বুধবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১২

খিলাফত শাসন ব্যবস্থার স্বরূপ ও রূপরেখাঃ দারিদ্র দূরীকরণ, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও গণমানুষের অধিকার রক্ষা

একমাত্র খিলাফত শাসন ব্যবস্থারই পারে দারিদ্র দূরীকরণ, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও গণমানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে।

ভূমিকাঃ

বাংলাদেশের সরলপ্রাণ কঠোর পরিশ্রমী জনসাধারণ দারিদ্র বিমোচনের নামে অনেক প্রতিজ্ঞা আর প্রকল্পের ছড়াছড়ি দেখেছে; কিন্তু তার সাথে সাথে দিন দিন তাদের অবস্থার ক্রমাবনতি আর অধঃপতন ছাড়া কিছুই প্রত্যক্ষ করেনি। বছরের পর বছর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মত সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের এসএপি, পিআরএসপি ইত্যাদি নানা রকম প্রকল্পের নামে ছল-চাতুরী আর প্রতারণার আড়ালে বাংলার জনসাধারণের উপর সীমাহীন ঋনের বোঝা চেপেছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের জনগণের উপর সাম্রাজ্রবাদী রাষ্ট্রসমূহের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ সুসংহত হয়েছে।

দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত জাতির সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। তাদের পেট আর পকেট ফুলে ফেঁপে উঠেছে। অথচ জনসাধারনের ভাগ্যের ক্রমাবনতি ছাড়া ন্যূনতম কোন পরিবর্তন সাধিত হয়নি। যখন পরিশ্রমী কৃষক ন্যূনতম সার আর বীজ ক্রয় করে কোন রকম টিকে থাকার সংগ্রামে বার বার পরাজিত হচ্ছে, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট দালাল চক্র, মজুতদার আর ফড়িয়াবাজরা কৃষকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে। জিডিপি বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উচু উচু বিল্ডিং আর বিলাসবহুল এপার্টম্যান্ট। বিদেশী প্রসাধনী পণ্য আর কোমল পানীয়ের বন্যায় বাজার ছেয়ে গেছে। অথচ বেকারত্বের মাত্রা এমন একটি জায়গায় এসেছে যেখানে অনেক উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবক রিক্সা চালাতে কিংবা হোটেল রেস্তোরার বয় বেয়ারা হতে বাধ্য হচ্ছে। একই সময়ে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। 

এমন এক পরিস্থিতিতে স্বভাবতই কতগুলো প্রশ্ন আমাদের বুদ্ধি ও অস্তিত্বকে অসাড় করে দিতে চায়; এই চরম দারিদ্রের কোন সমাধান কি আদৌ নেই? আমাদের নেতৃত্ব জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদেরকে এই দুর্দশা থেকে বের করে আনতে কতটুকু দায়বদ্ধ? নাকি তারা শুধুই তাদের পেট পকেট আর শান শওকতের চিন্তায় বিভোর?

আজ আমাদের সমাজের চিন্তাশীল মানুষদের এসব সমস্যা আর প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এর সমাধান খুঁজে বের করার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে জাতি আমাদের আন্তরিকতা আর দায়বদ্ধতা প্রত্যাশা করে। আর একমাত্র ইসলামের পক্ষেই এই সমস্যার সমাধান দেওয়া সম্ভব। কারণ ইসলাম মানুষের সমস্যা ও প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবগত। সুতরাং ইসলাম কিভাবে সমাজ থেকে দারিদ্র দূর করবে সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

২. দারিদ্রের বর্তমান চিত্র এবং দারিদ্র দূরীকরণের জন্য গৃহীত নীতি ও কার্যক্রম সমূহ

দেশের ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে শতকরা ৪২ ভাগেরও বেশী মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। উপরন্ত জনসংখ্যার শতকরা ৩৬ ভাগ মানুষ চরম দারিদ্রের শিকার।

২.১ দারিদ্রের মাত্রা নিরূপনের বিভিন্ন পদ্ধতি

দারিদ্রের সংজ্ঞা নিরূপণের অনেকগুলো পদ্ধতি আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। সংজ্ঞার পরিবর্তনের সাথে সাথে দারিদ্রের শতকরা হার এবং সংখ্যার তারতম্য হয় বটে কিন্তু বাস্তব অবস্থার সত্যিকার কোন পরিবর্তন হয় না। দারিদ্র নিরূপনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো গৃহস্থালীর ব্যয়ের (Household Expenditure Survey) উপর জরিপ পরিচালনা করে থাকে। এই জরিপে ১৯৯১/৯২ সাল পর্যন্ত সরাসরি ক্যালরি গ্রহণের (Direct Calorie Intake) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতির প্রধান সমস্যা হলো, এখানে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি কি পরিমাণ পুষ্টিমাণ গ্রহণ করে থাকে, সেটার উপর ভিত্তি করে দারিদ্র নিরূপণ করা হয়। কিন্তু মানুষের জন্য জীবনধারণের অন্যান্য উপকরণ, যেমনঃ বসবাসের ঘর, পরিধানের কাপড়, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় আনা হয় না। এই পদ্ধতিতে মানুষ আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। পশুদের জীবনধারণের জন্য যেমন খাদ্যগ্রহণটাই মুখ্য, মানুষেরও কি তাই?

১৯৯৫-৯৬ এবং ২০০০ সালের গৃহস্থালীর ব্যয় নির্বাহ নামক জরিপে দারিদ্র নিরূপণের পদ্ধতিতে গুণগত কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এ সমীক্ষাগুলোতে মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয়পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে সীমিত আকারে হলেও মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয়কে দারিদ্রের মাত্রা নিরূপণে বিবেচনায় আনা হয়। পদ্ধতিগত এই পরিবর্তনের পরও আমাদের সরকারগুলো দারিদ্রের মাত্রা কমিয়ে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে শিক্ষাবঞ্চিত, ভূমিহীন এবং কৃষকরাই মূলত এদেশে দারিদ্রের শিকার। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এদেশের সিংহভাগ মানুষই ভূমিহীন এবং কৃষক।

২.২ দারিদ্র দূরীকরণের জন্য গৃহীত নীতি ও কার্যক্রম সমূহ

বিগত ৩৫ বছর ধরে সব কটা সরকার দারিদ্র বিমোচনের জন্য একের পর এক কর্মসূচী ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) সমাজের সকল স্তরের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার নামে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনের উপর জোর দেয়া হয়। কিন্তু যুদ্ধোত্তর অর্থনীতি পূণর্গঠনের চাপে সরকার তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করতেই ব্যর্থ হয়। এরপরই আসে দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৮-৮০)। এই দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারকে আসলে দিশেহারা অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও উন্নয়নের দিকনিদের্শনা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সম্পদের স্বল্পতার দরু সরকারকে চলমান কার্যক্রমগুলো কাটছাঁট করতে হয়। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৮০-৮৫) সরকার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়ে জোর দেয়ার কথা বলে। বস্তুত এ সময় সরকার তার অর্থনীতিকে বাজারমুখী করতে শুরু করে এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে সামাজিক বাধাগুলো অপসারণ করাকে তার প্রধান কাজ হিসেবে গণ্য করে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো একই ধারা বজায় রেখে চলে। প্রতিটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে দারিদ্র বিমোচনের নামে কিছু নতুন প্রকল্প ও কিছু নতুন চমক উপস্থাপন করা হয়। কোন কোন সরকারের পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যখাত এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি গুরুত্ব পায়। আবার দেখা যায় অন্য সরকার মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতের উপর জোর দিচ্ছে। আর এসবের পাশাপাশি বার্ধক্য ভাতার মতো চমকতো আছেই। স্বাধীনতার পর থেকে সবকটি সরকার তাদের গৃহীত পরিকল্পনার মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে বিরাট সাফল্য আশা করেছিল। কিন্তু আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সার্বিক অবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি।

দারিদ্র বিমোচনে সরকারগুলোর সীমাহীন ব্যর্থতা ঢাকতে সাম্প্রতিককালে নতুন নামে নতুন আঙ্গিকে কিছু পরিকল্পনার কথা অলোচিত হচ্ছে। এ সকল বাহারী নামের পরিকল্পনায় দারিদ্র বিমোচনে শিক্ষা, আর্থসামাজিক অবস্থা, সুশাসন এবং অবকাঠামোর উন্নয়নের মত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়।

পরিশেষে একথা নির্দ্বীধায় বলা যায় যে পরিকল্পনা অনেক, কিন্তু ফলাফল শূণ্য। সার্বিক বিচারে দেখা যাচ্ছে দারিদ্র বিমোচনের কৌশল নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশ একটি আদর্শ গবেষণা ক্ষেত্র। জনগণ অনেক পরিকল্পনা আর প্রকল্প দেখেছে, কিন্তু নিজেদের অবস্থার উন্নতির কোন সম্ভাবনা তারা দেখতে পায়নি।

৩. বর্তমান নীতিসমূহের সমালোচনা

সরকার কাগজে-কলমে দারিদ্র বিমোচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা ও প্রকল্প প্রণয়ন করলেও বাস্তবে সরকারী অর্থ বরাদ্ধ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র বিবেচনায় আনলে দারিদ্র বিমোচন তাদের কাছে যে একটি উপেক্ষিত বিষয় তা পরিষ্কার ধরা পড়ে।

বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো বিচার করলে দেখা যায় যে এ সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সত্যিকার কোন কার্যক্রম বা প্রকল্প সরকার হাতে নেয়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে স্বাস্থ্য, কৃষি, সমাজসেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনভাবে এমন সব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে যাতে দারিদ্র বিমোচনের বিষয়টি সত্যিকার অর্থে বিবেচনায় আসেনি। দ্বিতীয় ও তৃতীয়-পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পর্যালোচনার ফলাফলে দেখা গেছে যে দারিদ্র বিমোচনে যে পরিমান অর্থ বরাদ্ধ ছিল, সত্যিকার ব্যয় হয়েছিল তার থেকে অনেকগুণ কম। দারিদ্র বিমোচনের অনেক গালভরা বুলি সরকার শুনিয়ে থাকে এবং সরকারী পরিকল্পনায় এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জোর দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দারিদ্র বিমোচনে সরকারী বরাদ্ধ কখনই দেশের জিডিপির ১৪% এর বেশী হয়নি।

৩.১ বর্তমান ব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি

মৌলিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতির পথ অনুসরন করে, যা জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে পরিচালিত। এই পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিচারে যারা বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না, তাদের টিকে থাকার কোন অধিকার নেই। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে প্রচলিত অসম প্রতিযোগিতায় যখন সিংহভাগ জনগোষ্ঠী টিকতে পারছেনা, তখন কি দেশের মানুষগুলোকে মেরে ফেলা হবে? সরকার সুকৌশলে এই প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গিয়ে ধোঁকাবাজীর মাধ্যমে জনগণকে বুঝাতে চায় তাদের গৃহীত প্রকল্প ও পরিকল্পনাগুলোর ফলে দেশের দারিদ্র দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর নির্দেশনায় গৃহীত এ সকল পরিকল্পনাগুলোর সফলতার বিষয়ে তারা নিজেরাই নিশ্চিত নয়। সুতরাং তারা এখন দারিদ্র বিমোচনের বদলে নতুন টার্ম দারিদ্র হ্রাসব্যবহার করা শুরু করেছে। অর্থাৎ তাদের নতুন নির্ধারিত লক্ষ্য দারিদ্র দূর করা নয়, দারিদ্র কমানো। এখানেই শেষ নয়, এর থেকেও ভয়াবহ বিষয় হচেছ দারিদ্র হ্রাসের গতি। তাদের মতে ক্ষেত্রবিশেষে দারিদ্র হ্রাসে ১০০ বছরেরও বেশী সময় লাগতে পারে। তাও যদি এই সময়ে সার্বিক অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ বড় কোন পরিবর্তন এ সময়কে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

