বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১২

নাস্তিকতার অন্ধ বিশ্বাস

ইসলামের অনুসারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবনমনের পর এবং ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের উত্থানের পর একটা বিশাল সময় ধরে তথাকথিত আঁতেল বুদ্ধিজীবীদের মুখে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসকে অন্ধ বিশ্বাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এখনও সমাজতন্ত্রীরা স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসকে আফিমতুল্য মনে করেবিজ্ঞান কর্তৃক স্রষ্টাকে আবিষ্কার করার ব্যর্থতা এবং বিবর্তনবাদ তাদের আত্মতৃপ্তির পালে হাওয়া দিয়েছিল। নিম্নে আমরা আলোচনা করার চেষ্টা করব যেস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাসনাকি নাস্তিকতা অন্ধ বিশ্বাস। এইখানে স্পষ্ট হয়ে নেয়া ভাল যেস্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণিত হলেধর্মনিরপেক্ষতাসমাজতন্ত্রফ্রীডম বা ব্যাক্তি স্বাধীনতাগণতন্ত্র প্রভৃতি ধারণাগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা হারাবে। অর্থাৎ স্রষ্টা প্রদত্ত জীবনব্যবস্থার বাইরে অন্য সকল জীবনব্যবস্থা বুদ্ধিদীপ্ত মনের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

প্রথমে, আমরা দেখব যে, বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দিয়ে স্রষ্টাকে প্রমাণ করা কতটা যৌক্তিক। বস্তুত, বিজ্ঞান শুধুমাত্র ঐসকল বিষয় নিয়ে মতামত দিতে পারে, যেইসব বিষয় পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা তার আছে। উদাহরণস্বরূপ, ১ টা ৫ ফুট লম্বা টেবিল যে ৫ ফুট, এটা বিজ্ঞান তখনই বলতে পারবে, যখন তার কাছে ফুট এর সংজ্ঞা জানা থাকবে। কিন্তু টেবিলকে মাপতে পারলেও কোন ব্যক্তি এটা বানিয়েছে, বা আদৌ এটা কেউ বানিয়েছে কিনা, কিংবা সে দেখতে কেমন, কি খায়, কি পরে এইসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান দিতে পারেনা। বিজ্ঞান শুধু বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করে তার বৈশিষ্ট্য আমাদেরকে জানাতে পারে। কিন্তু বৈশিষ্ট্যের কারণ জানাতে পারেনা। যেমন ২ টা হাইড্রোজেন (H) ১ টা অক্সিজেন (O) এর সাথে মিলে পানি তৈরি করে, কিন্তু কেন পানিই তৈরি করল, আগুন কেন তৈরি করলনা, এই ব্যপারে বিজ্ঞান নীরব। সে শুধু বস্তুর গুনাগুন বা বৈশিষ্ট্য বলতে পারে, ততটুকুই যতটুকু সে পরীক্ষালব্ধ ফলাফল থেকে অবগত হয়। তাই এই সীমিত বিজ্ঞান কে দিয়ে স্রষ্টাকে খুঁজে না পেলেই যে তাকে অস্বীকার করতে হবে, এটা হাস্যকর।

দ্বিতীয়ত, অনেকেই যৌক্তিক পদ্ধতি (Logical method) ব্যবহার করে স্রষ্টার অস্তিত্ব বুঝার জন্য। কিন্তু এর দুর্বলতা হল যে, যুক্তি সবসময় ১ টা পূর্বলব্ধ ভিত্তি (Premise) এর উপর ভর করে চলে। যদি এই পূর্বলব্ধ ভিত্তি ভুল হয়ে থাকে তাহলে, যুক্তির উত্তরটি ভুল হবে। যেমন ধরুন, কেউ বলল, “কাঠ আগুনে পুড়ে, রফিকের নৌকাটি কাঠের তৈরি, তাই ওটাও আগুনে পুড়বে এই কথাটি মিথ্যা হবে যদি, নৌকাটি পানিতে ডুবানো থাকে। এখন যুক্তি সবসময় যে পূর্বলব্ধ ভিত্তি নিয়ে কাজ করে তা যে স্বাভাবিক উপলব্ধিমূলক হবে তার কোন মানে নেই। অন্য একটা উদাহরণ দেই, “বাঙ্গালীরা দুর্নীতিবাজ, ফারযানা একজন বাঙ্গালী, সুতরাং সেও দুর্নীতিবাজ এই কথাটা সত্যও হতে পারে আবার মিথ্যাও হতে পারে। কোন নিশ্চয়তা নাই। তাই যুক্তি দিয়ে স্রষ্টাকে প্রমাণ করার প্রমাণ যেমন আছে, অপ্রমাণ করার প্রমাণ ও আছে। অতএব যৌক্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করে কখনো চূড়ান্ত ও সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এইবার আসি চিন্তার ঐ পদ্ধতিতে যা মানবজাতি সার্বজনীনভাবে তার জীবনের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করে থাকে। আর তা হল, বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি (Rational method) এই পদ্ধতিতে মানুষ তার চারপাশের বস্তুসমুহকে তার ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করে। সেই বস্তু সম্পর্কে তার কাছে কিছু পূর্বলব্ধ তথ্য (Previous information) থাকে। সেই পূর্বলব্ধ তথ্য কে ব্যবহার করে সে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। সব মানুষই এই পদ্ধতিতে চিন্তা করে থাকে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Scientific Method) এবং যৌক্তিক পদ্ধতি (Logical method) কে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি (Rational method এর শাখা বলা যেতে পারে। মানুষ কিভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে, তার একটা উদাহরণ দেই। যখন আপনার দরজায় কেউ টোকা দেয়, তখন আপনি কিন্তু মাপতে বসেন না যে, কত কম্পাংকে, তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে শব্দটা আসল, তারপর হিসাব করেন যে একজন মানুষ কত জোরে বা কত কম্পাংকে আঘাত করতে পারে, তারপর দরজা খুলেন। না, আমরা কেউই এইভাবে সিদ্ধান্ত নেইনা। বরং দরজায় টোকা দিলে তা আমরা ইন্দ্রিয় (শ্রবণ) দ্বারা উপলব্ধি করি, আমাদের মস্তিষ্কে এর ব্যপারে পূর্বলব্ধ তথ্য আছে যে, টোকা দেওয়ার মানে এই যে কেউ এসেছে, এবং তখন আমরা দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নিই। এ থেকে আমরা বলতে পারি যে, বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নিতে যে কয়েকটি বিষয় থাকা প্রয়োজন তা হল

