বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১২

জ্ঞান অন্বেষণ করা


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
 
أَفَمَنْ يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ

যে ব্যক্তি জানে যে, যা কিছু আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে তা সত্য সে কি ব্যক্তির সমান, যে অন্ধ? তারাই বোঝে, যারা বোধশক্তি সম্পন্ন’ [সূরা রাদ:১৯]

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ

নবী (সা) বলেন, ‘জ্ঞান অন্বেষন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয

নবী (সা) বলেন, ''তোমরা এমন একটি সময়ে বাস করছ যখন প্রচুর ফকীহ (ইসলামী আইনবিদ) রয়েছে এবং সামান্য কয়েকজন বক্তা রয়েছে, অর্থাৎ প্রশ্ন করবার মত লোক কম এবং বলবার মত লোক বেশি এসময়ে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে আমল শ্রেয় খুব দ্রুতই এমন একটি সময় আসবে যখন সামান্য সংখ্যক ফকীহ প্রচুর বক্তা থাকবে; অর্থাৎ অনেকে জানতে চাইবে এবং সামান্য জ্ঞান বিতরণকারী থাকবে সে সময়ে আমলের চেয়ে জ্ঞান অর্জন করা শ্রেয়''

ইসলামের দাওয়াতের জন্য জীবন উৎসর্গকারী দা'ঈদেরকে অবশ্যই জ্ঞান আহরণ করার দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করতে হবে কেবলমাত্র একটি সার্কেলে বক্তব্য দেয়া বা একজন Contact এর সাথে কনসেপ্ট আলোচনা করার জন্য যতটুকু জ্ঞান অর্জন করা জরুরী ততটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সঠিক নয় বরং আমাদেরকে সবসময় দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা উচিত যেসব কারণে জ্ঞান অর্জন করা জরুরী:

. আল্লাহ' ভয় বৃদ্ধি করার জন্য
. আমাদের আকলিয়া নাফসিয়া তৈরী করার জন্য
. কার্যকরভাবে দাওয়াত বহন করার জন্য
. পূণর্জাগরণের উদ্দেশ্যে উম্মাহ' উপরে নেতৃত্ব নেয়ার জন্য
. জ্ঞান অর্জন করে আল্লাহ' পুরষ্কার লাভের উদ্দেশ্যে

যেসব বিষয়ের জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরযে আইন

প্রথমত, কোনরূপ সন্দেহ ব্যতিরেকে যথাযথভাবে ইসলামের উপর ঈমান আনা আমাদের সবার উপর ফরয এবং সেকারণে জ্ঞান আমাদের জানা থাকতে হবে এটি হল আক্বীদার মৌলিক বিষয়ের উপর জ্ঞান
 
وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا

অথচ সত্যের ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়’ [সূরা নাজম:২৮]

সুতরাং আবেগতাড়িত অনুকরণসর্বস্ব আকীদা আমাদের জন্য হারাম আমরা আমাদের নিজেদের জন্য জানব, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অস্তিত্ব, মুহাম্মদ (সা) তাঁর সর্বশেষ রাসূল, কুরআন আল্লাহ' প্রেরিত বাণী এবং এর মধ্যে যাই আছে তাই সত্য, যেমন: ফেরেশতা, পূর্ববর্তী কিতাব, পূর্ববর্তী নবী, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি

দ্বিতীয়ত, নিজের জীবন আমল সর্ম্পকে শরী'আহ হুকুম জানা আমাদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক বা ফরয

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কুর'আনের বহু জায়গায় আমাদের উদ্দেশ্যে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
 
হে বিশ্বাসীগণ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর

وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
 
রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক’ [সূরা হাশর:]

সুতরাং আমরা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ফরয মুহাররামাত বা নিষিদ্ধ বিষয়ের জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হব, যেমন:

- সালাত রোযার সাথে সংশ্লিষ্ট আহকাম বা হুকুম
- মাতাপিতার (স্ত্রী, সন্তান যদি থাকে) প্রতি দায়িত্বের ব্যাপারে আহকাম বা হুকুম
- বিপরীত লিঙ্গের সাথে সর্ম্পক স্থাপনের ক্ষেত্রে আহকাম বা হুকুম
- ক্রয়ের আহকাম (বিক্রয়, ব্যবসা, কর্মে নিয়োগ-যদি আমরা সেসব কাজে নিয়োজিত থাকি)
- গীবতের হুকুম
- খিলাফতের জন্য কাজ করার আহকাম ইত্যাদি