৩.২ কিছুসংখ্যক লোকের মাঝে সম্পদ পুঞ্জীভুত হওয়া

প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষকে সুনির্দিষ্ট মৌলিক চাহিদা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না; শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির সূচকের (জিডিপি) মাপকাঠি দিয়ে বিচার করা হয়। বর্তমান অর্থনীতির এই মানদন্ডে অতি সহজেই গণমানুষের মৌলিক অধিকারকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির জটিল মারপ্যাঁচে লুকিয়ে ফেলা যায়। জনগণকে বুঝনো হয় জিডিপি বাড়লেই জনগণের অবস্থার উন্নতি ঘটবে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জিডিপি, জিএনপি (GNP), জিডিপি পার ক্যাপিটা, জিএনপি পার ক্যাপিটা ইত্যাদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিমাপের উপায় হিসাবে গ্রহণ করে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঠিক রেখে সন্তেুাষজনক জিডিপি পার ক্যাপিটা (মাথাপিছু আভ্যন্তরীণ আয়), জিএনপি পার ক্যাপিটা (মাথাপিছু জাতীয় আয়) অর্জন করা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র সন্তুষ্ট থাকে। আমাদের দেশের পুঁজিবাদের অনুসারী অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই হিসাব ও চিত্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে জিডিপি পার ক্যাপিটার নামে অধিকাংশ জনগণের হাতে এর কোন সুফল না পৌঁছিয়ে আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা ও ব্যবসাক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণকারী কিছু অতিরিক্ত ধনী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে এই পুরো প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত থাকে।

তাছাড়া দারিদ্র দূরীকরণের জন্য সাম্প্রতিক পিআরএসপি এবং মিলেনিয়াম ডেভলাপমেন্ট গোলের নামে প্রকল্পিত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক প্রেক্ষিত ইত্যাদিকে নুতন করে পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। এগুলো পুঁজিবাদীদের গোপন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের এমন কতগুলো পরিকল্পনা যার মাধ্যমে তারা আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত তাদের বাজার স¤প্রসারণ করাসহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো গঠনের প্রকল্পসমূহ বেসরকারী খাতে হস্তান্তরের মাধ্যমে গুটিকয়েক সুবিধাভোগী পুঁজিপতির হাতে পুরো ব্যবস্থাটির নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এটি কিছুতেই দারিদ্র সমস্যার সমাধান করবে না।

মৌলিকভাবে সম্পদ উৎপাদনকারী কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তির হাতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সমস্ত সুফল কেন্দ্রীভূত হয়। পুঁজিবাদ সম্পদের বন্টন ব্যবস্থার উপর কোন গুরুত্ব না দিয়ে বরং একে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ এবং চুঁইয়ে পড়া নীতির উপর ছেড়ে দেয়। সারা বিশ্বে এর বাস্তবতা পরিলক্ষিত - যেখানে মাত্র তিনশটি বহুজাতিকের হাতে বিশ্বের ২৫% সম্পদ পুঞ্জীভূত। পৃথিবীর বৃহৎ কিছু বহুজাতিক কোম্পানির বার্ষিক আয় আমাদের বাংলাদেশের মত অনেক দরিদ্র দেশের বার্ষিক জিডিপির তুলনায় বেশী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতিই গুটিকয়েক ব্যক্তি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশে এমন একটি সামাজিক বৈষম্য তৈরী হয়েছে যেখানে কাউকে কোটি টাকা দামের বারতম গাড়িটি কিনতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হয় না। অথচ অনেকের পক্ষে রিকশা ভাড়া যোগাড় করাই দুঃসাধ্য।

৩.৩ বেকারত্ব

বেকারত্ব পুঁজিবাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি আমরা একটু গভীরভাবে বাংলাদেশের বাস্তবতা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব শুধুমাত্র ধনীরাই নতুন প্রকল্পের জন্য সব রকম অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পায়, যার ফলশ্রুতিতে আরো বেশী বেকারত্ব তৈরী হচেছ। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মত প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পগুলো বৃহৎ শিল্প মালিকদের অধিক মুনাফালোভী প্রবণতা ও অমানবিক প্রতিযোগিতার কাছে না টিকতে পেরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ বৃহৎ শিল্পগুলো জিডিপিতে বেশী অবদান রাখার কারণে রাষ্ট্র সেগুলোকেই সবসময় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশী সুযোগ সুবিধা দেয়।

৩.৪ মানুষের তৈরী নিয়ম-কানুনের প্রতারণা

মানবরচিত পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভ্রান্ত চিন্তা শুধু নীতিগতভাবে ব্যর্থ তাই নয়, প্রায়োগিক দিক থেকেও এর ব্যর্থতা সীমাহীন। যার ফলে শোষণ এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার লাভ করে আর দুর্নীতিগ্রস্থ সমাজব্যবস্থা দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরো স্পষ্ট যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি দুর্নীতি আরো বৃদ্ধি করেছে। মানুষ যেখানে জনসাধারনের ভাগ্য নির্ধারণ করে, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে এটি খুবই স্বাভাবিক। যে মানুষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রবৃত্তি প্রবল, সেই মানুষই যখন আইন বানানোর ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তখন সে অবশ্যই তার সুবিধা আদায় করে নিবে। তারা তাদের ক্ষমতাকে আরো বিস্তৃত করে আরো ধনী হবার জন্য। তারা আইনকে নিজের পক্ষে আনার জন্য তাদের অর্থ ব্যয় করে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। যার ফলশ্রুতিতে জনসাধারনের উপর গুটিকয়েক মানুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩.৫ ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থা ও এনজিওদের ভূমিকা

জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি ব্যয় হয় নির্বাচনে নয়তো দুর্নীতিতে। আর অসহায়, অভুক্ত জনগণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। দেশে রমরমা এনজিও ব্যবসা এবং ক্ষুদ্রঋণের অভাবণীয় সাফল্য দরিদ্র জনগণের দারিদ্র নিয়ে আরেকটি নিষ্ঠুর অধ্যায়। দরিদ্র জনগণের উপর অবলীলায় চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে মোটা অংকের সুদের বোঝা। দারিদ্রকে পুঁজি করে এই অভাবনীয় ব্যবসা মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা।

আমাদের সমাজের চিন্তাশীলদের এই বাস্তবতায় দারিদ্র দূরীকরণে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। তাদেরকে একইসাথে ইসলামিক সমাধান নিয়ে আন্তরিকভাবে চিন্তা করা উচিত। খিলাফত রাষ্ট্রে ইসলামিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিম্মোক্ত খসড়া মূলনীতিসমূহ গ্রহণ করতে পারে।

৪. দারিদ্র বিমোচনে ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে খসড়া ইসলামী নীতি

মানবজাতির সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) কর্তৃক প্রদত্ত ব্যবস্থার নাম ইসলাম। মানুষের সকল সমস্যার মূল কারণ, স্বরূপ ও সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) সম্যক অবগত।

৪.১ স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেকের প্রয়োজন ও চাহিদার স্বীকৃতি

ইসলাম সমাজের সকল জনগণকে সমষ্টি হিসাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে। ইসলাম প্রথমেই তাকে মানুষ হিসাবে দেখে ও তার মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দেয়। অতঃপর ইসলাম তাকে এমন বিশেষ ব্যক্তি হিসাবে দেখে যার সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক চাহিদা পূরণের যোগ্যতা আছে । স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করা ইসলামিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকাকে নিশ্চিত না করে সবাইকে সমাজ থেকে যেনতেন ভাবে তা অর্জন করার জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয় না। বরং ইসলাম প্রথমে প্রত্যেককে মৌলিক চাহিদা সম্পন্ন মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করে; অতঃপর তার সামর্থ্যের মধ্যে জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের জন্য পরিবেশ তৈরী করে। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য খিলাফত রাষ্ট্র খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান - এই তিনটি মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করে।

রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

আদম সন্তানের এর বেশী চাওয়ার কিছু নাই - একটা ঘর, যেখানে সে বসবাস করে; এক টুকরো কাপড়, যা দিয়ে সে লজ্জা নিবারণ করে এবং এক টুকরো রুটি ও কিছু পানি, যা দিয়ে সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মিটায়।

সুতরাং দারিদ্র বিমোচন খিলাফত রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তির মৌলিক চাহিদাই পূরণ করে না বরং সমাজে মানুষের মর্যাদাকে আরো উচ্চে তুলে ধরে।

৪.২ জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে খলিফার বাধ্যবাধকতা

আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) খিলাফত রাষ্ট্রের উপর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তাকে ফরজ বা বাধ্য করে দিয়েছেন। রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবে।

আনাস (রাঃ) থেকে আল্ বাজ্জার বর্ণনা করেন যে রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ

"যে ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত জেনেও ভরপেটে ঘুমাতে যায়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।

উপরোক্ত হাদীস থেকে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারে যে খিলাফত রাষ্ট্র কত সহজে এই সমস্যা সমাধানে সক্ষম। এমন একটি দায়িত্বশীল মানসিকতা খলিফাকে পরিপূর্ণভাবে এই বিষয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়ে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সামর্থকে জরুরী ভিত্তিতে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে নিয়োজিত করাবে। যেহেতু খিলাফত রাষ্ট্র মুসলমানদের মৌলিক আকীদার উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই জনগণ সর্বান্তকরণে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে। ফলশ্রুতিতে ঐক্যবদ্ধ উদ্দেশ্য নিয়ে এমন একটি স্বতঃস্ফুর্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টার সূচনা হবে, যা কখনো ব্যর্থ হবার নয়।

৪.৩ সম্পদের অবাধ প্রবাহ

অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গিতে পুঁজিবাদের সাথে ইসলামের সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা যেখানে সম্পদের স্বল্পতাকে সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে উৎপাদনের প্রতি বেশী মনযোগ দেয়, ইসলামী অর্থব্যবস্থা সেখানে সমস্যা সমাধানের প্রাথমিক উপায় হিসাবে প্রাপ্ত সম্পদের বন্টন ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। এক্ষেত্রে আল্লাহর (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) হুকুম হচ্ছেঃ

যাতে ধনৈশ্বর্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়।” (আল-হাশরঃ৭)

সুতরাং মজুতদারীর মত অমানবিক কার্যক্রম ইসলামী রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে।

আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) আরো বলেন,

আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।” (তাওবাঃ ৩৪)

মজুতদারী, ফড়িয়াবাজী কিংবা মূল্য নির্ধারণের মত কার্যাবলীর প্রভাব যেকোন অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহকে বিঘ্নিত করে একে অলস ফেলে রাখা হয়। ফলশ্রুতিতে সমাজে বেকারত্ব তৈরী হয় এবং সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরো দারিদ্রের মধ্যে নিপতিত হয়। এর দুষ্ট প্রভাব আমাদের সমাজেও পরিলক্ষিত, যেখানে এক দিকে গুটিকয়েক সম্পদশালী ব্যক্তি ও ফড়িয়াবাজ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসেছে, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক দুর্যোগ।

