "এই শহর হচ্ছে কামারের জ্বলন্ত চুল্লীর মতো; এটি অপবিত্রতা ও অপরিচ্ছন্নতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে এবং সেইসাথে, শ্বাশত সুন্দর ও সত্যকে আলোকদ্যুতির মতো বিচ্ছুরিত করে।" (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭২০৯)

এছাড়া, আব্দুল্লাহ্‌ বিন উমরের বরাত দিয়ে মুসলিম নাফিঈ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (ইবন উমর (রা) রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন,

'যে ব্যক্তি আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিল, সে কিয়ামতের দিন এমনভাবে আল্লাহ্‌'র সাথে দেখা করবে যে তার পক্ষে কোন প্রমাণ থাকবে না।' (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫১)

বস্তুতঃ খলীফার বাই'আত থেকে হাত উঠিয়ে নেবার অর্থ হল আল্লাহ্‌'র আনুগত্য থেকে হাত সরিয়ে নেয়া। তবে, এটি শুধুমাত্র সে অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যখন খলীফাকে নিযুক্তির বাই'আত দেয়া হবে কিংবা মুসলিম উম্মাহ্‌ খলীফাকে পূর্ণ আনুগত্যের শপথ প্রদান করবে। তবে, কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে খলীফা হিসাবে মনোনীত করে বাই'আত দেয়, কিন্তু উক্ত মনোনীত ব্যক্তি যদি মুসলিম উম্মাহ্‌ কর্তৃক নিযুক্তির বাই'আত না পায়, তবে এক্ষেত্রে বাই'আত দানকারী ব্যক্তি তার প্রদত্ত বাই'আত থেকে হাত সরিয়ে নিতে পারবে। কারণ, সে মুসলিম উম্মাহ্‌ কর্তৃক নিযুক্তির বাই'আত প্রাপ্ত হয়নি। মূলতঃ উপরোক্ত হাদীসটি (চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত) খলীফার আনুগত্য থেকে হাত সরিয়ে নেবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে; এমন ব্যক্তির উপর থেকে নয় যিনি খলীফা হিসাবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত বা নিযুক্ত হননি।

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

খলীফা নিয়োগ করার প্রক্রিয়া

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতা কর্তৃক লিখিত আজহিজাতু দাওলাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একাংশ হতে গৃহীত)

শরী'আহ যখন উম্মাহ্‌'র উপর একজন খলীফা নিয়োগ করাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, একইসাথে, শরী'আহ খলীফা নিয়োগ করার পদ্ধতিও নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ পদ্ধতি আল্লাহ্‌'র কিতাব ও রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌ দ্বারা প্রমাণিত। যে সমস্ত মুসলিম খলীফাকে বাই'আত দিবে তাদের অবশ্যই সে সময়ে খিলাফত রাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে। আর, যদি পরিস্থিতি এরকম হয় যে, যখন কোন খিলাফত রাষ্ট্র নেই, তখন সে অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উপরই বাই'আত দেবার দায়িত্ব বর্তাবে যেখানে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

বাই'আত যে খলীফা নির্বাচনের পদ্ধতি তা প্রমাণিত হয়, রাসূল (সাঃ) কে মুসলিমদের বাই'আত দেবার ঘটনা ও ইমামকে বাই'আত দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্‌'র রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশ থেকে। তৎকালীন মুসলিমরা রাসূল (সাঃ) কে নবী হিসাবে বাই'আত দেয়নি; বরং শাসক হিসাবে বাই'আত দিয়েছিল। কারণ, তাদের এ বাই'আত বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত ছিল না, বরঞ্চ তাদের কাজের সাথে সম্পর্কিত ছিল। সুতরাং, রাসূল (সাঃ) কে নবী বা রাসূল হিসেবে বাই'আত দেয়া হয়নি বরং শাসক হিসেবেই বাই'আত দেয়া হয়েছিল। কারণ, নবুয়্যতকে স্বীকৃতি দেবার বিষয়টি মূলতঃ বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত এবং এখানে বাই'আতের প্রক্রিয়াটি প্রযোজ্য নয়। সুতরাং, আল্লাহ্‌'র রাসূলকে বাই'আত দেবার বিষয়টি তাকে শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া বলেই বিবেচিত হবে।

পবিত্র কুর'আন ও হাদীসেও বাই'আতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:

"হে নবী ! তোমার নিকট মুমিন স্ত্রী লোকেরা যদি একথার উপর বাই'আত করবার জন্য আসে যে, তারা আল্লাহ্‌'র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যাভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, আপন গর্ভজাত জারজ সন্তানকে স্বামীর সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং কোন ভাল কাজের ব্যাপারে তোমার অবাধ্যতা করবে না, তবে তুমি তাদের বাই'আত গ্রহণ কর।" [সূরা মুমতাহিনা : ১২]

অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"হে নবী! যেসব লোক তোমার নিকট বাই'আত গ্রহণ করেছিল তারা আসলে আল্লাহ্‌'র নিকট বাই'আত করছিল। তাদের হাতের উপর আল্লাহ্‌'র হাত ছিল।" [সূরা আল ফাত্‌হ : ১০]

বুখারী থেকে বর্ণিত হযরত উবাদা ইবন সামিত (রা) বর্ণনা করেন,

"আমরা রাসূল (সাঃ) এর নিকট সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় শ্রবন ও আনুগত্য করার শপথ নিয়েছি। একথার উপরও শপথ নিয়েছি যে, আমরা উলূল আমর (শাসন কর্তৃত্বশীল)-এর সাথে বিবাদ করবনা। আমরা এই মর্মেও শপথ নিয়েছি যে, হকের জন্য উঠে দাঁড়াবো কিংবা হক কথা বলব যে অবস্থায়ই থাকি না কেন। আর, আল্লাহ্‌'র কাজের ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবো না।" (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫৪; সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-৪৭৪৮)

