রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১২

আফগানিস্তানে মার্কিন পরাজয়

খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ

আফগানিস্তানে মার্কিন আক্রমণ যুদ্ধ না, আগ্রাসন - এ বিষয়ে এখন আর কোনও সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ও যৌথ বাহিনীর প্রধানের পদচ্যূতকরণ এবং আফগান যুদ্ধ ও কলাকৌশল সম্পর্কিত প্রায় ৯২,০০০ তথ্যপ্রমাণ সম্বলিত দলিল ফাঁস হওয়ায় মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে মার্কিন আগ্রাসনের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর বর্তমান অবস্থা এটাকে ভিয়েতনামের পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কানাডার সাবেক প্রতিরক্ষা প্রধান রিক হিলারের মন্তব্য এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয় - আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনী এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যার তুলনা করা যায় মৃতদেহের সাথে, যাতে দিন দিন পচন ধরছে। শুরুর দিকে আফগান যুদ্ধ রহস্যে ঘেরা থাকলেও ন্যাটো বাহিনীর মিথ্যে আশ্বাস ও একে একে আফগান যোদ্ধাদের কাছে তাদের প্রাণ হারানোর ঘটনা পুরো আফগানিস্তানকে ন্যাটো বাহিনীর কবরস্থানে পরিণত করেছে। শুধু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নয়, আফগানিস্তানের ইতিহাসই রচিত হয়েছে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে; যা আফগান মুসলিমদের বিশ্বে পরিচিত করিয়েছে যোদ্ধা জাতি হিসেবে। তালেবানদের নাম করে আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপস্থিতি ও পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বর্তমান বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় নির্দেশ করে।

রহস্যের আবর্তে আফগান যুদ্ধ আফগানিস্তান আক্রমণের পর থেকেই মার্কিন প্রশাসন প্রচারণা চালিয়ে আসছে যে, সেখানে আগ্রাসন চালানো ব্যতীত যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষার দ্বিতীয় কোন উপায় ছিলনা। কিন্তু আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে আসলে আক্রমণের কোনও হুমকি ছিলনা। বরং যুক্তরাষ্ট্র তার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতেই সেখানে আক্রমণের সূচনা করেছে - বিশ্ববাসীর নিকট আজ এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে আল কায়দার নেটওয়ার্ক রয়েছে। এবং আফগানিস্তানে আল কায়দার সদস্য সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। এটাও জানা যায় যে, ৯/১১ এর পরিকল্পনার পুরোটাই গৃহীত হয়েছিল জার্মানীর বনে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের হুমকি ছিল, তবু বলতে হবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলনা। কেননা ভারত প্রশাসন ৫ লাখ সৈন্য নিয়ে কাশ্মির দখল করেও আজ পর্যন্ত কাশ্মিরী জনগোষ্ঠীর ভারতীয় শহরাঞ্চলগুলোতে আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি। ফিলিস্তিনে উপর্যুপরি ইসরাইলী আক্রমণ ইসরাইলী জনগোষ্ঠীকে ফিলিস্তিনের আক্রমণের হুমকি হতে নিরাপদ করতে পারেনি। ৩৯ বছর ধরে উত্তর আয়ারল্যান্ডে বৃটেনের মেতায়েনকৃত ২৭ হাজার সেনাও আই.আর.এ (আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি) কে বৃটেন আক্রমণ হতে নিবৃত করতে পারেনি। অনুরূপভাবে বিশ্বকে নিরাপদ করতে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আক্রমণও আদৌ বিশ্ববাসীকে কোনও নিরাপত্তা দিতে পারেনি। বরং এ সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যার পররাষ্ট্র নীতি হল বছর বছর ফিলিস্তিনে ইসরাইলী গণহত্যাকে সমর্থন দেয়া, নিজ দেশে তেল গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইরাকের মত সম্পদশালী একটি দেশকে কবরস্থানে পরিণত করা, মুসলিম দেশগুলোতে সুবিধামত পুতুল সরকার বসিয়ে নিরীহ মুসলিম জনগণের সম্পদ লুটে খাওয়া।

কি ধরনের ঠুনকো মিথ্যে অজুহাতে আফগানিস্তানের লক্ষ লক্ষ নিরীহ মুসলিম নরনারীকে প্রাণ দিতে হচ্ছে, তার উপাখ্যান কিছুটা তুলে না ধরলেই নয়। অক্টোবর ২০০৯ সালে হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেমস জোন্স সি.এন.এন-এ দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন, “সুসংবাদ হল, আফগানিস্তানে আল কায়দার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। আমি আশা করিনা যে, তালেবানরা কখনও কোনও হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে। আমি আরও স্পষ্ট করে বলতে চাই, আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে আর কোনও ধরনের সমস্যার সম্ভাবনা নেই...। (১)

এখন প্রশ্ন হল:

প্রমত, যদি আফগানিস্তান কোনও হুমকি না হয় তবে কেন এখনও ১ লক্ষ ৯০ হাজার মার্কিন বাহিনী সেখানে মজুদ আছে? আফগানিস্তানে আল কায়েদার সংখ্যা ১০০ এরও কম। তাহলে কেন সেখানে মার্কিন যৌথ বাহিনী আরও বাড়ানো হচ্ছে? এ সামান্য সংখ্যক আল কায়েদা মোকাবেলায় আফগান নিরাপত্তা বাহিনীই কি যথেষ্ট নয়?

দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে আল কায়েদার অবস্থান আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে। মার্কিন বাহিনীর অবস্থানও তাহলে সেই সীমান্ত এলাকাতেই হওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে মার্কিন বাহিনী কাবুল, হেরাত ও মাজার-ই-শরীফ অবস্থান নিয়েছে কোন উদ্দেশ্যে?

