রবিবার, ২৫ মার্চ, ২০১২

ভূ-রাজনীতির কল্পকাহিনী

ভূ-রাজনীতি ঐতিহ্যগতভাবেই মুলতঃ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিসমুহের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ককে ঘিরে আবর্তিত। ইংল্যান্ডের হ্যালফোর্ড ম্যাককিন্ডার এর কাজ ও ১৯০৪ সালে তার হার্টল্যান্ড থিওরি প্রকাশের পর ভূ-রাজনীতির ধারণাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং এ ধারণাটি পরবর্তীতে সমুদ্রপথে বৃটিশ সাম্রাজ্যের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ  ভুমিকা রেখেছে।

রাজনীতি যেখানে ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করে সেখানে ভূ-রাজনীতি ক্ষমতার আলোচনা করে এর সাথে ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্পদের সম্পকের্র প্রেক্ষাপট থেকে। বিগত তিন শতাব্দী ধরে পশ্চিমা বিশ্ব রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং সম্পদ নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও অবতীর্ণ হয়েছে। সমুদ্রপথে আধিপত্য বিস্তার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে পরাশক্তির মর্যাদা এনে দেয়। নৌবিজ্ঞানের উপর্যপুরি উৎকর্ষ সাধন ব্রিটিশদেরকে সমুদ্রে বাণিজ্যিক পথ অনুসন্ধানে ব্যাপক সাফল্য অর্জন ও মহাসাগরসমূহে আধিপত্য বিস্তারের পথকে সুগম করেছিল। নেপোলিয়ান যদিও বৃটিশ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল কিন্তু ১৮১৫ সালের ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজয় নেপোলিয়ান বরণ করে।

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে জার্মানী ডুবোজাহাজ ও রেলওয়ের উন্নয়ন সাধন করে প্রথম মহাযুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। যুদ্ধে বিজয়ী যৌথ শক্তি বৃটেন ও ফ্রান্স ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের নতুন হাতিয়ার-তৈলসহ বিজিত অঞ্চল ও অন্যান্য সম্পদ তাদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। মাত্র ২৫ বছরের মধ্যে জার্মানী বৃহদাকার, শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক রকেট প্রযুক্তির উদ্ভাবন করে যা মিসাইল চালনা এবং উড়োজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের প্রভূত উন্নয়ন সাধন এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণী দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্ম দেয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুপার পাওয়ার হিসেবে আর্বিভূত হয় এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, পারমাণবিক ও জ্বালানী শক্তির উৎকর্ষতার যুগের সূচনা হয়। প্রযুক্তির উনয়নের মাধ্যমে সম্পদ আহরণের দ্বারা মার্কিনীরা পুরোমাত্রায় আধিপত্য বিস্তার করে ও একধরণের অপ্রতিরোধ্য প্রতিমুর্তি গড়ে তোলে।

একচ্ছত্র আধিপত্যের একটি অলীক চিত্র তুলে ধরবার জন্য পশ্চিমা পুজিঁবাদীরা প্রপাগান্ডার আশ্রয় নেয় এবং তাদের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও সমস্যাসমূহকে আড়াল করবার জন্য অসংখ্য কল্পকাহিনী ও আখ্যানের জন্ম দেয়। এর একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি হল, বিশ্বের অনেক লোক পশ্চিম ও পুঁজিবাদের আরোপিত আধিপত্যের মোহে প্রবঞ্চিত হয়ে পড়ে। এ কারণে অনেকেই পশ্চিমের কৃত্রিম প্রহেলিকা যা তাকে সাময়িক সস্থিরতা দিয়েছে তা ভেদ করে কিছুই দেখতে পায় না যদিও এর অবসানের জন্য একটু শক্তিশালী বাতায়নই যথেষ্ট।

আর এসব কারণেই এই প্রবন্ধটি লিখা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের একজন অভিভাবক হিসেবে বিশ্ব পরিস্থিতি জানবার জন্যই কেবল এ প্রয়াস নয়, বরং এর মাধ্যমে পশ্চিমা পুজিঁবাদীদের দুর্বলতাও গোচরীভূত হয়।

আর ভূ-রাজনীতি এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। এ ব্যাপারে ১৯১৯ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন বলেন, “এমন কোন পুরুষ, নারী বা শিশু কি আছে যে জানে না বর্তমান আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের বীজ মুলতঃ বাণিজ্যিক এবং শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে?”