মূলত যে কোন কাজ সম্পাদন করার আগে এর হুকুম সর্ম্পকে আমাদের জেনে নিতে হবে উসুলের মধ্যে একটি মূলনীতি রয়েছে: ‘প্রতিটি কাজের জন্য হুকুম প্রয়োজন

সুতরাং একজন ডাক্তারের জন্য তার ক্ষেত্র সর্ম্পকে জানা ফরয, যেমন: ময়না তদন্ত অনুমোদিত কিনা, বিপরীত লিঙ্গকে চিকিৎসা দেয়া অনুমোদিত কিনা, চিকিৎসার কারণে নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা যাবে কিনা, ইত্যাদি
 
একজন মসজিদের ইমামের জন্য সালাতে ইমামতি করার ব্যাপারে আহকামসমূহ, খুতবার বাধ্যবাধকতা, মুসলিমদের প্রতি কর্তব্য, মিম্বার থেকে হক কথা বলার বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করা ফরয
 
একজন শিক্ষককে জানতে হবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কুফর বিস্তার লাভ করে এমন কোন বিষয় পড়ানো যাবে কিনা, বিপরীত লিঙ্গের কাউকে শিক্ষা দেয়া যাবে কিনা, ছাত্রদের শৃংখলাবদ্ধ করার হুকুম ইত্যাদি
 
স্বামীর জন্য স্ত্রীর প্রতি বাধ্যবাধকতা সর্ম্পকে জানা ফরয, জানতে হবে তার সাথে কোন কাজসমূহ নিষিদ্ধ, যদি সে নির্দেশ অমান্যকারী হয় তাহলে তাকে কীভাবে শৃংখলার মধ্যে আনা যায় এবং একইভাবে স্ত্রীকে জানতে হবে তার স্বামী সন্তানের প্রতি কী কর্তব্য রয়েছে, সন্তানের মাতাপিতার প্রতি কী কর্তব্য রয়েছে ইত্যাদি
 
দাওয়াত বহনকারীর জন্য দাওয়াত বহন করবার ব্যাপারে আহকাম চিন্তা সর্ম্পকে জানা ফরয
 
মুসলিমদের খলীফাকে তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হুকুমের ব্যাপারে জানতে হবে ইত্যাদি
 
আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, আমরা প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত কোন হুকুম নয় বরং শরী'আহ মেনে চলছি
ইসলাম আমাদের জ্ঞানের পথ ব্যতিরেকে অন্য কোন পথ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছে:

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
  
যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না নিশ্চয় কান, চক্ষু অন্তকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে’ [সূরা বনী ইসরাইল:৩৬]

এমন কি আমরা যদি কোন দলীল সর্ম্পকে সুনিশ্চিত না হই, তাহলে বৈধ ইজতিহাদের দ্বারা ইসলামী দলীল থেকে প্রাপ্ত হুকুম জেনে নিতে হবে
 
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
 
'অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর [সূরা আম্বিয়া:]
 
তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের মধ্যে যারা জানে না তাদেরকে যারা অধিক জ্ঞানবান তাদের কাছ থেকে জেনে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন
 
মানদুব বা উৎসাহিত জ্ঞান
 
আক্বীদার মৌলিক বিষয়াবলী জীবনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত আহকাম ব্যতিরেকে ইসলামের অন্য কোন ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন করা মানদুব, যেমন: তাফসীর, আরবী ভাষা, হাদীসের জ্ঞান উসুল আল ফিকহ
 
এসব জ্ঞান অর্জন করার জন্য আমাদেরকে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে
 
জ্ঞান আহরণকারী ব্যক্তির মর্যাদা পুরষ্কার
 
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
 
هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
 
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? নিশ্চয়ই শিক্ষা গ্রহণ করে কেবল তারাই করে, যারা গভীর চিন্তাশীল [সূরা যুমার:]
 
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
 
'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ্তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন আল্লাহ্খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর' [সূরা মুজাদালাহ:১১]
 
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
 
বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল আল্লাহকে (সত্যিকার অর্থে) ভয় করে [ফাতির: ২৮]
 
مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
 
আল বুখারী মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান থেকে বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, 'আল্লাহ যার কল্যান চান, তাকে দ্বীনের ফিকহ (গভীর জ্ঞান) দান করেন'
 