তৃতীয়ত, যদি তাত্ত্বিকভাবে ধরেও নেয়া হয় যে, মার্কিন যৌথ বাহিনী আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থানরত প্রতিটি আল কায়েদা সদস্যকে পরাস্ত করতে সক্ষম, তবুও এটা তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণ করেনা। কারণ এ কথা সর্বজন বিদিত যে, আল কায়েদা শুধু আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে নয়, বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র মিডিয়ার সাহায্যে বিশ্বে প্রচার করছে যে, বিশ্বের বেশিরভাগ সন্ত্রাসীর উৎপত্তিস্থল আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে। কিন্তু বৃটেন সরকারের পরিসংখ্যান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন এ ধরনের প্রচারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। বৃটেনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হতে ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বৃটেন হতে গ্রেফতারকৃত ১৪২ জন চরমপন্থী কয়েদীর মধ্যে মাত্র ৩ জন ছিল পাকিস্তানী। সেখানে আফগানিস্তানের কেউ ছিলনা।

পঞ্চমত, সারা ল্যাডবারি তার এক গবেষণা মূলক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন বিশ্বব্যাপী ইসলামের উপর পশ্চিমা আক্রমণ; ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও ইরাকে নির্বিচারে নিরীহ মুসলিম হত্যা; আফগানিস্তানের মত বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত পুতুল সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, অন্যায়-অবিচার ও জননিরাপত্তা দানে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে মূলতঃ মুসলিমগণ এর অবসান ঘটাতে মুক্তির পথ হিসেবে তালেবান ও হিজব-ই-ইসলামীর মত দলগুলোতে যোগ দিচ্ছে। (৩)

ষষ্ঠত, ২০০৮ সালে প্রকাশিত র‍্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, মুসলিম জনপদগুলোতে মার্কিন সামরিক অভিযানই প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধির জন্য দায়ী।(৪) যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৬ সালের ৭,০০০ তালেবান সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ৪ গুন বেড়ে ২৫ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে।(৫) উপরন্তু আফগানিস্তানে আরও সৈন্য সংখ্যা বর্ধিত করণের ঘোষণা মূলত তালেবান সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি ব্যতীত আর কোনও ভাল ফল বয়ে আনবেনা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিথ্যা আশ্বাস
বেশ কিছুদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্র বলে আসছে আফগানিস্তান থেকে সরে আসার জন্য সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তাবাহিনী গঠন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই আশ্বাস বাস্তবায়নের নমুনা সত্যিই হাস্যকর। ন্যাটোর হিসাব মতে, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আফগান ন্যাশনাল আর্মির সংখ্যা হল ৯৪,০০০ এবং পুলিশ ফোর্সসহ এই সংখ্যা সর্বমোট ১ লক্ষ ৯০ হাজার। ২০০৯ সালের আগষ্টে সাবেক মার্কিন এবং ন্যাটো কমান্ডার জেনারেল ম্যাকক্রিস্টাল এ সংখা দ্বিগুন অর্থাৎ ৪ লক্ষ করার সুপারিশ করেছেন।(৬) কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, জন কেরি তার এক বক্তৃতায় হতাশার সাথে বলেছেন, প্রায় লাখ খানেকের মত আফগান নিরাপত্তা বাহিনী থাকলেও সেখানে ৫০ হাজারেরও কম সেনা আছে, যারা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবে।(৭)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিসেব অনুযায়ী আফগানের ৭৮% পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালনে অক্ষম।(৮) অন্যদিকে আফগান ন্যাশনাল আর্মি দ্বিগুন করতে যুক্তরাষ্ট্রের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও এতে নিয়োগের হার অত্যন্ত হতাশা ব্যঞ্জক; সম্প্রতি তা ৫০% এরও নিচে নেমে এসেছে। আর তাও যে কজন নিয়োগ পাচ্ছে মাদকাসক্তি, অসুস্থতা, আহত ও অঙ্গহানি বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর ২৫% আফগান সেনা পেশা থেকে অব্যহতি নিচ্ছে।(৯) ফলে যতই সদস্য বৃদ্ধির পক্ষে সাফাই গাওয়া হোক, আফগান ন্যাশনাল আর্মি দ্বিগুন করাতো দূরের কথা; বর্তমানের লাখ খানেক সৈন্য টিকিয়ে রাখতেই যুক্তরাষ্ট্রকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই একথা আজ বিশ্ববাসীর অজানা নয় যে, আফগান ন্যাশনাল আর্মি শক্তিশালী করে মার্কিন বাহিনীর সেখান থেকে সরে যাবার আশ্বাস সম্পূর্ণ মিথ্যে ও ভিত্তিহীন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কখনই আফগান ন্যাশনাল আর্মি গঠন ছিলনা। বরং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মত আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর পাকাপোক্ত একটি ঘাঁটি নিশ্চিত করা, যাতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মত এ অঞ্চলকেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

ন্যাটো বাহিনী নিয়ে মার্কিন মিথ্যাচার
আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালিয়েছে যে, তাকে সমর্থন জানিয়ে ৪৩ টি রাষ্ট্র তাদের সৈন্য দল প্রেরণ করেছে। কারণ ইরাক আগ্রাসনের সময় আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বিশ্বব্যাপী বৈধতা যুক্তরাষ্ট্রের ছিলনা। তাই আফগানিস্তান আগ্রাসনে বৈধতার ঘাটতি দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের এই আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হল মাত্র দুটি দেশ সেখানে ৫ হাজারের বেশি সেনা পাঠিয়েছে। আফগানিস্তানে মার্কিন যৌথ বাহিনীর ৭০% হল মার্কিন বাহিনী। সেখানে ৩৪ টি দেশের প্রেরিত সৈন্য সংখ্যা ১,০০০ এর কাছাকাছি বা তার চেয়ে কম। এবং ১০টি দেশের সৈন্য সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য - এমনকি একজন দুজন করে (জর্জিয়া ও আইসল্যান্ড)। এইযুদ্ধে বৃটেনের একার সৈন্য সংখ্যাই ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে। এ যুদ্ধে বৃটেনের হারানো সেনা সদস্যের পরিমাণ ন্যাটো ও ইউরোপের সম্মিলিত সৈন্য সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের কোনও রাষ্ট্রই আফগানিস্তানে বৃটেনের এই পরিণতি বরণ করতে রাজি নয়।