৪.৪ কর্মসংস্থানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী

ইসলাম প্রত্যেক সক্ষম নাগরিকের উপর তার নিজের ও তার উপর নির্ভরশীলদের জন্য জীবিকা অর্জন করার জন্য কাজ করা ফরজ করে দিয়েছে।

আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) বলেন,

অতএব তোমরা পৃথিবীতে বিচরণ কর এবং তার দেওয়া রিযিক আহার কর।” (সূরা মূলক-১৫)

বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সাঃ) সাদ বিন মুয়াজ (রাঃ) এর সাথে করমর্দন করলেন এবং তার হাতে রুক্ষতা অনুভব করলেন। যখন রসূল (সাঃ) তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, সাদ (রাঃ) বললেন, “আমি আমার পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কোদাল দিয়ে খনন করি।রাসূল (সাঃ) সাদ (রাঃ) এর হাতে চুম্বন করে বললেন এ দুটো হাতকে আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) পছন্দ করেন। কেউই তার নিজ হাতের উপার্জন ছাড়া উত্তম কোন খাবার আহার করতে পারে না।

খিলাফত রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরী করা যেখানে জীবিকার জন্য জনসাধারণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। খিলাফত রাষ্ট্র জনসাধারণের জন্য চাষযোগ্য জমির ব্যবস্থা করবে এবং অবকাঠামো তৈরী করবে, এমন শিল্প স্থাপন করবে, যেখানে স্থানীয় দক্ষ জনসাধারনের নিয়োগ দান করা হবে। জনসম্পদ উন্নয়নের জন্য খিলাফত রাষ্ট্র সক্রিয় পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। তাছাড়া সম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম হওয়ার কারণে সম্পদ অলস পড়ে থাকবে না বরং প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হবে। সম্পদশালীরা বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে থাকবে। ফলশ্রুতিতে অনেক কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টি হবে।

৪.৫ প্রাপ্ত সম্পদের সমীক্ষা ও বর্তমান বিতরণ ব্যবস্থার সমস্যা

খিলাফত রাষ্ট্র প্রাপ্ত সম্পদের উপর একটি জরিপ (Study) পরিচালনা করবে এবং সম্পদের বর্তমান বন্টন ব্যবস্থার আগাগোড়া অধ্যয়ন করবে। এই পর্যবেক্ষণ সিষ্টেম লস, মজুতদারী ও দুর্নীতি চিহ্নিত করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে। আমরা জানি, সবুজ নান্দনিকতা বাংলাদেশের চিরকালীন স্বকীয় সৌন্দর্য। আমাদের সবুজ গ্রাম্য জীবন ও সেখানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ আমাদেরকে গর্বিত করে। আমরা গর্ব করি এদেশের কঠোর পরিশ্রমী কৃষককে নিয়ে। আমরা জানি যেকোন দেশ তার কৃষির উপর ভিত্তি করে ও এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করে। হাজার বছর ধরে আমরা পাট, মসলিন, সুতা, সিল্ক, শাক-সব্জি ইত্যাদি পণ্য বিদেশে রপ্তানী করেছি, যা ঐতিহাসিকভাবে একটি স্বীকৃত সত্য। এদেশের কৃষিজ সম্পদের লোভে বার বার বৃটিশ, ফরাসী, পর্তুগীজ ও ওলন্দাজ ইত্যাদি জাতিসমূহ আমাদের দেশে ছুটে এসেছে। কিন্তু আমরা হতাশা নিয়ে দেখেছি বিশ্বব্যাংক, আই.এম.এফ এর এস.এ.পি (SAP) কিংবা পি.আর.এস পির (PASP) মত ধ্বংসাত্মক পলিসি কিভাবে এ সম্পদকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। অথচ বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের চাহিদা যেকোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে বেশী। অত্যন্ত বেদনার সাথে আমরা লক্ষ্য করেছি আদমজী পাটকলকে কিভাবে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উর্বর জমিন এবং কঠোর পরিশ্রমী ও দৃঢ়প্রত্যয়ী কৃষক যেকোন দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান। অন্যভাবে বলা যায় এ দুটি থাকলেই যেকোন দেশ রাতারাতি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে এ দুটিই যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। খিলাফত রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিম্নোক্ত নিয়ম-কানুনসমূহ বাস্তবায়ন করবেঃ

ক. খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত ভূমি খলিফা ঐ সমস্ত দরিদ্র অভাবী মানুষের মাঝে বিতরণ করবে, যারা এর সঠিক ব্যবহার করতে পারে। যেহেতু খারাজি ভূমির মালিকানা সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রের, তাই খলিফা একে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারেন। আবার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হওয়াতে এসব ভূমি সঠিক বন্টনের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক চাহিদাসমূহ রাষ্ট্র যথাযথভাবে পূরণ করবে।

খ. ভূমি মালিকদের হাতে অব্যবহৃত জমি এবং যা তারা সরাসরি ব্যবহার করে না, সেসব জমি খলিফা তাদের কাছ থেকে নিয়ে নিবেন। কোন জমি যদি তার মালিকের কাছে তিন বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকে, তবে খলিফা সে জমি অধিগ্রহণ করবেন। যারা এই জমি ব্যবহার করতে সক্ষম, খলিফা সেসব দরিদ্র মানুষের কাছে বন্টন করে দিতে পারে। কৃষিভূমির বর্গা দেয়াও ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। মালিককে তার জমি হয় নিজে সরাসরি ব্যবহার করতে হবে অথবা নিজে ব্যবহার করা কিংবা বিক্রি করার যোগ্যতা অর্জন করার আগ পর্যন্ত কাউকে তা ব্যবহার করার অনুমতি দিতে হবে। যদি তিন বছর পর্যন্ত সে এর কোনটিই করতে না পারে, তবে রাষ্ট্র তার কাছ থেকে সেটি নিয়ে নিতে পারে।

এ ধরনের নিয়মনীতির বাস্তবায়ন ভূমির বন্টনকেই শুধু সম্প্রসারিত করবে না, বরং ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করবে।

৪.৬ কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারের উৎসাহ

খিলাফত রাষ্ট্র কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মুসলমানরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ভীত না হয়ে বরং আল্লাহর (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) উৎসাহে প্রকৃতিকে আরো গভীরতর উপলদ্ধি ও গবেষণার মাধ্যমে উন্নয়নের দিকে নিজেদের পরিচালিত করবে। নিত্যনতুন আবিষ্কার ও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানরা আল্লাহ্ (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে জীবনকে সম্পূর্ণ উপভোগ করবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তারা পরকাল এবং তার হিসাব-নিকাশকে উপেক্ষা করে দায়িত্বে অবহেলা করবে না। বিজ্ঞান একটি নিরপেক্ষ বিষয়। একে যে কেউ তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভাল-খারাপ যে কোন কাজে লাগাতে পারে। পশ্চিমারা যখন অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে ছিল, তখন মুসলামানরাই প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা বিজ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র উম্মোচিত করে বিজ্ঞানের জগতে পৃথিবীতে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। সুতরাং এটি খুব সহজেই অনুমেয় যে খিলাফত রাষ্ট্র উন্নততর শস্য উৎপাদন ও সেগুলোর সুষ্ঠু সংরক্ষণের জন্য বিজ্ঞানকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে জাতিকে খাদ্যসহ বিভিন্ন মৌলিক চাহিদা ও বিলাস দ্রব্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে আত্ম-নির্ভরশীলতার দিকে পরিচালিত করবে।

৪.৭ ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ

উপরোক্ত নীতিসমূহ আন্তরিকতা সহকারে বাস্তবায়ন করলে সমাজে দারিদ্র থাকবে না। কিন্তু ইসলাম এখানেই থেমে যায় না। ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করে। তাই ব্যক্তির সকল মৌলিক চাহিদা পূরণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে পারে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা কিভাবে ইসলাম পূরণ করে তার পদ্ধতি নিম্নে বর্ণনা করা হলঃ

৪.৭.১ পারিবারিক দায়িত্বশীলতা আরোপঃ খলিফা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সব সময় প্রত্যেক নাগরিকের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত অবহিত হবে। তাই যখনই খলিফা কোন নাগরিকের দারিদ্রাবস্থার কথা জানতে পারবে, তখন তিনি তাঁর নির্বাহীর মাধ্যমে ঐ নাগরিকের দায়িত্ব তার নিকটাত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করবেন।

৪.৭.২ খলিফা যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন করবেনঃ খলিফা যাকাত সংগ্রহ করে পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত খাত অনুযায়ী বন্টন করবেন। ইসলাম আল্লাহর (সুবহানাহুওয়াতায়ালা) দেয়া পবিত্র জীবনব্যবস্থা। সুতরাং ভ্যাট (VAT), ট্যাক্সের মত নিষ্ঠুর ব্যবস্থায় ইসলাম বিশ্বাস করে না। জনগণের উদ্ধৃত্ত সম্পদের উপর ইসলামের একটি কর ব্যবস্থা রয়েছে। নিসাবের শর্তপূরণকারী ব্যক্তির অব্যবহৃত সম্পদের যাকাত মুসলামানরা তাদের আকীদা থেকে উৎসারিত ইবাদত মনে করে আদায় করে। এটি এমন একটি কর ব্যবস্থা যা সম্পদকে ধনীদের হাতে কুক্ষিগত করে না রেখে পুরো উম্মাহ্র মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া নিশ্চিত করে। কোরআনে বর্ণিত দরিদ্র, অক্ষম, অভাবী ইত্যাদি আটটি ক্ষেত্রে যাকাত দেয়া হয়। যাকাতের মাধ্যমে উম্মতের দরিদ্ররা ধনীদের সম্পদে অংশীদার হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি যত বেশী ধনী এবং সম্পদের অধিকারী, তাকে তত বেশী পরিমাণে যাকাত প্রদান করতে হয়।

৪.৭.৩ উত্তরাধিকারীবিহীন মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ খলিফা (অভাবীদের মাঝে) বন্টন করবেনঃ উত্তরাধিকারীবিহীন মৃত ব্যক্তির সম্পদ রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং খলিফা ঐ সমস্ত সম্পদের অধিগ্রহণ, ব্যয় ও বরাদ্দের সম্পূর্ণ অধিকার সংরক্ষণ করেন। জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণের ফরজ দায়িত্বের অংশ হিসাবে খলিফা যে কোন অভাবী ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন পূরণের জন্য এ সম্পদ দান করতে পারেন।

৪.৭.৪ রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরও যদি সমাজে অভাবী জনগোষ্ঠী অবশিষ্ট থাকে তবে সম্পূর্ণ উম্মাহর উপর তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব বর্তায়ঃ বাইতুল মাল-এ যদি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের মত যথেষ্ঠ সম্পদ না থাকে, তবে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর হাদীস, “যে ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত জেনেও ভরপেটে ঘুমাতে যায়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়”-এর ভিত্তিতে খলিফা ধনীদের স্বাভাবিক ব্যয় ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে নিয়ে অভাবী মানুষের অভাব পূরণ করবেন।

৫. উপসংহার

খিলাফত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপরোক্ত পর্যলোচনা থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে দারিদ্র বিমোচনের স্বার্থে এই অর্থব্যবস্থা জনগণের ও রাষ্ট্রের সম্পদের একটি পাথর কণাকেও অলস ফেলে রাখবে না। দারিদ্র দূরীকরণের লক্ষ্যকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিবে খিলাফত ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা জাতির প্রতি গভীর কর্তব্যবোধ ও দায়িত্ব নিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত। উপরোক্ত মূলনীতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে দারিদ্রকে উৎখাত করা সম্ভব।

রবিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১২

খিলাফত শাসন ব্যবস্থার স্বরূপ ও রূপরেখাঃ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার প্রাপ্তি

একমাত্র খিলাফত শাসন ব্যবস্থাই পারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে

. ভূমিকাঃ

সেক্যুলার পূঁজিবাদী রাষ্ট্রে বিনা কারণে গ্রেফতার, বিচারবিহীন অনির্দিষ্ট কালের অন্তরীণ কিংবা নিরপরাধ মানুষের সাজাপ্রাপ্তি আমাদের সমাজে এখন অতি সাধারণ বিষয়। গণগ্রেফতারের ঘটনাও আর বিশেষভাবে আলোচিত হয় না। অপরাধীর তালিকায় নিষ্পাপ কোন নবজাতকের নাম দেখলেও সমাজের মানুষ তেমন চমকে ওঠে না। প্রতিদিনের সাধাসিধে রুটিনের মত এসব বিষয় যেন আমাদের সয়ে গেছে। অপর দিকে গুটি কয়েক মহাজনের অনৈতিক কারসাজিতে লাফিয়ে লাফিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরে বেড়ায়, আর জনপ্রতিনিধিরা মানষের মিছিলে গুলির নির্দেশ দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। এখানে প্রায় প্রতিদিনই স্নেহময়ী মায়েদের বুক খালি হয়, পুত্রশোকে পিতারা বুকে পাথর বাঁধে আর প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বিধবারা করে অশ্রুবিসর্জন। শ্লীলতা হারিয়ে আমাদের সমাজের সহস্র তরুণী আর দিনের আলোয় মুখ দেখাতে চায় না। এসিডদগ্ধ নারীর মুখে তার ঝলসানো স্বপ্নগুলো ঢাকা পড়ে থাকে। এসবের যেন কোন বিচার নেই। বিচারের দাবি ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে এক সময় শূন্যে মিলিয়ে যায়। আইনের শাসন আর বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা সম্ভবত এ সামাজের সবচেয়ে দূর্লভতম বিষয়। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আমাদেরকে আন্তরিক ভাবে ভাবতে হবে। আলোচনা সমলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধান বের করতে হবে।

২. সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ

বর্তমান বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতাকে সঠিকভবে বোঝার জন্য আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করছি যেখানে পূঁজিবাদের ভোগবাদি মূল্যবোধগুলো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে এদশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী ইসলামী মূল্যবোধগুলোও আঁকড়ে ধরে থাকতে চাচ্ছে। নিম্নে আমাদের সমাজিক প্রেক্ষপট বিশ্লেষণের জন্য তিনটি উপাদান আলোচিত হলঃ

২.১. ভোগবাদি মানসিকতার বিকাশঃ

আমরা একটি সেক্যুলার পূঁজিবাদী রাষ্ট্রে বসবাস করি। আর পূঁজিবাদের মৌলিক মানদন্ড হচ্ছে লাভ-ক্ষতি। এই মানদন্ডের ভিত্তিতে গৃহীত কর্মকান্ডগুলো যেকোন ধরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত। এখানে মানুষ অধিক মুনাফা অর্জন এবং ন্যূনতম ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করে। সমাজে এর পরবর্তী ফলাফল কি হতে পারে তা বিবেচনা করা হয় না। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন চিত্রগুলো দেখলেই এ বাস্তবতা উপলব্ধি করা য়ায়। অধিকাংশ মানুষের সামর্থ্যের বিষয়টি চিন্তা না করে গড়পড়তা ভোগবাদি মানসিকতা তৈরী করা হচ্ছে। ফলে মানুষ বৈধ-অবৈধ উপায়ে, এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইন-লঙ্ঘন করে তাদের চাহিদাপূরণ করার চেষ্টা করছে। চাহিদাপূরণের উপায় অবলম্বনের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি কিংবা আইন-কানুন যেন মানুষের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁডি়য়েছে। আইনী প্রতিবন্ধকতা লঙ্ঘন করতে পারাটাই অনেকের প্রাপ্তির বিষয়। ফলশ্রুতিতে বিচার ব্যবস্থার উপর এমন চাপ পড়ছে যা সামলানোর ক্ষমতা এর নেই। তাই বর্তমানে যে বিচারগুলো নিঃষ্পত্তির অপেক্ষায় জমে আছে তা সম্পন্ন করতে আরো শত বছরেরও বেশী সময় লাগবে। আদৌ এগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব কী না তাও সন্দেহমুক্ত নয়।

২.২. বিচার ব্যবস্থা ও জনগণের বিশ্বাসের দ্বন্দ্বঃ

পূঁজিবাদী মূল্যবোধের প্রসার ঘটানোর চলমান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এদেশের মুসলমানদের পক্ষে ইসলামী মূল্যবোধগুলো ত্যাগ করা পুরোপুরি অসম্ভব। বৃটিশদের রেখে যাওয়া আইন ও বিচার ব্যবস্থা এদেশের মানুষ সর্বান্তকরণে গ্রহণ করতে পারেনি। বরং এই বিচার ব্যবস্থা অধিকাংশ মানুষের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী। সাধারণ মানুষের কাঙ্খিত জীবন পদ্ধতির সাথে এই ব্যবস্থাটি সামঞ্জস্য বিধান করতে ব্যর্থ। তাই এই বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের কোন শ্রদ্ধাবোধ কিংবা দায়বদ্ধতা নেই। এজন্য সাধারণ জনগণের কাছ থেকে এই বিচার ব্যবস্থা কোনরূপ সহায়তা পায় না।

২.৩ রাজনৈতিক দল কর্তৃক বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহারঃ

সাধরণ জনগণের এই বিচার ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকার সুযোগ নেয় রাজনৈতিক দলগুলো। এরা অহরহ বিচার ব্যবস্থাকে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। ক্ষমতারোহন করেই প্রত্যেকটি দল বিচার ব্যবস্থাকে তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ারে পরিণত করে। আসলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসলেই পুরো দেশটাকেই তাদের নিজেদের মনে করে। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে বাংলাদেশে মূলত যেটা চলছে সেটা হলো দলীয় শাসন। বাংলাদেশে যে দল যখন ক্ষমতায় যায় সেই দল তার নিজের দলীয় স্বার্থে শাসন প্রতিষ্ঠা করে। সংসদ ভবন থেকে আরম্ভ করে মন্ত্রীদের কেবিনেট আর আদালত থেকে আরম্ভ করে ইউনিয়ন পর্যায়ের মেম্বার পর্যন্ত সবাই দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যাস্ত। ৭১ থেকে ২০১২ পর্যন্ত প্রতিটি সরকার তার নিজের মত করে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। কোন সরকার এদেশের ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

এরকম সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বিচার প্রার্থী সাধারণ জনগণ এবং বিচার ব্যবস্থা পরস্পর মুখোমুখি, এবং যেখানে দলীয় স্বার্থে বিচার ব্যবস্থাকে সহজে ব্যবহার করা যায়, সেখানে বিচার ব্যবস্থার সফলতার সম্ভাবনা শুরুতেই অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে আসে। যে বিচার ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্বহীন এবং সাধারণ মানুষ যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত সে বিচার ব্যবস্থা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এমন অবস্থায় আইনের শাসন ও বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তার মাত্রাও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে থাকে। তাছাড়া আমাদের বিচার ব্যবস্থায় ভেতরগত আরো কতগুলো মৌলিক ত্রুটিও বিদ্যমান; যেগুলো এই ব্যবস্থার পরিপূর্ণ ব্যর্থতাকে একেবারে শতভাগ নিশ্চিত করেছে। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হল

৩. বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহঃ

এই বিচার ব্যবস্থা আইনের শাসন ও বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ, কারণ মৌলিকভাবে এটি ত্রুটিপূর্ণ। নিম্নে এর প্রধান ত্রুটিসমূহ আলোচিত হল

      আইনের সীমাবদ্ধতা
      অস্বচ্ছ আইন-কানুন
      বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব
      কেন্দ্রীভূত বিচার ব্যবস্থা
      বিচার প্রক্রিয়ার বাণিজ্যিকীকরণ
      বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতা
      দুর্নীতিগ্রস্থ বিচার ব্যবস্থা

৩.১. আইনের সীমাবদ্ধতাঃ

বর্তমান সেক্যুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইনের একমাত্র উৎস হচ্ছে মানুষ। আর মানুষের বাস্তবতা হচ্ছে সে একই সাথে সব কিছু উপলব্ধি করতে পারে না। সে ততটুকুই বুঝতে পারে যতটুকু সে উপলব্ধি করতে পারে। আবার তার উপলব্ধিও তার পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা ও সীমাবদ্ধ চিন্তা-ভাবনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে কোন বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে তার অবশ্যই ভূল হয়। এজন্য মানুষের তৈরী আইন কানুনে থাকে সীমাবদ্ধতা। বছরের পর বছর সংশোধন করেও এগুলোকে আবারো সংশোধন করতে হয়। তবুও এসব আইন-কানুন সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে পারে না। তাছাড়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় অন্ধভাবে হুবুহু বিদেশীদের আইন নকল করে বিচার কার্য চালানোর চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে এদেশের মানুষ ও সামাজিক প্রেক্ষপট বিবেচনায় আনা হয় না। তাই অন্য কোন দেশের প্রেক্ষপটে যে আইন সফল বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা ব্যর্থ হয়।

৩.২. অস্বচ্ছ আইন-কানুনঃ

যে আইন কানুন দিয়ে বিচার কার্য পরিচালনা করা হয় সেই আইন কানুন সম্পর্কে জনগণ কিছুই জানেনা। জনগণ জানেনা কি অপরাধ করলে কি ধরণের বিচার হবে। কিংবা বিচার প্রক্রিয়ার ধরণ সম্পর্কেও সাধারণ মানুষ অজ্ঞ। আইনের মাপ্যাঁচএখন একটা অতি ব্যবহৃত প্রবাদে পরিণত হয়েছ। আইনের মাপ্যাঁচবলতে অনিশ্চিত দুর্বোধ্য কোন কিছুকে বোঝানো হয়। প্রকৃতপক্ষে আইন আদালতের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী ছাড়া এ ব্যবস্থা আর কেউ বোঝে না। জনগণের কাছে বর্তমান আইন এবং আইনি প্রক্রিয়া একটি অনিশ্চিত দুর্বোধ্য বিষয়। ফলে এখানে লঘু পাপে গুরু শাস্তি আবার গুরু পাপে লঘু শাস্তি নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার হয়ে দাঁডি়য়েছে। যেহেতু জনগণ আইন-কানুন সম্পর্কে একদমই অজ্ঞ, তাই তাদেরকে খুব সহজেই বিভ্রান্ত করে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা যায়।

৩.৩. বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বঃ

বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক দলগুলো বিচার বিভাগের উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করছে না। এবং এটা নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় প্রচলিত এই আওয়ামী লীগ ও বি.এন.পির কোন দলই এই বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করবে না। এর জলন্ত প্রমাণ হলো নির্বাচনী ইশতিহারে এই দুই দল জনগণের কাছে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার ওয়াদা করলেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে এই দলগুলো আর সেটা বাস্তবায়ন করেনা। এর প্রধান কারণ হলো বিচার বিভাগকে যদি নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করে ফেলা হয় তাহলে বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে পড়ে এবং এর উপর শাসকগোষ্ঠীর আর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন হয়ে পড়ে তাহলে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে দূর্নীতি করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়বে। শাসকগোষ্ঠী জনগণের সম্পদ যথেচ্ছা লুটপাট করে অকল্পনীয় বিত্তবৈভবের মালিক হতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে যতদিন লুটপাটের এই শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে ততদিন বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে সত্যিকার অর্থে আলাদা হবে না।

৩.৪. কেন্দ্রীভূত বিচার ব্যবস্থাঃ

কেন্দ্রীভূত বিচার ব্যবস্থা এই সমাজব্যবস্থায় বিচার না পাওয়ার আরো একটি বড় কারণ। এখানে যে কোন ধরণের বিচার কার্য চালানোর জন্য গ্রামের সাধারণ মানুষজনকে শহরমুখী হতে হয়। কারণ শহরকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিচার ব্যবস্থার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এই অবস্থায় গ্রামের সাধারণ মানুষ বিচার কার্য চালাতে শহরে আসতে গিয়ে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক হয়রানির শিকার হয়। শহরে এসে আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট দূর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠীর দ্বারা নানাভাবে প্রতারিত হয়। এজন্য অনেকেই অযথা হয়রানির আতঙ্কে বিচার কার্য চালাতে চায় না। প্রকৃতপক্ষে চরমভাবে কেন্দ্রীভূত এই বিচার ব্যবস্থা থেকে জনগণের প্রতি এর চরম দায়িত্বহীনতার চিত্রই ফুটে ওঠে। এই বিচার ব্যবস্থা দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের কাছে যায় না বরং সাধারণ জনগণকে বিচার প্রাপ্তির জন্য একটি দীর্ঘ হয়রানির মধ্যে ঠেলে দেয়।

৩.৫. বিচার প্রক্রিয়ার বাণিজ্যিকীকরণঃ

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বিচারকার্য এক ধরণের লাভজনক ব্যবসা। প্রচুর টাকা ব্যতিত একজন দক্ষ আইনজীবির সহায়তা লাভ করা যায় না। এখানে বিচার কার্য চালাতে হলে প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে কেস করার আগে মানুষ জানতে চায় কেস চালাতে কি পরিমাণ টাকা লাগবে। টাকার চিন্তা করে আতঙ্কিত দরিদ্র জনগণ বিচার পাওয়ার আশা ত্যাগ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমাদের সমাজের তথাকথিত ভূমিদস্যুদের আইন, আইনজীবি কিংবা বিচার ব্যবস্থার যেকোন রকমের সহায়তার অভাব হয় না। সাধারণ দরিদ্র মানুষের সম্পদ লুটপাট করতে আসা এশিয়ান এনার্জি, নাইকো ইত্যাদি কোম্পানিগুলোকে প্রথিতযশা বিজ্ঞ আইনজীবিরা সর্বাত্মক সহযোগীতা দেয়। জনগণের স্বার্থ , আইনের শাসন অথবা বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এখানে বিষয় নয়, বরং এটি স্পষ্ট টাকার পাল্লা যে দিকে ভারী, বিচার ব্যবস্থা কিংবা আইনজীবিরা সেদিকেই অবস্থান নেন।

৩.৬. বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতাঃ

বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতা এদেশের জনগণের বিচার প্রাপ্তির জন্য আরোকটি বড় বাধা। রায়ের বিরুদ্ধে আপীল, রায়ের উপর স্থগিতাদেশ কিংবা এক আদালত থেকে অন্য আদালতে হস্তান্তরের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করা হয়।এদেশে এক একটি বিচারের জন্য কত বছর সময় লাগবে একথা যেমন একজন ভুক্তভোগী ব্যক্তি জানেনা, তেমনি একজন বিচারকও জানেনা। আদালতে এক একটি কেস র্দীঘ দশ-বিশ বছর ধরে ঝুলে থাকার পরেও নিষ্পন্ন হয় না। খবরের কাগজে নিউজ হয় বাংলাদেশের সব কেসগুলো যদি নিঃস্পন্ন করতে হয়ে তাহলে প্রায় ২০০ বছর লেগে যাবে। আদৌ এই সময়ের মধ্যেও তা সম্পন্ন হয় কিনা তাতেও অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন

৩.৭. দুর্নীতিগ্রস্থ বিচার ব্যবস্থাঃ

যেহেতু বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা নয়, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রীতা, ও অস্বচ্ছ আইন-কানুন বিদ্যমান, ফলে স্বভাবতই দুর্নীতি এখানে জেঁকে বসবে এ আর অসম্ভব কি। টি.আই.বি-র রিপোর্ট মোতাবেক বাংলাদেশে সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লোয়ার কোর্ট একটি। মানুষকে বলতে শোনা যায় আদালতের মাটিও নাকি টাকা চেনে। যেখানে দুর্নীতি বিদ্যমান সেখানে বিচার প্রাপ্তির কোন নিশ্চয়তা থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই চলছে বাংলাদেশের আদালতগুলো দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ। আজকে এই দেশের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় এখানে টাকা দিয়ে বিচার কেনা যায়, টাকা দিয়ে বিচার বন্ধ করা যায়, এমনকি টাকা দিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে নিজেদের ইচ্ছেমত সাজিয়ে নেয়া যায়।

বিভিন্ন সময় এই বিচার ব্যবস্থাকে বিভিন্নভাবে সারিয়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিদেশী প্রভুদের নানারকম পরামর্শ বাস্তবায়নে কালক্ষেপন করেও একে কার্যক্ষম করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এসব কিছু শুধু ব্যর্থই হয়নি বরং এই ব্যবস্থার জটিলতাকে আরো বাডি়য়েছে। ব্যর্থ বিচার ব্যবস্থা দিন দিন আরো ব্যর্থ হয়ে অবশেষে দেউলিয়া হয়ে গেছে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটলিয়ন (র‍্যাব) গঠনের মাধ্যমে বিচার বহিভূর্তভাবে মানুষ হত্যা করে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা তার বিচার বিভাগের দেউলিয়াপনাকে নগ্নভাবে মানুষের সামনে প্রকাশ করেছে। আর এই দেউলিয়াপনা থেকে আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে কখনোই বের করে আনা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন এই ব্যর্থ ব্যবস্থাটিকে উপড়ে ফেলে এমন একটি বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা যা মানুষের বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং যে ব্যবস্থা হবে মৌলিকভাবে ত্রুটিমুক্ত। একমাত্র ইসলামিক বিচার ব্যবস্থাই আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা। তাই আমাদের ইসলামিক বিচার ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ। আমরা এখন বিস্তারিতভাবে ইসলামিক বিচার ব্যবস্থা আলোচনা করব।

৪. খিলাফত রাষ্ট্রের সমাজিক প্রেক্ষাপটঃ

মূল আলোচনায় যাবার আগে যে সমাজে ইসলামি বিচার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে তার মৌলিক চিত্রটা আমাদের সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। নিম্নে ইসলামী সমাজের দুটি দিক আলোচিত হলঃ

৪.১. জনমতঃ

খিলাফত রাষ্ট্রে ইসলামিক মূল্যবোধগুলোর উপর ভিত্তি করে শক্তিশালী একটি জনমতের উপর সমাজ প্রতিষ্ঠিত। এখানে মানুষ বিশ্বাস করে তার প্রত্যেকটি কাজের জন্য তাকে আল্লাহ্ (সুবঃ)র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ (সুবাঃ) বলেন,

অতঃপর কেউ অনু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।” (আল কুরআন- ৯৯ - ৭-৮)

সুতরাং মানুষ অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। আর তাছাড়া ইসলামী সমাজে অন্যায়কারী তথা পাপীর সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পায়। তাই নিজেদের মর্যাদা রক্ষার্থেই মানুষ অন্যায় থেকে দূরে থাকতে চায়। যদি কেউ অসাবধানতাবশে কোন অন্যায় করে তবে সে পরকালে কঠিন জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুনিয়াতে হালকা শাস্তি মাথা পেতে নেয়। তাই বিচার ব্যবস্থা চাপমুক্ত থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়; এক মহিলা রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে বললোঃ আমি জ্বেনা করেছি এবং জ্বেনার কারণে গর্ভবতী হয়ে গিয়েছি। নবী করীম (সাঃ) তাকে বললেনঃ তুমি চলে যাও, সন্তান প্রসব হলে এবং তার দুধপান করানোর সময় অতিক্রান্ত হলে এসো

৪.২. জনগণের বিশ্বাসই বিচার ব্যবস্থার ভিত্তিঃ

খিলাফত রাষ্ট্রে জনগণের বিশ্বাস ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি এক ও অভিন্ন। মানুষ বিশ্বাস করে মৃত্যুর পরে আল্লাহ্ (সুবাঃ)র সামনে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে; এজন্য তাঁর দেওয়া বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। পক্ষান্তরে বিচার ব্যবস্থাও অল্লাহর দেওয়া সেই বিধি বিধানগুলোই বাস্তবায়ন করে। এজন্য জনগণ ও বিচার ব্যবস্থা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তাই মানুষ আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিচার বিভাগকে সহায়তা করে এবং বিচার ব্যবস্থা অন্যায়কে প্রতিরোধ করে মানুষের জান্নাতের পথকে সহজ করে তোলে। উপরে উল্লেখিত মহিলার ঘটনার বিচারের পর রাসূল (সাঃ) বলেছিলেনঃ এ মহিলা এমন তওবা করেছে যে, তা যদি পৃথিবীবাসীর মধ্যে বন্টন করে দেয়া হয় তবে সকলের (জান্নাতের) জন্য তা যথেষ্ট হবে।


সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট খিলাফত রাষ্ট্রে সমাজকে এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যেন মানুষ সর্বাত্মকভাবে বিচার ব্যবস্থাকে সহযোগীতা করে। তাই খিলাফত রাষ্ট্রে বিচার ব্যবস্থা খুব সহজেই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এমন সমাজে বিচার ব্যবস্থার পক্ষে আইনের শাসন বাস্তবায়ন ও বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করাও কঠিন নয়। আইনের শাসন ও বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য উপরোক্ত প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াও খিলাফত রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কতগুলো মূলনীতি রয়েছে। নিম্নে সেগুলো আলোচিত হলঃ

৫. ইসলামী বিচার ব্যবস্থার মূলনীতিঃ

পর্যায়ক্রমে কতগুলো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে সুষ্পষ্ট কিছু মূলনীতি বাস্তবায়ন করে খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা আইনের শাসন ও বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করবে। খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার কতগুলো মূলনীতি নিম্নরূপঃ

      সুস্পষ্ট ও ত্রুটিমুক্ত আইন-কানুন
      নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া
      নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীন
      বিচার ব্যবস্থার কাঠামো
      বিচার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ
      দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা
      দূর্নীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা
      সহজলভ্য বিচার প্রাপ্তি

নিম্নে উপরোক্ত মূলনীতিগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলঃ

৫.১. সুস্পষ্ট ও ত্রুটিমুক্ত আইন-কানুনঃ

ইসলামিক আইন-কানুনের একমাত্র উৎস হচ্ছেন আল্লাহ্ (সুবাঃ)। তিনি ছাড়া অন্য কোন উৎস হতে আইন গ্রহণ করা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। আর আল্লাহ্ (সুবঃ) তার গ্রন্থ আল-কুরআন এবং বার্তাবাহক মোহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে তাঁর নিয়ম কানুনসমূহ মানুষের কাছে প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ্ (সুবঃ) বলেনঃ

আর অমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পাস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করুন” (আল মায়িদাহঃ ৪৯)

সৃষ্টিকর্তা সকল সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। তাই তিনি যে আইন প্রণয়ন কিংবা মূলনীতি দান করবেন মৌলিকভাবেই সেগুলো সব ধরণের ত্রুটি থেকে মুক্ত। আল্লাহ্ (সুবাঃ) মানুষ সৃষ্টি করেছেন বলে মানুষকে তিনি সবচেয়ে ভালভাবে বুঝতে পারেন। তাই মানুষের জন্য সঠিক আইন-কানুন একমাত্র তাঁর পক্ষেই দেয়া সম্ভব। আল্লাহ্ (সুবাঃ) বলেন,

তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহ প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছে।

এজন্য মানুষের জন্য আইন প্রণয়ণের সবচেয়ে নির্ভূল উৎস হচ্ছে আল-কুরআন যার মধ্যে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা বৈপরীত্য নেই। আল্লাহ্ (সুবাঃ) বলেনঃ

এরা কি লক্ষ্য করে না কুরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ্ ব্যতিত অপর কারো পক্ষ থেকে হত তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত।” (কুরআন-৪ - ৮২)

কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সঠিকভাবে আইন বের করতে হয় যা সহজেই সবার কাছে বোধগম্য হয়। ইসলামের পরিভাষায় কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আইন বের করার এই প্রক্রিয়াটিকে বলে ইজতিহাদ। ইজতিহাদেরর মাধ্যমে প্রাপ্ত আইন স্বচ্ছ, স্পষ্ট এবং পূর্ণাঙ্গ হতে হবে। অস্পষ্ট কোন আইন গ্রহণযোগ্য নয়। হযরত ওমর (রাঃ) তার এক প্রশাসক আবু মূসা আশআরী (রাঃ) কে এক ফরমানে কতগুলো মূলনীতি বলে দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি ছিল নিম্নরূপঃ

যে আইন দ্বারা বিচার হবে তাকে সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ হতে হবে।

সুতরাং প্রথমত ইসলাম ত্রুটিমুক্ত, সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ আইন নিশ্চিত করে। তাছাড়া খিলাফত রাষ্ট্রের আইন-কানুন সম্পর্কে শুধু বিচারকগণই সচেতন থাকবেন না জনগণও সচেতন থাকবে। ফলে জনগণের উপর ভুল বিচারের সম্ভাবনা থাকবে না বললেই চলে।

৫.২. নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়াঃ

খিলাফত রাষ্ট্রে সর্বাত্মক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়। আল্লাহ (সুবঃ) বলেনঃ

হে ঈমানাদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহ্র ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতা অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ্ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসর করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয় পেঁচিয়ে বল কিংবা পাশ কটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ্ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত।” (আল-কুরআনঃ ৪ - ১৩৫)

রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ইতিপূর্বে বণী ইসরাঈল নিপাত হওয়ার একমাত্র কারণ হলো যে, তাদের শরীফ লোক চুরি করলে তাকে তারা ছেড়ে দিত। কিন্তু কোন দূর্বল লোক যখন চুরি করতো তার উপর তারা হদ্দ’ (আল্লাহ্ রায়) জারি করতো। সেই মহান সত্ত্বার কসম যার কবজায়মুহাম্মদের প্রাণ; মুহাম্মদ তনয়া ফাতেমা (রাঃ) চুরি করলেও আমি তাঁর হাত পর্যন্ত কেটে দিতাম।

হযরত ওমর (রাঃ) মদপান করার অপরাধে নিজের সন্তানকে শাস্তি দিয়েছিলেন, যার ফলে তিনি নিহত হয়েছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) খলিফা থাকাকালীন একজন অমুসলিম নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করে হেরে গিয়েছিলেন।

৫.৩. নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীনঃ

খিলাফত রাষ্ট্রে একমাত্র আল্লাহ (সুবাঃ) সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। আর শরীয়াহ্র মাধ্যমেই তাঁর সার্বভৌমত্ব্ রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত থাকে। সুতারং শরীয়াহ্ কোন কিছুর অধীনে থাকতে পারে না। শরীয়াহ্ কোন কিছুর অধীনে থাকা মানে হচ্ছে আল্লাহ (সুবাঃ)’র সার্বভৌমত্ব অন্য কোন কিছুর অধীনে চলে যাওয়া। এজন্যই যে বিচার ব্যবস্থা শরীয়াহ্ বাস্তবায়ন করে তা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকা অসম্ভব। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি অনুসারে ইসলামী বিচার ব্যবস্থা মৌলিকভাবেই নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। খলিফা শুধু কাজী-আল-কুজ্জা বা প্রধান বিচারপতি বিধি মোতাবেক নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারেন। বরং কখনো কখনো খলিফাসহ পুরো নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের অধীনে চলে আসে। রাষ্ট্র এবং জনগণের মাঝে যদি কোন বিষয়ে বিরোধ উপস্থিত হয়, তবে সে বিরোধের নিস্পত্তির জন্য ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় মাহ্কামাত মাদালিম নামে আলাদা একটি আদালত রয়েছে। আলাহ্ (সুবাঃ) বলেন,

যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে আল্লাহ্ ও তার রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ্ ও কেয়ামত দিবসের উপরে বিশ্বাসী হয়ে থাক। (আল-কুরআন; ৪ - ৫৯)

রাসূল (সাঃ) রাষ্ট্র প্রধান থাকাকালীন রাশীদ ইবনে আব্দুল্লাহকে মাদালিমের কাজী নিযুক্ত করলেন এবং বললেনঃ অমি যদি কারো অর্থ নিয়ে থাকি, এই আমার অর্থ, তাকে এখান থেকে নিতে দাও। আমি যদি কারো পিঠে চাবুক মারি, এই আমার পিঠ, তাকে শোধ নিতে বল।

মাহকামাত মাদালিমের বিচারক কাজী-উল-মাদালিম খলিফা থেকে শুরু করে শাসকগোষ্ঠীর যেকোন ব্যক্তির যে কোন ধরণের অন্যায় আচারণের ব্যাপারে আইনী কার্য্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। কাজী-উল-মাদালিম যখন খলিফা অথবা শাসকবর্গের বিচারকার্য পরিচালনা করেন তখন কাজী উল-মাদালিমকে বরখাস্ত করার কোন বিধান খিলাফত রাষ্ট্রে নেই। বিচারক বাদি ছাড়াই উপযাচক হয়ে রাষ্ট্রের যে কোন দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন। যেমন, খলিফা বা রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লীষ্ট কোন ব্যক্তি যদি আইন বহির্ভূত কোন কাজ করে, কাজী উল-মাদালিম উপযাচক হয়ে বাদী ছাড়াই আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।

৫.৪. বিচার ব্যবস্থার কাঠামোঃ

খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় সফল মূলনীতির সাথে বাস্তবায়নযোগ্য একটি বিচার কাঠামো রয়েছে। খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার কাঠামো নিম্নরূপঃ

৫.৫. বিকেন্দ্রীভূত বিচার ব্যবস্থাঃ

খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের প্রন্তিক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের হাতের নাগালে নিয়ে যাওয়া হয়। জনগণকে বিচার প্রাপ্তির জন্য অযথা হয়রানিমূলকভাবে শত শত মাইল এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট স্বীকার করতে হয় না। রাসূল (সাঃ) মুয়াজ ইবনে জাবালকে (রাঃ) ইয়েমেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কিভাবে বিচার করবে?” মুয়াজ (রা) উত্তর দিলেন আল্লাহ কুরআন অনুসারে।রাসূল (সাঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন, “যদি তুমি কুরআনে তা না পাও তবে কি করবে?” তিনি (রাঃ) বল্লেন, “রাসূলের সুন্নাহ অনুসারে।রাসূল (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ যদি তুমি সুন্নাহতেও তা না পাও তবে কি করবে?” মুয়াজ তখন উত্তর দিলেন, “আমার সাধ্যের ভেতর নিজের ইজতিহাদ অনুযায়ী মানুষের ভেতর বিচার ফয়সলা করব।তখন রাসূল (সাঃ) মুয়াজের জন্য দোয়া করে বললেন, “প্রশংসা আল্লাহ যিনি আল্লাহ নবীর প্রতিনিধিকে সঠিক হেদায়েত দান করেছেন, যা আল্লাহ নবী পছন্দ করেন।উপরোক্ত উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি রাসূল (সাঃ) তাঁর বিচার ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত করে রাখেননি। উপরন্তু প্রত্যেক গভর্ণর প্রয়োজন অনুযায়ী তার প্রদেশকে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করে প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা বিচারক নিয়োগ করতে পারেন। হযরত ওমর (রাঃ) মিসরের গভর্ণর আবু মুসা আশআরী (রাঃ)কে লেখা এক চিঠিতে কতগুলো ফরমান দিয়েছিলেন, তার একটি নিম্নরূপ;

লোক সংখ্যা অনুপাতে যথেষ্ট পরিমাণে বিচারালয় ও বিচারকের ব্যবস্থা থাকা যদ্দরুণ বিচার প্রার্থীগণকে অহেতুক হয়রানি হতে না হয়।

শুধু তাই নয়, খিলাফত রাষ্ট্র প্রয়োজনে মসজিদে মসজিদে বিচারক নিয়োগ করবে যাদেরকে বলা হয় কাজি-উল-মসজিদ। অল-মাওয়ার্দি তাঁর আল-আহকাম আল-সুলতানিয়্যা গ্রন্থে লিখেছেন, “আবু আব্দুল্লাহ আল জুবায়র (রাঃ) বলেনঃ বসরার আমিরগণ শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে বিচারক নিয়োগ করেছেন। তাঁরা তাঁকে মসজিদের বিচারক বলতেন।

তাছাড়া জনস্বার্থ দেখাশুনাকারী বিচারকের রায় প্রদান করার জন্য কোন বিচারালয় প্রয়োজন হয় না। তিনি বাডি়তে, বাজারে ভ্রমণে, দিনে, রাতে যেকোন সময়ে যেকোন জায়গায় অপরাধ সনাক্ত করতে পারলে সাথে সাথে সেখানেই রায় প্রদান করে তা পুলিশের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে পারেন। রাসূল (সাঃ) একদিন মদিনার বাজারে হাঁটার সময় একটি খাবারের স্তুপের ভেতর আদ্রতা উপলব্ধি করলেন। অতঃপর তিনি সাথে সাথে ভেজা খাবারগুলো উপরে রাখতে নির্দেশ দিলেন, যাতে ক্রেতাগণ প্রতারিত না হন।

অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থাকে এমন পর্যায় পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় যেন প্রত্যেক নাগরিক তার লোকালয়ে অবস্থান করেই বিচার পান।

৫.৬. দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণঃ

ইসলামী বিধান মতে যতক্ষণ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত না হয় তৎক্ষন পর্যন্ত কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা, সন্দেহমূলকভাবে হলেও কাউকে গ্রেফতার করে অনির্দিষ্ট অথবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেলে রাখা ইসলামী শরীয়াহ্ মোতাবেক বৈধ নয়। কারো বিরুদ্ধে মামলার জন্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লাগবে। যেহেতু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট অইন-কানুন রয়েছে সেহেতু এই বিচার ব্যবস্থায় বিচারের রায় হবে দ্রুত এবং নির্ভুল। তাই একবার বিচারের রায় প্রদান করার পর আসামীর পক্ষে আর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোন সুযোগ নাই। কারণ বিচারের রায় পরিবর্তন করা মানে আল্লাহ্ (সুবঃ)র শরিয়াহ পরিবর্তন করা যা কোনভাবেই সম্ভব নয়। রাসূল (সাঃ) বলেন

যার সুপারিশ আল্লাহর কোন হদ্দ (রায়) বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সে যেন আল্লাহ মোকাবিলা করল।

হযরত ওমরের একটি রায়ের বিরুদ্ধে হযরত আলী (রাঃ) এর কাছে নাজরানের কিছু লোক এসে বলল আমিরুল মুমিনীন, আপনার ডান হাতে বই আর আপনার কন্ঠে হচ্ছে ক্ষমা।হযরত আলী (রাঃ) বললেনঃ তোমাদের প্রতি দুর্ভোগ! ওমর সত্য পথে ছিলেন। আমি ওমর কর্তৃক দেওয়া কোন রায়কে উল্টাব না। তাছাড়া খিলাফত রাষ্ট্রের কোন একটি নির্দিষ্ট বিচারের ক্ষেত্রে একের অধিক বিচারকের রায় প্রদানের ক্ষমতা নেই। এক বিচারক অন্য বিচারকের রায় বাতিল করতে পারেন না। অন্যান্য বিচারক শুধু মতামত দিতে পারেন। সুতরাং এক আদালত থেকে আরেক আদলতে হস্তান্তর কিংবা রায়ের উপর স্থগিতার্দেশ ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম প্রলম্বিত হবে না।

৫.৭. দূর্নীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থাঃ

খিলাফত রাষ্ট্র তার বিচার ব্যবস্থাকে দূর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় বিচারক ছাড়া আর কারো বিচার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগই নেই। আর বিচারকের অন্যায়ের ব্যপারে ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চরণ করেছে। কারণ আল্লাহ(সুবাঃ) শরিয়াহ্র বিরাট একটি অংশ বিচারকের মাধ্যমে সরাসরি সমাজে বাস্তবায়িত হয়। এ দায়িত্বে কোনরূপ অবহেলা মানে হচ্ছে আল্লাহ্ (সুবাঃ)র শরিয়াহ বাস্তবায়নে অবহেল। এজন্য বিচারকগণ শরিয়াহ্র প্রত্যেকটি আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং পরিপূর্ণ দায়িত্ববোধ থেকে কর্তব্য পালন করেন। আল্লাহ্ (সুবঃ)

যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম।” (আল-কুরআনঃ ৫ - ৪৫)

রাসুল (সাঃ) বলেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর প্রত্যেকেই নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।আর বিচারককে খুব কঠিনভাবে জিজ্ঞোস করা হবে। এ প্রেক্ষিতে তিনি (সাঃ) আরো বলেন, “বিচার দিবসে ন্যায়বান বিচারককে ডাকা হবে এবং তাকে কঠিনভাবে জবাবদিহী করতে হবে, সে যে ধরণের বিচার করেছে সেই ব্যাপারে, যতক্ষণ না সে ইচ্ছা পোষন করে সে তার জীবনে কোন মানুষের বিচার করেনি, এমন কি একটি খেজুরের ব্যাপারে হলেও।এজন্যই ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতির সম্ভাব্য সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

৫.৮. বিচার প্রাপ্তির সহজলভ্যতাঃ

একটু চিন্তা করলেই আমাদের সমাজের ব্যায়বহুল হয়রানিমূলক দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার একটি মূল কারণ বেরিয়ে আসে। তাহলো, যে অন্যায় করে সে তার শাস্তি এড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ খরচ করেও উকিল নিয়োগ করে। প্রবাদ আছে ডাক্তারের কাছে আর উকিলের কাছে নাকি কোন কিছু লুকাতে নেই। উকিল অপরাধীর বিবরন শুনে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে তার পক্ষে মামলা সাজায়। এজন্য যার উপর অন্যায় করা হয়েছে সেও যথাসম্ভব খরচ করে উকিল নিয়োগ করতে বাধ্য হয়। তা না হলে তার বিচার প্রাপ্তির ন্যূনতম সম্ভাবনাও থাকে না।

চলবে....

শনিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১২

আশুরাঃ অনৈসলামী শাসকের বিরুদ্ধে এক জলন্ত প্রতিবাদ


আশুরার কিছু ঘটনাবলীঃ

আশারা শব্দের অর্থ হচ্ছে দশ। তাই মুহররম মাসের দশ তারিখকে বলা হয় আশুরা। মুসলিম বিশ্বে আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। প্রাচীনকাল থেকেই মুসলিম বিশ্বে আশুরা পালিত হয়ে আসছে। হযরত মুসা (আঃ) বনী ইসরাঈলকে আশুরার দিনে ফেরাউনের বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করে ছিলেন এবং ঐ দিন ফেরাউন তার বাহিনীসহ কুলজুম নামক স্থানে ডুবে মরেছিল। প্রাচীনকালে আরবরা আশুরার দিনে রোজা রাখতো এবং ঐ দিন কাবা শরিফ সাধারণ দর্শকদের জন্য খুলে দেয়া হতো। আবার পবিত্র আশুরার দিনে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এ সকল কিছুকে ছাপিয়ে ৬১ হিজরীর ১০ মুহররম, ৬৮০ খ্রীস্টাব্দে ১৯ অক্টোবর মুসলিম বিশ্বে আশুরার দিনে সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে, তা হচ্ছে হযরত ইমাম হুসাইন(রা) এর শাহাদাত বরন।

কারবালার প্রেক্ষাপট ও সংক্ষিপ্ত বিবরনঃ

আমীর মুয়াবিয়া(রা) মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াযীদ মদীনা, কুফা ও সিরিয়ার শাসনভার গ্রহণ করে। ইয়াযীদ ছিল একজন ইসলামবিরোধী জুলুমবাজ, স্বৈরাচারী শাসক। ইয়াযীদ তার শাসন ক্ষমতার প্রতি হযরত হুসাইন(রা) এর আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রিয় দৌহিত্র, সাচ্চা ঈমানদার বান্দা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন যে এর ফলে খিলাফত ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বৈরাচারী ও বংশের শাসনের গোরাপত্তন হতে যাচ্ছে। ফলে তিনি ইসলাম বিরোধী, জুলুমবাজ স্বৈর শাসককে আনুগত্য করতে রাজী হলেন না। মূলতঃ এটাই ছিল কারবালা ট্রাজেডির মূল কারণ।

এ সময় হযরত হুসাইন(রা) মদীনায় থাকতেন। ইয়াযীদ মদীনার গভর্নরকে হযরত হুসাইন(রা)-এর আনুগত্য আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ বলে। ফলে মদীনার গভর্নরের অনুরোধ ক্রমেই হুসাইন (রাঃ) মক্কায় নিরাপদ স্থানে হিযরত করেন। কিন্তু কুফাবাসীরা হযরত হুসাইন(রা) কে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বার বার পত্র লিখতে থাকেন। তিনি কুফাবাসীদের পক্ষ থেকে এভাবে দেড়শত আমন্ত্রন পত্র গ্রহণ করেন। ফলে তিনি কুফাকে নিরাপদ স্থান মনে  করে তাদের আমন্ত্রনে সাড়া দিয়ে স্বপরিবারে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। মুহররম মাসের ৮ তারিখে ইমাম পরিবার কারবালায় পৌঁছেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই ধুর্ত ইয়াযীদ কুফার শাসনকর্তা পরিবর্তন করে উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে নতুন শাসনকর্তা হিসেবে প্রেরণ কর। উবায়দুল্লাহ ছিল অতিশয় হিংস্র এবং নির্মম। কুফার শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেই সে ৪০০০ সৈন্যের বিশাল এক সেনাবাহিনী হুসাইন (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে প্রেরণ করে। তারা কারবালায় ইমাম হুসাইন(রাঃ)-এর গতিরোধ করে এবং ফোরাত নদীর তীর অবরোধ করে পানি বন্ধ করে দেয়। ইয়াযীদ বাহিনী কর্তৃক বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে হুসাইন (রাঃ) কারবালা প্রান্তরে তাবু ফেলতে বাধ্য হন। ইয়াযীদ সৈন্যরা ঘোষনা করে দেয় যে, হয় ইয়াযীদের আনুগত্য করতে হবে অর্থাৎ ইয়াযীদকে শাসনকর্তা হিসেবে মেনে নিতে হবে, অন্যথায় যুদ্ধে অবর্তীর্ন হতে হবে। অন্যায় শাসককে মেনে নেয়া ছাড়া যুদ্ধ এড়ানোর কোন বিকল্প পথ তার সামনে খোলা থাকলো না। হুসাইন(রাঃ) তখন অনৈসলামিক জুলুমবাজ ও স্বৈর শাসকে মেনে না নিয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবর্তীর্ন হওয়াকেই শ্রেয় মনে করলেন। ১০ মহররম ক্ষুধা আর পিপাসায় কাতর ইমাম বাহিনী শাহাদাতের জন্যই তৈরি হলেন। মাত্র ৩২ জন ঘোড় সওয়ার আর ৪০ জন পদাতিক নিয়ে গঠিত হলো তার ক্ষুদ্র বাহিনী। ডান দিকে যুহাইর বিন কাইন আর বাম দিকে হাবীব বিন মুযাইর দু’জনকে দু দলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হলো। পতাকা দেয়া হলো ছোট ভাই আব্বাসের হাতে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও হুসাইন(রাঃ) যুদ্ধ এড়ানোর জন্য শত্রু বাহিনীর উদ্দেশ্যে এক মর্মস্পর্শী ভাষন দিলেন। কিন্তু তাতে শত্রুদের মন গললো না। রক্ত পিপাসু স্বৈরাচারী ইয়াযীদ বাহিনী তখন শক্তি প্রদর্শনের জন্য ব্যাকুল। ফলে যুদ্ধ হয়ে উঠলো অনিবার্য। সেনাপতি সাদ প্রথম ইমাম হুসাইন(রাঃ)-এর প্রতি তীর নিক্ষেপ করল। কিছুক্ষন মল্ল যুদ্ধ হলো, তারপর সর্বব্যাপি যুদ্ধ শুরু হলো। ইমাম বাহিনীর পক্ষে মুসলিম বিন আওসাজা সর্বপ্রথম শাহাদাতের নজরানা পেশ করলেন। ইমাম হুসাইন(রাঃ) মুসলিম বিন আওসাজার নিথর দেহের কাছে দাড়িয়ে বললেন “আল্লাহ তোমার উপর রহমত নাজিল করুন”। তারপর তিনি সুরা আহযাব থেকে তিলাওয়াত করলেন, নিষ্ঠাবান মুমিনদের কেউ কেউ শাহাদাত বরন করেছে, আর অন্যরা অপেক্ষায় আছে, কখন আল্লাহর পথে নজরানা পেশ করবে। তারা তাদের বিশ্বাসে কোন পরিবর্তন আনেনি। ইমামের ক্ষুদ্র বাহিনী বিশাল ইয়াযীদ বাহিনীর বিপক্ষে বীরত্বের সাথে লড়াই করে একে একে শাহাদাত বরন করতে লাগলো। হযরত হুসাইন অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেন। আর বলছিলেন “ওহে কুফাবাসী, তোমরা কি আমাকে হত্যা করার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেলে? আল্লাহর কসম আমার হত্যায় আল্লাহ যত অসন্তুষ্ট হবেন, আমার পর আর কোন বান্দার হত্যায় তত অসন্তুষ্ট হবেন না। সর্বশেষে সীমার বাহিনী চারিদিক থেকে ইমাম হুসাইন(রাঃ) কে ঘিরে ফেলল। যারয়া বিন শারীক তামিমী তলোয়ার চালিয়ে হুসাইন(রাঃ)’র বাহু বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তার কপালে তলোয়ার মারলো। সিনান বিন আনাস আশজায়ী তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে ধরাশায়ী করে ফেলল। সীমার তার মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করল। মধ্যাকাশে সেদিন সূর্য অস্ত গেল। মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম মর্মভেদী শাহাদাতের ঘটনা সংঘটিত হলো। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি চরম আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিষ্ঠিত হলো।

হুসাইন(রাঃ) কেন স্বপরিবারে জীবন দিলেনঃ

·         তিনি বুঝতে পেরে ছিলেন যে খিলাফত ব্যাবস্থার ধারাবাহিকতা বিপন্ন করে যে স্বৈরাচারী শাসনের সুচনা হলো তা কোন ভাবে মেনে নেয়া যায় না। খিলাফত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বিপন্ন হচ্ছে, তার প্রতিবাদ করাই ছিল ইমাম হুসাইন(রাঃ) শাহাদাত বরন করার প্রধান কারণ। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরে ছিলেন যে ইয়াযীদের সিংহাসন অরোহনের ফলে যে স্বৈরতন্ত্র সূচনা হবে তা ইসলামী খিলাফতের উদ্দেশ্য ও প্রকৃতির পরিবর্তন করে দিতে পারে। মূলত এর ফলে আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্বের ধারণা কেবলমাত্র মৌখিক স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পরল। তাই তিনি খিলাফত ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রয়োজনে  স্বপরিবারে জীবন বিসর্জনে অটুট থাকলেন।

·         খিলাফত রাষ্ট্রের আওতায় একজন শাসক প্রজাপালনের ব্যাপারে নিজেকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহী মনে করত। কিন্তু উত্তারাধিকার সুত্রে সিংহাসন দখল করে ইয়াযীদ ইনসাফের পরিবর্তে জুলুম, আল্লাহ ভীতির পরিবর্তে মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করা, অন্যায় ভাবে ক্ষমতা ধারণ, উচ্ছৃংখলতা, চরিত্রহীনতা, অপচয় আর বিলাসিতার স্রোত প্রবাহিত করে দিল। শাসকের চরিত্রে ও কাজে হালাল ও হারামের কোন পার্থক্য থাকলো না। মূলত একজন শাসককে অস্বীকার করাই ছিল ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত বরণ করার আর একটি কারণ।

·         তিনি মুসলিম উম্মাহকে এ শিক্ষাই দিয়ে গেলেন যে জালিম আর মানবতার শত্রু ইসলামের দাবীদার হলেও তাকে মেনে নেয়া যায় না। তাকে উৎখাত করার সংগ্রাম চলতেই থাকবে, হয় জালিম শাসক নিপাত যাবে অথবা মুজাহিদ শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে। তিনি এ চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন।

নব্য ইয়াযীদঃ

ইয়াযীদের চরিত্রে যে সকল বৈশিষ্ট্য ছিল আজকের মুসলিম ভূখন্ডে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত অধিকাংশ রাজা বাদশাদের চরিত্রে একই বৈশিষ্ঠ্য বিদ্যমান আছে। ইয়াযীদের মতো মুসলমান নামধারী, মদ্যপ, মাতাল, হালাল-হারমের প্রতি তোয়াক্কা বিহীন, বিলাসী, উচ্ছৃংখল, চরিত্রহীন শাসকরা আজও অধিকাংশ মুসলমি দেশে ক্ষমতায় বসে আছে। যে মদ্যপ, স্বৈরাচারী, অনৈসলামিক ইয়াযীদকে অস্বীকার করার জন্য ইমাম হুসাইন (রাঃ) জীবন দিলেন সে ইয়াযীদের উত্তরশুরীরা আজও স্বমহিমায় বদ্যিমান। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা প্রয়োজনে ইসলামের উপর খড়গ হানছে, ইসলাম বিরোধী নিয়ম-কানুন চালু করছে,  ইসলাম বিরোধী পশ্চিমা কুফর শক্তির সাথে আতাত করে ইসলামী ব্যবস্থা পূনঃপ্রতষ্ঠিার পথ রোধ করে দিচ্ছে। এসকল শাসকরা ক্ষমতায় বসে কেবলমাত্র তাদের প্রভূদের এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করে চলেছে। এ নব্য ইয়াযীদদের চিহ্নিত করতে পারলে আশুরার শিক্ষা এবং করনীয় কি তা পরিস্কার হয়ে যাবে। ইমাম হুসাইন (রাঃ) ভালবাসার কথা বললে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে আজকের নব্য ইয়াযিদদের চিহ্নিত করা ও অস্বীকার করা এবং তাদের উৎখাত করার জন্য প্রয়োজনে স্বপরিবারে আত্ম ত্যাগের জন্য তৈরি হওয়া।

বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত কারবালাঃ

যে কারবালায় ইমাম হুসাইন(রাঃ) জীবন দিলেন, আজ সারা পৃথিবীব্যাপী সে কারবালা বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের উপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, চারিদিক থেকে তাদের শৃঙ্খলিত করে ফেলা হচ্ছে, নির্বিচারে হত্য করা হচ্ছে, তাদের সম্পদ লুন্ঠিন করা হচ্ছে, ভূমি দখল করে নেয়া হচ্ছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগ্রসী তৎপরতা কেবলমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং পৃথিবীর সকল মুসলিম ভূখন্ডে বিস্তার লাভ করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান, কাশ্মির, প্যালেষ্টাইন, চেচনিয়া, ভলকান, গুজরাট, সুদান, উজবেকিস্তানে মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, মা বোনদের ইজ্জত লুন্ঠন করা হচ্ছে। পৃথিবীর যেখানে সত্যিকার ভাবে ইসলামী ব্যবস্থা  ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দেয়, সেখানেই পূঁজিবাদীরা বীনা অজুহাতে খড়গ হাতে হাজির হয়। আজকে মুসলমান ভূখন্ডে অকারণে আক্রমণ তারই সাক্ষ্য বহন করে। আজ অনৈসলামী শক্তির আক্রমন কেবলমাত্র কারবালার মরুভূমিতেই সীমাবদ্ধ নয় তা আজ পৃথিবীব্যাপী সকল মুসলিম ভূখন্ডে বিস্তার লাভ করছে।

আমাদের সমাজে আশুরাঃ

প্রতি বছর আমাদের জীবনে আশুরা আসে, আমরা শোকে বিহ্বল হই। এক শ্রেণীর লোক বুক চাপড়িয়ে রাস্তায় তাজিয়া মিছিল করে। কিন্ত যে আদর্শের জন্য হুসাইন (রাঃ) শাহাদাত বরন করলো তা তারা উপলদ্ধি করার চেষ্টা করেন না। কেবলমাত্র আদর্শ অনুসরণ বিহীন শোক যাত্রায় মহড়া দেয়। ইমামকে সত্যিকার ভাবে ভালবাসলে তার আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপন লড়াই করতে হবে। অন্যথায় রাস্তায় বুক চাপড়িয়ে লোক দেখানোর মহড়া দিলে, মানুষরা কেবল করুণা করবে। তাতে ইমামকে ভালবাসার দাবী পুরণ হবে না, তার আদর্শও কোন দিন বাস্তবায়ন হবে না।

আর এক শ্রেণীর লোক মুহররম পালনের নামে নানা রকম আলোচনায় সভা, সেমিনার ও ওয়াজ মাহফিলে নিজেদের ব্যাপৃত করে তোলেন। কিন্তু যে আদর্শহীন ভূইফোর অনেসলামী স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে ইমাম জীবন দিলেন, আজকের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সে সকল স্বৈরশাসকদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন না, তাদের অন্যায়কে উন্মোচন করেন না, এবং তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেন না। বরং এ জাতীয় আলোচকরা নব্য ইয়াযীদদের বাহবা কুড়ানোর জন্যই ব্যস্ত হয়ে থাকেন। আজকের ইয়াযীদদের চিহ্নিত না করতে পারলে এ জাতীয় আলোচনায় মহরমের কোনই তাৎপর্য বহন করে না।

আশুরার শিক্ষা ও আমাদের করণীয়ঃ

মুসলিম ভূখন্ডে শাসকের নামে নব্য ইয়াযিদরা ক্ষমতায় বসে আছে। যাতে ইসলামের আলো সমাজে বা রাষ্ট্রে পৌছতে না পরে, মানুষরা যাতে জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করতে না পারে তার সকল ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে ফেলা হয়েছে। ইমাম হুসাইনের (রা) উত্তরসুরীদের দায়িত্ব হচ্ছে নব্য ইয়াযীদদের অপসারণ করে আবার সত্যিকার ইসলামী আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের আনুগত্য করা। তাতে যদি সর্বোচ্চ ত্যাগেরও প্রয়োজন হলেও তার জন্য প্রস্তত থাকা।

পৃথিবী থেকে আজ সে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার সর্বশেষ নিশানাটুকু মুছে গেছে ১৯২৪ সনের ৩ মার্চ। তারপর পশ্চিমা পূঁজিবাদী শাসন-ব্যবস্থা দ্বারা মুসলমানদের আষ্টে-পিষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে, আমাদের ইসলামী আকিদা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে,  যাতে আমরা আবার ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার ছায়াতলে ফিরে না আসতে পারি তার সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হচ্ছে অত্যন্ত সুকৌসলে। যে খিলাফতের ধারাবাহিকতার জন্য ইমাম হুসাইন(রাঃ) জন্য জীবন দিলেন তাহলে তার উত্তরসূরীরা কি করে খিলাফতের অবর্তমানে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে? কি করে তারা অনৈসলামিক ব্যবস্থাকে মেনে নিয়ে ইমাম হুসাইন(রাঃ)কে ভালবাসার দাবী করতে পারে? আজ ইমাম হুসাইন(রাঃ) উত্তরসূরীদের দায়িত্ব হচ্ছে পূতিগন্ধময় পশ্চিমা পূজিবাদী শাসন-ব্যবস্থাকে মুসলমানদের জীবন থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করা এবং পৃথিবীতে আবার সে খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগের মহিমায়  উজ্জীবিত হওয়া। জীবনের সবটুকু হিম্মত দিয়ে এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করা। যতদিন এ খিলাফত ব্যবস্থা ফিরে না আসবে ততদিন প্রত্যেকটি মুমিনকে প্রয়োজনে ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর মতো ত্যাগের জন্য তৈরি হতে হবে। জীবনের সকল সময় আর সঞ্চয় বিলিয়ে বেড়াতে হবে খিলাফতের আগমন তরান্বিত করার জন্য। যারা ইমাম হুসাইন (রাঃ)'কে ভালবাসার দাবী করেন তাদেরকে অবশ্যই এ ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হবে। এ ত্যাগ স্বীকারের মধ্যেই নিহিত রয়েছে কারবালার আসল শিক্ষা। আল্লাহতায়ালা আমাদিগকে এ বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ  করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মোহাম্মদ আজিজুর রহমান খান