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বর্ণণা করেন যে, নবী (সা) বলেন, ‘দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও মত হওয়ার চেষ্টা করো না, ) প্রথমত যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং সে হক পথে তা ব্যয় করে এবং ) দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী আমল করে অন্যদের শিক্ষা দান করে’ [বুখারী]

النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ خِيَارُهُمْ فِى الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِى الإِسْلاَمِ إِذَا فَقُهُوا
 
মানুষ স্বর্ণ রৌপ্যের খনির মত জাহিলিয়্যাতের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ তারা ইসলামের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ হবে যদি তারা জ্ঞানবান হতে পারে [মুসলিম]
 
জান্নাতের পথ
 
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ

আবু হুরাইরা বলেন যে, নবী (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোন পথে যাত্রা করল, তার জন্য আল্লাহে জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দিবেন

নবী (সা) বলেন, 'যদি কেউ জ্ঞান অর্জন করার জন্য রাস্তায় বের হয়, তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের একটি রাস্তা দিয়ে ভ্রমণ করাবেন যে জ্ঞান অন্বেষণ করে তার প্রতি ফেরেশতাগণ সানন্দ চিত্তে তাদের পাখাসমূহ নত করে দেয় আলেম ব্যক্তির জন্য আকাশ পৃথিবীর অধিবাসীগণ, এমনকি গভীর পানির মাছেরাও মাগফেরাত কামনা করে একজন ভক্তের তুলনায় একজন আলেম ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব রাতের আকাশের পূর্ণাঙ্গ চাঁদের মত যখন সে চাঁদের পাশে সব তারাগুলো ম্লান হয়ে থাকে আলেমগণ নবীগণের উত্তরসুরী এবং নবীগণ এমন কোন কিছু উত্তরাধিকার সূত্রে রেখে যাননি যার আর্থিক মূল্য রয়েছে তারা কেবলমাত্র জ্ঞান রেখে গেছেন এবং যে তা গ্রহণ করল সে যেন বিশাল অংশ গ্রহণ করল
 
ইমাম হাসান আল বসরী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

مَنْ جَاءَهُ الْمَوْتُ وَهُوَ يَطْلُبُ الْعِلْمَ لِيُحْيِىَ بِهِ الإِسْلاَمَ فَبَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّبِيِّينَ دَرَجَةٌ وَاحِدَةٌ فِى الْجَنَّةِ
 
যার মৃত্যু চলে আসে এই অবস্থায় যে সে ইসলামকে পুনর্জীবিত করার জন্য জ্ঞানার্জন করে যাচ্ছে, তবে তার নবীগণের মধ্যে জান্নাতে মাত্র এক ধাপের ব্যবধান থাকবে’ [সুনান আত তিরমিযী, সুনান আদ দারিমী]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে দু করি যাতে তিনি আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান অর্জন তা প্রয়োগ করবার সামর্থ দান করেন

রবিবার, ২০ মে, ২০১২

তৃতীয় বিশ্বকে তাদের উন্নয়নের জন্যই অর্থনীতিকে আরও উদার করতে হবে


বিগত তিন দশক ধরে পুরো বিশ্ব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের আধিপত্য দেখেছে । এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে করায়ত্ব করেছে এবং পুরো পৃথিবীতে তার অর্থনৈতিক দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে । এশীয় বাঘ হিসেবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, এবং হংকং উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে সাফল্য লাভ করেছে এবং এগিয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব ব্যাংকের মত শিল্পায়ন এবং উদার অর্থনৈতিক চিন্তা গতানুগতিক সমাজ ও অর্থনীতিতে এক ধরনের রূপান্তর ঘটায় । এর প্রভাব দরিদ্র দেশ সমূহকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যায়- যে পথে পশ্চিমা শিল্পোন্নত বিশ্ব শিল্প বিপ্লবের সময় গিয়েছে ।

বর্তমান দরিদ্রতা পৃথিবীর অধিকাংশ জনগণের বাস্তবতা। প্রায় ৩ বিলিয়ন লোক ২ ডলারের কম আয় করে ।অন্য ১.৩ বিলিয়ন লোক ১ ডলারের কম আয় করে। ৩ বিলিয়ন লোকের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই এবং ২ বিলিয়ন লোক বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উদার নীতি গ্রহণের কারণে পুরো পৃথিবী জুড়েই সম্পদের আকাশসম সম বণ্টন এবং দারিদ্র সুনিশ্চিত হয়েছে। উদার নীতি পশ্চিমা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে বাকি বিশ্বকে দারিদ্র উপহার দিয়েছে। উদার অর্থনীতি কোনভাবেই দারিদ্র বিমোচন সহায়ক নয়। সেকারণে তৃতীয় বিশ্ব এ নীতির প্রয়োগের কারণে দারিদ্র আরও ঘনীভূত হয়েছে ।