হযরত আবদুল্লাহ্‌ বিন আমর বিন আ'স (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্‌'র রাসূলকে (সাঃ) বলতে শুনেছি যে,

"যে ব্যক্তি কোন ইমামকে বাই'আত প্রদান করল, সে যেন তাকে নিজ হাতের কর্তৃত্ব ও স্বীয় অন্তরের ফল (অর্থাৎ সব কিছু) দিয়ে দিল। এরপর তার উচিৎ উক্ত ইমামের আনুগত্য করা। যদি অন্য কেউ এসে (প্রথম নিযুক্ত) খলীফার সাথে (ক্ষমতার ব্যাপারে) বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে দ্বিতীয় জনের গর্দান উড়িয়ে দাও।" (মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা-১০)

এছাড়াও মুসলিম বর্ণনা করেন আবু সাইদ খুদ্‌রী (রা) রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন:

"যদি দু'জন খলীফাকে বাই'আত দেয়া হয়, তাহলে দ্বিতীয়জনকে হত্যা কর।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫৩)

আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন যে, আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাঁকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

"বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সাঃ) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই'আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন।" (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৩৪৫৫)

উপরোক্ত দলীল সমূহ এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্‌'র কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ্‌ অনুযায়ী খলীফা নিয়োগ করার প্রক্রিয়া হল বাই'আত। সকল সাহাবী (রা) এটি জানতেন এবং তাদের জীবনে তা কার্যকর করেছিলেন। সুতরাং, খোলাফায়ে রাশেদীনদের কেন বাই'আত দেয়া হয়েছিল, এ সমস্ত দলীল-প্রমাণ থেকে তা পরিষ্কার।

খলীফা নিয়োগ করা ও বাই'আত প্রদানের জন্য গৃহীত বাস্তব পদক্ষেপসমূহ

বাই'আত প্রদানের পূর্বে খলীফা নিয়োগের বাস্তব পদক্ষেপসমূহ বিভিন্ন রকম হতে পারে। যে রকমটি হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ে, যারা আল্লাহ্‌'র রাসূল (সাঃ) এর ইন্তিকালের পরপরই উম্মাহ্‌'র খলীফা হিসাবে মনোনীত হয়েছিলেন - যেমন: আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী (রা)। এ সমস্ত পদক্ষেপের ব্যাপারে সকল সাহাবী (রা) নীরব থেকে তাঁদের স্বীকৃতি ও সম্মতি প্রদান করেছিলেন। এ বিষয়সমূহ যদি শারী'আহ্‌ সম্মত না হত তাহলে তাঁরা তা কোনক্রমেই মেনে নিতেন না। কারণ, এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার উপর মুসলিমদের মর্যাদা ও শরী'আহ্‌ হুকুম-আহ্‌কাম বাস্তবায়ন নির্ভর করে। আমরা যদি খোলাফায়ে রাশেদীনদের নিয়োগের বিভিন্ন ধাপসমূহের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব যে, বনু সা'ইদার প্রাঙ্গনে কিছু মুসলিমের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। (আল্লাহ্‌'র রাসূলের পর) সম্ভাব্য খলীফা হিসাবে সা', আবু উবাইদাহ্‌, উমর ও আবু বকর (রা) প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে, উমর ও আবু উবাইদাহ্‌ (রা) আবু বকর (রা) কে চ্যালেঞ্জ করতে অস্বীকৃতি জানান। অর্থাৎ, বিষয়টি তখন সা'দ এবং আবু বকর (রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার পর আবু বকর (রা) কে খলীফা হিসাবে বাই'আত দেয়া হয়। পরদিন মুসলিমদেরকে মসজিদে আহ্বান করা হয় এবং তারা সেখানে আবু বকর (রা) কে বাই'আত দেয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, বনু সা'ইদার প্রাঙ্গনের বাই'আতটি ছিল খলীফা হিসাবে নিয়োগের বাই'আত - যার মাধ্যমে আবু বকর (রা) মুসলিমদের খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হন। আর তার পরের দিন, মসজিদে গৃহীত বাই'আতটি ছিল আনুগত্যের বাই'আত।

আবু বকর (রা) যখন বুঝতে পারলেন যে তাঁর অসুস্থতা তাঁকে ক্রমশঃ মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে, ঠিক সে সময়ে মুসলিম সেনাবাহিনী পারস্য ও রোমান পরাশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধ করছিল। তখন তিনি তাঁর মৃত্যুর পর কে খলীফা হবেন এ ব্যাপারে মুসলিমদের সাথে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। তিনি প্রায় ৩ মাস ব্যাপী মদীনার মুসলিমদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে যখন তিনি অধিকাংশ মুসলিমের মনোভাব বুঝতে পারলেন, তখন তাঁর উত্তরসূরী হিসাবে তিনি উমর (রা.) এর নাম ঘোষণা করলেন। তবে, তাঁর এই মনোনয়ন উমরকে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসেবে নিয়োগের চুড়ান্ত চুক্তি হিসাবে বিবেচিত হয়নি। কারণ, আবু বকরের মৃত্যুর পর মুসলিমরা মসজিদে এসে উমর (রা) কে বাইয়াত দেয় এবং এভাবেই খলীফা হিসাবে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, উমর (রা) শুধুমাত্র বাই'আতের মাধ্যমেই খলীফা হয়েছিলেন; মুসলিমদের সাথে আবু বকর (রা) এর আলাপ-আলোচনা বা তাঁর মনোনয়নের মাধ্যমে নয়। যদি আবু বকর (রা) এর মনোনয়নই খলীফা নিয়োগের চূড়ান্ত চুক্তি হত, তাহলে উমর (রা) কে মুসলিমদের বাই'আত দেবার কোন প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং, এ ঘটনা আমাদের স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে যে, মুসলিমদের বাই'আত ছাড়া কেউ খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হতে পারবে না।