১. বাস্তবতা
২. ইন্দ্রিয় দ্বারা বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা
৩. বাস্তবতা সম্পর্কে পূর্বলব্ধ তথ্য
৪. পূর্বলব্ধ তথ্য এর সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সুস্থ, স্বাভাবিক মস্তিষ্ক।

এখন মনের মধ্যে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে, স্রষ্টার কোন বাস্তবতা আমাদের সামনে নেই যে আমরা তাকে ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করব, তাহলে স্রষ্টার অস্তিত্ব এই পদ্ধতিতে বুঝব কিভাবে?? ১০০% correct. আপনার দরজায় নক করলে আপনি দরজার বাইরে কারো অস্তিত্ব বুঝতে পারেন, কিন্তু যিনি নক করছে, তিনি কি পুরুষ না মহিলা, ফর্সা নাকি কালো তা কিন্তু বুঝার উপায় নেই। কিন্তু তার অস্তিত্ব বুঝা যায়। আমাদের সামনে স্রষ্টার বাস্তবতা না থাকলেও সমস্যা নেই। আমাদের চারপাশে যে বস্তুসমুহ আছে, যাদেরকে আমরা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি, চলুন সেগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গবেষণা করে দেখি। আমরা আমাদের আশপাশের প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করব, এবং দেখব আদৌ কোন স্রষ্টার প্রয়োজন আছে কিনা। এখানে মনে রাখতে হবে এই পদ্ধতিতে আমরা দেখব মহাবিশ্বের স্রষ্টা আছে কিনা, কিন্তু তিনি দেখতে কেমন, কিভাবে কাজ করেন তা বুদ্ধিবৃত্তিকভাব জানা সম্ভব নয়, কারণ উনি আমাদের ইন্দ্রিয়ের বাইরে, তাকে জানতে হলে একটা পদ্ধতিই আছে, আর তা হল উনি যদি নিজে থেকে আমাদেরকে জানান।

আমাদের চারপাশের প্রত্যেকটি বস্তুর মধ্যেই ২ টি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এরা প্রত্যেকেই সীমাবদ্ধ এবং নির্ভরশীল। যেমন, গাছ আকার আকৃতি, দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য সূর্য, পানি ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। মানুষ নানা দিক দিয়ে সীমাবদ্ধ এবং নির্ভরশীল। আলো তরঙ্গদৈর্ঘ্য, গতি দ্বারা সীমাবদ্ধ, নির্ভরশীল উৎস কিংবা রুপান্তর প্রক্রিয়ার উপর। প্রত্যেকটি বস্তু নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল। এবং এরা কেউই নিজেরা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য দায়ী নয়। যদি তারা নিজেরা নিজেদেরকে অস্তিত্বে আনতে পারতো তাহলে তারা সীমাবদ্ধতা আর দুর্বলতার উর্ধ্বে থাকত। যদি ধরে নেই যে, নির্ভরশীলতায় তারা একে অপরের উপর নির্ভরশীল এবং কোন স্রষ্টার দরকার নেই, তাহলে আদিকাল থেকে চলে আসা ঘটনা বা বস্তুসমুহের সরুপ দাঁড়ায় .......... y। এইটা অসম্ভব, কারণ কোন শুরু না থাকলে, v, w, x, y এদের কারো অস্তিত্বে আসা সম্ভব নয়। একটা উদাহরণ দেই। আপনি একটা ক্রিকেট দলের ১০ নাম্বার ব্যাটসম্যান। আপনি কয়জনের পর নামবেন? ৯ জনের পর। আপনি কোন দলের ১০০ তম ব্যাটসম্যান হলে নামবেন ৯৯ জনের পর। আপনার দলে যদি অসীম সংখ্যক ব্যাটসম্যান থাকে, তাহলে আপনি কবে নামবেন? কখনই নামবেন না, কারন আপনার পূর্বে অসীম সংখ্যক ব্যাটসম্যান আছে (অর্থাৎ শুরুও নাই, শেষ ও নাই) আপনার আগেরজনের পূর্বেও অসীম সংখ্যক, তার আগের জনের পূর্বেও অসীম সংখ্যক। সুতরাং কোন ব্যাটসম্যানই নামতে পারবেনা, কারণ প্রত্যেকের পূর্বেই আছে অসীম সংখ্যক। অর্থাৎ কোন শুরু যদি না থাকে তাহলে কেউই অস্তিত্বে বিরাজমান করেনা। অসীম এই শব্দটা শুধু গাণিতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, বাস্তবতায় কোন কিছুই অসীম নয় (আমাদের চেনা বাস্তবতায়)। সুতরাং একটা শুরু আছে এমন আরেকটা উদাহরণ দেই, আপনাকে যদি বলি ১০ থেকে শুরু করে ৯৯ পর্যন্ত গুনে আসেন, আপনি গুণতে পারবেন, কিন্তু যদি বলা হয়, অসীম থেকে শুরু করে ৯৯ পর্যন্ত গুনেন, এটা অসম্ভব। আপনি শুরুই করতে পারবেন না এবং ৯৯ তেও আসতে পারবেন না। ৯৯ তে আসতে হলে শুরু আপনাকে করতেই হবে। সুতরাং মহাবিশ্বের শুরু আছে, এবং সে নিজে নিজে তা শুরু করেনি।