শুক্রবার, ২৩ মার্চ, ২০১২

মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা পর্ব-২


কিন্তু ইজতেহাদের দরজা বন্ধ, আরবী ভাষার প্রতি অবহেলা এবং মিশনারী আক্রমণের মতো সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখে আল্লাহর প্রিয় এই উম্মাহ তিলে তিলে ইসলামের চিন্তা হারিয়ে ফেলতে লাগল। চিন্তার এই পতন এমন এক পর্যায়ে পৌছাল যে মুসলিম চিন্তাবিদরা আলোচনা শুরু করল সভ্যতার উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে। ইউরোপিয়ানদের ভেতর এটা খুবই প্রচলিত ছিল কার ভাষা সবচেয়ে বিশুদ্ধ, কার সাহিত্য খুবই উন্নতমানের অথবা কোন জাতি সত্যিকার অর্থে সভ্য। রুশো, উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বাস করত সবচেয়ে বড় ভক্তি হল দেশের প্রতি ভালবাসা সভ্যতার উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে। ইউরোপিয়ানদের ভেতর এটা খুবই প্রচলিত ছিল কার ভাষা সবচেয়ে বিশুদ্ধ, কার সাহিত্য খুবই উন্নতমানের অথবা কোন জাতি সত্যিকার অর্থে সভ্য। রুশো, উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বাস করত সবচেয়ে বড় ভক্তি হল দেশের প্রতি ভালবাসা। মানুষকে অবশ্যই দেশপ্রেমের গুণ দ্বারা দীক্ষিত করতে হবে। মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে এই প্রকারের জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমের আলোচনা এমন এক সময়ে শুরু করা হয় যখন ভূখণ্ডগুলো প্রত্যেকে স্বাধীনতা চাইতে শুরু করল। রেনেসাঁ পরবর্তী আলোকিত যুগের চিন্তা চারিদিকে ছড়াতে লাগল এবং ১৮১৬ শতকের শুরুতে রুশো, ভলটেয়ার ও মনটেসকু প্রমুখের লেখনীতে মুসলিমদের লাইব্রেরী ভরে গেল। সামরিক আগ্রাসনের সমান্তরালে পরিচালিত সাংস্কৃতিক ও মিশনারী আগ্রাসন (যা “শিক্ষা ও মানবতা” র ছদ্মবরণে ছিল) মূলত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পথকে সুগম করে দিয়েছিল মুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে রাজনৈতিকভাবে দখল করে নিতে। মিশনারী স্কুলগুলো খুবই সফলতার সাথে আগামী প্রজন্মসমূহের চিন্তাধারাকে দুষিত করতে পেরেছিল। যারা স্কুলগুলোতে পড়েছিলো তারা পশ্চিমা সিলেবাস ও পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে ইতিহাস ও গবেষণাধর্মী লেখনী শুরু করে। এভাবে অনেক মুসলমানই পশ্চিমা মূল্যবোধে দীক্ষিত হয় এবং পশ্চিমা জীবনব্যবস্থায় আলোকিত হতে থাকে। পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা তারা এতটায় মুগ্ধ হয়ে পড়ে যে এক পর্যায়ে তারা মনে করা শুরু করে ইসলামী সংস্কৃতিই মুসলিম উম্মাহর পতন ও পশ্চাদপদতার মূল কারণ। এর পাশাপাশি চলতে থাকে ইউরোপীয়দের দ্বারা গোপনে পরিচালিত বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, যা উদাহরণ তুর্কি আল ফাতাত (অটোমান বিকেন্দ্রীকরণ সোসাইটি), ইয়ং তুর্ক, ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রোগ্রেস, আল আহদ (আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন)। জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত এই বীজ বপনই ছিল ইউরোপীয়দের নতুন এক পরিকল্পনা। খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় ভুলটি ছিল এই মিশনারী সংগঠনগুলোকে মুক্তভাবে মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে কাজ করার অনুমতি দেওয়া। এই মিশনারীসমূহে যারা ছিল তারা হল মূলত ব্রিটিশ, ফরাসী ও আমেরিকান এজেন্ট, তাদের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য ছিল – মুসলমানদের ইসলামের সঠিক ধারণা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা (ইসলামী আক্বিদার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরী করা) এবং তুর্কি, পারস্য ও আরবদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রেক্ষিতে সংঘাত তৈরী করা।