এ যুদ্ধে ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি ও স্পেনের মত বিশ্ব শক্তিও খুব বেশি সংখ্যক সেনা প্রেরণ করেনি। সেনা প্রেরণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও অন্যান্য লাভক্ষতির হিসেব কষে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়াও এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণটি হল - আফগানিস্তান পশ্চিমাদের জন্য একটি বিরাট হুমকি এবং এ আগ্রাসন তাদের জন্য অপরিহার্য-এ ধারণা বিশ্বব্যাপী প্রচার করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

আর আফগানিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেসব সৈন্য সংগ্রহ করেছে, তাও তাকে পেতে হয়েছে বহু শর্ত সাপেক্ষে। ২০০৯ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মড সার্ভিস কমিটির দেয়া তথ্য মতে, আফগানিস্তানে সৈন্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬৯ টি রাষ্ট্রের শর্ত ও সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হয়েছে। আর এই শর্তারোপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যগণ।(১০)

আরোপিত শর্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হল:

১। জার্মান সেনা সদস্যগণ রাতের বেলায় উত্তর আফগানিস্তানে এবং হাসপাতালের সীমানা হতে ২ ঘন্টার বেশি দূরত্বে কোনও অপারেশন চালাবেনা।

২। তুর্কী সেনাগণ শুধু কাবুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর বাইরে তারা যাবেনা।

৩। দক্ষিণ ইউরোপের সেনা সদস্যরা বরফ বা তুষারপাতের মধ্যে কোনও অভিযানে যাবেনা।

৪। আর একটি দেশ হতে প্রেরিত সৈন্যদল শর্ত দিয়েছে, পাকিস্তান সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনও অপারেশনে গেলে তার নিজ দেশের অনুমতি নিতে হবে।

৫। অপর একটি দেশ জানিয়েছে, তাদের প্রেরিত যুদ্ধবিমান তাদের দেশীয় সৈন্য ব্যতীত যৌথ বাহিনীর অন্য কোনও দেশের সদস্য ব্যবহার করতে পারবেনা।

এই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বহুল প্রচারিত আফগানিস্তান আগ্রাসনে ৪৩ টি রাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত ব্যাপক সাহায্য সমর্থনের নমুনা!

আফগানিস্তান: সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের কবরস্থান
চেঙ্গিস খান যখন তার ২ মিলিয়ন দুর্ধর্ষ মঙ্গল সেনা নিয়ে আফগানিস্তানে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাকে পরাস্ত করার মধ্য দিয়েই আফগানিস্তানের এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মোকাবেলার বীরত্ব গাঁথা শুরু। দুই পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঠান্ডা লড়াই চলাকালে এবং এর পরও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও স্থলবেষ্টিত অবস্থানের কারণে সর্বদাই রাষ্ট্রটি বহিঃশক্তির আক্রমণের হুমকি মোকাবেলা করে এসেছে। দেশটির অতীত ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ফরাসী, গ্রীক, মঙ্গল, বৃটিশ, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ কোনও দখলদার শক্তিই কখনও একে পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। একারণেই একে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের কবরস্থান বলা হয়।(১১)

বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে এই রাষ্ট্রটিতে বারবার আগ্রাসী শক্তির কবর রচিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তাচ্ছিল্য ভরে নির্বোধের মত আফগানিস্তানের এই গৌরব ইতিহাস অগ্রাহ্য করেছে। যার খেসারতস্বরূপ ডিক চেনি ইতোমধ্যে একে অসমাপ্ত যুদ্ধ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এটা আগ্রাসন হলেও আফগানিস্তানের অধিবাসীদের নিকট এটি তাদের অস্তিত্বের সংকট, জীবন বাঁচানোর লড়াই। এই লড়াইয়ের স্পৃহা এসেছে তাদের বিশ্বাস, জীবন বিধান ইসলাম থেকে।

সুতরাং এর চেয়ে কঠিনতম পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও তারা এতটুকু পিছু হটবেনা। ইতোমধ্যেই বিশ্ববাসী সেখানে মার্কিন যৌথ বাহিনীর নাজেহাল দশা প্রত্যক্ষ করেছে। লোকবল, অস্ত্রসস্ত্রে শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তারা এই দুর্বল স্বল্প সংখ্যক জনগোষ্ঠীর সাথে পেরে উঠছেনা। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, আফগানিস্তানে পূর্ব  যেসব আগ্রাসী শক্তি তাদের স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ হয়েছে, মার্কিন যৌথ বাহিনী অচিরেই সেই একই ভাগ্য বরণ করতে চলেছে।

মার্কিন পরাজয় কেন?
বিস্ময়কর ব্যাপার হল পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি তার অপরিমেয় সম্পদ, সর্বাধিক ব্যয়বহুল সামরিক বাহিনী, সরঞ্জামাদি ও সম্মিলিত ন্যাটো বাহিনী নিয়ে লড়ছে মাত্র ২৮ মিলিয়নের এমন এক হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাথে, যাদের দুই তৃতীয়াংশের প্রাত্যহিক আয় ২ ডলারেরও নিচে। কিন্তু গত ৯ বছর যাবত চেষ্টার পরও তারা এই দারিদ্র পীড়িত জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ এবং সেই সাথে অসম এই যুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করতে যাচ্ছে। দিন দিন মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে; এমনকি পশ্চিমা জনমতও এই আগ্রাসনের বিপক্ষে রায় দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতই বলা হোক যে তারা আত্মরক্ষার খাতিরে এ আগ্রাসন চালিয়েছে, সমগ্র বিশ্বের নিকট আজ তাদের এ অজুহাত প্রশ্নবিদ্ধ।