উদার নীতি পশ্চিমে ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে-যার উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রে ও যুক্তরাজ্যে প্রবল । উদাহরণ হিসেবে যদি যুক্তরাজ্যের কথা বলি তাহলে দেখা যাবে যে , ২০০৫ সালে তাদের মোট বার্ষিক উৎপাদিত সম্পদ ও সেবার পরিমাণ প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড –যা বিগত বছরের তুলনায় বেশী ছিল। অনেকে এক উদার নীতি গ্রহণের কারণে মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির পরিচায়ক হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন। অর্থাৎ জনগণ এখন খুশী- কারণ তাদের খরচ করার মোট সম্পদ বেড়েছে। কিন্তু আমরা যদি লক্ষ্য করি কিভাবে ব্রিটেনের ৬০ মিলিয়ন জনগন এ সম্পদকে গ্রহণ করেছিল। ২০০৫ সালে প্রকাশিত এইচ.এম রেভিনিউ এন্ড কাস্টমস- এর উপাত্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ ধনী শতকরা ১০ ভাগের কাছে রয়েছে জাতীয় সম্পদের শতকরা ৫০ ভাগ এবং শতকরা ৪০ ভাগ ব্রিটিশ জনগণ এ সম্পদের মাত্র ৫ ভাগ ভোগ দখল করে। সে কারণে বৃটেনের অধিকাংশ জনগণকে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য ধার করতে হয়। এ কারণে যুক্তরাজ্যে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড যা তাদের মোট অর্থনীতির চেয়ে বড়। আমেরিকার অবস্থা আরও ভয়াবহ। তারা হয়ত বছরে ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ তৈরি করে কিন্তু জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মার্কিন জনগণ ঋণের মাধ্যমে তাদের ব্যয় নির্বাহ করছে, যতই তারা সম্পদ ও সেবা তৈরি করুক না কেন। ২০০৫ সালে হার্ভাড ইউনিভার্সিটির এক রিপোর্টে বলা হয়, শতকরা ১০ ভাগ জনগণ ৭০ ভাগ সম্পদ ভোগ করে এবং শীর্ষে ১ ভাগ ৪০ ভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। অপরদিকে ৪০ ভাগ জনগণ শতকরা ১ ভাগ সম্পদ ভোগ করে।

সুতরাং উদার নিতি পশ্চিমা বিশ্বেও সম্পদের ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে-যারা প্রায় শতাব্দীকাল ধরে এ নীতির আওতায় রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব আজকাল আমাদের যেসব নীতিমালার কথা বলছে,তারা উন্নয়ন করেছে এর বিপরীত সব নীতিমালার ভিত্তিতে। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হা জনু চেঙ ২০০৩ সালে তার অবিস্মরণীয় কাজ “কিকিং অ্যাওয়ে দি ল্যাডার”- উল্লেখ করেন, প্রত্যেকটি শিল্পোন্নত দেশ উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে রক্ষণশীল নীতিমালা গ্রহণ করেছে। উন্নয়নের ধারা সম্পর্কে যে ধারনা পাওয়া যায় তাতে অপেক্ষাকৃত বেশী সুযোগ সিবিধা আদায় নয় বরং বাজারকে রক্ষা করার মাধ্যমে উচ্চ উপযোগ সৃষ্টিকারী পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে বাজারকে প্রভাবিত করার প্রক্রিয়াটি ঔপনিবেশিক এবং দাসপ্রথাতান্ত্রিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বাজার প্রভাবিত হয় কৃষি ও ইস্পাত খাতে ভুতর্কির মাধ্যমে। সরকার ব্যাপক খরচ করে জীবপ্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে যা ও এক ধরনের ভুতর্কি ।

সে কারণে উদার নীতি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয় বরং এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা। দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ কারণ হল উদারনীতি গ্রহণ।

শনিবার, ১৯ মে, ২০১২

ইসলামে কি কোন সরকার ব্যবস্থা নেই ???


