শুক্রবার, ৪ মে, ২০১২

আমাদের নিরবতা কি অপরাধ নয়?

বর্তমান সমাজের যে অবস্থা তাকে কোনোভাবে সুস্থ অবস্থা বলা চলে না। প্রতিদিনের পত্রিকায় যে পরিমাণ নির্যাতন, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাস্তানি, দুর্নীতি, প্রতারণা, কেলেঙ্কারী ইত্যাদির খবর প্রকাশিত হয় তা আমাদের সমাজের মারাত্মক অধঃপতনের চিত্র তুলে ধরে। যদিওবা বিভিন্ন ব্যক্তি এসব ঘটনার সাথে জড়িত, তথাপি এগুলো শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ের কিছু বিচ্ছিন ঘটনামাত্র নয়। এগুলো এখন ব্যাপকতর পরিসরে ঘটমান দৈনন্দিন ঘটনা।

মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের সামনে সবসময় দুটি পথ খোলা রেখেছেন-একটি হল, সত্য বা আলোর পথ। আরেকটি হল, বাতিল বা অন্ধকারের পথ। অর্থাৎ একটি আল্লাহ, তার নবী-রাসুল, আল্লাহর ওহী, আখিরাত-হাশর, জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাসের পথ আর অন্যটি হচ্ছে অবিশ্বাস, কুফর ও হারামের পথ। সৃষ্টির প্রাম্ভিক কাল থেকে ঈমান আর কুফরের এক চিরন্তন দন্ধ ও সংঘাত চলে আসছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

এবং আমি তাকে (মানুষকে) দুটো পথ (ভাল-মন্দ) দেখিয়েছি” [সূরা আল-বালদঃ ১০]

সমাজের প্রতি ফরয দায়িত্বকে অবহেলা করে শুধু মাত্র ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা করে আমরা মুক্তির আশা করতে পারি না। যখন সমাজে ব্যাপক বিশৃংখলা আর জুলুম তখন কিভাবে আমরা শুধুমাত্র নিজের জীবন যাপন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারি? রাসুল (সাঃ) এর উপর যদি আমাদের ভালবাসা থেকে থাকে, আর তাঁর আদর্শ যদি আমরা অনুসরণ করে থাকি তাহলে এই জাহেল সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব।

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন ,

তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।” (মুসলিম, তিরমিযী)

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আরো বলেন:

যারা আল্লাহ হুকুম মেনে চলে আর যারা সেগুলোকে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (উভয়ে) যেন তাদের মতো যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নিচের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। যখন নিচের লোকদের পিপাসা মেটানোর প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচতলার লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ও আমরা যদি জাহাজের নিচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের তলার লোকদের কোন সমস্যা করবো না।এখন যদি উপরের তলার লোকেরা নিচতলার লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আর তারা যদি তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরতলা) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী)

তাই কেউ ব্যক্তিগত ইবাদত ঠিকমতো চালিয়ে গেলো আর সমাজে যেসব অব্যবস্থাপনা চলছে সে ব্যাপারে কিছু করলো না বা বলল না তখন সেটা  কোন ইসলামী চিন্তাবলে গ্রহণ যোগ্য হবে না । উপরোক্ত হাদীসদ্বয় থেকে এটা পরিষ্কারভাবে অনুধাবন হয়, যে সমাজে যখন জুলুম, অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন ঐ সমাজে বসবাসরত মুসলমানদের জন্য ঐ সমাজের পরিবর্তন করার জন্য কাজ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। আর এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে না আসলে সবাই একসাথে শাস্তিযোগ্য হবে। হযরত আবু বকর (রা.) বলেনআমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি :

মানুষ কোন অত্যাচারীকে অত্যাচার করতে দেখেও তার দুই হাত চেপে ধরে তাকে প্রতিহত না করলে অচিরেই আল্লাহ্ তাআলা তাদের সকলকে (অর্থাৎ অত্যাচারী ও যারা অত্যাচার মেনে নেয় উভয়কে) তাঁর ব্যাপক আযাবে নিক্ষেপ করবেন।” (তিরমিযী)

আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর পবিত্র সীরাতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব তিনি এমন একটি সমাজে এসেছিলেন যা ছিলো পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন, সব ধরণের অন্যায়, অত্যাচার, অনাচারে পরিপূর্ণ। ঐ সমাজের লোকেরা মিথ্যা ইলাহদের পূজা করতো, ওজনে কম দিতো, এতিম ও দাসদের অধিকার বঞ্চিত করতো, কথায় কথায় যুদ্ধ আর হানা-হানিতে মেতে উঠতো ইত্যাদি। এমনি এক পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের সাথে নিয়ে ঐ সমাজকে পরিবর্তনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সমাজের এসব অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে সমাজকে ইসলামের দিকে জোরালোভাবে আহ্বান করেন। তিনি কেবল ব্যক্তিদেরকে সংশোধনে ব্যস্ত থাকেননি বরং পুরো সমাজদেহটাকেই সুস্থ করার লক্ষ্যে সমাজের সব প্রচলিত মিথ্যা ধ্যান ধারণা ও অনাচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন। আজকের বর্তমান সমাজ আর ততকালীন মক্কার কুফর সমাজের মধ্য কোন তফাৎ নেই ।

কারণ আমাদের বর্তমান সমস্যার মূল বা প্রকৃত কারণ হচ্ছে মানব রচিত কুফর জীবন ব্যবস্থা-যেখানে টাকা, ব্যক্তি স্বার্থ হচ্ছে মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। এই ধরণের জীবন ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই এমন সমাজের জন্ম দেয় যেখানে অপরাধ ও দুর্নীতি হয় ব্যাপক ও নিয়ন্ত্রণহীন।