অপেক্ষা করুন তারা এখনো আশা ছেড়ে দেয়নি, তারা বলছে zyxwvz অর্থাৎ এটা একটা বৃত্তাকার চক্র। সুন্দর অর্থাৎ z থেকে শুরু হয়ে আবার z এ এসে মিশেছে। এবং z হল সূচনাকারী অর্থাৎ চক্রটাকে ছোট করলে হয় যে z y (প্রথম আর শেষ বস্তু)... সুতরাং z, y এর উপর নির্ভরশীল, আর y, z এর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু z না থাকলে তো y existence এ আসতে পারেনা, আবার y না থাকলে z আসতে পারেনা। তাহলে হয় দুইজন একইসাথে অস্তিত্বশীল করে অথবা দুইজনই তাদের অস্তিত্বে আসার জন্য এই বৃত্তের বাইরে তাদের কোন স্রষ্টার উপর নির্ভরশীল।

দুইজন একসাথে অস্তিত্বে থাকলে সমস্যা আছে। তাহলে পৃথিবীর তথা মহাবিশ্বের সব ঘটনাকে একসাথে অস্তিত্বে থাকতে করতে হবে। অর্থাৎ আমি, আমার দাদা, আমার দাদার দাদার দাদার দাদা, আমার নাতি, আমার নাতির নাতির নাতি সবাইকে একসাথে অস্তিত্বে থাকতে হবে। কিন্তু আমরা বাস্তবতায় এটা দেখিনা। উপরন্তু z যেহেতু y এর উপর নির্ভরশীল, সেহেতু Y এর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা সূচনাকারী z এর নাই। তার মানে y, তার অস্তিত্তের জন্য z এর উপর নির্ভরশীল নয়, একইভাবে z এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যার কারণ y নয়। তাই z y এর উপর নির্ভরশীল নয়। এরা প্রত্যেকেই এদের অস্তিত্বের জন্য এদের চক্রের বাইরের কারো উপর নির্ভরশীল।

সুতরাং মহাবিশ্ব নিজেকে নিজে অস্তিত্বে আনেনি, এবং এর পুরো অস্তিত্ব অন্য কারো উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছে। এবং সেই স্রষ্টা মহাবিশ্বের উপর নির্ভরশীল নন, কারণ তাহলে তিনিও চক্রের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং তিনিও অস্তিত্বের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সুতরাং আমরা সিদ্ধান্তে আসলাম এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য একজন স্রষ্টা থাকা অপরিহার্য। স্রষ্টা ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অসম্ভব। সুতরাং পরের আলোচনা হতে পারে,

Who is the Creator of the Creator…..