(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

দীর্ঘ প্রায় চৌদ্দশত বছর ধরে এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক ছিল না যে, ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই। ১৯২৪ সালে যখন খিলাফত শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের সম্মুখীন তখন এ প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছিল। এটা সে সময়ের কথা যখন অনেক ব্যক্তিই পশ্চিমা সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পন করছিল এবং ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা থাকাকে অস্বীকার করছিল। ১৯২৫ সালে খিলাফত ধ্বংসের এক বছর পর আলী আবদুর রাজিক 'আল ইসলাম ওয়া উসুলুল হুকুম' বইয়ের মাধ্যমে উল্লেখ করেন, ইসলামে কোন ধরণেরই শাসন বা সরকারব্যবস্থা নেই। স্যার থমাস আরনল্ডের মত ওরিয়েন্টালিস্টও ইসলামী অনেক তথ্য প্রমাণ দ্বারা ব্যাপক সাহিত্য রচনা করে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেন যে, ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই।

দূর্ভাগ্যজনকভাবে আজকাল অনেক মুসলিমও ইসলামকে আধুনিকীকরণের নামে প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যে, ইসলামের নিজস্ব কোন সরকার ব্যবস্থা নেই। তাদের যুক্তি হচ্ছে মুসলমানরা যে কোন সমাজে বসবাস করতে পারে এবং এর মধ্যে সবচেয়ে ভালটি গ্রহণ করতে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ইংল্যান্ডে ২০০৭ সালে ইসলাম এন্ড মুসলিমস ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড টুডেশীর্ষক সেমিনার আয়োজন করে। মিশরের প্রধান মুফতি আলী গোমাসহ অন্যান্য 'মধ্যমপন্থি' (মডারেট) মুসলিমের তকমা লাগানো ব্যক্তিবর্গ আলোচনা করেন কীভাবে ইসলামকে পশ্চিমাদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করা উচিত। ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই - এ বিষয়টি প্রমাণের জন্য আলী গোমা বলেন,

'অনেকে মনে করেন ইসলামী শাসনব্যবস্থা মানেই খিলাফত- যেখানে খলীফা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতির মাধ্যমে শাসন করবেন। ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে এর কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। খিলাফত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা মুসলিমরা একটি বিশেষ সময়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনে গ্রহণ করেছিল। তার মানে এই নয় যখনই সরকার ব্যবস্থার প্রসঙ্গ আসবে তখনই খিলাফতের কথা ভাবতে হবে। মিশর এ ব্যাপারে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। এ ব্যাপারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন মুহম্মদ আলী পাশা। যার ধারবাহিকতায় খেদিব ইসমাইল একটি আধুনিক মিশর গড়বার প্রয়াস পায়। এর মানে হল ইসলামী আইনের সংস্কার। এ প্রক্রিয়ায় ইসলামিক চিন্তাবিদদের সমর্থন নিয়েই মিশর গণতান্ত্রিক শাসনের অধীনে একটি উদার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হয়। মুসলমানরা তাদের প্রয়োজনমাফিক ইচ্ছেমত যে কোন ধরণের শাসনব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার রাখে।'

ইতোমধ্যে বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রীয় মন্ত্রীবর্গ একটি সম্ভাব্য ইসলামী শাসনব্যবস্থার উত্থানের ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছেন। এর মানে হল ইসলামে একটি শাসনব্যবস্থা রয়েছে এটা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া। মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘিষ্ট একটি মহল মনে করে যে ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই। তাদের যুক্তি হল ইতিহাসে যে ইসলামী শাসনব্যবস্থা দেখতে পাই তা মূলত: একটি সাময়িক ব্যাপারমাত্র - যা বর্তমান সময়ে একেবারেই অপ্রযোজ্য। পূর্বে ইসলামে যে শাসন আমরা দেখেছি তা বস্তুত কিছু রীতিনীতির অধীন ছিল। এ ব্যাপারটি বুঝতে হলে আমাদের ইসলামী প্রামাণ্য দলিলসমূহ খুব সুক্ষ্ণভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

কুর'আন আল্লাহ্‌'র আইন দ্বারা শাসিত হবার ব্যাপারে বিভিন্ন আয়াতে বেশ জোর দিয়েছেন। যেমন:

'এবং যারা আল্লাহ্‌'র দেয়া বিধান ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে বিচার ফয়সালা করে তারাই কাফের (অবিশ্বাসী).....জালেম (অত্যাচারী)...ফাসেক (মিথ্যাবাদী)।' (সূরা মায়েদা:৪৪-৪৭)