আর এ চিন্তার দ্বারার মূলভিত্তি হচ্ছে মানব রচিত পুঁজিবাদী মতবাদ অর্থাৎ ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক করে ফেলা। তারা এই পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থাকে মুসলিম জাতিসত্তার ভেতর প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর। এসবের মূল উদ্দেশ্য একটাই আর তা হলো পশ্চিমা কুফর শক্তি যাতে নিশ্চিত থাকতে পারে যে মুসলমানরা সর্বদাই অত্যচার আর নিপীড়নের যাঁতাকলে পিষ্ট হয় এবং কখনোই যাতে মনশ্চক্ষে ইসলামী পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখতে না পায়। পশ্চিমা কুফর শক্তি এও নিশ্চিত করতে চায় যে মুসলমানরা যাতে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নিজেদের আলাদা রাখে। এসবের কারণ হলো পশ্চিমারা ভালো করেই জানে যে একমাত্র রাজনৈতিক কর্মকান্ড এবং ইসলামভিত্তিক রাজনীতি ছাড়া পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তা ও শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত করার আর কোন উপায় নেই। এই প্রচারাভিযান আজ এ পর্যায় পর্যন্ত পৌছে গেছে যেখানে দেখানো হচ্ছে রাজনীতি হলো ইসলামের মহানত্ব ও পারলৌকিকতার সম্পূর্ণ বিরোধী। কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এটা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন যে আমরা যাতে রাজনীতির সাথে সংযুক্ত থাকি এবং শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করি। শাসকবর্গকে সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং তাদের মন্দ কাজের প্রতিবাদ করা রাজনীতির প্রধান অংশ।

আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন,

তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে।” [সূরা আলি ইমরান: ১১০]


রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার জন্য।

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন,

অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ। (তিরমিযী)

শহীদদের সর্দার হামযা এবং ঐ ব্যক্তিও, সে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।” (হাকিম)

তিনি (সাঃ) আরো বলেন,

যদি তুমি দেখ যে আমার উম্মত কোন জালেমকে একথা বলতে ভয় পাচ্ছে যে, ‘তুমি একজন জালেমতাহলে আমার উম্মতকে বিদায়” [অর্থাৎ এটা উম্মতের জন্য বিদায় বা পতনের সংকেত] (আহমাদ, তাবারানী, হাকিম, রায়হাকী)

বর্তমান কুফর সমাজে ইসলামী রাষ্ট্রের মাধ্যমে ইসলামকে আবার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে রাসূলুলাহ্ (সাঃ) এর অনুসরণে রাজনীতি করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। আসলে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সর্বযুগে সর্ব পরিস্থিতিতে একটি ওয়াজিব বিষয় এবং ব্যাপক অর্থে এটাই ইসলামী রাজনীতি। তাই ইসলামের আর সব অবশ্য পালনীয় বিষয়ের মতো এ বিষয়টিকেও আমাদের পালন করতে হবে এবং সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতিতে যোগ দিতে হবে।

বুধবার, ২ মে, ২০১২

ভু-রাজনীতির মর্মকথা

একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনেকগুলো ঘটনা ঘটলে অনেকের চিন্তার জগত এটা ভেবে মেঘাচ্ছন্ন হতে পারে যেকারা কোন উদ্দেশ্যে এসব করছেযেহেতু মুসলিম উম্মাহ পুরো পৃথিবীতেই ইসলামের দাওয়াকে ছড়িয়ে দিবেসেহেতু বিশ্ব বাস্তবতা সম্পর্কে জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। এ বাস্তবতা অনুধাবন করা এবং বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও জাতির রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও অভিলাষ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। বিশ্ব বাস্তবতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের মত ব্যাপারসমূহ বুঝবার জন্য কিছু জিনিস খেয়াল রাখা দরকার :

১. যে কোন রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা কোন নীতির কৌশলগত অবস্থান নিরীক্ষণ অথবা কোন আপাত বাস্তবতা সাজানো নাটক কিনা এ ব্যাপারে বুঝতে হলে একজনকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিবাদমান বিভিন্ন পক্ষগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে সবসময় সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না, বরং যেসব রাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তাদের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে সামগ্রিক ও ব্যাপক চিন্তা কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য ধরিয়ে দেয়।

২. ভূ-রাজনীতি রাজনীতির একটি অংশ। বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে ভূ-রাজনীতি বুঝতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাজনীতির মাধ্যমে ভূ-রাজনীতি প্রতিভাত হয়। রাজনীতি হল একটি আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত রাষ্ট্রের নীতি, পরিকল্পনা ও কার্যপদ্ধতির অপর নাম। আর সেদেশের পররাষ্ট্রনীতি হল রাষ্ট্রের গন্তব্যকে সামনে রেখে গৃহীত নীতিসমূহ। রাজনীতি ভূ-রাজনীতির গতিপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রন করে। পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা পানির উৎসসমূহের নিয়ন্ত্রণ, তেলের রাজনীতি, সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ অথবা পারস্য উপসাগরীয় সংঘাত এর কোনটিই শুধুমাত্র এদের নিজ নিজ অবস্থানের কারণে নয়, বরং বিভিন্ন জাতির বিবিধ স্বার্থ কৌশলগতভাবে এদের গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

৩. পৃথিবীর কিছু কিছু জাতি আদর্শিক। এই আদর্শই তাদের আইন প্রণয়ন ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দেয়। যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানী পুঁজিবাদী আদর্শের বিশ্বাসী রাষ্ট্র আবার এরকম অনেক রাষ্ট্র রয়েছে যারা ঠিক আদর্শিক নয়, তবে তাদের ইতিহাস ও অবস্থান নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করে। নিজস্ব স্বার্থ নীতিসমুহের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে, যেমন- পাকিস্তান ভারতের মধ্যে একধরণের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলতে থাকে এবং তিব্বত চীন থেকে স্বাধীন হতে চায়। আদর্শের প্রয়োগ অথবা জাতীয় স্বার্থের কারণেই বিশ্বরাজনীতি দ্বন্দ্ব বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে।

৪. সব দেশের অবস্থা সর্বদা একরকম থাকে না। শক্তিমত্তা অথবা দুর্বলতা, প্রভাব বলয় থাকা অথবা না থাকা, অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন ইত্যাদি বিভিন্ন দিক থেকে একটি দেশের অবস্থান পরিবর্তনশীল। একারণে একটি ধ্রুব সত্যের ভিত্তিতে কোন দেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অসম্ভব। কারণ পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি ও নীতিসমূহ পরিবর্তন হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা একটি মন্তব্য এ শর্তসাপেক্ষে সঠিক হতে পারে যে, তা সময়ের সাপেক্ষে ধ্রুব নয়। যে কোন দেশের ক্ষমতাও সময় নিরপেক্ষ নয়।