সংগৃহীত ও পরিমার্জিত

মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১২

খিলাফত প্রতিষ্ঠায় মুসলিম সেনাবাহিনীর ভূমিকা পর্ব-১

খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ

ভূমিকাঃ
২০০৭ সালে যখন চার দলীয় জোট ক্ষমতা থেকে বিদায় নিচ্ছিল এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট রাজপথে আন্দোলন করছিল, তখন বাংলাদেশের আপামর মুসলিম জনগণ হাসিনা-খালেদার পরিবর্তে একটি বিকল্প রাজনীতির ধারার জন্য অপেক্ষা করেছিল। এক-এগারোর সরকার এ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংস্কারের নামে ক্ষমতায় বসানো হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারকে। মাত্র কয়েকদিনের মাঝেই ভারতীয় চক্রান্তে পিলখানা হত্যাকান্ডে সরকারের মদদ থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি ভারতীয় প্রেসিডেন্ট প্রতিভা পাতিল কর্তৃক শেখ হাসিনাকে ক্রুসেডার উপাধি প্রদান, পরিবর্তনের এ সরকারের প্রকৃত চেহারা উন্মুক্ত করেছে। এ চিত্র শুধু বাংলাদেশেরই নয় বরং সারা মুসলিম বিশ্ব জুড়ে একই অবস্থা। প্রায় ১০ বছরের সামরিক শাসনের পর পাকিস্তানের আসিফ জারদারীর গণতান্ত্রিক সরকার প্রকৃত অর্থে মুসলিমদের সাথে এক বিশ্বাসঘাতকার নাম। যাকে কাফের সাম্রাজ্যবাদী ক্রুসেডার মার্কিন-বৃটেনের দালাল ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। একইভাবে ২০০৭ সালে গাজার গণহত্যার সময় মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারকের ভূমিকা, যাতে সে ইসরাইলের আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য ফিলিস্তিনের নিরীহ মুসলিমরা ‘রাফা’ সীমান্ত দিয়ে মিশরে প্রবেশের সময় সেনাবাহিনী দিয়ে বাঁধা প্রদান করতে চাইলে মিশরীয় সেনাবাহিনী তাতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরিণামে হোসনী মোবারক বেশ কিছু উর্ধ্বতন সেনা অফিসারদের বরখাস্ত করে। আর তাছাড়া আমরা জানি আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই, ইরাকের নূরে-আল মালিকী, সৌদি রাজা আব্দুল্লাহ সহ অসংখ্য মুসলিম শাসকদের কথা, যারা রসুল (সা) কে পরিত্যাগ করেছে, যখন ইউরোপ বিকৃত কার্টুন ছেপে আমাদের প্রিয় নবী (সা) এর অবমাননা করেছে। তারা কুর’আনকে পরিত্যাগ করেছে যখন মার্কিনীরা পবিত্র কুর’আনকে টয়লেটে ফ্লাশ করেছে। তারা ডঃ আফিয়া সিদ্দিকীর মত বোনদের পরিত্যাগ করেছে যখন মার্কিনীরা তাকে গত ৭ বছর ধরে ধর্ষণ করে তারপর ৬০ বছরের জেল প্রদান করেছে। একটু চিন্তা করুন যখন শেখ মুজিবকে কটাক্ষ করে কবিতা লেখা হয়, তখন ঐ লেখককে খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। তার ফাঁসির ব্যবস্থা করার জন্য আন্দোলন করা হয়। অথচ যেসব দেশ রসুল (সা) কে অপমান তাদের নেতাদের সফর উপলক্ষ্যে তৈরী করা হয় লাল গালিচা সংবর্ধনা, তাদেরকে ডাকা হয় ‘বন্ধু’ হিসেবে। যখন কোনও এক দলের নেতা খুন করে তার বদলা নেয়া হয়। অথচ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ অন্যায় যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নিধনের ব্যাপারে তাদের শুধু নিরবতাই নয়, বরং মুসলিমদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসব কাফের মুশরিকদের মুসলিম সেনাবাহিনী, ভূমি, সম্পদ ও জনবল ব্যবহার করতে দিয়ে কাফেরদের সাহায্য করা মুসলিম, ইসলাম, কুর’আন, রসুল (সা.) এবং সর্বোপরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে গাদ্দারীর সমান।

মুসলমি বিশ্ব আজ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন-মার্কিনীদের “Divide and Rule” পলিসির কার্যকারীতা ও আমাদের মেরুদন্ডহীন দালাল শাসকগুলোর কল্যানে ৫৭ টি’র মত ভূখন্ডে বিভক্ত। আজকের মুসলিম বিশ্ব অর্থনৈতিক দিক হতে পশ্চাদপদ। পশ্চিমা কাফের মুশরিকরা মুসলিমদের সম্পদ, সম্মান লুণ্ঠনের জন্য কখনো বা একে অপরকে ডাকছে এবং কখনোবা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। ১৯২৪ সালে খিলাফত ব্যবস্থা পতনের পর, স্বৈরাচারী, রাজতান্ত্রিক, সামরিক এবং সর্বশেষ গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বকে একটি বিভক্ত ও পদানত জাতিতে পরিণত করেছে। প্রকৃত অর্থে, মুসলিমদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আসেনি। আর তাই যারা বারবার একই ব্যবস্থাপত্র দেন (গ্রহণ করেন), অথচ ভিন্ন ফল আশা করেন, তাদেরকে চিন্তার দিক থেকে দেউলিয়াগ্রস্থ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

রসুল (সা) এর জীবনীই একমাত্র আদর্শঃ
আমরা সবাই আমাদের সমাজের পরিবর্তন চাই। সমাজে পরিবর্তনও এসেছে। বাকশাল গিয়ে সামরিক শাসন এসেছে। সামরিক শাসনের পর স্বৈরশাসন এসেছে। স্বৈরশাসনের পর গণতন্ত্র এসেছে। গণতন্ত্রের পর আবার এসেছে পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষিতদের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার শাসন। তারপর এসেছে জেলের মাঝে থেকে পাপমুক্ত হওয়া আসামীদের আবারও সেই গণতন্ত্র। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি। আর তা হল সাধারণ মুসলিমদের ভাগ্য। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আগে মানুষ জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত ছিল, এখন দেশের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। তাই আমরা যারা বিশ্বাস করি যে, ইসলাম এক শ্বাসত জীবন ব্যবস্থা, এটি কোনও কালের জন্য নয় বরং পৃথিবীর শেষ সময় পর্যন্ত এর সমাধান, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালায় বিশ্বাসী, বুদ্ধিমান মানুষের জন্য এটিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। আর তাই তাদের জন্য ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

“নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবন ব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম... ” [সূরা আল মায়েদা: ১৯]

যেহেতু আমরা খিলাফত প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতার অধিষ্ঠিত ব্যাক্তিদের ভূমিকার ব্যাপারে আলোচনা করছি আর তাই আমাদের রসুল (সা) এর জীবনীতে ফিরে যাওয়া উচিত। যাতে করে আমরা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারে এমন একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করি যা খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সফলতা পেয়েছে। তাছাড়া রসুল (সা) রসুল (সা.) এর জীবনেই রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। তাছাড়া রসুল (সা) যেহেতু এই পৃথিবীতে একবারই এসেছেন, এবং একবারই ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন (আজকের নেতাদের মত কোনও গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরী করেননি, তৈরী করেননি কোনও সেক্যুলার সমাজ!)। আর তাই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একাধিক পদ্ধতি থাকা অসম্ভব। এটি তখনই সম্ভব হত যদি রসুল (সা) একাধিকবার একাধিক উপায়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতেন।

রসুল (সা) ৬১০ সালে নবুয়্যত প্রাপ্তির পর থেকে ৬২৩ সালে মদিনায় প্রথম ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সুদীর্ঘ ১৩ বছরের জীবনে তিনি যেসকল কাজ করেছেন তারই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অনুগ্রহে মদিনাতে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। যা মানব জাতিকে এনেছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। এ দীর্ঘ সময়ে রসুল (সা) অনেক কাজ করেছেন। যার মাঝে কিছু কাজ আছে যা একজন ব্যাক্তি হিসেবে তিনি তা সম্পন্ন করেছেন। যেমন তিনি খেয়েছেন, তিনি ঘুমিয়েছেন, তিনি বিবাহ করেছেন। এসব কাজের মাঝে অনেক কিছুই আছে যা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। কিন্তু এগুলো ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পর্কিত নয়। আবার তিনি খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করেছেন তার মাঝে কিছু কাজ তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে করেছেন, আর কিছু কাজ তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজগুলোর মাঝে ধারাবাহিকতা রাখা প্রয়োজন। রসুল (সা) এর খিলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে তিনটি ধাপে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।

প্রথমত: গোপনে দাওয়াত ও দল গঠন পর্যায়।

দ্বিতীয়ত: সমাজের প্রচলিত মানব রচিত নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনমত তৈরীর প্রচেষ্টা। যেমন শিরক, সুদ, ব্যভিচার, নারীদের সাথে অন্যায় ব্যবহার, লেনদেনে অসততা, অন্যের সম্পদ ভক্ষণ, নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যাক্তিদের স্বেচ্ছাসারিতা, মানব তৈরী আইন ইত্যাদির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা।

তৃতীয়ত: মক্কায় রসুল (সা) এর দল নিষিদ্ধ হয়ে, সিয়াবে আবু তালেবে অবস্থানকালে মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত গোত্র প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গের নিকট ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ (সমর্থন) প্রাপ্তির চেষ্টা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অনুগ্রহে মদিনায় আনসারদের সহযোগিতায় প্রথম খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আলোচ্য নিবন্ধে তৃতীয় তথা শেষ ধাপ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

মদিনায় প্রথম খিলাফত প্রতিষ্ঠায় রসুল (সা) কে আনসারদের গোত্র প্রধান ও সেনাপতিদের নুসরাহ্ (সমর্থন) প্রদানঃ
রসুল (সা) মক্কায় তার সর্বশক্তি দিয়ে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করেন। রসুল (সা) এর প্রচেষ্টা এবং সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা এমন ছিল যে, তা পরবর্তী যুগে খিলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিতদের জন্য এক অবশ্য অনুকরণীয় হয়ে আছে। নবুয়্যতের ১০ম বছরে রসুল (সা) ও তাঁর দল [সাহাবা (রা.)] ব্যাপক পরীক্ষার সম্মুখীন হন। রসুল (সা) এর চাচা আবু তালিব মারা যান। যিনি রসুল (সা) কে এক ধরণের নিরাপত্তা প্রদান করে আসছিলেন। তাছাড়া মক্কার কাফের ও মুশরেকরা নবীজি (সা) ও তাঁর দলকে মক্কায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, মক্কা থেকে বিতাড়িত করে শিয়াবে আবু আলেবে এক ধরণের বন্দীদশায় প্রেরণ করে। এ ঘটনার পূর্বে রসুল (সা) মোটামুটি নিরাপত্তার মাঝেই ইসলামের দাওয়াত প্রচার করছিলেন। কিন্তু এখন তিনি অনুধাবন করলেন যে, মক্কার সমাজ এ বাণীকে ঐভাবে গ্রহণ করেনি। না মক্কার জনসাধারণের মাঝে এটি কোনও ধরণের স্থায়ী জনমত তৈরি করতে পেরেছে। আর এই অবস্থাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রসুল (সা) কে নুসরাহ (সাহায্য বা সমর্থন) আদায়ের দিকে মনোনিবেশ করার আদেশ দেন। নুসরাহ্ শব্দটি একটি আরবী শব্দ। এখানে নসর শব্দের অর্থ হল অন্যায় অত্যাচারের শিকার ও নির্যাতিতের সাহায্য করা এবং আনসার শব্দের অর্থ হল সে গ্রুপ বা দল যারা অত্যাচারের শিকার ও নির্যাতিতের সাহায্য করে। একটি ক্রিয়া ও অপরটি কর্তা।