বর্তমান মার্কিন যৌথ বাহিনীর মত সোভিয়েত ইউনিয়নও ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়েছিল। কিন্তু ১০ বছরের মাথায় তারা চরম পরাজয় বরণ করে এবং খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তৎকালিন সময়ের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের ২.৫ লক্ষ সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তারা সহজেই ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চল দখল করেছিল, কিন্তু সেখানকার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলগুলোকে কখনই কব্জা করতে পারেনি। মার্শাল একরোমেভ ১৯৮৬ সালে বলেছিলেন, আমরা কাবুলসহ কেন্দ্রীয় প্রদেশগুলো নিয়ন্ত্রণে এনেছি কিন্তু...আফগান জনগণের জন্য আমরা যুদ্ধে হেরে গিয়েছি।(১২)

বর্তমান মার্কিন যৌথ বাহিনীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল সৈন্য বহর অত্যাধুনিক অস্ত্র ও রণকৌশল কোনটিই আফগানিস্তানের পাথুরে ভূমি ও অসমতল পাহাড়ি জনপদের বেলায় কাজে আসেনি। নিম্নমানের অস্ত্রসজ্জিত স্বল্প সংখ্যক মুজাহিদীনদের চাতুর্যপূর্ণ গেরিলা আক্রমণের মুখে তারা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল আফগানিস্তানে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্দশা থেকে মার্কিন প্রশাসন কিছুই শেখেনি। গত ৯ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ওবামা ক্ষমতায় এসে সেখানে আরও সৈন্যবল বৃদ্ধি ও অর্থ বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল বিশ্বের দূরদর্শী একমাত্র এই পরাশক্তি তার দীর্ঘ ভিয়েতনাম যুদ্ধের তীক্ত অভিজ্ঞতা থেকেও কোনও শিক্ষা গ্রহণ করেনি। যেখানে ৫ লক্ষ ৩৫ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মার্কিনীরা ভিয়েতনামে মার খেয়েছে, তার চেয়ে ৪ গুন বড় আফগানিস্তানে তারা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে তা সত্যিই দুর্বোধ্য। উল্লেখ্য, বর্তমানে আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর সংখ্যা তৎকালীন ভিয়েতনামের মাত্র ৩২ ভাগের এক ভাগ। মার্কিন বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ভিয়েতনাম ও আফগান অভিযানের কিছু সাদৃশ্য তুলে না ধরলেই নয়:

১। ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তান দুদেশেরই যথাক্রমে ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আগ্রাসী শক্তি মোকাবেলার ইতিহাস রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রাসী বাহিনী বিশাল সৈন্য সম্ভার ও আধুনিক সমরাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও করুণভাবে পরাজিত হয়েছে।

২। মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসনকৃত ২টি দেশই যুক্তরাষ্ট্র হতে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। উল্টো আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত যে সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে তা হল আফগানিস্তানের স্থলবেষ্টিত সীমান্ত। সেখানে কোনও উপকূল না থাকায় বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ-বাহিনী ব্যবহারের আশা ত্যাগ করতে হয়েছে।

৩। দুটি দেশের ক্ষেত্রেই মার্কিন বাহিনীকে ৮০ ভাগের বেশি গ্রামাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠীর তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যার সাথে তারা সম্পূর্ণ অপরিচিত।

৪। অসমতল পাহাড়ী ভূমি ও পাথুরে রাস্তার কারণে উভয় দেশে প্রচলিত ট্যাংক-কামান ব্যবহার করাটা তাদের জন্য দুঃসাধ্য। ফলে আকাশপথেই তাদের আক্রমণ চালাতে হয়েছে।

৫। উভয় রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মার্কিন বাহিনীকে অশান্ত, শত্রুভাবাপন্ন, বিশাল সীমান্ত এলাকার মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং আগ্রাসন চালানোর গ্রহণযোগ্য কোনও অজুহাত তারা দাঁড় করাতে পারেনি।

মার্কিন প্রশাসন ক্রমাগতভাবে আফগানিস্তানকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে দাঁড় করাতে চাইছে। অন্যদিকে তালেবান যোদ্ধাদের যুক্তি হল তারা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মুখে আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করছে। যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের কোন ইচ্ছা আদৌ তাদের ছিলনা, বর্তমানেও নেই। ৯/১১ এর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র একপাক্ষিকভাবে আফগানিস্তানকে দায়ী করলেও তার যুক্তিযুক্ত কোনও প্রমাণ বিশ্ববাসীকে দেখাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থনকারী লেখকগণও (সেথ জোন্স ও মার্টিন লিবিকি) তাদের রচনায় একই মতামত ব্যক্ত করেছেন: মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার আশংকাকে আরও বৃদ্ধি করেছে।(১৩) প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নয়, সম্পূর্ণ হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এই আগ্রাসন। যা উম্মাহ্র মধ্যে মার্কিনীদের প্রতি পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে এবং কাফির মার্কিনীদের কবর রচনা করে ইসলামী রাষ্ট্র - খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করছে।