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরও বলেন,

'সুতরাং তাদের মধ্যে ফয়সালা করুন আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন ও যে সত্য আপনার কাছে এসেছে তা দিয়ে এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।' (সূরা মায়েদা: ৪৮)

তিনি আরও বলেন,

'আর আপনি আল্লাহ্‌'র নির্দেশ অনুযায়ী ফায়সালা করুন এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, সাবধান থাকুন, যাতে তারা বিভ্রান্ত করতে না পারে।' (সূরা মায়েদা: ৪৯)

এছাড়াও দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং শারী'আহ্‌ দ্বারা শাসিত হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এর এটা কখনওই সম্ভবপর হবে না যদি একজন শাসক না থাকেন -যিনি এই শারী'আহ্‌ বাস্তবায়ন করবেন। এভাবে অসংখ্য প্রমাণ পেশ করা যাবে যেসবের দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, একজন শাসক নিয়োগ করা ফরয দায়িত্ব।

একজন খলীফা নিয়োগ করবার বাধ্যবাধকতা আমরা রাসূলের সুন্নাহ ও ইজমায়ে সাহাবা থেকে পেয়ে থাকি। নাফিয়া বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি (খলীফার) আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিল, সে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে এমনভাবে উত্থিত হবে যে, তার পক্ষে কোন প্রমাণ থাকবে না এবং যে তার কাঁধে খলীফার বাই'য়াত না থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল সে যেন জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।' (মুসলিম)

সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) সব মুসলিমের কাঁধে বাই'য়াত থাকবার প্রয়োজনীয়তা ফরয করে দিয়েছেন। তিনি বাই'য়াতহীন মৃত্যুকে জাহেলিয়াতের সময়ের মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছেন। 'কাঁধে বাইয়াত থাকা' এর অর্থ হল একজন খলীফা থাকা। খলীফা নির্বাচনের পদ্ধতিও রাসূলুল্লাহ (সা) বিবৃত করেছেন। আবু হাজিম বলেন যে, তিনি আবু হুরাইরার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করাকালীন সময়ে শুনতে পান যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। একজন মারা গেলে অন্যজন তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। এরপর আসবেন অসংখ্য খলীফা। তখন সাহাবা (রা.) প্রশ্ন করলেন এ ব্যাপারে আপনি আমাদের কী করতে উপদেশ দেন? তিনি (সা.) বলেন, তোমরা প্রথম একজনের পর অপর প্রথম (খলীফা)-এর প্রতি বাই'য়াত পূর্ণ করবে এবং তাদের জন্য রক্ষিত অধিকার প্রদান করবে। আল্লাহ্‌ অবশ্যই তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন।'

নবী করীম (সা.) ইসলামী সরকারের রূপরেখা প্রদান করেন, এর নিয়মকানুন বাতলে দেন এবং বিস্তারিত ব্যাখা দেন। তিনি যখন মদীনাতে সপ্তম শতাব্দীতে খিলাফত রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন তখন সেটা ছিল বিবাদমান বিভিন্ন গোত্র অধ্যুষিত একটি শহরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র। কুরাইশরা নতুন গড়া সমাজকে সমূলে উৎপাটন করার অপচেষ্টা চালায়। রাসূল (সা.) অতিদ্রুত এমন এক রাষ্ট্র কায়েম করেন যা ছিল প্রতিরক্ষায় সক্ষম এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি কুরাইশদের ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ব্যবসায়িক পথকে সুগম রাখবার জন্য বাণিজ্য চুক্তি ও বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।

মদীনায় পা ফেলার মুহূর্ত থেকেই মুসলিম ও অমুসলিমদের সমস্যাসমূহ বিবেচনায় নিয়ে তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন শাসক হয়ে উঠেছিলেন। ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুহাম্মদ (সা) একটি কল্যাণমূলক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। একজন যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ইহুদী, বানু দামরাহ ও বানু মাদলাজের সাথে চুক্তি করেন। তিনি তারপর চুক্তি স্বাক্ষর করেন কুরাইশ, আয়লাহ, আল জারবাহ এবং উজরাহের সাথে। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি অনেক যুদ্ধের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন। তিনি প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ওয়ালী (গভর্ণর) এবং প্রত্যেক অঞ্চলে একজন করে আমীল (মেয়র) নিযুক্ত করেন। যেমন: তিনি উতায়েব ইবনে উসাইদকে মক্কা বিজয়ের পর ওয়ালী এবং বাধান ইবনে সাসানকে ইয়েমেনের ইসলাম গ্রহণের পর ইয়ামেনের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। মুয়াজ ইবনে জাবাল আল খাজরাজীকে তিনি আল জানাদের ওয়ালী এবং খালিদ ইবনে সাইদ ইবনে আল আসকে সানার আমীল নিযুক্ত করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা) লোকদের বিবাদ নিরসনের জন্য বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি (সা) আলী (রা) কে ইয়েমেনে কাজী নিয়োগ করেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে নওফেলকে মদীনার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। রাসুল (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করতেন, “তোমরা কি দিয়ে শাসন করবে?” তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলতেন, “কোন রায়ের জন্য সমাধান যদি আমরা কুর'আনে না পাই, তাহলে তা সুন্নাহ্‌'র মধ্যে খুঁজব। যদি সেখানেও না পাই তাহলে আমরা কিয়াসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব।তিনি (সা) এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেন। রাসুল (সা) কখনও কখনও বিচারকদের এবং উলাহ্‌'দের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালও গঠন করেছেন। তিনি ট্রাইব্যুনাল আসার পূর্বে বিবাদমান বিষয়সমুহ তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ করা ও বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে রশীদ ইবনে আবদুল্লাহকে আমীর নিযুক্ত করেন।

মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান হিসেবে কয়েকজন রেজিস্ট্রার নিয়োগ করেন।

- আলী ইবনে আবু তালিবকে চুক্তিপত্রের লেখক হিসেবে
- মুয়াকেব ইবনে আবু ফাতিমাকে রাজস্ব বিভাগের সচিব হিসেবে
- হুজায়ফা ইবনে আল ইয়ামানকে হিজাজ অঞ্চলের ফসল ও ফলমুলের হিসেবের দায়িত্ব
- জুবায়ের ইবনে আল আওয়ামকে সাদকার সচিব
- আল মুগীরাহ ইবনে শুবাহকে সকল ঋণ ও চুক্তিনামা লিপিবদ্ধের দায়িত্ব
- শারহাবিল ইবনে হাসানাকে বিভিন্ন বাদশাহের কাছে প্রেরিত চিঠি লিখবার দায়িত্ব

এভাবে মুহম্মদ (সা.) বিভিন্ন বিভাগে সচিব অথবা পরিচালকের পদে বিভিন্ন সাহাবীদের নিয়োগ দেন। এ ব্যাপারে তিনি (সা) সাহাবীদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন-যারা এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও চিন্তার অধিকারী ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিম- অমুসলিমদের সম্পদ বিশেষত ভূমি, ফসল ও ফলমুলের উপর কর ধার্য করেন। এগুলোর মধ্যে ছিল যাকাত, ওশর, গণীমতের মাল, খারাজ বা ভূমিকর এবং অমুসলিমদের কাছে প্রাপ্ত জিজিয়া। আনফাল এবং গণীমতের মাল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকত। কুর'আনে বর্ণিত আটটি খাতেই জাকাতের অর্থ বন্টন করা হত।

মহানবী (সা) তাঁর জীবদ্দশাতেই এসব ব্যবস্থাদি বাস্তবায়ন করেন। তিনি (সা) রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ছিলেন আর তাঁকে সহায়তা করবার জন্য ছিল বিভিন্ন সহযোগী, গভর্ণর, বিচারক, সেনাবাহিনী, সচিবগণ এবং পরামর্শ সভা। এ ধরণের কাঠামোকে বলা হয় খিলাফত এবং এটাই ইসলামের শাসনব্যবস্থা। ইসলামী রাষ্ট্রের এসব কাঠামো বিস্তারিতভাবে তাওয়াতুর বর্ণনার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে পৌঁছবার দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আবু বকর ও ওমর (রা) তাঁর দু'জন সহযোগী ছিলেন। সাহাবীগণ রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পর ঐক্যমত্যে (ইজমা) পৌঁছেছিলেন যে, ইসলামী খিলাফতের প্রধান নির্বাহী হিসেবে একজন শাসক অর্থাৎ খলীফা নিয়োগ করা প্রয়োজন। অবশ্যই এই ব্যক্তি কোন নবী বা বার্তাবহনকারী হবেন না, কারণ মুহম্মদ (সা) ছিলেন শেষ নবী। একটি শাসনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা মহানবী (সা.) তার জীবনকালেই প্রদর্শন করে গেছেন। সেকারণে তাঁর প্রদর্শিত শাসনব্যবস্থা আমাদের জন্য এখনও অণুকরণীয়।