খলীফা থাকাকালীন সময়ে উমর (রা) যখন গুরুতরভাবে আহত হলেন তখন মুসলিমরা তাঁকে একজন খলীফা মনোনীত করার জন্য অনুরোধ করলেন; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু, এ ব্যাপারে তাদের ক্রমাগত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছয়জনকে খলীফা পদের জন্য মনোনীত করেন। অতঃপর তিনি শুয়াইব (রা) কে ইমাম নিযুক্ত করলেন এবং তাঁর মনোনীত ছয়ব্যক্তিকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে (তাঁর মৃত্যুর) তিনদিনের মধ্যে শুয়াইব (রা) কে খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব দিলেন। উমর (রা), শুয়াইব (রা) কে বললেন, "...যদি (ছয়জনের মধ্যে) পাঁচজন একব্যক্তির (খলীফা হবার) ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছে এবং একজন দ্বিমত পোষণ করে তাহলে তরবারি দিয়ে তার মস্তক উড়িয়ে দেবে...।" এ ঘটনাটি তাবারণী তার তা'রীখ গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন; এছাড়া, আরও উল্লেখিত আছে ইবন কুতাইবা'র গ্রন্থ আল ইমামা ও সিয়াসাহ, যা কিনা 'খিলাফতের ইতিহাস' (দ্যা হিস্ট্রি অফ খিলাফাহ্‌) নামে পরিচিত এবং ইবন সা'দ এর গ্রন্থ আত-তাবাকাত আল-কুবরাহ্‌'তে। তারপর উমর (রা) আবু তাল্‌হা আল-আনসারীকে পঞ্চাশ জন ব্যক্তির সহায়তায় তাঁর মনোনীত ছয়ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন এবং সেই সাথে, আল মিকদাদ ইবনে আল-আসওয়াদকে উক্ত ছয়প্রার্থীর মিলিত হবার স্থান নির্ধারণের দায়িত্ব দিলেন। উমর (রা) এর মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত ছয় ব্যক্তি একত্রিত হলেন। এরপর, আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) তাদের প্রশ্ন করলেন, "তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিকে খলীফা নির্বাচিত করার জন্য কে নিজেকে এ পদ থেকে সরিয়ে নিতে চাও?" এ প্রশ্নের উত্তরে সকলে নিশ্চুপ থাকলে তিনি বললেন, "আমি স্বেচ্ছায় খলীফার পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি।" তারপর তিনি এক এক করে প্রত্যেকের সাথে আলাদাভাবে আলোচনা করলেন। তিনি প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করলেন, "নিজেকে ছাড়া ছয়জনের মধ্যে আর কাকে তুমি এ পদের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি বলে মনে কর?" তাদের সকলের উত্তর আলী (রা) এবং উসমানের (রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ হল। এরপর, আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) এ দু'জনের মধ্যে কাকে জনগণ খলীফা নির্বাচিত করতে চায়, সে বিষয়ে মতামত সংগ্রহের জন্য বেরিয়ে পড়লেন। জনমত যাচাই এর জন্য তিনি মদীনার নারী-পুরুষ সবাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং খলীফা নির্বাচনের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি দিনরাত কাজ করেছিলেন। আল মুসওয়ার ইবনে মাখরামা'র বরাত দিয়ে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, "রাতের কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর আব্দুর রহমান বিন আউফ আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছিল যে পর্যন্ত না আমি জেগে উঠলাম। তিনি বললেন, "আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি ঘুমাচ্ছো, কিন্তু আল্লাহ্‌'র কসম, গত তিন রাত আমি খুব কমই ঘুমের আনন্দ উপভোগ করেছি।" এরপর মদীনার জনগণ ফজরের সালাত আদায় করার পর উসমান (রা) কে খলীফা হিসেবে বাই'আত দিল এবং এভাবেই তিনি মুসলিমদের বাই'আতের মাধ্যমে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হলেন। সুতরাং, উসমান (রা) মুসলিমদের বাই'আতের মাধ্যমেই খলীফা হয়েছিলেন, উমর (রা) কর্তৃক মনোনয়নের মাধ্যমে নয়।

উসমান (রা) নিহত হওয়ার সময় মদীনার সাধারণ জনগণ এবং কুফাবাসী আলী ইবনে আবি তালিব (রা) কে খলীফা হিসেবে বাই'আত দেন। এভাবে তিনিও মুসলিমদের বাই'আতের মাধ্যমে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হন।

সাহাবীদের বাই'আত দেয়ার প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করলে এটা পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, প্রথমে জনগণের কাছে খলীফা পদপ্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হতো এবং এদের প্রত্যেককে অবশ্যই খলীফা হবার আবশ্যিক শর্তাবলী পূরণ করতে হত। তারপর উম্মাহ্‌'র প্রভাবশালী ব্যক্তি - যারা উম্মাহ্‌কে প্রতিনিধিত্ব করতেন তাদের মতামত সংগ্রহ করা হত।

খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ে উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধি ছিলেন সাহাবা (রা) কিংবা মদীনার অধিবাসীগণ। যে ব্যক্তি সাহাবীদের (রা) অথবা অধিকাংশ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত হতেন, তাকেই বাই'আত দেয়া হত এবং তার আনুগত্য করা তখন মুসলিমদের উপর ফরয হয়ে যেত। এভাবেই মুসলিমরা খলীফাকে আনুগত্যের বাই'আত প্রদান করতো এবং তাদের নির্বাচিত খলীফাই শাসন ও কর্তৃত্বের ব্যাপারে উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধি হয়ে যেতেন।

খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) বাই'আত দেবার ঘটনাসমূহ থেকে মূলতঃ এ বিষয়গুলোই বোঝা যায়। এছাড়া, উমর (রা) এর ছয়জন ব্যক্তি মনোনীত করার বিষয়টি এবং উসমান (রা) কে বাই'আত দেবার সময় যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছিল, তা থেকে আরও দুটি বিষয় পরিস্কারভাবে বোঝা যায়। আর তা হল, প্রথমত একজন অন্তর্বর্তীকালীন আমীর (নেতা) এর উপস্থিতি, যিনি নতুন খলীফা নির্বাচিত হওয়া কালীন সময় উম্মাহ্‌'র দায়িত্বে থাকবেন এবং দ্বিতীয়ত খলীফার জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

অন্তর্বর্তীকালীন আমীর

একজন খলীফার কাছে তার মৃত্যু নিকটবর্তী মনে হলে কিংবা খলীফার পদ শূন্য হবার মত কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে নতুন খলীফা নির্বাচিত হওয়া কালীন সময়ে মুসলিমদের বিষয়াবলী দেখশুনা করার জন্য একজন অন্তর্বর্তীকালীন আমীর নিয়োগ করার ক্ষমতা খলীফার রয়েছে। পূর্ববর্তী খলীফার মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং তার প্রধান কাজ হবে তিনদিনের ভেতর নতুন খলীফা নির্বাচিত করা।

নতুন কোন আইন গ্রহণ করবার ক্ষমতা অন্তর্বর্তীকালীন খলীফার নেই। কারণ, এটি কেবলমাত্র উম্মাহ্‌'র বাই'আতের মাধ্যমে নির্বাচিত খলীফার জন্য সংরক্ষিত। খলীফা পদের জন্য মনোনীতদের মধ্য হতে কেউ অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হতে পারবেন না কিংবা মনোনীতদের কাউকে তিনি সমর্থন করতে পারবে না। কারণ, উমর (রা) তাঁর মনোনীত ছয়জনের মধ্য হতে কাউকে অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসেবে নিয়োগ দেননি।

নতুন খলীফা নির্বাচিত হওয়া মাত্রই অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের কার্যকাল শেষ হয়ে যাবে, কারণ তার মেয়াদ অস্থায়ী এবং দায়িত্ব একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের (নতুন খলীফা নির্বাচিত করা) মধ্যেই সীমিত।

শুয়াইব (রা) যে উমর (রা) কর্তৃক নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন আমীর ছিলেন তা উমর (রা) এর মনোনীত ছয়ব্যক্তি সম্পর্কিত উক্তি থেকে বোঝা যায়: "যে তিনদিন তোমরা আলোচনা করবে সে সময় শুয়াইব তোমাদের সালাতে ইমামতি করবে।" এরপর তিনি বলেছিলেন, "...যদি (ছয়জনের মধ্যে) পাঁচজন একব্যক্তির (খলীফা হবার) ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছে এবং একজন দ্বিমত পোষণ করে তাহলে তরবারি দিয়ে তার মস্তক উড়িয়ে দেবে...।" এটা প্রমাণ করে যে, শুয়াইব (রা) কে তাদের উপর কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছিল। এছাড়া, শুয়াইব (রা) কে সালাতের ইমামও নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং সে সময়ে সালাতে ইমামতির অর্থ ছিল জনগণের উপরও ইমাম (নেতা) নিযুক্ত হওয়া। এছাড়া, তাঁকে শাস্তি প্রদানের (মস্তক উড়িয়ে দেয়ার) ক্ষমতাও দেয়া হয়েছিল এবং আমরা জানি যে, একমাত্র আমীরই কোন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করার ক্ষমতা রাখেন।

আমীর নির্বাচনের এ ঘটনাটি একদল সাহাবীদের সম্মুখেই ঘটেছিল এবং এ বিষয়ে তারা কেউ কোন দ্বিমত পোষণ করেননি। সুতরাং, এটি ইজমা আস-সাহাবা বা সাহাবীগণের ঐক্যমত যে, নতুন খলীফা নির্বাচিত হবার পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে উম্মাহ্‌'র বিষয়াবলী এবং নতুন খলীফা নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া সমূহ দেখাশুনা করার জন্য একজনকে আমীর নিযুক্ত করার ক্ষমতা খলীফার রয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, খলীফা তার জীবদ্দশায় রাষ্ট্রের সংবিধানে এ অনুচ্ছেদটি সংযুক্ত করতে পারেন যে, যদি কোন খলীফা অন্তর্বর্তীকালীন আমীর নিযুক্ত না করেই ইন্তেকাল করেন, তবে একজনকে অবশ্যই অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসাবে নিযুক্ত করতে হবে।