সিরাতে ইবনে হিশামে বর্ণিত আছে যে, ইবনে ইসহাক বলেন, ‘যখন আবু তালেব মারা যান, তখন মক্কার কোরাইশরা রসুল (সা.) ও সাহাবা এর উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার শুরু করে। রসুল (সা) এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশে ইসলামের প্রতি সমর্থন আদায় এবং নিরাপত্তার জন্য তায়েফ গমন করেন। রসুল (সা.) তাঁর পালিত পুত্র যায়েদসহ একাই তায়েফে গমন করেন এবং তাদের কাছে ইসলামকে উপস্থাপন করেন। ইবনে হাজারের ফাতাহ উল বারী, তুহফাত উল আহওয়াদী, আল কওয়ালাম এবং আল হাকিমে ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, এবং আবু নূয়াইম এবং বায়হাকীতে নির্ভরযোগ্য সূত্রে আলী ইবনে আবি (রা) তালিব রাসুল (সা) কে আরবের বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের কাছে ইসলামের বাণী নিয়ে যাবার আদেশ দিলেন তখন আমি ও আবু বকর রাসুল (সা) কে মিনা পর্যন্ত বিভিন্ন গোত্রের কাছে পৌঁছে দিলাম।

আলী ইবনে আবু তালিব কর্তৃক বর্ণিত উপরোক্ত হাদিস অনুযায়ী এটা প্রতিষ্ঠিত যে, আরবের গোত্রসমূহের কাছে নুসরাহ্ (সমর্থন) প্রদানের আহবান এই আহবানের সময় আল্লাহ সুবহানাহ ওয়া তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত। ইসলামকে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত করে শারী’আহ্’র পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ঐ নির্দেশিত সময়ে রসুল (সা.)কে নুসরাহ্ (সমর্থন) আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

রসুল (সা.) তাঁর এ দায়িত্ব শুরু করেন মক্কার পাশে অবস্থিত তায়েফ গোত্র থেকে। তায়েফ গোত্র ছিল তৎকালীন আরবের অন্যতম শক্তিশালী গোত্র। এরা ক্ষমতা, প্রভাব, সম্মান এসব দিক থেকে মক্কার কোরাইশ গোত্রের সমতূল্য ছিল। মক্কার নেতা ওয়ালিদ বিন মুগিরার বক্তব্য থেকে তা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যখন সে কোরআনকে অস্বীকার করে বলে যে, কেন এই গ্রন্থ মক্কা বা তায়েফের কোনও সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তির উপর নাযিল হয় নি?

রসুল (সা.) মক্কা থেকে তায়েফ গমন করেন এবং সেখানে তিনি তায়েফের গোত্র প্রধানদের কাছে ইসলামকে তুলে ধরেন, ইসলাম গ্রহণ করে এর নিরাপত্তা বিধানের জন্য তাদেরকে আমন্ত্রন জানান। তারা আল্লাহর রসুল (সা) কে প্রত্যাখ্যান করে এবং তার উপর অত্যাচারের বোঝা চাপিয়ে দেয়। রসুল (সা.) তায়েফ থেকে ফিরে আসেন এবং মক্কার অদূরে আল মু’তিম ইবনে আদির বাসায় অবস্থান করেন। এটাই ছিল নুসরাহ্ গ্রহণের প্রথম প্রচেষ্টা। এটাই ইতিহাস। এটাই রসুল (সা.) এর শিক্ষা ও সুন্নাহ্।

চলবে ......

সোমবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১২

শাসন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ (সা) এর বক্তব্যসমুহ ও এর ব্যাখ্যা পর্ব-২

ইসলামী রাষ্ট্র ও তার সম্প্রসারণের ভিত্তি হলো ইসলামী আকীদাহ্

হাদীস-৬
জুনাদাহ ইবনে আবু উমাইয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন - আমরা উবাদা বিন সামিতের নিকট গমন করলাম, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমরা তাঁকে বললাম আল্লাহ্ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আমাদেরকে রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ থেকে এমন কোন হাদীস বর্ণনা করুন যা দ্বারা আল্লাহ্ আমাদের উপকার করতে পারেন। তিনি বললেন - রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাঁকে বাইআত প্রদান করলাম। তিনি যে সকল অঙ্গিকারগুলো আমাদের উপর বাধ্যতামূলক করেছেন সেগুলো হলো - আমাদের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি, সংকট ও সমৃদ্ধি, এমনকি আমাদের উপর যদি অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয় তবুও সর্বাবস্থায় আমীরের নির্দেশ শ্রবণ করব ও তার আনুগত্য করব এবং ক্ষমতার ব্যাপারে আমরা তাদের সাথে বিবাদ করব না (সর্বাবস্থায়ই তাদের প্রতি আনুগত্য থাকবে)। তিনি (সাঃ) বলেন, “কিন্তু তোমরা যদি তাদের মধ্যে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রমাণিত স্পষ্ট কুফর দেখতে পাও তবে নয়।” [মুসলিম]

হাদীস-৭
রাসূল (সাঃ) বলেছেন - আমাকে মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে আদেশ দেয়া হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তারা এই সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই আর মুহাম্মদ আল্লাহ্র রাসূল আর তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। [বুখারী ও মুসলিম]

ব্যাখ্যা:
ক. ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে ইসলামী আকীদাহ্ ছাড়া অন্য কিছু থাকা জায়েয নাই। সূতরাং রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন কানুন অবশ্যই শারীআহ্ থেকে গ্রহণ করা হবে।

খ. প্রথমোক্ত হাদীসটি এর প্রমাণ বহণ করে কেননা এতে বলা হয়েছে যে, ইসলামী আকীদাহ্ থেকে বিচ্যুত হওয়াই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণ করার একমাত্র বৈধ কারণ। অন্যকথায় ইসলামী আকীদাহ্ থেকে উদ্ভুত হয়নি এমন কোন আইন বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের কোন বৈধতা থাকবেনা।

গ. এরূপ অন্যান্য হাদীসেও শাসকের বিরুদ্ধে তরবারী উত্তোলন করতে নিষেধ করা হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, স্পষ্ট কুফুরী না করে অথবা আল্লাহ্র বিরুদ্ধে প্রকাশ্য পাপ না করে। মোটকথা হলো শুধুমাত্র ইসলাম বাস্তবায়ন করাই শাসকের কর্তৃত্বের বৈধতার উৎস; অন্য কিছু নয়।

ঘ. ইমাম নববীর মতে, স্পষ্ট কুফর হলো প্রকাশ্য পাপ কাজ যা শারীআহ্র দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

ঙ. শাসককে অপসারণ করা কখন ফরয হয় এ ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কাজী ইয়াদের মতে, যখন কুফরী সাধন, শারীআহ্ আইনের পরিবর্তন এবং নতুন মনগড়া আইন উদ্ভাবনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় তখন মুসলিমদের জন্য সেই শাসককে অপসারণ করে তদস্থলে অন্য একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক প্রতিষ্ঠা করা ফরয হয়ে যায়।

চ. এটা লক্ষ্যণীয় যে, এই সকল হাদীস শুধু অত্যাচারী শাসকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যে মূলতঃ বৈধ শাসক ছিল কিন্তু পরবর্তীতে সে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠে অথবা শাসন ব্যবস্থা ইসলাম অনুযায়ী পরিচালিত কিন্তু শুধু শাসকের সংশোধন প্রয়োজন। অন্যকথায় এই হাদীসগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের সেই শাসকবৃন্দের সংশোধনের সাথে সংশ্লিষ্ট যারা পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান যুগের শাসকবৃন্দ কখনোই ইসলামের ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেনি এবং তাদের শাসন ব্যবস্থা পুরোটাই অনৈসলামিক।

ছ. দ্বিতীয় হাদীসের মতে, শুধু ইসলামী আকীদাহ্ই শাসন কর্তৃত্ব ও সরকারের ভিত্তি হবে তা নয় বরং রাসূল (সাঃ) জিহাদকে ফরয করেছেন এবং এই আকীদাহ্ (ইসলাম) মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য জিহাদকে সকল মুসলিমের উপর ফরয করেছেন।

আইনের উৎস

হাদীস-৮
রাসূল (সাঃ) হযরত মুয়ায (রাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যদি তোমার নিকট কোন একটি বিষয় আনয়ন করা হয় তখন তুমি কিভাবে তার সমাধান করবে?” হযরত মুয়ায (রা.) বলেন, “আমি আল্লাহ্র কিতাব (কুরআন) দিয়ে বিচার করব।রাসূল (সাঃ) বললেন, “যদি তুমি আল্লাহ্র কিতাবে এর সমাধান না পাও তাহলে?” মুয়ায (রা.) উত্তরে বললেন, “তাহলে আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ (হাদীস) দ্বারা বিচার ফয়সালা করব।রাসূল (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, “যদি তুমি সুন্নাহ্ কিংবা আল্লাহ্র কিতাবে তার সমাধান না পাও তাহলে?” উত্তরে মুয়ায (রা.) বললেন যে, তিনি তখন তাঁর নিজস্ব বিচার-বিবেচনা ব্যবহার করবেন (অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে ইজতিহাদ করবেন)। [আবু দাউদ, আহমদ]

ব্যাখ্যা:
ক. মুসলিমদের হেদায়েত ও আইন প্রণয়নের প্রধান দুইটি উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ্ (সহীহ হাদীস) - এখানে তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

খ. যদি কোন বিশেষ ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসে সরাসরি স্পষ্ট বর্ণনা না থাকে তাহলে মুজতাহিদদের জন্য ইজতিহাদের প্রক্রিয়া হলো তারা যে বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছে সে ব্যাপারে শারীআহ্র হুকুম বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

গ. আহলে সুন্নাহ্ কর্তৃক গৃহীত শারীআহ্র চারটি মূলনীতি হলো কুরআন, সুন্নাহ্ (হাদীস), ইজমা (সাহাবীদের ঐক্যমত), এবং কিয়াস।