৫. বিশ্বের বিবিধ দেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিচায়ক। এই পরিস্থিতি সুপার পাওয়ার ও তার সাথে বিবদমান পক্ষগুলোর সম্পর্কের আলোকে নির্ধারিত হয়। বিশ্বের সুপারপাওয়ারদের সম্পর্কে ধারণা ছাড়াও ক্ষমতার ভারসাম্যে অবদান রাখা পক্ষগুলো এবং এদের নীতি ও পরিকল্পনা বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জ্ঞান থাকতে হবে। এসব নীতি ও পরিকল্পনা হল সুপারপাওয়ারের সাথে অন্যান্য শক্তি সমূহের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের প্রত্যক্ষ ফলাফল। একারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সুস্থির নয় বরং পরিবর্তশীল। বৈশ্বিক ভারসাম্যের যে কোন আলোচনা সময়ের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ। যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় তখন এ আলোচনা আর প্রাসঙ্গিক থাকে না বরং ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

৬. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে একটি দশা থেকে অন্য দশায় স্থানান্তরিত হওয়া পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রন করে। পরিস্থিতি ও অবস্থার এ পরিবর্তন রাষ্ট্রের শক্তিশালী অথবা দূর্বল হওয়া কিংবা অন্যদের সাথে সে রাষ্ট্রের সম্পর্কের শক্তিশালী কিংবা দুর্বল হওয়ার ফল। এসবক্ষেত্রে বিশ্বশক্তিসমূহের ক্ষমতার ভারসাম্যের কারণে বৈশ্বিক ভারসাম্য নির্ধারিত হয়। একারণে ক্ষমতার ভারসাম্য বুঝতে হলে বিশ্বরাজনীতিতে অবদান রাখা বিবিধ রাষ্ট্রের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা থাকা অপরিহার্য।

৭. একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্ব বাস্তবতা বুঝতে হলে একজনকে পুরো বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে এমনটি নয়। পৃথিবীময় ক্ষমতার ভারসাম্য যেহেতু শক্তিধর রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের কারণে নির্ধারিত হয় সেকারণে দুর্বল ও প্রভাব বিস্তারে অক্ষম রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান থাকার আবশ্যকতা নেই।

-     মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যে সংকট তা চীন ও মার্কিনীদের মধ্যকার সংঘাতেরই বহিঃপ্রকাশ। চীন তার পেছনের দরজায় কোন ধরনের সংঘর্ষ চায় না বলেই উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রিকরণের ব্যাপারে বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এ ধরনের বৈঠক থেকে আসা সংকেতসমূহ ছিল পরস্পরবিরোধী। চীন এসব প্রচেষ্টায় গা-ছাড়া হতাশাব্যঞ্জক ভূমিকা পালন করলেও মার্কিনীরা যুতসই কুটনীতির মাধ্যমে সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উত্তর কোরিয়ার সাথে আলোচনায় না বসায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হচ্ছে। প্রলম্বিত ও হতাশাব্যঞ্জক অগ্রগতি ঐ অঞ্চলে প্রায় ১০০০০০ এর মত মার্কিন সেনার অবস্থানকে সমর্থন যোগাচ্ছে। কারণ ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক পারমাণবিক বোমার পরীক্ষার মাধ্যমে আরও দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন উপস্থিতির যৌক্তিকতা পুনপ্রমাণিত হয়েছে। জে রিলে একটি কৌশলপত্রে উল্লেখ করেন: অত্র অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনা কেবলমাত্র অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর”-এর জন্য নয়, বরং দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণই উপস্থিতির প্রধান কারণ। প্রচুর পরিমানে তেল সম্পদে সমৃদ্ধ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজ চলাচলের পথের খুব কাছে অবস্থিত এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রগুলোতে প্রবেশের জন্য সুগম। মার্কিনীদের প্রলম্বিত উপস্থিতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের সাথে সামরিক জোট গঠন চীনের হতাশাকে বাড়াচ্ছে এবং আসিয়ানের মত আঞ্চলিক ফোরাম থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীন ইমেজ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

-       পূর্ব ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধের জের ধরেই দক্ষিণ ওসেটিয়া জর্জিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার ডাক দিচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর সময়ে রাশিয়াকে চাপে রাখার জন্য ও প্রভাব বলয়ের ভেতর রাখবার জন্য মার্কিনীরা বলকান যুদ্ধের অবতারণা করেছিল। ঐতিহাসিক কারণে সার্বিয়াকে রাশিয়া তার দলে ভেড়াতে পেরেছে এবং মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সার্বিয়া একটি বড় বাধা ছিল। সেকারণে শুরুতেই সার্বিয়া থেকে মন্টিনিগ্রো পৃথকীকরণের মাধ্যমে একে দুর্বল করার প্রচেষ্টা চালানো হয় এবং পরবর্তীতে কসোভোকে সার্বিয়া থেকে আলাদা করা হয়। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কসোভোতে সার্বিয় অবস্থান এবং সার্বিয়ার ভেতরে ন্যাটো হামলা পরিচালনা করে। উত্তর ওসেটিয়া হল রাশিয়ার একটি আধা স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় জর্জিয়ার অন্তর্গত ছিল দক্ষিণ ওসেটিয়া। এ অঞ্চলে মার্কিনীদের বিপাকে ফেলবার জন্য রাশিয়া তার প্রভাব ব্যবহার করে উত্তর ওসেটিয়া মাধ্যমে দক্ষিণ ওশেটিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে উদ্বুদ্ধ করে। রাশিয়া সেকারণে তাসকিনভ্যালী (Tskhinvali) অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতৃবৃন্দের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে। অধিকাংশ দক্ষিণ ওসেটিয়দের রাশিয়ান পাসপোট রয়েছে এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা রাশিয়ান মুদ্রা রুবল ব্যবহার করে।