একইভাবে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, খলীফার শাসনকালের শেষের দিকে যদি তার পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন আমীর নিয়োগ করা সম্ভব না হয়, তবে খলীফার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (Next Eldest Delegated Assistant) অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হবেন যদি না তাকে খলীফা পদের জন্য মনোনীত করা হয়। যদি তিনি খলীফা পদের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হন, তাহলে তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হবেন। যদি খলীফার সব প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীই পরবর্তী খলীফা পদের জন্য মনোনীত হন, তবে খলীফার জ্যেষ্ঠ্য নির্বাহী সহকারীকে আমীর নিযুক্ত করা হবে এবং পূর্বের মতোই ব্যাপারটি চলতে থাকবে। যদি উল্লেখিত সকলেই মনোনীত হন তবে কনিষ্ঠ নির্বাহী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবেন।

যদি খলীফাকে কোন কারণে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয় তাহলেও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রেও একইভাবে খলীফার জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হবেন, যদি না তিনি মনোনীতদের মধ্যে কেউ হন। আর, যদি তিনি মনোনীতদের একজন হন তাহলে তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী আমীর নিযুক্ত হবেন এবং এভাবে প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীদের শেষব্যক্তি পর্যন্ত ব্যাপারটি চলতে থাকবে। প্রতিনিধিত্ব সহকারীদের সকলেই মনোনীত হলে, জ্যেষ্ঠ্য নির্বাহী সহকারী আমীর হবেন এবং পূর্বের মতোই ব্যাপারটি চলতে থাকবে। যদি উল্লেখিত সকলেই মনোনীত হন তবে কনিষ্ঠ নির্বাহী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবেন।

খলীফা যদি শত্রুর হাতে বন্দী হন সেক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। তবে, এক্ষেত্রে খলীফাকে উদ্ধার করার কোন সম্ভাবনা না থাকলে অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের নির্বাহী ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা যথাযথ সময়ে উম্মাহ্‌'র কাছে উপস্থাপন করা হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, এই অন্তর্বর্তীকালীন আমীর খলীফা জিহাদে বা ভ্রমণে যাবার সময় যে ধরনের ডেপুটি বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন সেরকম কিছু নয়। রাসূল (সাঃ) যখন জিহাদে বা হিজ্জাত আল ওয়াদাতে যেতেন তখন এ রকম ডেপুটি নিয়োগ করতেন। জনগণের বিষয়াদি দেখাশুনা করার জন্য যতটুকু নির্বাহী ক্ষমতার দরকার হয়, সাধারণত এ ধরনের ডেপুটি খলীফা কর্তৃক ততটুকু নির্বাহী ক্ষমতা প্রাপ্ত হন।

মনোনীতদের তালিকা সংক্ষিপ্তকরণ

খোলাফায়ে রাশেদীনদের খলীফাপদে নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকা সংক্ষিপ্তকরণের একটি বিষয় ছিল। বানু সা'ইদার প্রাঙ্গনে মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর (রা), উমর (রা), আবু উবাইদাহ (রা) এবং সা'দ বিন উবাদাহ্‌ (রা)। কিন্তু, উমর (রা) এবং আবু উবাইদাহ (রা) নিজেদেরকে আবু বকরের সমতুল্য মনে করেননি, এজন্য তাঁরা আবু বকরকে চ্যালেঞ্জও করেননি। এ কারণে প্রতিযোগিতা আবু বকর ও সা'দ বিন উবাদাহ্‌র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে, বানু সাইদা'র প্রাঙ্গণে উপস্থিত মদীনার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ আবু বকরকে বাই'আত দিয়ে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত করলেন এবং এর পরদিন জনগণ আবু বকর (রা) কে আনুগত্যের বাই'আত দিলেন।

আবু বকর (রা) শুধুমাত্র উমর (রা) কে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। এ পদের জন্য তিনি অন্য আর কাউকেই মনোনীত করে যাননি। পরবর্তীতে, মদীনার মুসলিমরা প্রথমে উমরকে নিযুক্তির বাই'আত ও পরে আনুগত্যের বাই'আত প্রদান করে।

উমর (রা) ছয়ব্যক্তিকে খলীফা পদের জন্য মনোনীত করেছিলেন এবং খিলাফতকে এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছিলেন।

সেইসাথে, তিনি জনগণকে ছয়জনের মধ্য হতে একজনকে পছন্দ করবার সুযোগ দিয়েছিলেন। মনোনীতদের মধ্য হতে আব্দুর রহমান (রা) নিজেকে এ পদ থেকে সরিয়ে নিয়ে বাকী পাঁচজনের সাথে একান্তে আলোচনা করে সংখ্যাটি দুইয়ে নামিয়ে এনেছিলেন - এরা ছিলেন আলী (রা) এবং উসমান (রা)। পরবর্তীতে জনগণের মতামত যাচাই-বাছাই এর পর উসমান (রা) দিকে পাল্লা ভারী হয় এবং উসমান (রা) মুসলিমদের খলীফা নিযুক্ত হন।

আলী (রা) কে খলীফা হিসাবে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে সে সময় খলীফা পদের জন্য আর কেউ মনোনীত না হওয়ায় মদীনা ও কুফার অধিকাংশ মুসলিম তাঁকেই বাই'আত দেয়। আর, এভাবেই তিনি চতুর্থ খলীফা হিসাবে নিযুক্ত হন।