সাহাবীগণ এ মর্মে ঐক্যমত্যে পৌঁছেছিলেন যে, রাসুলূল্লাহ (সা) এর মৃত্যুর পর একজন উত্তরসুরী নিয়োগ করা প্রয়োজন। তারা সেকারণে আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর একই ধারাবাহিকতায় উত্তরসুরী হিসেবে ওমর (রা) কে খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। এভাবে উসমান ও আলী (রা) খলিফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। একজন খলিফা নিযুক্ত করবার আবশ্যকতা আমরা সাহাবী (রা) ঐক্যমত্য থেকে পাই যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর শীঘ্রই মৃতদেহ সৎকারের বাধ্যবাধকতার চেয়ে তাঁরা খলীফা নিয়োগ করার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মৃতের দাফন কাফনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য দাফন কাফন শেষ করবার আগে অন্য কোন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করা এক অর্থে হারাম। এরপরও কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা) এর দাফনের চেয়ে খলীফা নিয়োগ করা নিয়ে তখন ব্যস্ত ছিলেন। অন্য সাহাবীরা এই ব্যাপারে নীরব ছিলেন যদিও তাঁরা রাসূল (সা) এর দাফন সম্পূর্ণ করতে দুই রাত অপেক্ষা নাও করতে পারতেন।

অর্থাৎ তাঁর (সা) মৃত্যুর পর উম্মাহর ঐকমত্য নিয়ে সাহাবীগনের মধ্য হতে একজন খলীফা নিয়োগ করা হয়েছিল। যখন ইসলাম বিস্তার লাভ করছিল তখন বিভিন্ন জায়গায় ওয়ালী নিয়োগ করা হয়েছিল এবং এভাবে ইসলাম সুসংহত হয়েছিল। প্রত্যেক সাহাবীই পুরো জীবনভর একজন খলীফা নিয়োগ করবার ব্যাপারে একমত ছিলেন। কে খলীফা হবেন- এ ব্যাপারে মত পার্থক্য থাকলেও খলীফা নিযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও ভেতর কোনরূপ দ্বিধা ছিল না। এটা রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের মৃত্যুর পর উত্তরসুরী খলীফা নিয়োগের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে। একইভাবে সাহাবীদের ঐকমত্য (ইজমায়ে সাহাবা) এই যে, মুসলমানদের একজন খলীফা থাকতেই হবে।

কখনও কখনও অপপ্রয়োগ ঘটলেও রাসূলের সময় থেকে ইস্তাম্বুলে ১৯২৪ সালে ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা) খিলাফতের যে বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা প্রদর্শন করে গেছেন তাতে এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই যে, এটা কেবলমাত্র একটি ঐতিহ্যগত বিষয় ছিল। আর এটা সর্বকালের জন্য সত্য কথা যে, অবশ্যই রাজতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। সুতরাং খিলাফত ইসলাম দ্বারা পরিচালিত একটি অনন্য শাসন ব্যবস্থা। খিলাফত ইসলামকে বাস্তবায়ন করে এবং সব অঞ্চলে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়।

ইতিহাসে খিলাফতের শাসনব্যবস্থা ছিল সর্বজনগ্রাহ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

ওরিয়েন্টালিস্ট বার্ণার্ড লুইস তার বই 'What went wrong?' এ বলেন:

'পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছিল ইসলাম.....এটা ছিল অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার....অর্জন করেছিল মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান ও কলায় সর্বোচ্চ উৎকর্ষমন্ডিত সভ্যতা-যা ছিল বহুজাতিক, আন্তর্জাতিক -অন্যকথায় আন্তমহাদেশীয়।'

পশ্চিমাদের কাছে জীবিত কিংবদন্তীতুল্য বুদ্ধিজীবি ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা-যিনি বিশ্বাস করেন বর্তমান পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিপরীতে ইসলামই একমাত্র চ্যালেঞ্জ-তাঁর মতে, 'আদর্শের জগতে বর্তমানে গণতন্ত্রের একমাত্র যোগ্যতর প্রতিদ্বন্দ্বী হল রাজনৈতিক ইসলাম। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ রাষ্ট্র হল ইরান-যা কট্টরপন্থী শিয়া মোল্লাদের দ্বারা পরিচালিত। সুন্নী কট্টরপন্থীরা তার সমর্থকদের কাছে সঠিকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে না পারায় এখনও একটি জাতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না।'