-     তিব্বত থেকে চীনের বিচ্ছিন্নতার আহবান মূলতঃ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের ফসল। ১৯৫০ এর দশকে চীন সমাজতন্ত্রকে তার আদর্শ হিসেবে গ্রহণের পর থেকে সি.আই.এ এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে। ১৯৫৯ সালে সংগঠিত রক্তক্ষয়ী মুক্ত তিব্বত আন্দোলন মূলত সমাজতান্ত্রিক চীনের বিরুদ্ধে সি.আই.এ সমর্থিত গোপন অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা। হাজার হাজার তিব্বতি এতে জীবন দিলেও দালাই লামা ও তার প্রায় ১০০০০০ এর মত অনুসারী দুর্গম হিমালয় দিয়ে নেপাল ও ভারতে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। সি.আই.এ আমেরিকার কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের কেম্প হিলের নিকটে লিডভিলে দালাইলামার অনুসারীদের জন্য গোপন সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প তৈরি করে। তিব্বতীয় গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে তারা সমাজতান্ত্রিক চীনের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ ও অন্তর্ঘাতী আক্রমন পরিচালনা করতে পারে। জিনজিয়াং প্রদেশের উইগুরের মুসলিম, ফালুংগং সম্প্রদায় সহ আরও অনেক স্বাধীনতাকামীদের নিয়ে চীন বেশ বিপদেই আছে। তিব্বতের লোকজন নির্যাতনকারী বেইজিং এবং চীনকে দুর্বলকারী সুযোগসন্ধানী ওয়াশিংটনের ফাঁদে পড়ে বেশ জুলুমের মধ্যে রয়েছে।

৮. সময়ের শুরু থেকেই বিশ্বশক্তি সমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে আসছে, থাকবে শেষ দিন পর্যন্ত। ফেরাউনের অধীনে থাকা মিশর ছিল প্রাচীনকালের সুপারপাওয়ার এবং মেসোপটিয়ানরা ছিল তাদের প্রতিপক্ষ। রোমানরা ছিল সুপারপাওয়ার এবং পারস্যরা ছিল তাদের প্রতিপক্ষ। খিলাফত তারপর অবশিষ্ট পারস্য ও বাইজানটাইন সভ্যতাকে পরাজিত করে এবং আঠারশ শতকের আগ পর্যন্ত মঙ্গোলীয় ও ক্রুসেডারদের চ্যালেঞ্জ্যের মুখে পড়ে। আঠারশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় তিন শতাব্দীকাল ধরে ওসমানিয়া খিলাফতের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় জার্মানী ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং এসময় ফ্রান্স এবং ব্রিটেন তার সাথে প্রতিযোগিতা করে। জার্মানী আবারও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটেনকে সুপারপাওয়ার হিসেবে চ্যালেঞ্জ করে এবং এর মাধ্যমে জার্মানীর প্রতিপত্তি খর্ব হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন সুপারপাওয়ার হিসেবে আর্বিভূত হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯০ সালে ধ্বংসের আগ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশক ধরে প্রতিদ্বন্দী হিসেবে ছিল।

৯. ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সুপারপাওয়ার। যদিও দোদুল্যমান, তারপরও বিশ্বের সর্বত্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনও বেশ প্রবল। এ দেশটির রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতি, ব্যাপক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং স্বীয় স্বার্থ সুরক্ষার জন্য পৃথিবীময় সামরিক ঘাটি। আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতায় সক্ষম জাতিসমূহের মধ্যে রয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং জার্মানী। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ চারটি রাষ্ট্রের রয়েছে উচ্চাকাংখা। গত দশকে রাশিয়া তার খনিজ সম্পদ ও শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের মাধ্যমে অর্জনকারী সুবিধাভোগীদের সমূল উৎপাটনে সমর্থ হয়েছে। মার্কিনীরা সে অঞ্চলে এক দশক অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকবার পর এখন রাশিয়ার বিশাল খনিজ সম্পদে আর্শীবাদপুষ্ট অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনীর চ্যালেঞ্জের সমুখীন হচ্ছে।

-       ব্রিটেন ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বশক্তি ছিল এবং এখনও তার উপনিবেশের আওতায় ছিল এরকম রাষ্ট্রসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইউরোপে ব্রিটেন প্রধান শক্তি এবং সেখানে অনেক মার্কিন পরিকল্পনাকে তারা ভন্ডুল করে দিয়েছে। বৈশ্বিক শক্তি হবার বাসনা ব্রিটেনের বরাবরই রয়েছে এবং এর জন্য প্রয়োজনে কখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতাপূর্ণ আবার কখনওবা প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

-       ব্রিটেনের মত ফ্রান্সও ইতিহাস ও রাজনৈতিক কারণে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দশকের পর দশক ধরে তার উপনিবেশসমূহে বিভিন্ন নীতি, ফরাসি সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করবার চেষ্টা করছে।

-    ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে জার্মানী বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস। ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারের রপ্তানী বাণিজ্য রয়েছে এদেশটির। পূর্ব ইউরোপে কিছু বিশেষ নীতিমালাসহ জার্মানী এখন অর্থনৈতিকভাবে বিস্তার লাভ করছে। তারা ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার বন্দী বিনিময়ে সফলভাবে মধ্যস্ততা করেছে। ২০০৬ সালে ইসরাইল কর্তৃক লেবানন দখলের সময় জার্মানী একটি নৌবাহিনী মোতায়েন করে। দুটি ফ্রিগেডের সমন্বয়ে এটি গঠিত ছিল- মেকলেনবার্গ-ভোরপোমার্ণ এবং কার্লশ্রুহে যা হেলিকপ্টার, সরবরাহ জাহাজ এবং ১৫০০ লোকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পেট্রোল নৌকা সমৃদ্ধ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এটি জার্মানীর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ।

-       মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে পারে এমন দেশসমূহের পরেই সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী দেশের তালিকায় রয়েছে চীন-যদিও এটা এখনও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। যদি চীন কেবলমাত্র নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত না থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রয়াস অব্যাহত রাখত-তাহলে এতদিনে বিশ্বশক্তি হিসেবে অনায়াসে আবিভূর্ত হতে পারত। আশা করা যায় ভবিষ্যতে এ দৃশ্যপট পরিবর্তিত হবে।

-       মার্কিনীদের পর জাপান অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম। অর্থনীতি ছাড়া এর প্রভাব বিস্তার করার মত আর কোন দিক নেই। তবে এ দেশটির বর্তমান নীতি হল আফগানিস্তানে সামরিক জোটে অংশ নেয়া এবং সংবিধানের ৯ নং অনুচ্ছেদের বিলোপ সাধন করে সৈন্য মোতায়েন ও পারমাণবিক বোমা প্রস্তুত করার অধিকার লাভ করা। এটা আসলে এ অঞ্চলে চীনের সাথে শক্তির ভারসাম্য বিধান করবে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে।

-      বিশ্বের বড় বড় ক্ষমতাধর শক্তিগুলো নিয়ে আলোচনার পর কিছু কিছু জাতি নিয়ে কথা বলা দরকার যেগুলো ঐতিহাসিক এবং অবস্থানগত কারণে অল্পসংখ্যকক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে এবং যা অস্থায়ী। যেমন ভারতের রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা ও পারমাণবিক শক্তি এবং তার আশেপাশের অঞ্চলকে প্রভাবিত করার মত সক্ষমতা। একইভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ইটালী একটি গুরুতপূর্ণ শক্তি ছিল।

বর্তমানে এটা হল বিশ্বশক্তির ভারসাম্যের ব্যাপার, যা সময়নিরপেক্ষ নয়। বিশ্বশক্তিসমূহের ইতিহাস, তাদের উন্নয়ন, তাদের বিশ্বাস এবং বোধ, তাদের আদর্শ প্রত্যেকটি রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। এসকল শক্তিসমূহ নিজেদের সাথে এবং কখনও কখনও পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্ব পরিস্থিতি প্রকৃতপ্রস্তাবে বিশ্বশক্তিসমূহের মধ্যকার স্বাথর্গত দ্বন্দ্বের ফলাফল।

১০. মুসলিমদের একটি ব্যাপার অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বিশ্ব পরিস্থিতি যা আমাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে তা সবসময় সত্য নাও হতে পারে এবং অনেক সময় অল্প প্রয়াসে এগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব। উনিশ শতক পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ বিশ্বশক্তি ছিল এবং পুরো পৃথিবীর রাজনীতিকে প্রভাবিত করত। ১৯২৪ সালে মুসলমানদের সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওসমানিয়া খিলাফতের পতনের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। কেননা এসময় তাদের প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকায় তারা এখন অধ:পতিত, ক্লিষ্ট এবং নির্যাতিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিকট অতীত থেকে পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। যেকারণে খিলাফত ফিরে আসবার ব্যাপারটি আজ আর শুধু মুসলিমদের মূলধারার চেতনা নয় বরং অমুসলিমদের কন্ঠেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মুসলিম উম্মাহ পশ্চিমের ব্যর্থ চিন্তার তিক্ত অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে পেয়ে গেছে। সেকারণে তারা পুঁজিবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসলামকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করছে। আর খিলাফত ফিরে আসবার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি:

তোমাদের মধ্যে নবুয়্যত ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি তার অবসান ঘটাবেন। তারপর নবুয়্যতের আদলে খোলাফায়ে রাশেদীন আসবে। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। অতপর আসবে জুলুমের শাসন আর তা ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন আল্লাহ চান। আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন এরও অবসান হবে। তারপর আসবে নবুয়্যতের আদলে খিলাফত (খোলাফায়ে রাশেদা)। অতপর তিনি (সা.) চুপ থাকলেন।’ (মুসনাদে ইমাম আহমদ (২৭৩))

খিলাফত প্রতিষ্ঠায় মুসলিম সেনাবাহিনীর ভূমিকা পর্ব-৩

পূর্ব প্রকাশের পরঃ

খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ

সতর্ক পরিকল্পনা ও সাহসী বাস্তবায়ন:
নুসরাহ্ একটি ইসলামিক দায়িত্ব। এটি ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিদের জন্য একটি অবশ্যকরণীয় কর্তব্য। কেউ যদি তার সামর্থ্য থাকার পরও এ দায়িত্ব পালন না করে তবে এটি বড় গুনাহের কাজ। ইসলাম ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিদের দু’টি দায়িত্ব দিয়েছে। যার একটি আরেকটি হতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রথমত, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে যারা শাসন করেনা সেসব শাসকদের কাছ থেকে তারা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কেড়ে নিবেন। দ্বিতীয়ত, যে বা যারা ইসলামী খিলাফতের জন্য কাজ করছে এ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাদের কাছে হস্তান্তর করবেন।

আর এ দু’টি দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে নুসরাহর কর্তব্য সম্পাদিত হয় এবং যে ব্যক্তি এ দুটি কাজ সম্পাদন করবে তাকে বলা হবে ‘আনসারুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ্’র সাহায্যকারী। তাদের মর্যাদা মদিনার আনসারদের মর্যাদার সমান। এভাবে একবার খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তাদের মর্যাদা ও সম্মান হবে সা’দ ইবনে মুয়ায (রা.), সা’দ ইবনে উবাদা (রা.), আসাদ ইবনে জুরারাহ (রা.) ও উসায়েদ ইবনে হুজায়ের (রা.) এর মত, যারা রাসূল (সাঃ) কে প্রথম খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য করেছিলেন।

আজকে পশ্চিমাদের জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়নকারী মুসলিম বিশ্বের বর্তমান যালেম শাসকদের অপসারণ করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতা গ্রহণ এবং তা খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত দলের কাছে হস্তান্তর করার জন্য প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা। এর জন্য প্রয়োজন অপরিসীম সাহস এবং বাস্তবায়ন করার জন্য ইসলাম অনুসারে বৈধ নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ। তাছাড়া ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিদের মাঝে যারা নুসরাহ্ প্রদান করতে চায় তাদের সাথে খিলাফতের প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত দলের একটি সুসংগঠিত সহযোগীতার পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। সর্বোপরি নুসরাহ্ গ্রহণের জন্য যাবতীয় শারী’আহ্ সিদ্ধ প্রাথমিক কার্যাবলী সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। আর এসবের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছা ও অনুগ্রহে প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়্যতের আদলে খিলাফত। ইনশা’আল্লাহ্।

