শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১১

ইরান আক্রমণের হুমকি নাকি ইসরাইলের আজাইড়া ফাঁপড়

শুনলাম ইসরাইল নাকি আমেরিকার সাহায্য নিয়ে ইরান আক্রমণ করবে। চিন্তার বিষয়!!!!। যাইহোক আপনাদের অবগতির জন্য সংবাদপত্র হতে সংবাদটির একাংশ নিম্নে দিলামঃ

“ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আগামী দুই মাসের মধ্যে ইসরায়েল হামলা চালাবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্রিটেনের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইল গতকাল বৃহস্পতিবার কয়েকটি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ওপরের মহল ধারণা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে ইসরাইল ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চালাবে।

তবে ইরান বলেছে, তাদের ওপর কোনো হামলা হলে তা সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা বলেন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ডেইলি মেইল জানায়, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে দূরে রাখতে হামলা চালাতে পারে ইসরায়েল। সেই 'সময়ও খুব দ্রুত' আসবে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, 'আমরা মনে করি, বড়দিনের আগেই হয়তো একটা কিছু ঘটে যাবে। আর নয়তো নতুন বছরে (হামলা) হতে পা্রে”।'( দৈনিক কালের কন্ঠ, ১১/১১/১১)

কয়েকদিন পর পর ঘুরেফিরে একই সংবাদ আমরা পাই আর তা হল ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরী করছে। এজন্য মাতব্বর আমেরিকা আর তার জারজ সন্তান ইসরাইলের মাথা খারাপ। তারা এই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করছে ২০০৩ সাল থেকে যখন International Atomic Energy Agency (IAEA) এর প্রধান আল বারাদি ইরান নিয়া একটি রিপোর্ট দেয়।

ইরানকে নিয়ে আমেরিকা কয়েকদিন পর পর উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকে। এমন আচরণ করে যেন খুব শীঘ্রই যুদ্ধ হবে। যদিও ইরান সবসময় বলে আসছে তারা পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করতে চায় কিন্তু আমেরিকা বার বার ইরানকে একটি আতংক হিসাবে তুলে ধরছে এবং এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে। উপসসাগরীয় অঞ্চলে দেশগুলো যেকারণে নিজেদের নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে এবং আমেরিকার সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করছে যা মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করছে।

যাই হোক ইসরাইল ইরান আক্রমণের যে হুমকি দিয়েছে তা পুরোই অমূলক ও অসম্ভব। তার কারণগুলো নিম্নে দেওয়া হলঃ

১। ইরানকে আক্রমণ করতে হলে তা অবশ্যই বিরাট এলাকা জুড়ে আকস্মিকভাবে করতে হবে।

২। আমেরিকা যখন ইরাকে তার সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে , আক্রমণ হলে ইরান সেখানে ভয়ংকর সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ এই অঞ্চলে শিয়া প্রধান দলগুলোর উপর ইরানের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

৩। এই অঞ্চলে আমেরিকা তার ঘাঁটিগুলোকে কখনো ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না কারণ ইরান তার ব্যালাস্টিক মিসাইলের মাধ্যমে ঐ অঞ্চলে আমেরিকার ও ইসরাইলের সকল স্থাপনাগুলোকে অল্প সময়ে ধ্বংস করতে সক্ষম।

৪। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর উপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বেশি। সুতরাং ইরান যদি এই অঞ্চলে সকল জাহাজ চলাচল বা বাণিজ্য বন্ধ করে দেয় তবে তা সরাসরি যুদ্ধের চাইতেও মারাত্বক হবে। কারণ এতে করে পৃথিবীর ৪০% তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধ্বস তৈরী করবে।

৫। এছাড়াও আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে কিছু আঞ্চলিক স্বার্থের বন্ধন রয়েছে। যেমন- ইরাক ও আফগানিস্থান পুনর্গঠনে ইরান আমেরিকাকে সাহায্য করছে।

৬। ভূ-রাজনীতিক দিক থেকে আমরা দেখছি রাশিয়া পুনরায় শক্তি অর্জন করছে। এই অঞ্চলে এমনিতেই রাশিয়ার প্রভাব রয়েছে। এই অঞ্চলে পুরোনো প্রভাব ফিরিয়ে আনার জন্য রাশিয়া অবশ্যই ইরানের সাথে সুসম্পর্ক চায়, ফলে কখনোই আমেরিকার সাথে একমত হবে না। শুধু তাই না আমেরিকা যদি ইরান আক্রমণ করে তবে তা রাশিয়ার জন্য প্রভাব অর্জনের একটি সু্যোগও তৈরি করবে ।

৭। এছাড়াও আমেরিকা যেখানে দীর্ঘ দশ বছরেও আফগানিস্তানে জয়ী হতে পারছে না সেখানে ইরান আক্রমণ করে সে তার সম্মানের ঝুঁকি নিবে কি? অর্থনৈতিক মন্দায় যেখানে ইউরোপের দেশগুলো কাতর তখন নতুন আরেকটা যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা তার আছে কি?

তাই ইসরাইল এই মুহুর্তে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে ইরান আক্রমণ করবে তা সম্ভব না। বরং এই ধরণের হুমকির পেছনে উদ্দেশ্য হল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা। ইরানকে একটি আতংক হিসাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান বিদ্বেষ তৈরি করা ও এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোকে আরো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা।

একটা প্রবাদ শুনেছিলাম, পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তবে। তাই আমি বলব এই হুমকি গুলো হলো আজাইড়া ফাপড়। আমেরিকা আজকে কাগজের বাঘে পরিণত হয়েছে , মৃত্যুর প্রহর গুনা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই।

মঙ্গলবার, ৮ নভেম্বর, ২০১১

আলিম ও যুবক

একদিন এক যুবক এক আলিমের কাছে আসল, এসে বলল- হুযুর আমি তো এক তরুণ যুবক, কিন্তু সমস্যা হল আমার মাঝে প্রবল খায়েশ কাজ করে। আমি যখন রাস্তা দিয়ে চলা ফেরা করি তখন আমি মেয়েদের দিকে না তাকিয়ে পারি না। আমি এখন কি করতে পারি। তখন ঐ আলিম চিন্তা করল, চিন্তা করার পর তাকে একটা দুধ ভর্তি গ্লাস দিল যার পুরোটায় দুধে কানায় কানায় পুর্ণ ছিল এবং তাকে বলল – আমি তোমাকে বাজারের একটি ঠিকানা দিচ্ছি তুমি এই দুধটুকু সোজা সেখানে পৌছিয়ে দিয়ে আসবে। ঐ আলিম তাকে নির্দেশ দিল যে, গ্লাস থেকে এক ফোঁটা দুধও যাতে না পরে, তো যুবকটি বলল – তা কখনো হবে না। অতপর সে তার এক ছাত্রকে তার সহযোগী করে আদেশ দিল, তুমি তার সাথে বাজারে যাও এবং সে যদি যাওয়ার সময় এই গ্লাস থেকে এক ফোঁটা দুধ ফেলে তবে তাকে তুমি চরমভাবে পিটাতে থাকবে। ঐ যুবকটি সহজেই দুধটুকু বাজারে পৌছিয়ে দিল এবং এই সংবাদ হুযুরকে জানানোর জন্য সে দৌড়ে ছুটে আসল। হুযুর জিজ্ঞাসা করল – তুমি যাওয়ার সময় কয়টি মেয়ের চেহারা দেখেছো? যুবকটি সবিস্ময়ে বলল – হুযুর আমি তো বুঝতেই পারি নি আমার চারপাশে কি চলছিল। আমি তো এই ভয়েই তটস্থ ছিলাম যে, আমি যদি দুধ ফেলি রাস্তায় সমবেত মানুষের সামনে আমাকে মার এবং অপমানিত হতে হবে। হুযুর হাসল এবং বলল – মুমিনরা ঠিক এভাবেই আল্লাহকে ভয় করে এবং সে চিন্তা করে যদি সে আল্লাহর উপর বিশ্বাস ঐ দুধের ন্যায় ছিটকে ফেলে তবে তিনি সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কিয়ামত দিবসে সমগ্র সৃষ্টি জগতের সামনে থাকে অপমানিত করবেন। এভাবেই সর্বদাই বিচার দিবসের চিন্তা মুমিনদের গুনাহ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে।

অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ

ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য যারা আপোষহীন সংগ্রামে লিপ্ত ও শত আঘাত সত্ত্বেও যারা সত্য পথে অবিচল সেই সকল অপরিচিতদের অনুপ্রেরণা ও সুসংবাদ জানানোর জন্যই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে।

ইমাম মুসলিম সাহল বিন সাদ আস-সাদির বরাত দিয়ে বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন,

‘’ইসলাম শুরু হয়েছিল অপরিচিতের বেশে, ইসলাম আবার ফিরে আসবে অপরিচিতের বেশে, সুতরাং অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।‘’

জিজ্ঞেস করা হল, ”তারা কারা ইয়া রাসুলূল্লাহ (সঃ)’’,

তিনি বললেন, ’’তারা হচ্ছে ওরা যারা মানুষ খারাপ হয়ে যাবার পরে তাদেরকে সংশোধন করবে।‘’

ইসলাম অপরিচিতের বেশে শুরু হয়েছিল রাসুল (সঃ) এবং তার সাহাবীদের দ্বারা, যারা তাকে বিশ্বাস ও অনুসরণ করেছিলেন। অদ্ভুত ছিল তাদের চিন্তার ধরণ এবং জীবন যাপন, তাই তারা সমাজের চোখে আগন্তুকের মতই ছিল, যাদের করা হত অবজ্ঞা ও ঠাট্টা তামাশা। তারা তাদের পরিবার ও প্রতিবেশিদের কাছেও ছিল আগন্তুকের মত। এই আগন্তুকদের উপর সমাজ সব ধরণের নির্মম অত্যাচার করেছিল যেখানে কদাচিৎই কেউ তাদের রক্ষা করত। তারা বহু বছর পাহাড়ে নির্বাসিত ছিলেন, যখন কেউ তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলনা, কেউ তাদের সাথে কেনাবেচাও করত না, যে কারণে শেষ পর্যন্ত তারা গাছের পাতা খেতে বাধ্য হয়েছিল।

ইসলাম অপরিচিতের বেশে শুরু হয়েছিল এমনই প্রজ্জলিত নক্ষত্রদের দ্বারা, যারা ছিল স্বীয় আত্মার আলোকে উদ্ভাসিত, পৃথিবীর মানুষের সকল দূর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাড়াঁনোর মানসিকতার কারণে তারা ছিল অপরিচিত। ইসলাম অপরিচিতের মত শুরু হয়েছিল সেইসব অগ্রপথিকদের দ্বারা, যারা তাদের মহা পরাক্রমশালী প্রভুর ইবাদাত ছাড়া আর কারো ইবাদাত করতে জানত না। ইসলামের শুরু হয়েছিল এইসব মহান ব্যাক্তিত্বের মাধ্যমে, আর মহান আল্লাহ্ তাআলার সাহায্যের দ্বারা শেষ হয়েছিল এক কষ্টকর দীর্ঘ যাত্রার, যতক্ষণ না সারা পৃথিবী তাদের আলোকে আলোকিত হয়েছিলো, আর সব ধরনের অত্যাচার আর বিপথগামিতা মানুষের মন থেকে মুছে গিয়েছিলো।
  
এইসব অগ্রপথিকদের ধৈর্যশীলতার ফসল ছিল এমন একটা রাষ্ট্র, যা আল্লাহর কিতাব ও তার রাসুলের সুন্নাহ দিয়ে শাসিত হয়েছিল, এবং এই অন্ধকার ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেছিল ন্যায়বিচার, ঋজুতা ও সঠিক পথ।

ইসলামের শুরু হয়েছিল এইসব বিশুদ্ধ অগ্রপথিকদের দ্বারা এবং এখন আবার ফিরে আসবে। এটা শুরু হয়েছিল কেয়ামতের আগ পর্যন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, রাসুল (সঃ) এর.সাহাবীদের দ্বারা। আর আজ এটা ফিরে আসছে রাসুল (সঃ) এর প্রিয় উম্মাত এর মাধ্যমে, যারা সত্য থেকে একচুলও বিচ্চ্যুত হয়নি, যাদের অন্তরের গভীরে প্রোথিত রয়েছে ঈমান, এবং চিন্তায়-মননে রয়েছে দৃঢ় প্রত্যয়।

এইসব নতুন নক্ষত্র থেকে একটা উজ্জ্বল আলো পৌঁছে যাচ্ছে এমন এক ভূমিতে যেখানে অত্যাচারী ও হীন লোকেরা নেতৃত্ব লাভ করেছে। যেখানে অবিশ্বাসীরা ইতোমধ্যে সীমালঙ্ঘন করে ফেলেছে এবং মানুষকে ইসলামের দাওয়াত বহনকারীদের প্রতি ভ্রু কুচঁকাতে বাধ্য করেছে। এখানে ওইসব প্রজ্বলিত নক্ষত্ররা হচ্ছে আগন্তুকের মত, যারা তাদের সাহায্যকারী হিসেবে কাউকে পাচ্ছে না, যখন কারিমভের অত্যাচারী অনুসারীরা এই আগুন্তকদেরকে জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থানে রেখেছে। তো কিভাবে বিশ্বাসীরা এই তিক্ত বাস্তবতার মোকাবেলা করছে? তারা কি তাদের তাদের ফিকরাহ (ধারণা) এবং তরিকাহ (পদ্ধতিতে) অটল আছে? নাকি তারা প্রতারণায় পতিত হয়েছে নাকি তাদের অন্তর অত্যাচারীদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে?

এইসব বীরপুরুষেরা অত্যাচার, বর্বরতা ও দুর্ভোগ এর ব্যাপকতা ও তীব্রতা থাকার পরেও সকল শয়তানী প্রচারণা বিরুদ্ধে মোকাবেলা করেছে অসীম সাহসিকতা ও কষ্টসহিষ্ণু শরীর দিয়ে ।

শীতের তীব্রতা থাকা সত্ত্বেও তারা অযু করেছে বরফ শীতল পানি দিয়ে। তাদের উপর কর্তৃপক্ষের নির্যাতন আরোপ হতে পরে জেনেও তারা জুমুআর নামায আদায় করে। তাদের উপর বিশেষ নজরদারি এবং নির্যাতন বা মৃত্যুর হুমকি থাকার পরেও তারা কারাগারের প্রকোষ্ঠে দাওয়াহ করে যাচ্ছে। তারা এমনকি জেল কর্মকর্তাদের লেখা একটা ছোট্ট কাগজে স্বাক্ষর করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যেখানে দাওয়াহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার শর্ত রয়েছে, যদিও তা তাদের মুক্তি এবং আরামদায়ক জীবনের নিশ্চয়তা দিবে। তারা সেটা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যদিও বা তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে নিজেদের জীবনের এক যুগ বা তারও বেশি পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় কাটিয়েছে।

তাদের মধ্যকার সেইসব শহীদেরা, যাদের সংখ্যা কমপক্ষে দুইশ ছাড়িয়ে গেছে, যারা নির্মম অত্যাচারে মারা গেছে। তাদের কারো কারো নাম আমরা জানি আবার অনেকেরই জানিনা । সেসব শহীদদের জন্য কোন সমাধি নির্মিত হয়নি, হাজার হাজার লোকের অংশগ্রহনের মাধ্যমে কোন শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়নি। তাদের অধিকাংশ কে রাতের অন্ধকারে কবর দেয়া হয়েছে, যেভাবে রাতের অন্ধকারে কারাকক্ষে তাদের হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই রাতের অন্ধকারেই তাদের হত্যার খবরকে চাপা দেয়া হয়েছে । গুটিকয়েক মানুষ যারা সাহস করে তাদের শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিল, কোন সন্দেহ নেই ওরা ছিল তাদের সবচেয়ে নিকট আত্মীয়দের কয়েকজন।

তারা যেভাবে মারা গিয়েছিলো, যেভাবে তাদের মৃতদেহ শেষকৃত্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এবং যেভাবে তাদের কবরে নামানো হয়েছিল তা দেখে মনে হয় তারা ছিল অপরিচিত আগন্তুক।

বাস্তবিকভাবেই, ওরা মানুষের কাছে আগন্তুকের মত, কিন্তু তারা নক্ষত্র ও প্রজ্জলিত আলোকের মত যারা তাদের ঈমান ও ত্যাগ সম্পর্কে অবহিত, যারা তাদের উপর কারাগারের দমন-নিপীড়ন, বিধিনিষেধ সম্পর্কে অবগত, যারা অবগত সত্য পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার কারণে তাদের উপর নির্যাতনের তীব্রতার ব্যাপারে, যা তাদেরকে শাহাদাতের দিকে ঠেলে দিবে।

তারা তাদের প্রভু, এই পৃথিবী ও বেহেশতের সৃষ্টিকর্তার দ্বারা বিশুদ্বভাবে নির্বাচিত। পবিত্র ফেরেশতারা বেহেশতে তাদের জানাজায় অংশগ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ । এমনকি পৃথিবীতেও, যদি কেউ তাদের জানাজায় না আসে, ফেরেশতারা তাদের কাছে অগ্রসর, উচ্চস্বরে আল্লাহর প্রশংসা করবে যা আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ শুনতে পারবে না। তারপর তারা এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাড়াবে যেভাবে এর আগে কোন মানুষ বা জীন দাড়ায় নি। যখন এটা শেষ হবে, তাদের আত্মা কে বেহেশতে বহন করে নিয়ে আসা হবে। প্রত্যেক বেহেশতে ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করবেন, কারা এই সৌভাগ্যবানরা, যাদের সুগন্ধে বেহেশত পূর্ণ হয়ে গিয়েছে? ’’বহনকারী ফেরেশতারা উত্তর দিবেন, তারাই হচ্ছে সেই আগন্তুকরা! দুঃশাসনের সময় মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসা আগন্তুকরা। সেই আগন্তুকরা যারা সকল অন্যায় ও বিচ্যুতির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল। সেই আগন্তুকরা যারা নিজেরা ঠিক হয়ে তারপর মানুষকে ঠিক করার জন্য কাজ করেছিল, তাই তারা ওইসব লোকেদের হাতে অত্যাচারিত হয়েছিল যারা পাপ কে বৈধতা দিয়েছিল এবং যারা অবিশ্বাস, প্রতারণা ও শয়তানের পথকে অনুসরণ করত।

বেহেশতের ফেরেশতারা সমস্বরে বলবেন,”সুসংবাদ! তাদের জন্য সুসংবাদ”। তারপর তারাও এই সম্মানিত প্রতিনিধি দলের সাথে একত্রিত হবেন, পরবর্তী বেহেশত পর্যন্ত সঙ্গদান করবেন। এভাবে প্রতিটি বেহেশত থেকে ফেরেশতারা তাদের সঙ্গ দিবেন যতক্ষণ না তারা একটা বিশেষ স্থানে পৌঁছুবে, যার মত অন্য কোন স্থান নেই, আর তা হল আরশের ছায়া। সেখানে প্রভু তাদেরকে বলবেন, ”তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত, সুসংবাদ তোমাদের জন্য এবং এই জায়গা ফিরে আসার জন্য কতই না চমৎকার!!” তিনি বেহেশতের ফেরেশতাদের আদেশ করবেন যেন বেহেশতের সর্বোচ্চ স্তরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের পূর্বে আসা নবীরা , শহীদরা এবং সত্যপন্থিরা আছে।

তাদের এই মহত্বের স্মৃতিচারণ এই দুনিয়াই কখনোই থামবে না। তাদের রক্ত এবং তাদের ছবি একটা দাওয়াহ হয়ে এমন অনেক স্থানে পৌঁছাবে যেখানে তারা নিজেরাও পৌঁছাতে পারত না। তারাই উত্তম, সত্যবাদী এবং প্রকৃত ধর্মভীরু। মানুষ তাদেরকে তাদের সত্যবাদিতা, সততা এবং ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমেই চিনবে।

হ্যাঁ, এই বিশুদ্ধ ও প্রকৃত ধার্মিক লোকেরা মানুষের কাছে একটা দাওয়াহ হয়েই থাকবে, যদিওবা তারা থাকবে এই পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দুরে। তাদের রক্তাক্ত মৃতদেহ জেলের ভিতরের ও বাইরের ভাইদের মনে মর্মস্পর্সী ছবি হয়ে থাকবে। যেন তাদের রক্ত জীবন্ত হয়ে বলবে,

 “বিশ্বাসীদের মধ্যে এমন মানুষ ও ছিল যারা আল্লাহর কাছে তাদের কৃত ওয়াদার ব্যাপারে সত্যবাদী ছিল। তাদের অনেকেই তাদের ওয়াদা পূর্ণ করেছে, অনেকে অপেক্ষা করছে (পূর্ণ করার জন্য), কিন্তু তারা কোন বিচ্যুতির দ্বারা বিচ্যুত হয় নি’’-সুরা আহযাবঃ২৩

হে নক্ষত্ররা, তোমরা এই পবিত্র সত্য দাওয়াহর সত্যিকারের পথপ্রদর্শনকারী। তোমরাই হচ্ছো আদর্শ এবং শক্তি, যদিও বা তোমরা কারাগারে বন্দী। তোমাদের ভাইরা তোমাদের দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকায়, কারণ প্রকৃতপক্ষে ধৈর্যের সাথেই বিজয় আসে, এবং কষ্টের পরেই আছে স্বস্তি, কষ্টের পরেই আছে স্বস্তি।

তোমরা হচ্ছ রাসুল (সঃ) এর সাহাবাদের অনুসারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং তাদের পর যারা এই দাওয়াহটাকে বহন করেছে তাদের মধ্য অন্যত্র। তোমরা হচ্ছ শায়খ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানির শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি, যিনি নির্যাতনের সময় ধৈর্যধারণ করেছিলেন, যদিও তা তাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যায়, কিন্তু এমন একটা শব্দও বলেননি যা দাওয়াহ বা কোন দাওয়াহ বহনকারীকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারত। তিনি এইভাবেই পড়ে ছিলেন যতক্ষণ না তার হাত নির্যাতনের তীব্রতায় অবশ হয়ে গিয়েছিল এবং শুধু এইটুকুই বলেন, ”আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ, চিকিৎসার জন্য প্রতিষেধক খুঁজছি।“, যার অর্থ উম্মাহ সুস্থতার জন্য প্রতিষেধক খুঁজছেন।

তোমরা হচ্ছ শায়খ তাকির শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি, যিনি ছিলেন আগন্তুকের মত, মারাও গিয়েছিলেন আগন্তুকের মত। মানুষ তার মারা যাবার পূর্বে তার নামও উল্লেখ করেনি, যদিও তিনি ছিলেন ঐ সময়ের পুনর্জাগরনকারী, যাদের আল্লাহ প্রতি শত বছরে পাঠান। তোমরা হচ্ছ তার উত্তরসূরি এবং ছাত্র শায়খ আব্দুল কাদিম যাল্লুম এর শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি ,যিনি একই পথে চলেছিলেন। নির্যাতনের ব্যাপকতা, তীব্রতা ও দৈর্ঘ্যের পরেও যিনি জেলজুলুম দ্বারা বিরত হননি। তিনি বেঁচেছিলেন আগন্তুকের মত, মারাও গিয়েছিলেন আগন্তুকের মত, এমনভাবে যে তার সাহায্যকারী ও অনুসারীরা তাকে চিনত ও না।

তোমরা হচ্ছ তারও শ্রেষ্ঠ সাথী যিনি তাদের পর এসেছেন এবং তাদের সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পতাকা বহন করে যাবেন। আবু ইয়াসীন বেঁচে আছেন আগন্তুকের মত, একাধিক দেশে উদ্বাস্তুর মত। তিনি বছরের পর বছর অত্যাচারী কারাগারে কাটিয়েছেন। তিনি তার স্ত্রী কে তার থেকে দূরে থাকতেই হারিয়েছেন, কিছুই জানতেন না একমাত্র কোথায় তাকে (তার স্ত্রী) দাফন করা হয়েছে এটা ছাড়া। তিনি একটা তারার মতই প্রজ্বলিত, তাকে তার পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য একাধিক দেশের অত্যাচারীর প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও।

তোমরা, হে আগন্তুকরা, হে বুখারি, তিরমিযি, আন-নায়সাবুরি ও আশ-সাজাস্তানির বংশধররা, হে পথনির্দেশকারীরা, তোমরা সেই আগন্তুক যারা প্রথমে নিজেদের সংশোধন করছো, তারপর সংশোধন করবে পৃথিবীবাসীকে, আল্লাহর ইচ্ছাই ঠিক যেভাবে তোমাদের পূর্বসূরি রাসুলের (সঃ) সাহাবারা করেছিলেন। তোমরা পৃথিবীপৃষ্ঠকে সংশোধন করবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা তোমাদের ভাইদের সাথে, যারা অপেক্ষা করছে আল্লাহর সাহায্য, সহায়তা এবং তার আরম্ভের জন্য।   

ইনশাআল্লাহ এমন এক দিন আসবে, যখন মহান আল্লাহর সর্বোচ্চ ইচ্ছায়, তোমরা ওই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বের হয়ে আসবে এবং তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমরা মাথা উঁচু করে দাড়াবে কুরআনের পতাকাতলে, ইসলামি রাষ্ট্রের ছায়ায় যা পৃথিবীর প্রতিটি কোণা থেকে ‘’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ,মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ(সঃ)’’ এর পতাকা উড্ডয়ন করবে।

পরিশেষে আমি বলব,” আমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে দুয়া করি যেন তার সাহায্য ও সহায়তা বৃদ্ধি পায়, তোমাদের বের করে আনেন এবং তোমাদের বিষয়াদিগুলো সহজ করে দেন। আল্লাহ বলেন,

‘’এবং যারা আল্লাহ কে ভয় করে, আল্লাহ তাদের জন্য তাদের বিষয়াদি সহজ করে দিবেন।‘’-আত তালাকঃ৪

‘’ এবং যারা আল্লাহ কে ভয় করে,আল্লাহ তাদের মুক্তির একটা পথ করে দেবেন।‘’-আত তালাকঃ২

আমাদের সর্বশেষ দুয়া, আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।