ইসলাম হুকুমগুলো নির্ধারণ করে, কৌশলগত (Styles and Techniques) বিষয়াদি নয়

হাদীস-৯
মুসা বিন তালহা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন - আমি রাসূল (সাঃ) এর সাথে খেজুর গাছের নিকটবর্তী কিছু লোকের পাশ দিয়ে গেলাম। তিনি (সাঃ) বললেন, “এই লোকগুলো কি করছে?” তারা বলল, “তারা গাছের কলম করছে (তারা পুরুষ ও স্ত্রী গাছকে একত্রে রোপণ করে এবং আশা করে যে, অধিক ফলন হবে)।তারপর রাসূল (সাঃ) বলেন, “আমার মনে হয় এটা কোন কাজে আসবে না।যখন লোকগুলো তা জানতে পারলো তখন তারা তা পরিত্যাগ করলো। পরবর্তীতে রাসূল (সাঃ) যখন বিষয়টি জানতে পারলেন তখন তিনি (সাঃ) বললেন, “যদি এতে (গাছের মিলনে) তাদের কোন উপকার হয় তবে তাদের তা করা উচিৎ। এটা শুধু আমার নিজস্ব একটি মতামত ছিল। তোমরা আমার নিজস্ব মতামত গ্রহণ করো না। কিন্তু যখন আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কিছু বলি তবে অবশ্যই তোমরা তা গ্রহণ করবে। কেননা আমি কখনোও সুমহান, মহিমান্বিত আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করিনা।” [মুসলিম]

হাদীস -১০
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) কিছু সংখ্যক লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন যখন তারা গাছ কলম করছিল। তখন তিনি (সাঃ) বলেন, “যদি তোমরা কলম না করতে তাহলে তাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হতো।” (ফলে তারা তা বর্জন করে) এতে তাদের ফলন খারাপ হলো। অতঃপর রাসূল (সাঃ) তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং বললেন, “তোমাদের খেজুর গাছের এই খারাপ অবস্থা কেন?” তারা বলল, “আপনি আমাদেরকে এরূপ করতে বলেছেন।তখন তিনি (সাঃ) বলেন, “তোমরাই পার্থিব বিষয়াদি সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখ।” [মুসলিম]

ব্যাখ্যা:
ক. কতিপয় আধুনিকপন্থী লোক এরূপ হাদীসগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে দাবী করে যে - মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার জন্য ইসলাম কোনরূপ বিধান দেয়নি। এটা এই হাদীসগুলোর সম্পূর্ণ অপব্যাখ্যা কেননা ইমাম নববী তার সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, “আলেমগণ বলেন, রাসূল (সাঃ) এর বাণী আমার নিজস্ব মতামতবলতে বুঝায় দুনিয়া ও জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পাদনের ধরন (Style) সংক্রান্ত বিষয়সমূহ, আইন সংক্রান্ত বিষয় নয়। কিন্তু আইন সংক্রান্ত বিষয় এবং তিনি যা শারীআহ্ ও ইজতিহাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন তা গ্রহণ করা ফরয। খেজুর গাছের পরাগায়ন এই ধরনের হুকুমের অন্তর্ভূক্ত নয় অর্থাৎ এটি দুনিয়া ও জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পাদনের ধরন (Style) সংক্রান্ত বিষয়।

খ. আমাদের কাজ সম্পাদনের ধরন (Style) ও খুঁটিনাটি বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার জন্য শারীআহ্ আসেনি বরং শারীআহ্ এসেছে হালাল-হারাম, বৈধ-নিষিদ্ধ বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে। কোন কাজ সম্পাদনের ধরন সাধারণত ঐ নির্দিষ্ট কাজের নীতিমালার মধ্যেই নিহিত থাকে; ফলে কোন কাজ বৈধ বলেই নির্দেশ দেয়া হতে পারে, যেমন- চাষাবাদ। কিন্তু সময় ও নির্দিষ্ট অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কাজের ধরন ভিন্ন হতে পারে, যেমন - সেচ ব্যবস্থা প্রয়োগ বা জমির উর্বরতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য পর্যায়ক্রমে শস্য উৎপাদন।

গ. এই হাদীসগুলো মূলতঃ খেজুর গাছের পরাগায়ন সংক্রান্ত। ফলে এগুলো কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে উদ্ভুত অনুরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ঘ. প্রথম হাদীসে উল্লেখিত ঘটনায় রাসূল (সাঃ) বলেন, এটা ছিল রাসূল (সাঃ) এর শুধু একটি ধারণা মাত্র। এটা আইন সংক্রান্ত কোন বিষয় নয় বরং তা ছিল কৌশলগত (Styles and Techniques) বিষয়ে রাসূল (সাঃ) এর একটি মতামত। একইভাবে বদর যুদ্ধের দিন সেনাবাহিনীর অবস্থান নির্ধারণে রাসূল (সাঃ) এর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আল হুবাব বিন মুনযির (রা.) জিজ্ঞাসা করেন, সিদ্ধান্তটি কি রাসূল (সাঃ) এর কৌশলগত মতামত নাকি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ওহী, অর্থাৎ যদি এটা তাঁর নিকট অবতীর্ণ ওহী হয় তাহলে এ ব্যাপারে কোন আলোচনার অবকাশ নেই কিন্তু যদি তা কৌশলগত বিষয়ে রাসূল (সাঃ) এর নিজস্ব কোন মতামত হয় তবে তা বিকল্প কোন স্থানে হতে পারে যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধিকতর কৌশলগত অবস্থান হবে।


চলবে ...