উপসংহার
সত্য মিথ্যার সংগ্রাম বস্তুতঃ পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। রাসূল (সাঃ) মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও এই কাফির-মুশরিক সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীই ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিন্তু খিলাফত রাষ্ট্রের সৈন্যদের হাতে তারা আজীবনই চরমভাবে পরাজিত হয়ে এসেছে। আল আহযাবের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী যেমনি তাদের মিত্রদের সাথে নিয়ে একত্রিত হয়ে মদিনা আক্রমণ করতে এসেছিল, ঠিক তেমনি আফগানিস্তানে মার্কিন ও তার মিত্ররা ন্যাটো বাহিনীর নামে এসেছে আগ্রাসন চালানোর জন্য। কিন্তু কুরাইশ বাহিনী ঐ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল মদিনা রাষ্ট্রের মুসলিম বাহিনীর হাতে। আজ একমাত্র সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা না থাকার দরুণ মুসলিমরা দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও কাফির সাম্রাজ্যবাদিদের হাতে হচ্ছে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত। কারণ পরাশক্তি সৃষ্ট রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোক্ষম জবাব দিতে পারে কেবল আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শিক পরাশক্তি। তাই মুসলিম বিশ্বে মার্কিন আধিপত্যের পতনের জন্য দরকার মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং একক নেতৃত্ব ও খিলাফত রাষ্ট্রের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের সূচনা করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, আর এই মুশরিকদের বিরুদ্ধে তোমরা সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে মিলে যুদ্ধ করে। আর মনে রেখ নিশ্চয় আল্লাহ্ মুত্তাকীদের সাথেই রয়েছেন। [সূরা আত-তাওবা : ৩৬]

খাদ্যের অপ্রতুলতাই কি তৃতীয় বিশ্বে দারিদ্র্যের কারণ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সম্পদের অপ্রতুলতা এবং গণতন্ত্রের অভাব দারিদ্র্যের সাধারণ কারণসমূহের মধ্যে প্রধান। সমাজবিজ্ঞানী ও অন্যান্য থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মধ্যে যদিও এ ব্যাপারে কোন ঐক্যমত্য নেই। এ ব্যাপারে খুব প্রাধান্য বিস্তারকারী ধারণা হচ্ছে মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে পুঁজিবাদের বিকাশই হল এ সমস্যার একমাত্র সমাধান। কিন্তু খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, খাদ্যের অপ্রতুলতা নয়, বরং অন্যান্য কিছু বাস্তবতা শুধুমাত্র মুসলিম বিশ্ব নয় পুরো তৃতীয় বিশ্বে দরিদ্রতার জন্য দায়ী।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক এবং এদের কাঠামোগত পরিবর্তন নীতি (Structural Adjustment Policy) মিশর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের বিবিধ অর্থনৈতিক সংকট তৈরির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্রতা মুক্তির উপর তাদের নিজস্ব প্রেসক্রিপশন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রয় করে থাকে। এসব সংস্থা প্রদত্ত নীতিসমূহের মধ্যে রয়েছে শস্যের মজুদ না রাখা বা কমিয়ে আনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত খাবারের উপর কর হ্রাস, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে নেয়া প্রভৃতি। অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহ থেকে আমদানির বদলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে তারা। বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করা ও একে দারিদ্রতা বিমোচনের পথ হিসেবে দেখানো হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার জন্য পাকিস্তানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন দরকার। এসময় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পাকিস্তানকে এসব খাতে সরকারী বিনিয়োগ কমিয়ে বরং রপ্তানীর দিকে আগে মনোযোগী হতে পরামর্শ দিয়েছে। তারা এমন সব খাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় যেতে বলে যেগুলোতে পাকিস্তান অনগ্রসর। আর এভাবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে।

দারিদ্র্যের অপর কারণগুলোর মধ্যে একটি হল ঋণ। আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিক সময়ের ঋণ পরিশোধ করবার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। এ ধরণের দেনার কারণ হচ্ছে অসদুপায়ে উচ্চ সুদে ঔপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহের ঋণ গ্রহণ। আবার অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসকদের বিলাসিতায় অপচয়ের জন্য ধনী দেশসমূহ ঋণ দিয়েছে যা 'ঘৃন্য ঋন' হিসাবে পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮ বিলিয়ন ডলারের (যা বর্তমানে ৪৬ বিলিয়ন) "বর্নবাদ জনিত ঋন" এ জর্জরিত। বর্নবাদ পরবর্তি আফ্রিকার উপর বর্নবাদ শাসনামলের ঋন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এ.সি.টি.এস.এ (এ.সি.টি.এস.এ: অ্যাকশন ফর সাউদার্ন আফ্রিকা) হিসেব করে দেখেছে যে, বর্নবাদ বজায় রাখবার জন্য ১১ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ১৮ বিলিয়ন ডলার) ধার করেছে। আর প্রতিবেশী দেশসমুহও এ জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন) ঋণ গ্রহণ করেছে। শতকরা ৭৪ ভাগের উপরে আফ্রিকান ঋণে জর্জরিত থাকায় পুরো মহাদেশ জুড়ে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বজায় আছে।

ঔপনিবেশিকতা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতার অন্যতম কারণ। উপনিবেশবাদ পশ্চিমাদের প্রতি নির্ভরশীলতাকে প্রলম্বিত করেছে। এ কারণে খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অংশের উপর পশ্চিমা আধিপত্য ও হস্তক্ষেপ বজায় ছিল। ঔপনিবেশিক আমল থেকে আফ্রিকার শ্রম পশ্চিমাদের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এবং সেদেশের জনগণকে পশ্চিমে উৎপাদিত পণ্য সাধ্যের অতীত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রাথমিক সময়ের মত কেবলমাত্র কৃষকের নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিচালিত হয় না। ১৯৬০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহ এ ধরণের ব্যবস্থা এবং সরকারকে খাদ্য সরবরাহের উপর হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে বের হয়ে আসবার জন্য কৌশল প্রণয়ন করেছে। লাভের অঙ্কটাকে বাড়িয়ে নেবার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলো এ সুযোগে এগিয়ে এসেছে। পণ্যদ্রব্যের মূল্যের ব্যাপক হ্রাসবৃদ্ধিতে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ এখন আর নেই। সেকারণে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের জনগণ কে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কর্তৃক বেধে দেয়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হয়। বিশ্ব মন্দা চলাকালীন সময়ে কিংবা তার আগে অনুমাননির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। শুরু থেকেই বিলাসজাত পণ্যদ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি ছিল বৈশ্বিক ব্যবসা। কিন্তু ১৯৬০ সাল থেকে খাদ্য দ্রব্য উৎপাদন আঞ্চলিক পরিমন্ডল থেকে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে রূপান্তরিত হয়।