তাদের প্রথম উদ্দেশ্যটি পুরোপুরি সফল হয়নি। আক্বিদা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও ইসলামের সঠিক ধারণা তারা বিনষ্ট করেছিল। বৃটেনের ইহুদী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরাইলির উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যখন সে কুরআন হাতে হাউস অব কমন্সে বলেছিল, মুসলমানদের কখনোই হারানো সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত এই কুরআন তাদের অন্তর থেকে সরিয়ে ফেলা না যায়।

ইতিহাস সাক্ষী মুসলমানদের কখনোই সামরিকভাবে পরাজিত করা যেত না কারণ তাদের লড়াই ও চিন্তা ছিল সর্বদা আক্বিদার উপরে প্রতিষ্ঠিত। তারা সঠিকভাবে বুঝত “আযল” (মৃত্যুর কারণ) ও “রিযক” এর ধারণাসমূহ। তাইতো খালিদ বিন ওয়ালিদ একদা এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুকে বলেছিল “এই মানুষ যারা আমার সাথে আছে তারা মৃত্যুকে সেরকম ভালবাসে যেরকম তোমরা জীবনকে ভালবাস”। চিন্তার জগতের ইউরোপীয় আগ্রাসন মুসলিম উম্মাহর এই সাহস ও পৌরুষদীপ্ত চেতনা সবই ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।

মূল ইতিহাসে আবার ফেরা যাক – ১৯০৮ সালের ইয়ং তুর্কস বিপ্লব এবং খলিফা আব্দুল হামিদের ১৯০৯ সালের নির্বাসন পরবর্তী সময়ে ক্রমশই বুদ্ধিজীবি এবং সামরিক অফিসাররা আরব স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হতে শুরু করে। এই ট্রেনিং ও শিক্ষায় শিক্ষিত যাদের প্রধানতম রাজনৈতিক চিন্তাই ছিল জাতীয়তাবাদ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধচলাকালীন সময়ে ব্রিটেন মূলত আরব জাতীয়তাবাদের চেতনা প্রবলতার সাথে উস্কে দেয়। তারা মক্কা শরীফের হোসেনকে মাসিক ২ লক্ষ পাউন্ডের বিনিময়ে উসমানী খিলাফতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় যা সে শুরু করে ১৯১৬ সালে এই অজুহাতে যে উসমানীয়রা আরবদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করছে। এই আন্দোলন অনেক সামরিক অফিসারদের আকর্ষণ করে যারা ছিল উসমানীয় খিলাফতের সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ।