আর তাই এদু’টি কাজ, পরিকল্পনা এবং দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন আমাদেরকে রাসূল (সাঃ) এর সময়ে একই কাজে তাঁর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসূল (সাঃ) এর মাঝে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। আর রাসূল (সাঃ) এর পদ্ধতির অনুসরণই আমাদের জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য কর্মপন্থা। রাসূল (সাঃ) এর হিজরতের ঘটনা এ’কাজের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। কারণ হিজরতের মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) মদিনায় প্রথম ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজকে সম্পন্ন করেছেন। এটা কোন সাধারণ সফর নয়। এটা ছিল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার একটি হুকুম। এটা ছিল মদিনায় গিয়ে ইসলাম বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়া। এটা ছিল ইসলামকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করে এর ভিত্তিতে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আর তাই মক্কার কাফেররা এটা হওয়া থেকে রাসূল (সাঃ) কে বিরত রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। তারা রাসূল (সাঃ) কে হত্যা করতে চেয়েছে। যাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর তাই হিজরত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ হতে রাসূল (সাঃ) ও ইসলামের প্রতি এক চূড়ান্ত বিজয়। আর এ কাজে জড়িত থাকার জন্য মদিনার লোকদেরকে আনসার বলা হয়। তারা সাহায্য করেছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কে, সাহায্য করেছেন রাসূল (সাঃ) কে, সাহায্য করেছেন ইসলামকে।

রাসূল (সাঃ) হিজরতের মাধ্যমে মদিনায় গিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার পুরো কৌশল পূর্ণাঙ্গরূপে পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নের জন্য তাঁর সমস্ত সহায়-সম্বল এতে ব্যবহার করেছেন। আর পুরো কাজের সফলতার জন্য তিনি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর নির্ভর করেছেন। তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ হতে আশু সাহায্যের উপর এতটুকুও দ্বিধান্বিত ছিলেন না। আর আজকের দিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নুসরাহ্’র বিষয়টি যখন অনিশ্চিত, তখন রাসূল (সাঃ) এর উদাহরণ আমাদের জন্য অনুকরণীয়।

সিরাতে বর্ণিত আছে যে, জিব্রাঈল (আ) রাসূল (সাঃ) এর কাছে ওহী নিয়ে এসে মক্কার কুরাইশদের ষড়যন্ত্র ও রাসূল (সাঃ) কে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করেন।। জিব্রাঈল (আ.) রাসূল (সাঃ) কে মক্কা ত্যাগের ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ অবহিত করেন এবং বলেন যে, “আপনি যে বিছানায় রাতে ঘুমান, সেখানে আজ ঘুমাবেন না।” অতঃপর মক্কার নিয়মানুযায়ী সবাই যখন দিনের প্রচন্ড তাপের সময় নিজগৃহে বিশ্রাম নেয় তখন রাসূল (সাঃ) আবু বকর (রা.) এর কাছে গিয়ে তাকে হিজরতের ব্যাপারে জানান এবং তাদের যাত্রার ব্যাপারে আলোচনা সেরে নেন। অতঃপর নিজ গৃহে ফিরে তিনি রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। অন্যদিকে সন্ত্রাসী কুরাইশ নেতারা, যারা রাসূল (সাঃ) কে হত্যা করে তাঁর পবিত্র রক্ত বিভিন্ন গ্রোত্রের মাঝেবন্টন করার হীন চক্রান্ত করেছিল তারা বিভিন্ন গোত্র হতে ১১ জনকে বাছাই করে রাতের প্র ম ভাগে রাসূল (সাঃ) এর বাসার কাছে জড়ো করে, যাতে করে রাসূল (সাঃ) যখন ঘুমিয়ে পড়বেন তখন তারা যেন রাসূল (সাঃ) কে হত্যা করার হীন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারে। রাসূল (সাঃ) আলী (রা.)-কে তাঁর গৃহে ঘুমানোর জন্য নির্দেশ দেন এবং তাঁকে একটি সবুজ হাদরামী কম্বল দিয়ে তাঁর মুখ ঢেকে রাখার পরামর্শ দেন। রাসূল (সাঃ) আলী (রা.) কে বলেন যে, তাঁর উপর কোন ধরনের বিপদ আসবে না। রাসূল (সাঃ) রাতের বেলায় কয়েক মুঠো বালি কাফেরদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সূরা ইয়াসিনের ৯ নং আয়াত পড়তে পড়তে তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাহায্যে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। যখন অন্য একজন ব্যক্তি তাদেরকে বললেন যে, রাসূল (সাঃ) ইতোমধ্যেই গৃহ ত্যাগ করেছেন, তখন তারা তা বিশ্বাস করেনি। পরবর্তীতে তারা দেখল যে, রাসূল (সাঃ) এর পরিবর্তে আলী (রা.) তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন। অন্যদিকে রাসূল (সাঃ) প্রথমে আবু বকর (রা.) এর গৃহে যান এবং আবু বকর (রা.) সহ তিনি দেয়ালের মধ্যবর্তী ফাঁকা দিয়ে বের হয়ে পড়েন, যাতে করে কেউ তাঁদেরকে চিনতে না পারে। তাছাড়া তাঁরা মদিনার উল্টো পথে চলতে থেকে ইয়েমেনের পথের দিকে অগ্রসর হয়ে মক্কা হতে ৫ মাইল দূরের থাওর গুহার কাছে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা তিন রাত পাহাড়ের গুহায় অবস্থান করেন। এটি ছিল পর্বতের উপরের অংশে এবং এর রাস্তা ছিল কংকরযুক্ত ও খাড়াভাবে উপরের দিকে উঠা। রাসূল (সাঃ) এর পরিকল্পনা ছিল যে, মক্কার কাফেররা তাঁকে খোঁজার জন্য উত্তর দিকে মদিনার পথে অগ্রসর হবে। আর তাই তিনি অগ্রসর হয়েছেন দক্ষিণ দিকে ইয়েমেনের পথে। রাসূল (সাঃ) এ যাত্রা শুরু করেন ২৭শে সফর।

আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.) রাতে এসে তাঁদের সাথে অবস্থান করতেন এবং ভোরের দিকে মক্কায় ফিরে আসতেন। তিনি তাঁদেরকে মক্কার কুরাইশ নেতাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করতেন। আবু বকর (রা.)’র দাস আমের ইবনে ফুহাইরা (রা.) গভীর রাতে এসে বিভিন্ন প্রকার খাবার সরবরাহ করতেন ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.)’র পায়ের চিহ্ন মুছে দিতেন।

কুরাইশরা যখন বুঝতে পারল যে, রাসূল (সাঃ) মক্কা ত্যাগ করেছেন, তখন তারা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আলী (রা.) কে আটক করে কাবা’র কাছে নিয়ে তাঁকে অত্যাচার শুরু করে। কিন্তু আলী (রা.)’র কাছ থেকে তারা কোন তথ্য না পেয়ে আবু বকর (রা.)’র বাসায় গিয়ে আসমা (রা.) কে পেয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা শুরু করে। তাঁর কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আবু জাহেল (তার উপর আল্লাহ্’র লানত) আসমা (রা.) কে মুখের উপর থাপ্পড় দিয়ে রাগে বের হয়ে আসে। পরবর্তীতে তারা এক জরুরী বৈঠক ডেকে রাসূল (সাঃ) ও আবু বকর (রা.) কে ধরার সমস্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাঁর মক্কা হতে মদিনা যাবার সকল রাস্তায় তাদের গোয়েন্দা নিয়োগ করে এবং রাসূল (সাঃ) ও আবু বকর (রা.) এর পবিত্র মস্তকের উপর ১০০ উটের পুরষ্কার ঘোষণা করে। ফলে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের সামর্থবানরা পুরস্কারের আশায় রাসূল (সাঃ) কে ধরতে বের হয়ে পড়ল। তারা এমনকি রাসূল (সাঃ) এর অবস্থিত গুহার পথে এসে উপস্থিত হয়। তারা এক পর্যায়ে গুহার এমন কাছে এসে উপস্থিত হল যে, আবু বকর (রা.) বললেন, “তারা যদি তাদের পায়ের দিকে তাকায় তবে তারা আমাদেরকে দেখতে পাবে।” রাসূল (সাঃ) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, “আপনি এই দুই ব্যক্তি ছাড়া তৃতীয়, আল্লাহ্’র ব্যাপারে কি বলবেন?” এ ব্যাপারে সূরা আত-তওবার ৪০ নং আয়াত নাযিল হয়।

আর এভাবেই মক্কার কুরাইশদের মিশন ব্যর্থ হয়ে পড়ে। যখন কুরাইশদের নজরদারি কমতে শুরু করে তখন রাসূল (সাঃ) মদিনা যাবার প্রস্ততি শুরু করেন। রাসূল (সাঃ) যাত্রা পথে তাঁকে সহায়তার জন্য পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকা আল-লুথির সাথে ইতোমধ্যেই কথা বলে নিয়েছিলেন। তিনি যদিও তার পূর্বপুরুষের ধর্ম তখনও বিশ্বাস করতেন, তবুও সে ছিল এ কাজে দক্ষ ও বিশ্বস্ত। কথা মত সে তিন দিন পর এসে উপস্থিত হলে রাসূল (সাঃ) রবি-উল আউয়াল মাসের প্রথম তারিখ রাতে আমের ইবনে ফুহাইরা (রা.) সহ রওনা হলেন।

তারা প্রথমে আরো দক্ষিণ দিকে ইয়েমেনের দিকে রওনা হন। তারপর সমুদ্রের পাশ দিয়ে এগিয়ে এমন স্থানে এসে উপস্থিত হন যা সম্পর্কে কুরাইশদের কোন ধারণা নেই। অতঃপর তারা লোহিত সাগরের পাশ ঘেঁষে উত্তরের দিকে যাত্রা করেন। অবশেষে তারা রবিউল আউয়াল মাসের ৮ম তারিখে মদিনার কুবা নামক স্থানে এসে উপস্থিত হন। মদিনার মুসলিমরা রাসূল (সাঃ) হিজরতের খবর পেয়ে আল-হারার দিকে এসে প্রত্যেকদিন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। এভাবে তাদের অপেক্ষার পালা শেষ হয়। রাসূল (সাঃ) মদিনায় এসে উপস্থিত হন। এমন সময় এক অপেক্ষারত ইহুদী বাড়ীর ছাদ থেকে বলে উঠল, “হে আরবের লোকেরা! এইতো আসছে সেই ব্যাক্তি যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছিলে।” মুসলিমরা তাদের অস্ত্র হাতে তুলে নিল এবং সবাই আনন্দে তাকবির দিতে থাকল। মদিনার সকল লোকেরা রাসূল (সাঃ) কে স্বাগত জানানোর জন্য তাদের ঘর থেকে বের হয়ে আসলো। এটা ছিল মদিনার জন্য, ইসলামের জন্য এক স্মরণীয় দিন। হিজরতের এই প্রক্রিয়ায় রাসূল (সাঃ) থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।

প্রথমত, পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন:
রাসূল (সাঃ) হিজরতের এই পরিকল্পনা নিজে গ্রহণ করেন। তিনি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যাবতীয় বিষয় নিজে তদারকি করেন। রাসূল (সাঃ) এর পরিকল্পনার ধরণ থেকে বুঝা যায় যে, পুরো বিষয়টিই ছিল বিচক্ষণতা ও কৌশল গত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসূল (সাঃ) কে হিজরতের নির্দেশ দেন আর রাসূল (সাঃ) নিজে এ জন্য পুরো পরিকল্পনা তৈরী এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বস্তুগত সম্বল সংগ্রহ করেন। এর মাধ্যমে তিনি হিজরত পুরো সফলতার সাথে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। আর তাই আজকে যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজকে সম্পনন্ন করার জন্য আনসারদের মত নুসরাহ্ প্রদান করবেন তাদেরকে অবশ্যই একটি পুর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরী করতে হবে। আর এর জন্য যাবতীয় বস্তুগত সহায়-সম্বল ও কৌশল গ্রহণ এবং সাহসের সাথে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। মদিনায় হিজরত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজকে সম্পন্ন করার জন্য রাসূল (সাঃ) কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনার ধাপসমূহকে নিচে উল্লেখ করা হল:

১. রাসূল (সাঃ) তাঁর বিছানায় আলী (রা.) কে ঘুমানোর জন্য ব্যবস্থা করেন।

২. রাসূল (সাঃ) তাঁর গৃহ থেকে রাতের অন্ধকারে আবু বকর (রা.)-এর বাসায় গমন করেন। এর মাধ্যমে তিনি (সাঃ) আরবরা তাঁকে খুঁজে পাবার সম্ভাবনাকে হ্রাস করেছেন।

৩. তাঁরা দু’জনেই আবু বকরের (রা.) গৃহ ত্যাগ করেছেন বাসার দরজার পরিবর্তে দেয়ালের মধ্যবর্তী ফাঁকা দিয়ে। এর মাধ্যমে কুরাইশরা যেন তাঁদেরকে খুঁজে পেতে না পারে বা তাঁদের পেছন নিতে না পারে তা নিশ্চিত করেছেন।

৪. তাঁরা মদিনায় যাবার জন্য সচরাচর যে পথ ব্যবহার করা হয় তা ত্যাগ করে উল্টোদিকে ইয়েমেনের পথের দিকে এগিয়েছেন।

৫. তাঁরা থুর গুহায় তিন দিন অপেক্ষা করেছেন যাতে করে রাসূল (সাঃ) কে খুঁজে পাবার তৎপরতা কুরাইশদের মাঝে কমে যাবে তখন মদিনার পথে যাত্রা করতে পারেন।

৬. আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.) রাতের বেলায় এসে কুরাইশদের পরিকল্পনা তাঁদেরকে অবহিত করতেন। এর মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) কুরাইশদের তৎপরতা সর্ম্পকে অবহিত থাকতেন।

৭. তাঁদের যাত্রার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) এর মাধ্যমে।

৮. আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.)’র রাতের বেলায় আসা যাবার পদচিহ্ন মুঁছে ফেলার জন্য আমের ইবনে ফুহাইরা (রা.) কে ব্যবহার করা হয়েছে।

৯. ইবনে উরাইকা নামের একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ লোককে তাঁদের গাইড নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ঐশ্বরিক সাহায্য:
হিজরতের পুরো প্রক্রিয়ায় রাসূল (সাঃ) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছেন। পবিত্র কুরআন ও সহীহ্ হাদীসে এ বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব ঘটনা হতে আমরা আমাদের সময়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার সময় সাহায্য পেতে পারি। ইমাম আহমেদ থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) হিজরতের সময় যে পর্বতের গুহায় তিন দিন আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে কুরাইশদের লোকজন গিয়ে উপস্থিত হয়। এমন সময় আবু বকর (রা.) রাসূল (সাঃ) কে বলেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাঃ), তারা আমাদেরকে খুঁজে পেয়ে যাবে।” রাসূল (সাঃ) বলেন, “না, তারা আমাদের খুঁজে পাবেনা। কারণ জিব্র্ঈাল (আ.) তাঁর পাখা দিয়ে আমাদেরকে ঘিরে রেখেছে।” লোকটি গুহার দিকে ফিরে বসে পড়ল। রাসূল (সাঃ) বললেন, “যদি সে আমাদেরকে চিহ্নিত করে ফেলে, তবে তা সে পারবেনা।” সহীহ বুখারী থেকে আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি (রা.) বলেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাঃ) তারা যদি তাদের মাথা নিচু করে তবে তারা আমাদেরকে দেখতে পাবে।” রাসূল (সাঃ) বললেন, “শান্ত হও আবু বকর! আমরা দু’জন আর তৃতীয়জন হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।” সুতরাং, এ ঘটনা হতে এটা প্রমাণিত যে, রাসূল (সাঃ)-এর সকল মানবীয় ক্ষমতা, পরিকল্পনা ও বিচার-বিশ্লেষণের পরও, কাফেররা আল্লাহ্’র রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে পৌঁছে যায়। এতে তাদের দৃঢ় সংকল্প এবং ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য রাসূল (সাঃ) কে হত্যা করার ব্যপারে তাদের বিরামহীন পরিকল্পনার সুষ্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আর এই পরিস্থিতিতে রাসূল (সাঃ) আল্লাহ্’র উপর পূর্ণ আস্থা ও আল্লাহ্’র পক্ষ হতে রাসূল (সাঃ)-কে সাহায্য করার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠে।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখ, আল্লাহ্ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন। যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন, তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, বিষন্ন হয়োনা, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁর প্রতি স্বীয় শান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ, আল্লাহ্ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন, আর আল্লাহ্’র কথাই সদা সমনত এবং আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা তওবা : ৪০]

আজকে যারা আল্লাহ্’র পৃথিবীতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম করছে এবং যাদের নুসরাহ্ দেবার মত সামর্থ্য ও মন মানসিকতা আছে তাদের জন্য এ আয়াতের অর্থ বুঝা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ্’র বান্দা হিসাবে আল্লাহ্ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি নুসরাহ্ দেয়ার অর্থ হল পূর্ণাঙ্গ ও সার্বিকভাবে দ্বীন ইসলামকে সমর্থন করা এবং আল্লাহ্’র পক্ষ হতে তাঁর বান্দার প্রতি নুসরাহ্ হল তাকে সাহায্য করে ইসলামকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করা। আজকে যদি বিশ্বাসীদের ভিতর থেকে ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ এবং ইসলামের দাওয়াত বহণকারী মানুষদের একটা বড় অংশ দ্ব্যার্থহীনভাবে তাদের সকল প্রচেষ্টা দ্বারা এই কাজে আত্মনিয়োগ করতো তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে নুসরাহ্ খুবই সন্নিকটে এবং এতে কোন প্রকার দ্বিধার অবকাশ নেই; কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলেন,

“নিশ্চয়ই আমি বিজয়ী করবো আমার নবীদেরকে এবং তাদেরকে যারা ঈমানদার এই দুনিয়ার জীবনে এবং ঐ দিন যখন সবাই স্বাক্ষ্য দিবে (কেয়ামত দিবসে)।” [সূরা আল-গাফির : ৫১]

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার হস্তক্ষেপ ও সাহায্য নিশ্চিতভাবেই আসবে যদিও আমরা তার প্রকৃতি ও ধরন সম্পর্কে অজ্ঞ।