যেহেতু উসমান (রা) কে খলীফা হিসাবে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে (শরী'আহ্‌) অনুমোদিত সর্বোচ্চ সময়ের সবটুকুই নেয়া হয়েছিল; অর্থাৎ, তিনদিন ও এই দিনগুলোর মধ্যবর্তী দুই রাত এবং মনোনীত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সংক্ষিপ্ত করে দুই ব্যক্তিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল, সেহেতু গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সঠিকভাবে বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা বিস্তারিতভাবে এ ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করবো :

১. ২৩ হিজরীর জিলহজ্ব মাস শেষ হবার চারদিন আগে বুধবার ভোরে মিহরাবে নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় উমর (রা) কে ছুরিকাঘাত করা হয়। অভিশপ্ত আবু লু'লুয়া'র ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে ২৪ হিজরীর মহররম মাসের প্রথমদিন রবিবার সকালে উমর (রা) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উমর (রা) এর ইচ্ছা অনুসারে শুয়াইব (রা) তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান।

২. উমর (রা) এর দাফনের পর, তাঁর পূর্ববর্তী নির্দেশ অনুসারে আল মিকদাদ (রা) উমরের মনোনীত ছয়ব্যক্তিকে একটি বাড়ীতে একত্রিত করেন; যাদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব ছিল আবু তাল্‌হা'র উপর। এরপর, তাঁরা একে অন্যের সাথে আলোচনায় বসেন। পরবর্তীতে তাঁরা আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) কে তাঁদের মধ্য হতে এবং তাঁদের সম্মতিক্রমে খলীফা নির্বাচিত করার ব্যাপারে প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেন।

৩. আব্দুর রহমান (রা.) তাঁদের সাথে একান্তে আলোচনা করেন এবং প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করলেন, "নিজেকে ছাড়া ছয়জনের মধ্যে আর কাকে তুমি এ পদের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি বলে মনে কর?" তাঁদের উত্তর আলী (রা) এবং উসমানের (রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছিল। এভাবে আব্দুর রহমান (রা) বিষয়টি ছয়ব্যক্তি থেকে বিষয়টি দুইব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন।

৪. এরপর আব্দুর রহমান (রা) মদীনার জনগণের সাথে আলোচনা করা শুরু করেন।

৫. বুধবার রাতে, অর্থাৎ (রবিবার) উমর (রা) ইন্তেকালের পর তৃতীয় দিন রাতে আব্দুর রহমান তাঁর ভাতিজা আল মুসওয়ার ইবনে মাখরামার বাড়িতে গেলেন। এ বিষয়ে ইবনে কাসীর তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াতে বর্ণনা করেছেন যে :

"যখন উমরের মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনের রাত শুরু হল আবদূর রহমান তাঁর ভাতিজা আল মুসওয়ার ইবনে মাখরামার বাড়িতে গেলেন এবং বললেন, "দেখতে পাচ্ছি তুমি ঘুমাচ্ছো, কিন্তু আল্লাহ্‌'র কসম! গত তিনরাত আমি খুব কমই ঘুমের আনন্দ উপভোগ করেছি।" তিনরাত মানে রবিবার সকালে উমর (রা.) মারা যাবার পরে অর্থাৎ, সোম, মঙ্গল ও বুধবারের রাত। তারপর তিনি বললেন, "...যাও আলী এবং উসমানকে ডেকে নিয়ে এসো...", তারপর তিনি তাঁদেরকে (আলী ও উসমানকে) মসজিদে ডেকে নিয়ে আসলেন এবং জনসাধারণকে নামাজের জন্য ডাকা হলো। এটা ছিল বুধবার ভোরের ঘটনা। তারপর তিনি আলী (রা) এর হাত ধরলেন এবং তাঁকে আল্লাহ্‌'র কিতাব, রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌ ও আবু বকর ও উমর (রা) এর কর্মের উপর বাই'আত করতে বললেন। আলী (রা) তাঁকে তার সেই বিখ্যাত উত্তরটি দিলেন, "আল্লাহ্‌'র কিতাব ও রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌র উপর আমি বাই'আত নিলাম। কিন্তু, আবু বকর ও উমরের কর্মের বিষয়ে তিনি বললেন যে, এ সকল বিষয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ইজ্‌তিহাদ প্রয়োগ করবেন। এ কথা শুনার পর আব্দুর রহমান, আলীর হাত ছেড়ে দিলেন। এরপর, আব্দুর রহমান বিন আউফ, উসমান (রা) এর হাতটি ধরলেন ও তাঁকেও একই কথা বলতে বললেন। উসমান (রা) বললেন, 'হ্যাঁ, আল্লাহ্‌'র নামে।' এভাবে উসমান (রা) এর বাই'আত সম্পন্ন হল।

শুয়াইব (রা) সেদিনের ফযর ও জোহরের নামাযে ইমামতি করলেন। এরপর, উসমান (রা) মুসলিম উম্মাহ্‌'র খলীফা হিসেবে আসর থেকে ইমামতি শুরু করলেন। এর অর্থ হচ্ছে, যদিও উসমান (রা) ফজরের সময় নিযুক্তির বাই'আত পেয়েছিলেন, কিন্তু মদীনার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বাই'আত পাবার পূর্ব পর্যন্ত মুসলিমদের আমীর হিসেবে শুয়াইব (রা) এর কর্তৃত্বই বহাল ছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বাই'আত দেবার পর্ব শেষ হয়েছিল মূলতঃ আসরের কিছু আগে, যখন সাহাবারা উসমান (রা) কে বাই'আত দেয়ার ব্যাপারে একে অপরকে আহ্বান করছিলেন। আসরের কিছুকাল পূর্বে বাই'আত গ্রহণ পর্ব শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে আমীর হিসাবে শুয়াইব (রা) এর কার্যকালও শেষ হয়ে যায় এবং আসরের নামায থেকে উম্মাহ্‌'র খলীফা হিসাবে উসমান (রা) ইমামতি শুরু করেন।

'আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থের রচয়িতা ব্যাখ্যা করেছেন, কেন উসমান (রা) ফজরের সময় বাই'আত নেয়া সত্ত্বেও শুয়াইব (রা) জোহরের নামাযে ইমামতি করেছিলেন। এ বিষয়ে তার ব্যাখ্যা হল: "কিছু মানুষ মসজিদে উসমানকে বাই'আত দেয়ার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মাজলিশ আশ-শুরা ভবনে (যেখানে শুরা কমিটির লোকজন মিলিত হতেন)।

সেখানে বাকীরা তাঁকে বাই'আত দেয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, জোহর নামায অতিক্রান্ত হবার পরও উসমানের বাই'আত গ্রহণ পর্ব চলছিল। আর, এ কারণেই মসজিদে নববীতে জোহরের নামাযে শুয়াইব (রা) ইমামতি করেছিলেন।

সুতরাং, মুসলিম উম্মাহ্‌'র খলীফা হিসাবে উসমান (রা) প্রথম যে নামাযে ইমামতি করেছিলেন তা ছিল আসরের নামায।"

বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে উমর (রা) ছুরিকাহত হওয়ার দিন, আহত হবার পর তাঁর ইন্তিকালের দিন এবং উসমান (রা) এর বাই'আতের দিনগুলোর ব্যাপারে কিছু মতপার্থক্য আছে। তবে, আমরা চেষ্টা করেছি দলীল-প্রমাণের দিক থেকে যেটি সবচাইতে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সেটি উপস্থাপন করতে।

উপরোক্ত আলোচনা অনুসারে, (খলীফার ইন্তিকাল কিংবা অপসারণের মাধ্যমে) খলীফার পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন খলীফা মনোনয়নের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়াবলীর প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে :

১. খলীফা নিয়োগের কাজটি দিন-রাত ব্যাপী করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি সম্পন্ন হয়।

২. খলীফা নিযুক্ত হবার আবশ্যিক শর্তাবলী পূরণের মাধ্যমে মনোনীতদের তালিকা করতে হবে এবং এ বিষয়টি মূলতঃ পরিচালিত হবে মাহ্‌কামাতুল মাযালিমের মাধ্যমে।

৩. তারপর মনোনীতদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করা হবে দু'বার: প্রথমে ছয় এবং পরে দুই। উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধি হিসাবে মজলিশ আল-উম্মাহ্‌ এই সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরীর কাজ করবে। এর কারণ হল, উম্মাহ্‌ উমর (রা) কে তাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিল এবং উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধি হিসাবেই তিনি সম্ভাব্য ছয়জনের তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন।

পরবর্তীতে, মনোনীত এই ছয়জন তাঁদের মধ্য হতে একজনকে অর্থাৎ, আব্দুর রহমান বিন আউফকে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছিলেন। যিনি আবার আলোচনার ভিত্তিতে এই তালিকা সংক্ষিপ্ত করে তা দু'জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছিলেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি পর্যায়ে উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই বিষয়টি সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং, এটি উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধিত্বকারী মজলিশ আল-উম্মাহ্‌'র কাজ।

৪. নতুন খলীফা নির্বাচনের ঘোষণার সাথে সাথে অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের কার্যকাল শেষ হবে না; বরং বাই'আত গ্রহণ পর্ব পুরোপুরি সম্পন্ন হবার পর তার কার্যকাল শেষ হয়ে যাবে। কারণ, শুয়াইব (রা) এর কার্যকাল উসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হবার সাথে সাথে শেষ হয়নি; বরং বাই'আত গ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হবার পরই তা শেষ হয়েছিল।

তিন দিন এবং এদের অন্তর্বর্তী রাত সমূহের ভেতর কিভাবে নতুন খলীফা নির্বাচিত করা যায় সে ব্যাপারে একটি বিল পাশ করা হবে। অবশ্য এটি ইতিমধ্যে কার্যকর হয়ে গেছে। ইন্‌শাআল্লাহ্‌ আমরা যথা সময়ে এটি উম্মাহ্‌'র কাছে উপস্থাপন করবো।

সুতরাং, মুসলিম উম্মাহ্‌'র যদি একজন খলীফা থাকে এবং কোন কারণে যদি তাকে অপসারণ করা হয় কিংবা তার মৃত্যু হয়, তবে এ সকল ক্ষেত্রে এ বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, মুসলিম উম্মাহ্‌'র উপর কোন খলীফা কর্তৃত্বশীল অবস্থায় নেই, তবে সেক্ষেত্রে মুসলিমদের জন্য শারী'আহ্‌ আইন বাস্তবায়ন করা এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেবার জন্য তাদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক হবে; ১৩৪২ হিজরীর ২৮ রজব তারিখে (১৯২৪ সালে ৩ মার্চ) ইস্তাম্বুলে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবার পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় মুসলিমদের প্রতিটি ভূমিই খলীফা নিয়োগ দেবার জন্য উপযুক্ত, যে খলীফার উপর খিলাফত রাষ্ট্রের গুরুভার অর্পণ করা হবে। সুতরাং, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোন একটি দেশের জনগণ যদি কাউকে খলীফা হিসেবে বাই'আত দেয় এবং তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর উপর উক্ত খলীফাকে আনুগত্যের বাই'আত দেয়া ফরয হয়ে যাবে, অর্থাৎ তার শাসন-কর্তৃত্বকে পরিপূর্ণভাবে স্বীকার করে নিতে হবে। তবে, এটি শুধুমাত্র উক্ত খলীফাকে তার নিজ ভূমির জনগণ বাই'আতের মাধ্যমে তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করার পরেই কার্যকরী হবে। যাই হোক, উক্ত রাষ্ট্রকে (যে রাষ্ট্রে খলীফা নিয়োগ করা হবে) নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:

১. উক্ত রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্ব অবশ্যই মুসলিমদের হাতে থাকতে হবে। এ শাসন-কর্তৃত্ব কোন কাফির-মুশরিক
রাষ্ট্র কিংবা শক্তির অধীনস্থ হতে পারবে না।

২. উক্ত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ইসলামের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে অর্থাৎ দেশের আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নিরাপত্তা অন্য সবকিছু ব্যাতীত শুধুমাত্র ইসলামের নামে হতে হবে এবং তা ইসলামী (মুসলিম) সেনাবাহিনীর হাতে থাকতে হবে।

৩. উক্ত রাষ্ট্রে ইসলামকে তাৎক্ষণিক, পূর্ণাঙ্গ এবং মৌলিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের সাথে খলীফাকে যুক্ত থাকতে হবে।

৪. খলীফাকে অবশ্যই নিয়োগের সকল আবশ্যিক শর্ত পূরণ করতে হবে, যদিও পছন্দনীয় শর্তসমূহ (preferred condition) পূরণ না করলেও চলবে।

যদি কোন রাষ্ট্র এ চারটি শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয় তাহলে শুধুমাত্র তাদের বাই'আতের মাধ্যমেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাদের মাধ্যমেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হবে। সেইসাথে, তাদের নির্বাচিত খলীফা হবেন উম্মাহ্‌'র বৈধ খলীফা এবং এ অবস্থায় তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বাই'আত প্রদান করা শরী'আহ্‌ সম্মত হবে না।

এরপর যদি অন্য কোন রাষ্ট্র কাউকে খলীফা হিসাবে বাই'আত দেয় তবে তা বাতিল বলে বিবেচিত হবে। কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

"যদি দুই জন খলীফাকে বাই'আত দেয়া হয় তাহলে পরের জনকে হত্যা কর।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫৩)

"প্রথমজনের বাই'আত সম্পূর্ণ কর, তারপরও প্রথমজনের।" (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৩৪৫৫)

"যে ব্যক্তি কোন ইমামকে বাই'আত প্রদান করল, সে যেন তাকে নিজ হাতের কর্তৃত্ব ও স্বীয় অন্তরের ফল (অর্থাৎ সব কিছু) দিয়ে দিল। এরপর তার উচিত উক্ত ইমামের আনুগত্য করা। যদি অন্য কেউ এসে (প্রথম নিযুক্ত) খলীফার সাথে (ক্ষমতার ব্যাপারে) বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে দ্বিতীয় জনের গর্দান উড়িয়ে দাও।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৪৪)

বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১২

সম্পদ যথেষ্ট, সম্পদের বিতরণই মূল অর্থনৈতিক সমস্যা


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জীবন পরিচালনা করার জন্য সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তিনি সৃষ্টি করে তা মানুষের ব্যবহারের জন্য অর্পণ করেছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

"তিনিই সে সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সেই সমস্ত।" [সূরা বাকারা : ২৯]

"এবং আয়ত্ত্বাধীন করে দিয়েছে তোমাদের, যা আছে নভোমন্ডলে ও যা আছে ভূমন্ডলে; তার পক্ষ থেকে।" [সূরা আল জাসিয়া : ১৩]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরো বলেছেন,

"যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়" [সূরা হাশর: ৭]

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা বাদ দিলে তার পরিণতি কি হবে সে সম্পর্কেও তিনি সমগ্র মানব জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছেন,

"যে আমার বাণী (কুরআন) প্রত্যাখ্যান করবে, তার জীবনসামগ্রী সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে পুনরুত্থান দিবসে অন্ধভাবে তুলব।" [সূরা তোয়াহা : ১২৪]

উন্নততর জীবনের পথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য কুরআন প্রেরণ করেছেন। তিনি পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যাসহ মানব জীবনের সকল সমস্যার বিস্তারিত সমাধান তুলে ধরেছেন। ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি তথা খিলাফত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আদেশ ও নিষেধ। এই ব্যবস্থা মানবরচিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল ভ্রান্তি আর পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে মুক্ত। আর একমাত্র খিলাফত সরকারই অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সমস্যা সমাধান করার সাথে সাথে গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে পরে।

ইসলাম মানুষের চাহিদাগুলোকে সামষ্টিকভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদাগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইসলামিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত না করে সবাইকে সমাজ থেকে যেনতেনভাবে তা অর্জন করার জন্য বিচ্ছিন্নবভাবে ছেড়ে দেয়না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা খিলাফত রাষ্ট্রের উপর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা - এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণকে ফরয বা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। রাসূল (সাঃ) বলেন, "বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য এক টুকরা কাপড়, আর খাওয়ার জন্য এক টুকরা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।" (তিরমিযী)

রাষ্ট্রের নাগরিকের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে খলীফা বাধ্য। যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: "সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।" ইমাম (তথা খলীফা যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনি)ও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।

মা'কিল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ্‌ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।" (মুসলিম)

সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখা কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক খলীফার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।