পশ্চিমা জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার সন্তান জাতীয়তাবাদঃ
মুসলিম উম্মাহকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনায় বিষাক্ত হাতিয়ার ছিল বিভিন্ন পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক সংগঠন যাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল লুকায়িত। যে সময় পশ্চিমারা রেনেসাঁ পরবর্তীতে পুঁজিবাদকে তাদের জীবনের জন্য একমাত্র আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়ে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, সে সময় মুসলমানেরা ইসলামী জীবনাদর্শকে ধীরে ধীরে ত্যাগের মাধ্যমে পশ্চিমাদের দাসে পরিণত হচ্ছিল। আর দাসত্বের শৃঙ্খলকে আরও টেকসই করার তাগিদে মূলত ১৯ম শতকের মাঝামাঝিতে পশ্চিমারা এক নতুন পরিকল্পনা নেয় যা তারা ইতিপূর্বে নেয়নি। মিশনারীরা তাদের বিদ্যালয়য়, হাসপাতাল এর মাধ্যমে যখন মুসলমানদের আকৃষ্ট করতে পারছিলনা, তখনই তারা “বৈজ্ঞানিক সংগঠন” এর পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয় যা সফলতার মুখ দেখে। ১৮৪২ সালে আমেরিকান মিশনের ছত্রছায়ায় একটি কমিটি গঠিত হয় যার উদ্দেশ্যই ছিল বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংগঠন তৈরীতে সহায়তা করা। পাঁচ বছরে কষ্টসাধ্য প্রচেষ্টার পর তৈরী হয় Association of Arts & Science যার সদস্য ছিল বুট্রোস আল বুসতানি। এই বুসতানিই সিরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল বিখ্যাত বিদ্যালয় “আল মাদ্রাসা আল ওয়াতানিয়া” (জাতীয়তাবাদী বিদ্যালয়)। এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টি করার জন্য। এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যই ছিল “হুব আল ওয়াতান” (দেশের প্রতি ভালোবাসা) সৃষ্টি করা শিক্ষার্থীদের ভেতর, একইভাবে মিশরে আমরা দেখতে পাই “রাফি আল তাহতাওয়ি” (১৮৭৩) Wataniya ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের দিকে আহ্বান জানাতে শুরু করে। এই পশ্চিমা দীক্ষিত মুসলিম পুনঃজাগরণবাদীর মতে ভাতৃত্ববোধ কখনোই বিশ্বাস দ্বারা সৃষ্টি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট একটি ভূমি, এ থেকে বোঝা যায় কিভাবে মুসলমানরা জাতীয়তাবাদে আস্থা আনা শুরু করল। তাদের জীবনের অর্থ বংশ, ভূমি ও ভাষার দ্বারা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে লাগল।

যদিও বা নতুন নতুন অনেক বৈজ্ঞানিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হতে লাগল, কিন্তু “সিরিয়ান সাইয়েন্টিফিক এসোসিয়েশন” এর প্রতিষ্ঠার আগে অন্যান্যগুলো সফলতা পায় নি। অন্যান্যগুলোতে শুধু খ্রিষ্টানরাই যোগদান করতঃ আর শেষোক্তটিতে মুসলমানদের যোগদানই ছিল বেশী। এই সংস্থাটির উদ্দেশ্যই ছিল সব গোত্র, ধর্মকে এক করে আরব জাতীয়তাবাদকে প্রজ্বলিত করা। এর পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আরব অঞ্চলের মুসলমানরা আরব জাতীয়তাবাদকে নিজের জীবনের ভিত্তি হিসেবে নিতে শুরু করল। ঐ সময়কার সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের প্রতিফলন আমরা এখনো দেখতে পাই ইসলাম নিয়ে উম্মাহর সংশয় এবং মুসলিম দেশ সমূহে জাতীয়তাবাদের শক্ত অবস্থান দেখে। তাইতো পুরো বিশ্বের মুসলমানরা ক্ষণিকের অশান্তির পর আবারো স্বাভাবিক বস্তুবাদী জীবনে ফিরে যেতে পারল চোখের সামনে তাদের ফিলিস্তিনি ভাই বোনদের অসহায়ত্ব দ্বারা আবৃত আহাজারি দেখার পরও। এই জাতীয়তাবাদী মানসিকতাই হল সাম্রাজ্যবাদীদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।

এভাবেই জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ মুসলিম ভূমিতে ইউরোপিয়ানরা বপন করেছিল। বিংশ শতকের শুরুতেই জাতীয়তাবাদের জ্বর সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। ১ম বিশ্ব যুদ্ধের শুরুতে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে সবচেয়ে বর্বর ও ভয়াবহ আক্রমণ সূচিত হল খিলাফতের বিরুদ্ধে এবং ইউরোপীয়রা এক সময়কার অদম্য ও অপরাজেয় রাষ্ট্রকে গ্রাস করে নিল। কোন প্রতিরোধ ছাড়াই দূর্বল ও মৃয়মান এই উম্মাহ তার রাসূল (সা) এর আমানতকে (খিলাফত রাষ্ট্রকে) কাফিরদের হাতে তুলে দিল। তাইতো ১৯১৭ সালে জেনারেল এলেনবি জেরুজালেম দখলের পর যথার্থই বলেছিল “আজ ক্রুসেড সমাপ্ত হল”

চলবে.........

বুধবার, ২১ মার্চ, ২০১২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি অজেয় ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

একুশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকা হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথিবীব্যাপী পুরোদস্তুর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে খুব বেশী বেগ পেতে হয়নি। মার্কসবাদ ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে আর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য বিরোধ দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই যেন সরকার ব্যবস্থার চূড়ান্ত অবয়ব। এই বাস্তবতা নব্য রক্ষণশীলতার ঔদ্ধত্যপণূর্ণ বিকাশকে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। এই পরিবেশ অনেকের মাঝে আমেরিকাকে আধিপত্য ও অজেয়তার অনিবার্য  প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু ক্ষমতার বিশ্বব্যাপী ভারসাম্য ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কের বর্তমান বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণ আমেরিকার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই রেখাপাত করে।

ইরাক এবং আফগানিস্তানে মুমুর্ষু মার্কিনীদের যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে - তা তাদের মৃত্যুর দিকেই নিয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই দুটি যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘতর হয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার দিক দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে উন্নয়ন মার্কিন সেনাবাহিনী কিছু অপ্রশিক্ষিত ও ১৯৬০ এর দশকের অস্ত্রে সজ্জিত যোদ্ধাদের সাথে পেরে উঠছে না। বিব্রত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য আঞ্চলিক শক্তিসমূহের উপর তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে। মার্কিনীরা স্থিতিশীলতা বজায় রাখবার জন্য ইরান ও সিরিয়ার সাথে পেছনের দরজা দিয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। দক্ষিণ ইরাকে স্থিতিশীলতার জন্য সে ইরানের দুই আয়াতুল্লাহর উপর নির্ভর করছে। এরা হলেন সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইসলামিক রেভ্যুলেশনের দুই নেতা - আয়াতুল্লাহ সিসতানি এবং আবদুল আজিজ আল হাকিম। এদের মধ্যে আবদুল আজিজ আল হাকিম ১০০০০ সৈন্য নিয়ে ইরাকের দক্ষিণে অবস্থিত ৯ টি প্রদেশ নিয়ে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার শিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ধারণা যেন ইরাককে তিন টুকরা করার মার্কিন পরিকল্পনার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। বাকের-হ্যামিলন্টন রিপোর্টে ইরান এবং সিরিয়াকে সংশ্লিষ্ট করার আহবান জানানোর এটাই প্রধান কারণ কেননা বিশেষ করে ইরান দক্ষিন ইরাকীদের আনুগত্য ভোগ করে থাকে।

ইরান উত্তর এবং পশ্চিম আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করে আসছে। কেননা একদিক দিয়ে ইরানের রয়েছে আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত। এ অঞ্চল দিয়ে পশতুন বিদ্রোহীরা যাতে মার্কিনীদের ক্ষতি করতে না পারে সে ব্যাপারে ইরান বাধা দেয়। ইরান আফগানিস্তানের ভেতর অনেক অবকাঠামোগত উনয়নে ভূমিকা রাখছে যা ন্যাটোকে আরও ক্ষুদ্র একটি প্রতিরোধ যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। তালেবানদের উৎখাতের ব্যাপারে ইরান গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং তারা আফগানিস্তানের ভেতর রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন এবং সীমান্ত স্টেশন তৈরিসহ আরও অবকাঠামোগত কাজের সাথে যুক্ত আছে। লন্ডনে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের ডিফেন্স এনালাইসিস ডিপার্টমেন্টের প্রধান কর্ণেল ক্রিস্টোফার লেংটনের মতে, “কেবলমাত্র অতীতে তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকার কারণেই নয়, সেখানকার হাযারা জনগোষ্ঠির (যারা ইরানীদের মতই শিয়া মুসলিম) উপর ইরানীদের প্রভাবের কারণেও তাদেরকে সম্পর্কিত করা হচ্ছে। আর উন্নয়ন খাতে ইতিমধ্যেই অনেক প্রকল্প আছে যাতে ইরান সম্পর্কিত, যেমন- পারস্য উপসাগরের বন্দর আব্বাস থেকে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সড়কপথ নির্মাণ। এটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ইরান এবং আফগানিস্তান সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এবং নিরাপত্তা ইস্যু বিদ্যমান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর থিংকট্যাঙ্কের একজন রিচার্ড হাস এ সম্পর্কে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং এ অঞ্চলে আধুনিক ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এই রঙ্গমঞ্চে নতুন কুশিলবগণ ও শক্তিসমূহ প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ রক্ষার জন্য আবির্ভূত হবে। সেসময় ওয়াশিংটনকে সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনীতির উপর বেশী নির্ভর করতে হবে।