কেবলমাত্র নিজস্ব চাহিদা পূরণের জন্য যারা খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করে তাদের চেয়ে যারা রপ্তানীর জন্য উৎপাদন করে তাদেরকে বিশ্ব বাণিজ্যিক নীতিসমূহ উৎসাহিত করে। যদিও গ্রীষ্মকালে বৃটিশ কলম্বিয়া এবং ক্যালিফোর্ণিয়া উভয় অঞ্চলের কৃষকেরা টমেটো উৎপাদন করে, তারপরও তাদের জন্য লাভজনক হচ্ছে এগুলো নিজ এলাকায় বিক্রয়ের চেয়ে রপ্তানী করা। অথচ ক্রমবর্ধমান পরিবহন ব্যয় পণ্যসমূহের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণে এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু কিছু অংশে প্রান্তিক চাষীদের দেখা যায় না বললেই চলে। মনোক্রপিং, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার মাধ্যমে কৃষির ব্যাপক শিল্পায়নের কারণে প্রান্তিক চাষীরা সফল হতে পারছে না। জেনেটিক রূপান্তরের জন্য গড়ে উঠা মনসান্তো, আরচার ড্যানিয়েলস,মিডল্যান্ড এবং কারগিল এর মত কোম্পানিসমূহ বিশাল অঙ্কের মুনাফা করছে।

উন্নত বিশ্ব দাবী করছে যে, অধিক জনসংখ্যার কারণে খাদ্যে অপ্রতুলতার দরুণ খাদ্য সংকট তীব্রতর হচ্ছে। খাদ্যের অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমুল্যের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়। তবে এরকম উচ্চফলনশীল ও দক্ষ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রায় এক বিলিয়ন লোক ক্ষুধার্ত থাকে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সমস্যা আসলে আন্তর্জাতিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই: বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্য বন্টন ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার একচেটিয়া কর্তৃত্বেও (মনোপলি) মধ্যে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরিদ্র দেশসমূহে ধনী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর অশুভ পদচারণার মাধ্যমে উপার্জনের ক্ষেত্রস্থল বানানোয় সেসব দেশের কৃষির উপর কুপ্রভাব পড়েছে। অসম বানিজ্য চুক্তি; প্রধান ফসলসমূহের উৎপাদনের উপর অতি খবরদারি; বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতি সংস্থার নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য দরিদ্র দেশসমূহের কৃষির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে।

কাঠামোগত পরিবর্তনের (Structural Adjustment) মত নীতির মাধ্যমে বিশ্বসংস্থাসমূহ উন্নয়নশীল দেশসমূহকে দরিদ্র মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থই শুধু নয়, বরং কৃষিখাতে বরাদ্দকৃত অর্থও সংকোচনে বাধ্য করে। দেশজ শিল্পের জন্য বিদেশী পণ্যের উপর বাণিজ্য বাধা দুরীকরণসহ অন্যান্য গৃহীত সুবিধার বিলোপসাধন ও বিদেশী কোম্পানীগুলোকে সহজে ব্যবসা করবার মত পরিবেশ তৈরির ব্যবস্থা করতেও বাধ্য করে (যদিও ধনী দেশসমূহ সে তুলনায় বিদেশী পণ্যের প্রবেশের পথ সুগম করে না)। এছাড়াও দরিদ্র দেশসমুহকে ঋণের ব্যয়ভার বহনের জন্য খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির মাধ্যমে ডলার উপার্জনের দিকে উৎসাহিত করা হয়। সেকারণে একই ধরণের ফসল বছরের পর বছর উৎপাদনের জন্য ফসলের বৈচিত্র ব্যাহত হয় এবং ফলে ইকোসিস্টেমে ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বিনষ্ট হয় ও রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়তে থাকে।

ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা ও অসমতা দরিদ্র দেশসমূহে দুর্নীতিকে বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও প্রতিকূল করছে। দরিদ্রদেশকে ধনীদেশের খাদ্য সহায়তা প্রদানের নামে অতিরিক্ত খাদ্য বিক্রি করা; উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান, প্রভৃতি তৃতীয় বিশ্বের খাদ্য সংকট ও দরিদ্রতাকে ঘনীভূত করছে।

পশ্চিমাদের নীতির কারণেই তৃতীয় বিশ্ব দরিদ্র এবং খাদ্যশস্যের অপ্রতুলতা নয় বরং উন্নত বিশ্বের অপব্যয়ের কারণেই সৃষ্ট খাদ্যসংকটের ফলে তারা দরিদ্রই থাকবে:

- বিশ্বের জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর মোট কৃষি উৎপাদনের ৮০ ভাগ পশ্চিমারা ভোগ করে
- মোট পণ্যদ্রব্যের শতকরা ৮৬ ভাগ ভোগ করে
- মোট দুধের ৭৫ ভাগ ভোগ করে
- মোট কাঠের ৭০ ভাগ ভোগ করে
- মোট পানির ৬২ ভাগ ভোগ করে
- মোট জ্বালানীর ৪৮ ভাগ ভোগ করে
- মোট মাছ এবং মাংসের ৪৫ ভাগ ভোগ করে

পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য রয়েছে; পশ্চিমারাই যার সিংহভাগ ভোগ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব কি আসল?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ব্যাপক সম্পদরাজি, ভূ-রাজনৈতিক গুরত্ব ও অপরিশোধিত তেলের সর্ববৃহৎ উৎসের কারণে গত একশত বছর ধরে বিভিন্ন শক্তির সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর এখানে ইরান অবশ্যই একটি গুরত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিগণিত। এ কারণে যে শক্তি ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করবে এই অঞ্চলের আধিপত্য তারই।

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের পর থেকেই বিভিন্ন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তাদের সমালোচনার শিকার হয়েছে ইরান এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের যুদ্ধের হুমকির মুখে পড়েছে। ২০০২ সালে বুশের স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে শয়তানের অক্ষশক্তি ঘোষণার পর থেকে জর্জ বুশ ইরানের সাথে যে কোন সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। ইরাকে জঙ্গীবাদ উস্কে দেয়া, হিজবুল্লাহকে সমর্থন প্রদান ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। তাদের লক্ষ্য ভিন্ন হওয়ায় এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের জন্য ইরান বড় হুমকি। সেকারণে ইরানকে নিরস্ত্র করা দরকার, বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ এবং এর ইসলামিক ভাবমূর্তিকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।

১৯৭৯ সালে তথাকথিত 'ইসলামিক বিপ্লব'-এর পর আসা ধারাবাহিক সরকারগুলোর মধ্যে রাফসানজানি ও খাতামির শাসনামল থেকে ইউরোপ ও ইরানের সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে ইরানের কট্টর রক্ষণশীল ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণে বেশ কিছু জায়গায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে মার্কিনীদের কাছ থেকে অস্ত্র ক্রয়ের মাধ্যমে ইরানের আসল চেহারা বের হয়ে আসে। আমেরিকা তার স্বঘোষিত শত্রুদেরকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অর্থায়ন করতে থাকে, যেমন: নিকারাগুয়ায় একটি কমিউনিষ্ট- বিরোধী দলকে তারা সহায়তা দেয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মাধ্যমে ইরানের কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মিসাইল ও ভূমি থেকে শূন্যে নিক্ষেপনযোগ্য মিসাইল বিক্রয় করে।

মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ইরানের বিষোদগার করলেও ইরানী সরকারে অবস্থানরত সংস্কারপন্থীরা ইরান, আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সংরক্ষণ করে আসছে। ইরাকে এস সি আই আর নেতা আয়াতুল্লাহ হাকিম ও বদর ব্রিগেডের প্রতি তেহরান সমর্থন অব্যাহত রেখেছে-যারা দক্ষিণ ইরাকে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান সূত্র হিসেবে কাজ করছে। আফগানিস্তানে কাবুল, হেরাত ও কান্দাহারে ইরান ব্যাপক হারে পূনর্গঠন ও প্রশিক্ষণ কাজে অংশ নিচ্ছে। উত্তর আফগানিস্তানে পশতুন প্রতিরোধ ঠেকানোর জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাকের-হ্যামিল্টনের রিপোর্টে এ ধরণের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়, "...ইরাক ও অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুতে ইতিবাচক নীতির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষভাবে ইরান ও সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। ইরান ও সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হবার সময় ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেয়া ও ছাড় না দেয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে.....বিশেষ করে মাকির্ন-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানকে সম্পৃক্ত করা সমস্যাপূর্ণ। এখন আফগানিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের সহযোগী এবং উভয় পক্ষকেই চিন্তা করে দেখতে হবে ইরাকেও একই ধরণের সহযোগিতার মডেল অনুসরণ করা যায় কিনা?"

অপরদিকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার প্রচেষ্টাকে মার্কিনীরা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে সবসময়ই ইরানকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। ইসরাইল একমাত্র দেশ যারা মনে করে মাসখানেকের মধ্যে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলভান সেলম নিউইয়র্কে ইহুদী নেতাদের এক বৈঠকে বলেন, "আমাদের জনবল, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর খুব, খুব কাছাকাছি চলে এসেছে- হয়ত বা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তারা এ ব্যাপারে পুরো জ্ঞান লাভ করবে।"

২০০৫ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিতব্য ইন্টারন্যাশনাল এটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আই.এ.ই.এ) এর বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী নিউক্লিয়ার অস্ত্র সংরক্ষণ, উৎপাদন এবং ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি ফতোয়া জারি করেন। এই সর্বোচ্চ নেতা ২০০৩ সালে ইসরাইলের সাথে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেন।

অর্ধশতাব্দীরও বেশী সময়কাল ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরান ও মার্কিন সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে আমরা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে একধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। যখন কোথাও কোথাও আমরা দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক দেখতে পাই। আবার অন্যদিকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি ও ইসলামিক ভাবমূর্তির জন্য প্রকাশ্যে ইরানকে তারা তিরষ্কার করে থাকে।

ইসলামিক বিপ্লবের পেছনে মার্কিন সহযোগিতা ইরানকে আমেরিকার ক্রীড়ানক হিসেবে ব্যবহারের পথকে সুগম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সচেতনভাবে উদ্দেশ্য হাসিল হবার পর ইসলামিক বিপ্লবকে থামিয়ে দেবার প্রচেষ্টা চালিয়েছে যেরকমভাবে পাকিস্তানে জিহাদীদেরকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের ব্যাপারে উস্কে দিয়ে পরে থামানোর চেষ্টা করেছে।