মার্কিনীরা এক দশক আগেও যেখানে নিরঙ্কুশভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে সেখানে তারা এখন অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মখুীণ হচ্ছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য এখন আগের মত বিভক্ত নয়, অনেক বেশী এককেন্দ্রিক। সেকারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আগের মত অঞ্চলভিত্তিক সমঝোতার প্রচেষ্টা বাদ রেখে এককেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের দিকেই মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ব্যাপারে চীন এবং রাশিয়ার সাথে মার্কিনীদের এখন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এ অঞ্চলের কাল সোনার জন্য তারা ভারত, জাপান সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে। সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের নামে ব্রিটেনও অনেক জায়গায় নিজের হিস্যা বুঝে নিচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ নিয়ে লিখবার সময় ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গ্রাহাম ফুলার উল্লেখ করেন, ‘অনেকগুলো দেশ হাজারো ক্ষত তৈরির মাধ্যমে বুশ এজেন্ডাকে দুর্বল, পথভ্রষ্ট, জটিল, সীমিত, ব্যহত, বিলম্বিত করে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য অনেক কৌশল ও পন্থা অবলম্বন করছে।

টনি ব্লেয়ারের সময় সিয়েরালিওনের প্রেসিডেন্ট কাব্বাকে সরিয়ে দেয়ার মার্কিন পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটেন আমেরিকাকে হতাশ করে এবং ৯/১১ এর পর নব্যরক্ষণশীল মার্কিনীদের কর্তৃক লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফীর সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনায় গাদ্দাফীর পক্ষে ব্রিটেন অবস্থান গ্রহণ করে। দক্ষিণ সুদানকে মূল ভূখন্ড থেকে পৃথক করার মার্কিন পরিকল্পনাও দারফুরে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সম্পৃক্ত তার কারণে সম্ভব হয়ে উঠেনি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বাইরে রাখতে এবং প্রতিবেশী আফ্রিকান রাষ্ট্রসমূহে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেবার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্যবহার করবার ক্ষেত্রে টনি ব্লেয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাছাড়া তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করবার জন্য আফ্রিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ১০০ টিরও বেশী চুক্তি করে চীনকে সুবিধা দিতে আমেরিকা বাধ্য হয়েছে।

২০০৪ সালে প্রো-ব্রিটিশ দল কংগ্রেসের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মার্কিন আধিপত্য হ্রাস পায়। ভারতীয় জনতা পার্টির পরাজয় ছিল মার্কিন স্বার্থের উপর বড় ধরণের আঘাত। পাকিস্তানেও ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় পারভেজ মোশারফের বিরুদ্ধে জনরোষ ঠেকানোর জন্য আমেরিকাকে ব্রিটেনের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে হয়েছে।

পশ্চিমা উদারপন্থী গণতন্ত্রকে পেছনে ফেলে রাশিয়া ও চীন দারুণভাবে উঠে আসছে। অনেকক্ষেত্রে রাশিয়া শুধু পশ্চিমাদের নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খোলামেলা চ্যালেঞ্জ করে আসছে। সেটা সমুদ্রবক্ষে আর্কটিক আইসকেপের নীচে পতাকা ওড়ানো দিয়ে হোক কিংবা ব্যাপক বিধ্বংসী এয়ারব্লাস্ট বোমার পরীক্ষা চালিয়ে হোক কিংবা পূর্ব ইউরোপে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র  বিধ্বংসী প্রতিরক্ষাবিরোধী বক্তব্য দিয়েই হোক না কেন। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে রাশিয়া পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করছে। কারণ ইতোমধ্যে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানকে মার্কিন আধিপত্য থেকে উদ্ধার করে নিজেদের আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছে এবং মধ্য এশিয়াকে সাম্প্রতিককালে সেখানে সংঘটিত তিনটি বিপ্লবের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছে। পৃথিবীর সর্বাধিক তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ দেশগুলোর অন্যতম একটি দেশের (রাশিয়া) কাছে ২০ বছর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক চ্যালেঞ্জের সম্মখুীন হচ্ছে।

১৮২৩ সালে মনেরো ডিক্লারেশনের পর থেকে নিজের বাড়ির উঠোন মনে করা ল্যাটিন আমেরিকার উপরও আমেরিকা এখন তার কর্তৃত্ব হারাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতদিন আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহকে কোন ধরণের হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়নি। আর এ কারণে ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে দূরে ছিল।

ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, বলিভিয়া, চিলি প্রভৃতি দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে। সেকারণে এসব স্বাধীন দেশ ওয়াশিংটনের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর-যা ইতিহাসে প্রথমবারের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, বলিভিয়ার মত রাষ্ট্রসমূহ গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহকে ইতোমধ্যে জাতীয়করণ করেছে এবং আই এম এফ, বিশ্বব্যাংকের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের মধ্যে ব্যাংক অব দ্য সাউথের মত অর্থনৈতিক বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। প্রায় দুইশত বছর পর আমেরিকা মহাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের নেতৃত্বের দ্বারা মার্কিনীরা সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মখুীন হচ্ছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রবেশের পর থেকে গড়ে তোলা অর্থনৈতিক আধিপত্য থেকেও যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বের অর্থনীতির পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত মার্কিন অর্থনীতি এখন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির পেছনে পড়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারতের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে মার্কিনীরা এখন তৃতীয়স্থানে রয়েছে। এ সমস্যা আরও জটিল হয়েছে তাদের ব্যাপক তেলের চাহিদার কারণে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে মার্কিনীরা চীনের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী চ্যালেঞ্জের সম্মখুীন হচ্ছে। এ কারণে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক জটিলতর হচ্ছে। মার্কিন কোম্পানীগুলো চীনের ১.৫ বিলিয়ন জনসংখ্যার বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চীনের ৭০ ভাগ উৎপাদিত পণ্য আমেরিকার বন্দরে পৌঁছে যায়। চীন-মার্কিন বাণিজ্য সমঝোতা থেকে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার রিজার্ভ নিয়ে চীন সবসময় সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। যুক্তরাষ্ট্র শিল্পকারখানাগুলো চীনের মত স্বল্প খরচে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ব্যর্থ হওয়ায় দু দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর দায় মেটায় ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে। ৫০২ বিলিয়ন ডলার নিয়ে জাপানের পর চীন এ বন্ড কেনার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে আছে-যা কিনা মার্কিনীদের মোট বিদেশী ঋণের শতকরা ২০ ভাগ। অন্যদিকে আমেরিকা চীনের ক্রমবর্ধমান তেলের চাহিদা থেকে লাভবান হচ্ছে। সুতরাং এ দু দেশের পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থায় থাকে না।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে ব্যর্থতা পুরো পৃথিবীজুড়ে মার্কিন প্রতাপ ও ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে অপরাজেয় মনে না করে সবাই পরনির্ভরশীল ভাবতে শুরু করেছে। আর তার সাথে যোগ হয়েছে অভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক সংকট। ২০০৫ সালে এফ.বি.আই এর সরবরাহকৃত উপাত্ত অনুসারে আমেরিকায় প্রতি ২২ সেকেন্ডে একটি করে অপরাধ, ৩১ মিনিটে একটি করে হত্যা এবং প্রতি ৫ মিনিটে একটি করে ধষর্ণ ও প্রতি ১ মিনিটে একটি করে ডাকাতি সংঘটিত হচ্ছে।

আমেরিকা অজেয় হওয়ার বাস্তবতা থেকে এখন অনেক দূরে। ক্ষয়িষ্ণু মার্কিনীরা সময়ের অতল গহবরে বিলীন হওয়ার প্রহর গুণছে মাত্র।