১৯৭৯ সালে বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে যাওয়া শাহকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা। সেক্ষেত্রে আমেরিকার কৌশলগত প্রাধান্য ছিল ইরানী জনগণের কাছে জনপ্রিয় বিকল্পকে দিয়ে শাহকে সরিয়ে দেয়া। সুদানি নেতা সাদেক আল মেহেদীর মধ্যস্ততায় বিপ্লবকে কার্যকরী করবার জন্য খোমেনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও এখানে প্রাক্তন অ্যাটর্নী জেনারেল রামসে ক্লার্ক ১৯৭৯ সালে খোমেনীর সাথে এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলেন। খোমেনীর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের মাধ্যমে রক্ষণশীলেরা কার্যকরভাবে সামরিকবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মার্কিন বিরোধী সকল প্রচারণার পরও ইরান কখনওই আমেরিকাকে তেল সরবরাহ করা বন্ধ করেনি কিংবা এ সম্পর্কিত কোন চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। কট্টরপন্থীদের অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিপ্লবকে বিপরীত খাতে প্রবাহিত করতে সমর্থ্য হয়নি। এই কট্টরপন্থীরাই তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় এবং স্পর্শকাতর অস্ত্র সংগ্রহ করতে চায়।

ইরানের জনগনের ৭০ ভাগেরই বয়স ৩০ এর নীচে। তার মানে সেদেশের জনগনের অধিকাংশই ইসলামী বিপ্লবের সময় জন্মই নেয়নি। এই তরুণ জনগনের বিপ্লব সম্পর্কে কোন স্বচ্ছ ধারণা নেই। আর তারা এমন একটি অংশ দ্বারা শাসিত হচ্ছে যারা বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। মার্কিনীরা সরাসরি ইরানী সরকারের সংস্কারপন্থী অংশ এবং ছাত্রদের সাথে সম্পৃক্ত এবং তাদেরকে এই ধারণা প্রদান করে যে, আমেরিকার স্বার্থ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে তারা সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।

যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে নিশ্চিত নয়, কিভাবে তারা ইরানের বিরুদ্ধে লক্ষ্য অর্জন করবে- কূটনৈতিকভাবে নাকি সামরিকভাবে? জর্জ বুশ দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে এ ব্যাপারটি বেশ তোলপাড় তুলে এবং ওয়াশিংটন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে।

ইরানের ব্যাপারে সঠিক সমাধান কি হবে এ ব্যাপারে দ্বন্দ্বের মধ্যে আছে বাস্তববাদী (realists) এবং নব্য রক্ষণশীলদের (neoconservatives) মতবাদ। আমেরিকান সরকারের সকল অংশ এবং বিভিন্ন সংস্থা, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগণ এবং সিআইএ যুদ্ধের ব্যাপারে একমত পোষণ করে। কিন্তু মতানৈক্য দেখা দেয় ২০০৪ সালে যখন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড জিবিংনিউ ব্রেজিনস্কির তত্ত্বাবধানে কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স (সি.এফ.আর) সংস্থাটি 'ইরানঃ টাইম ফর অ্যা নিউ এপ্রোচ'-নামক রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ রিপোর্ট দাবী করে যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় সম্পর্কে নব্য রক্ষণশীলদের বর্তমান ধারণা মোটেও সঠিক নয়। রিপোর্টের মতে, "রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি ও অসন্তোষ সত্ত্বেও ইরান আরেকটি বিপ্লবের সম্মুখীন নয়। যারা বর্তমান ব্যবস্থার পুরোধা তারা পুরো পরিস্থিতি এখনও ভালভাবেই নিয়ন্ত্রণ করছে।" রিপোর্টে জোর দিয়ে বলা হয় সকল সমস্যা সমাধানের জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার তুমুল বিতর্ক অবাস্তব; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিউক্লিয়ার শক্তি হবার উচ্চাকাংখা থেকে ইরানকে বিরত রাখার জন্য প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডের নিকটবর্তী নব্য রক্ষণশীলেরা এই রিপোর্টের মতামতকে মুহূর্তের মধ্যে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। নব্য রক্ষণশীল মাইকেল লেডেন, ন্যাশনাল রিভিউ অনলাইন-এ লিখেন যে, তেহরান হল ইসলামিক সন্ত্রাসীদের রাজধানী এবং সি এফ আর সুপারিশকে অপমানজনক ও আপোষকামী বলে উল্লেখ করেন।

বুশের দ্বিতীয়বারের শাসনামলে নব্য রক্ষণশীলদের প্রভাব ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। নব্য রক্ষণশীলদের মধ্যে পল উলফোভিচ, জন বোল্টন প্রমুখ ব্যক্তিদেরকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের নীতি বাস্তবায়নের কাজে নিযুক্ত করা হয়। অন্যদের মধ্যে ডগলাস ফেইথকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। নব্য রক্ষণশীলদের বিদায়ের মাধ্যমে বুশ প্রশাসনে বাস্তববাদীরা (Realists) সুযোগ পায়। পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ব্যাপারগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও পেন্টাগনের ভেতর সামঞ্জস্য বিধান করা হয়। অন্যান্য সহযোগী দেশকে সম্পৃক্ত করে পূর্ববতী মার্কিন প্রশাসন যৌথভাবে সুদান, লেবানন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের ব্যাপারে বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে বাস্তবাদীদের উপস্থিতি ইরানের ব্যাপারে নব্য রক্ষণশীলদের ভূমিকাকে পুরোপুরি স্তদ্ধ করতে পারেনি। নব্য রক্ষণশীলতাবাদের কট্টর সমর্থক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ইরানের তেল ও গ্যাসের উপর মার্কিন আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য সেদেশের উপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে, ইরান এবং মার্কিনীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সত্যিকার অর্থেই রয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেসব দ্বন্দ্বের উর্ধ্বে উঠে গিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। বুশ প্রশাসনের বাস্তবাদীরা এখন এগিয়ে আছে এবং তাদের নীতি হল একক প্রচেষ্টা বা সামরিক হস্তক্ষেপকে আপাত পরিহার করে বহুজাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের সাথে বিতর্কিত নিউক্লিয়ার সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এগিয়ে যাওয়া। তবে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর ব্যাপারে যারা চাপ প্রয়োগ করছিল তাদের দমানোর ব্যাপারে বুশ প্রশাসনের ব্যর্থতা বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবে।