রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

খিলাফত শাসন ব্যবস্থার স্বরূপ ও রূপরেখাঃ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী, গণমুখী ও জবাবদিহিতামূলক সরকার ব্যবস্থা

যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেনতদনুযায়ী শাসন করেনা তারাই জালেম। (সুরা মায়েদা-৪৬)

সূচনা
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সূচনালগ্নে এদেশের জনসাধারণ অনেক স্বপ্ন দেখেছিলো। কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেসার-বিদ্যুৎ-ডিজেলের মূল্য হাতের নাগালে থাকবেশ্রমিকসহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেশিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হবেশিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান হবেস্বৈরশাসনকালীন ভয়াবহ দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবেসর্বোপরিবঞ্চিত হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বিগত ১৫ বছরের বিএনপি-আওয়ামী লীগের দুঃশাসন জনগণের সেই আশা-আকাংখাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। চলমান এই রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা সন্ত্রাসবোমাবাজিসীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট ছাড়া দেশবাসীকে আর কিছুই দিতে সক্ষম হয়নি। দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী আজও সকল মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। জনগণের দুর্দশার কোন পরিবর্তন তো ঘটেইনিবরং সংকট আরো গভীর হয়েছে।

এরই মধ্যে গত মার্চ ২০০৫ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও নির্বাচন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের আবশ্যকতা শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে ২০০৭ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন আন্দোলনের সূচনা করে। আর মার্চ ২০০৬ এ জাতীর নির্বাচন ২০০৭: জবাবদিহিমূলক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় সুশীল সমাজের উদ্যোগ” শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’ শিরোনামে এক বক্তৃতার মাধ্যমে নুতন আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করেন। আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম করে রেখেছে। আর জনগণ অপেক্ষা করছে তথাকথিত সিভিল সোসাইটির যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাড়ায় তা জানার জন্য। শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত এই আলোচনা দুটি চলমান শাসনব্যবস্থার দূর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এমন অবস্থায় শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন দাবী না করে প্রচলিত ব্যবস্থাকে জিইয়ে রাখার এই সব আন্দোলন জনগণকে পুনরায় ধোঁকা দেয়ারই আরেকটি ষড়যন্ত্র। মানুষ বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান চায়। হিযবুত তাহরীরবাংলাদেশের গণমুখী আন্দোলনের ফলে খিলাফত সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এই নিবন্ধে আমি চলমান রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক দূর্বলতা আলোচনা করার পাশাপাশি খিলাফত ব্যবস্থার স্বরূপ ও রূপরেখা উপস্থাপন করবো।

১৯৯০-২০০৬: মূল্যায়ন প্রয়োজনঃ
স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর বাংলাদেশে তিন তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। বিগত ১৫ বছরের শাসনব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান জাতিকে কি দিয়েছেআমরা কাদেরকে আমাদের শাসক হিসেবে পেয়েছিসেই একই বিএনপিএকই আওয়ামী লীগ। পালাক্রমে এই দুই দল ক্ষমতায় এসেছেতা যারাই প্রধান উপদেষ্টা আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার হোক না কেন। এই দুই দল দেশ পরিচালনায় যখন চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেতখন চাল-ডাল-চিনি-সার-ডিজেলের দাম বা বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের ঘাটতি ইত্যাদি গণমানুষের ইস্যু থেকে জনগণের চোখ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চলছে সংস্কার আন্দোলন ও যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন। কৃত্রিম ইস্যু তৈরীর মাধ্যেমে দেশবাসীকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই সম্মিলিত ও সচেতনভাবে বিভ্রান্ত করছে। তারা পালাক্রমে দেশের সম্পদ লুটেপুটে খাবেএ যেন এক অলিখিত চুক্তি।

বিগত দেড় দশকের বিএনপি-আওয়ামী লীগের শাসন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে এক চরম হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠে। আজ দেশবাসী মরু সাহারায় এবং ভুমধ্যসাগরে বাংলাদেশী যুবকের করুণ মৃত্যু প্রত্যক্ষ করছে। এই দেশের মানুষ আজ মরুভূমিতে পঁচে মরতে রাজীসাগরে না খেয়ে মরতে রাজী। প্লেনের চাকায় নিজেকে বেঁধে অথবা ডিপফ্রিজের মধ্যে ঢুকে হলেও এদেশ থেকে মানুষ পালাতে চায়। দেশের এই অবস্থার জন্য দায়ী বিএনপি-আওয়ামী লীগের দেশ শাসনে ব্যর্থতা। বর্তমান শাসনব্যবস্থার নিম্নবর্ণিত অন্তর্নিহিত উপাদানের কারনেই আজ দেশবাসীর এই করুণ অবস্থা:

১. সার্বভৌম ক্ষমতার অপপ্রয়োগ তথা স্বেচ্ছাচারিতাঃ
জাতি একজন স্বৈরশাসকের বদলে এখন তিনশ স্বৈরশাসককে দেখছে। এই তিনশ স্বৈরশাসক যা ইচ্ছা তাই করতে পারেকারণ তারাই আইন প্রণেতা। তারা নিজের ইচ্ছামত আইন তৈরী করতে পারেন অথচ নিজেরা সকল আইনের উর্ধ্বে। তারা ইচ্ছামত কোটি কোটি টাকার টেলিফোন বিল বকেয়া রাখতে পারেন। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যক্তিগত আপ্যায়ন বাবদ খরচ করতে পারেন। কোটি টাকার শুল্কমুক্ত গাড়ী আমদানী করে ব্যবসা করতে পারেন। বেকার ও দরিদ্র জনগণকে তোয়াক্কা না করে নির্লজ্জের মতো নিজেদের বেতনভাতা বাড়িয়ে নিতে পারেন। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত এই তিনশ নীতিনির্ধারকরা যা বলবেনতাই সমগ্র জাতির জন্য আইন।

২. চরম দায়িত্বহীনতাঃ
সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হওয়া সত্ত্বেও এই আইন প্রণেতারা কোন কিছুর দায়িত্ব নেননা। লঞ্চ ডুবিতে মানুষ মারা গেলে অথবা সন্ত্রাসীর গুলিতে শিশু মারা গেলে আমাদের বলা হয় আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের দাবী উঠলে আমাদের শুনতে হয় মার্কেট ইকোনমি বা বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব যেখানে সরকারের কোন দায়-দায়িত্ব নেইবাজার অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহ ঠিক করবে পণ্যের মূল্য। উল্টো জনগণকে বাধাকপি খেয়ে থাকতে বলা হয়। আর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী ধসে পড়লে এবং আগুনে পুড়ে শ্রমিক মারা গেলে সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে কখনো দেখা যায় না।

৩. জবাবদিহিতার চরম অভাবঃ
সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে শাসকগোষ্ঠী দায়িত্ব তো কাঁধে নেয়ইনাউপরন্তু তাদেরকে কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হয় না। কারো কাছে তারা দায়বদ্ধ নন। অনেকে মনে করেন যেতথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠীকে পাঁচ বছর পর পর তো জনগণের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বলে কি তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধবাস্তবতা বলেকখনোই নয়। শাসনকালে হাজারো অন্যায় করলেও ভোটের সময় জনগণকে কালো টাকার বন্যায় ভাসিয়ে ও মাস্তানের ভয় দেখিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ই ক্ষমতায় যেতে পারঙ্গম। শাসকগোষ্ঠীকে কখনোই সত্যিকার অর্থে জনগণের মুখোমুখি হতে হয় না। এরাই হলো আমাদের যোগ্য প্রার্থী !

দায়দায়িত্বহীনজবাবদিহিতাবিহীন সার্বভৌম ক্ষমতা মানুষের হাতে অর্পণ করা হয় যে শাসনব্যবস্থায়তার বিগত ১৫ বছরে ফল আর কি হতে পারেসন্ত্রাসমাস্তানিচাঁদাবাজি দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছেদুর্নীতিতে স্বাভাবিকভাবে আমরা বিশ্বসেরাখুন আর ধর্ষণের মতো অপরাধের কোন বিচার কেউ পায়নাসুবিধাবাদীরা নির্বিবাদে লুটপাট আর স্বার্থের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে আর জনগণ হয়েছে রাজনীতিবিমুখ। চুড়ান্ত বিচারে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যেপ্রচলিত শাসনব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হচেছ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল - তা যে কোন উপায়েই হোক না কেন। মানবরচিত আইনপ্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থা শুধু কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকেই লাভবান করে। আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হয় জুলুমের শিকারঅধিকার বঞ্চিত। যতই সংস্কার হোক না কেনযতই যোগ্য প্রার্থী আসুক না কেনফলাফল একটিই - বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগের পূনরায় ক্ষমতায় আরোহণ। আজ দেশবাসী এই দুই দলের দায়িত্বহীনতাপ্রতারনা ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে মুক্তি চায়তাদের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি চায়। এদেশের মজলুমনিপীড়িতঅধিকার-বঞ্চিত মানুষ তাদের মৌলিক সমস্যার সমাধান চায়। প্রচলিত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে বিকল্প শাসনব্যবস্থা চায়। আর বৃহত্তর জনগণের চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের প্রতিফলনই হচ্ছে ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফত সরকার ব্যবস্থা।

ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি
ল্লাহ সুবহানাহুওয়াতায়ালা মানুষ ও বিশ্বজগৎ সৃষ্টির সাথে সাথে মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দিয়েছেন খিলাফত শাসন ব্যবস্থা। আমি এখন প্রচলিত শাসনব্যবস্থার যে তিনটি ত্রুটি ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছেতারই প্রেক্ষিতে ইসলামের শাসনব্যবস্থার মূলনীতি তুলে ধরবো।

১. সার্বভৌম ক্ষমতা তথা আইন তৈরীর অধিকারঃ
ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রধানতম মূলনীতি হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহুওয়াতায়ালা। তিনিই একমাত্র আইন প্রনেতা।

ল্লাহ্ সুবহানাহুওয়াতায়ালা বলেছেন:

ল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যেতিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না।” (সূরা ইউসুফ-৪০)

কিন্তু নাতোমার প্রতিপালকের শপথ। তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনাযতক্ষন না তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার তোমার উপর ন্যস্ত করে।” (নিসা-৬৫)

ল্লাহ্ ও তার রাসুল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা কোন মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার থাকবে না।” (আল-আহযাব-৩৬)

হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করতবে তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহআনুগত্য কর রাসুলের এবং তাদেরযারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারীকোন বিষয়ে তোমরা যদি বিবাদে লিপ্ত হওতাহলে তা উপস্থাপন কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট।” (নিসা-৫৯)

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

তোমাদের কেউ ততক্ষন পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে নাযতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমি যা আনয়ন করেছি তার অনুগত হয়।

সুতরাংইসলামী রাষ্ট্রে খলিফা নিজে কোন আইন তৈরী করতে পারবেন না। তাই তার স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী হবার কোন সুযোগ নেই। ইচ্ছামত নিজের বেতন বাড়িয়ে নেয়াকোটি টাকার গাড়ীর ব্যবসা করালক্ষ লক্ষ টাকার বিল বকেয়া রাখা ইসলামী রাষ্ট্রে সম্ভব নয়।

২. দায়িত্ব পালনঃ
একই ভাবে দায়িত্বের দিক থেকে জনগণের সমস্ত মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব খলিফার।

রাসুল (সাঃ) বলেছেন:

সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।” ইমাম (খলীফা) যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনিও দায়িত্বশীলতাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।

রাসুল (সাঃ) হাদীসে মানুষের তিনটি অধিকারের কথা বলেছেন : খাদ্যবস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার ।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর ভাষণে বলেছিলেন:

তোমাদের দুর্বলতম ব্যক্তি আমার কাছে সর্বাপেক্ষা শক্তিমানআমি তার নিকট তার হক পৌঁছিয়ে দিবই। আর তোমাদের শক্তিধর ব্যক্তিও আমার নিকট দুর্বলআমি তার থেকেও হক আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।

এভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা মানুষের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি মানুষের মৌলিক চাহিদা অবশ্যই পূরণ করবেন। আর মৌলিক চাহিদা পূরণের পরেই অন্যান্য চাহিদা পূরণের দিকে রাষ্ট্র নজর দিবে। সুতরাং খিলাফত ব্যবস্থা প্রকৃতিগতভাবেই গণমুখী।

৩. জবাবদিহিতাঃ
খলিফা তার নিজের কাজের জন্য আল্লাহর কাছে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। রাসুল (সাঃ) বলেছেন:

মুসলিম প্রজাদের দায়িত্বশীল কোন গভর্নর যদি তাদের ওপর যুলুম করে এবং তাদের হক আদায়ের ব্যাপারে খিয়ানত করে মারা যায়তাহলে আল−াহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিবেন।

তিনি আরো ইরশাদ করেন:

যাকে আল্লাহ তাআলা প্রজাদের উপর শাসক বানিয়েছেন সে যদি তাদের পূর্ণাঙ্গভাবে কল্যাণ কামনা না করেতবে জান্নাতের ঘ্রাণও তার নসিব হবে না।

এভাবে খলিফা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকেন। খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রাঃ) বলেছিলেনযদি ফোরাতের তীরে বকরির একটি বাচ্চাও হারিয়ে যায়তবে আমার ভয় হয় হয়তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সে সম্বন্ধে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ তথা মুসলিম ও অমুসলিম সকল নাগরিককে সব সময় সচেতন থেকে খলিফার কাছ থেকে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ইসলাম জোর দেয়।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,

জালিম শাসকের সামনে হক কথা বলা উত্তম জিহাদ।

তিনি (সাঃ) আরো বলেন,

শহীদদের সর্দার হামযা (রাঃ) এবং ঐ ব্যক্তিওযে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।

খিলাফত ব্যবস্থার স্বরূপ
ইসলাম রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু মূলনীতিই দেয়নিবরং একটি পরিপূর্ণ ও বাস্তবায়নযোগ্য সরকার কাঠামোও দিয়েছে। খিলাফত সরকারের কাঠামো আটটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। খিলাফত সরকার ব্যবস্থার রূপরেখা নিম্নরূপ:

ইসলামী আদর্শভিত্তিক খিলাফত সরকার কাঠামোর মধ্যেই অর্ন্তনিহিত আছে জনপ্রতিনিধিত্ব এবং জবাবদিহিতা। বাস্তবতায় কিভাবে খিলাফত এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করেতা এবার আলোচনা করব।



১. খলিফা নির্বাচনঃ
খিলাফত ব্যবস্থা রাজতন্ত্রস্বৈরতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্র নয়। খলিফা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ইরশাদ করেনতিন ব্যক্তিও যদি কোন উন্মুক্ত ময়দানে থাকেতাহলে আমীর ব্যতীত চলা তাদের জন্য জায়েয নয়বরং নিজেদের মধ্য থেকে তারা একজনকে আমীর নিযুক্ত করবে।

সুতরাংইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণ তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধান তথা খলিফা নির্বাচন করবেন। খলিফা যেহেতু নিজে কোন আইন তৈরী করতে পারবেন নাতাই তার স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী হবার কোন সুযোগ নেই। খলিফা জনগণকে অভুক্ত রেখে ইচ্ছামত নিজের বেতন বাড়াতে পারবেন না অথবা তেল-গ্যাস-বন্দর আমেরিকা ও ভারতের হাতে তুলে দিতে পারবেন না। তার একমাত্র কাজ কুরআন ও সুন্নাহ মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করামানুষের দেখাশুনা করা এবং মানুসের সমস্যা সমাধান করা। এটাকে তিনি ইবাদত হিসেবে দেখবেন।

২. পরামর্শ সভাঃ
খলিফাকে পরামর্শ দেয়াঅভিযোগ করা ও অধিকার আদায়ের জন্য জনগণ পরামর্শ সভার প্রতিনিধিও নির্বাচন করবে। নারী-পুরুষমুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিক ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন এবং নির্বাচিত হতে পারবেন। জনপ্রতিনিধিবৃন্দ খলিফাকে শাসন সংক্রান্তশিক্ষাস্বাস্থ্যকৃষিঅর্থনীতিশিল্প এমনকি পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সম্পর্কেও পরামর্শ দিবেন। পরামর্শ সভার অন্যতম দায়িত্ব খলিফাকে জবাবদিহি করা। শুধু তাই নয় পরামর্শ সভা রাষ্ট্রীয় যেকোন কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কে অভিযোগ আনতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে খলিফা তাৎক্ষনিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পদচ্যুত করতে বাধ্য।

৩. স্বাধীন নির্বাচন কমিশনঃ
নির্বাচন কমিশন খলিফার অধীনে থাকবেনাপরামর্শ সভার অধীনে থাকবে। যেহেতু পরামর্শ সভায় দলভিত্তিক বিভক্তি থাকবে নাতাই নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থী বাছাই জনগণের প্রতিনিধি দ্বারা স্বাধীনভাবে সম্পন্ন হবে। এই ব্যবস্থায় প্রতিনিধি সভার সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন খলিফার প্রভাবমুক্ত থাকবে। নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোন বিরোধ ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত (Court of Unjust Act) নিষ্পন্ন করবেন। আদালত যেকোন নির্বাচনকে তদন্ত সাপেক্ষে অবৈধ ঘোষণা দেয়ার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন।

৪. খলিফা পদপ্রার্থীর যোগ্যতাঃ
শুধুমাত্র ইসলামী ব্যক্তিত্ববিশেষ করে যিনি বিশ্বাসযোগ্য (Trustworthy)দুর্নীতিপরায়ন নয় এবং পদের যোগ্য (Competent/Capable for the Post)কেবলমাত্র তারাই খলিফা পদপ্রার্থী হতে পারেন। পরামর্শ সভা এই যোগ্যতা যাচাই বাছাই করে তবেই খলিফা পদপ্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করবেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ঋণখেলাপীকালো টাকার মালিকক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতি পরায়নসে কখনোই খলিফা পদপ্রার্থী হতে পারবে না।

৫. খলিফার শাসনের সময়সীমাঃ
খলিফা এই শর্তাবলী পূরণ করে কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী যতদিন জনগণকে শাসন করবেনততদিন তিনি এই পদে আসীন থাকবেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যেবর্তমান ব্যবস্থায় পাঁচ বছরের একটি সীমাবদ্ধতা আরোপ করা আছে। এর পেছনে যুক্তি হচ্ছে পাঁচ বছর পরে আবার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসতে হবে তথা এই প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। বাস্তবতা হচ্ছে পাঁচ বছরে সীমাহীন দুর্নীতি আর লুটপাট হয়সময় যত কমতে থাকেদুর্নীতি আর লুটপাটে ক্ষমতাসীনরা ততই মরিয়া হয়ে উঠে। এর আরেকটি দিক হচ্ছে দুর্নীতি করলে জনগণ পরদিনই ক্ষমতাসীনদের বিদায় করতে পারছেনা। অথচ ইসলামী ব্যবস্থায় খলিফা দুর্নীতি-লুটপাট তথা কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী কোন কাজ করলে পরদিনই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আর খলিফা ভাল কাজ করলে তাকে সরানোর কোন প্রয়োজন নেই। এই ব্যবস্থা সরকারের মধ্যে স্থিতিশীলতা দেয় যা উন্নয়ণের পূর্বশর্ত।

৬. স্বাধীন বিচার বিভাগঃ
ইসলামী রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালত (Court of Unjust Act, মাহকামাতিল মাযালিম)যেখানে জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। এই আদালতে জনগণ খলিফাসহ সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জুলুমের প্রতিকার এবং অধিকার আদায়ের জন্য মামলা করতে পারবেন। এই আদালতের বিচারক খলিফাসহ যে কোন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদচ্যুত করতে পারবেন। খলিফার বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সময়ে এই আদালতের বিচারককে পদচ্যুত করা যাবেনা। অভিযোগ ব্যাতিরেকে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যেকোন ধরনের জুলুম আমলে আনতে পারবেনতদন্ত ও রায় দিতে পারবেন।

৭. রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বঃ
ইসলামী রাষ্ট্রে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকতে পারে। এই রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ হবে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ।

ল্লাহ্ সুবহানাহুওয়াতায়ালা বলেছেন:

তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিতযারা কল্যানের প্রতি আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম।” (সুরা আলি ইমরান-১০৪)

সুতরাং এই দলগুলোর মূল কাজ হচ্ছে খলিফা তথা শাসকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখী করা। রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য কোন অনুমতিরও প্রয়োজন নেই।

৮. স্থানীয় প্রতিনিধি সভাঃ
প্রত্যেক প্রশাসনিক অঞ্চলে একটি করে স্থানীয় প্রতিনিধি সভা থাকবে যা ঐ অঞ্চলের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। আঞ্চলিক গভর্নর ও প্রশাসনকে জবাবদিহি করাই এই প্রতিনিধি সভার দায়িত্ব।

উপসংহারঃ
এটা স্পষ্ট যে প্রচলিত রাজনীতি স্বার্থের রাজনীতিলুটপাটের রাজনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতি। কে কার সাথে জোট করবে বা কে কিভাবে জোট ভাঙ্গবেসবাই সে হিসাব নিকাশে ব্যস্ত। অন্যদিকে ইসলামের রাজনীতি দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন করার রাজনীতিজবাবদিহিতার রাজনীতিমানুষকে সৎ পরামর্শ দেয়ার রাজনীতি। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ ইসলামী আদর্শরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শারীয়াহ্ আহকামেরই প্রতিফলন। একমাত্র আল্লাহ সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রেই জনগণের প্রতিনিধিত্বকারীগণমুখী ও জবাবদিহিতামূলক সরকার ব্যবস্থা সম্ভব। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আজকে রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিদের অর্থহীন স্লোগান মাত্র। রাজনীতিবিদরা মানৃষের ভাগ্য নিয়ে এতটা ছিনিমিনি খেলছে যে একটি চিঠির উত্তর দিতে আজকাল কমিটি গঠন করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান লুটপাটের রাজনীতি টিকিয়ে রেখে যে রূপকল্প ২০২০ তৈরীর উদ্যোগ নেয়া হয়েছেসেটাও মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন আনতে পারবেনাতা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আজকে তাই প্রয়োজন ইসলামের শাসনের দাবীতে গণআন্দোলন। সচেতন জনগণকে এই দাবীতে মাঠে নেমে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান ব্যবস্থার পতন ঘটাতে হবে। তবেই জনগণের মুক্তি নিশ্চিত হবে।

মহিউদ্দিন আহমেদ
এপ্রিল ৬২০০৬

বুধবার, ৯ মে, ২০১২

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ১

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

সূচনা

সকল প্রশংসা জগতসমূহের অধিপতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি এবং সালাম পেশ করছি রাহমাতুল্লীল আলামীন ও সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহম্মদ (সা), তাঁর পবিবার ও তাঁর সাহাবীদের প্রতি এবং যারা বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত তাঁকে ইহসানের সাথে অনুসরণ করবেন তাদের প্রতি। অত:পর,

- 'ইসলামের দাওয়াত' শীর্ষক এই বইয়ে আমরা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। এই বিষয়টি ব্যাপক, অনেক শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত ও চিন্তাগ্রাহ্য। এটা এমন এক পথ যা কুসুমাস্তীর্ণ নয় বরং বন্ধুর। আমাদের পূর্ববর্তী আলেম ও মুজতাহিদগন (র) ইবাদত, মুয়ামালাত, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদির মত এত ব্যাপকভাবে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেননি। 'ইসলামের প্রতি আহবান' এর যে দিকটি নিয়ে আলোচনা বেশী আবর্তিত হয়েছে তা হল, 'আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার' অর্থাৎ 'সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ' ও ব্যক্তিপর্যায়ের দাওয়াত। কারণ তাদের বাস্তবতা এই রকম ছিল না যে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা সমূলে উৎপাটিত হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, শরীয়াহ পরিত্যাক্ত হয়েছে এবং দারুল ইসলাম দারুল কুফর দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে তারা গবেষণা করতে পারেন না কেননা মুজতাহিদগন কেবলমাত্র বাস্তবে উদ্ভুত সমস্যাই বিবেচনা করেন, কোন আপাত বা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে নয়।

অতএব এই বইয়ে আমরা উক্ত বিষয়ে আলোকপাত করব। আমরা বলতে চাচ্ছি না এটা পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক। তবে এটা অবশ্যই এ বিষয়টিকে প্রবৃত্তির অনুসরণ, যথেচ্ছাচার, অতিরঞ্জিত চিন্তাচেতনা, কুফরের অন্ধ অনুকরণ ইত্যাদি থেকে ইসলামী শরীয়ার মূল ভিত্তির দিকে ফিরিয়ে নেয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

- দাওয়াতের ফরযিয়্যাত ও মানদুব (সুন্নাহ) বিষয়সমূহ আলোচনার চেয়ে এই বইয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতি নিয়ে বরং বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ বর্তমানে অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতিগত জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

বইটিতে মূলত 'খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের পদ্ধতি' নিয়েই আলোচনা করা হবে। কারণ আজকের দিনে দাওয়াত বহন করবার ক্ষেত্রে এটাই দাওয়াতের মেরুদন্ড হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন আর অস্তিত্বশীল নয়- এই বাস্তবতায় আজকের দিনে যখন কোন ইসলামী আহ্বানের শীর্ষে খিলাফত রাষ্ট্র পুণ:প্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকে অথবা এটিকে মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত না করা হয় তখন বুঝতে হবে সে আহ্বান আংশিক অথবা বিচ্যুত।

- বইটি 'ইসলামের দাওয়াত' নিয়েই মূলত আলোকপাত করবে এবং 'দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি' বিশেষ করে 'ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি'র উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করবে -যা ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ থেকে উৎসারিত। সেসব মৌলিক বিষয়গুলোও সংক্ষেপে উল্লেখ করা হবে, যদিও এসব মৌলিক বিষয় এই বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য নয়। যেমন:

১. ইসলামী আক্বীদার স্পষ্টতা ও বিশুদ্ধতা - যা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

২. ইসলামী আক্বীদার মধ্যে যন্ (অনুমাননির্ভরতা) বা ন্যূনতম যন্ এর সুযোগ নেই বরং তা হতে হবে ক্বাতঈ (সুনির্দিষ্ট ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী) হতে হবে। এক্ষেত্রে ত্বাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণের সুযোগ নেই। যদি তা না করা হয় তাহলে মুসলিমগন কুসংস্কারকে গ্রহণ করবে ও প্রবঞ্চণার মধ্যে পতিত হবে।

৩. আক্বীদার সাথে সর্ম্পকযুক্ত চিন্তার (ভিত্তিসমূহের শাখা) ক্ষেত্রে যৎসামান্য পরিমাণে যন্ বা অনুমাননির্ভরতা এবং ত্বাকলীদ বা অনুকরণ অনুমোদনযোগ্য। শরীয়াহ'এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

৪. শরীয়াহ'র আইনকানুন সমূহ সরাসরি শরীয়াহর দলিল এর উপর ভিত্তি করে গ্রহন করতে হবে অর্থাৎ কোরআন, সুন্নাহ, সাহাবাগনের ইজমা (ঐকমত্য), শরীয়াহর বর্ণণা থেকে আসা শরই ইল্লাত (ঐশী কারণ) এর উপর ভিত্তি করে কিয়াস। শরীয়াহ'র দলিল থেকে কেবলমাত্র মুজতাহিদ হুকুম বের করে নিয়ে আসেন। আর মুক্বাল্লিদ (অনুসরণকারী) কে সুনিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি যে মুজতাহিদের অনুসরণ করেন তার বক্তব্য তিনি বুঝতে পারছেন।

৫. যদি বাধ্যবাধকতার সংখ্যা অনেক বেশী হয়ে যায় এবং সবগুলো পালন করা মুসলমানের জন্য কঠিন হয়ে যায় বা তিনি অপারগ হন, তাহলে তাকে অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বাধ্যবাধকতাটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। (এটাও শরীয়া দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে, ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী বা পছন্দের ভিত্তিতে নয়)

- যখন মুসলিমগন স্বাভাবিক অবস্থায় আছে, অর্থাৎ যখন ইসলামী খিলাফত রয়েছে তখন 'আমর বিন মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার' করা এবং রাষ্ট্রের ভেতরকার অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বানের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণভাবে দাওয়াতী কাজ করা হবে। আর রাষ্ট্রের বাইরের অমুসলিমদের প্রামাণ্য দলিল সহকারে ইসলামের দিকে আহ্বান করা হবে। এবং এটা করা হবে খলীফার বিবেচনা অনুসারে জিহাদের মাধ্যমে।

আর যখন মুসলিমগন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থাকবে, অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই তখন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে ইসলামী দাওয়াতের কাজ করতে হবে। মুসলমানদের সংস্কার সাধনের জন্য তখন মারুফের আদেশ-মুনকারের নিষেধে, এবং অন্যদিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য অমুসলিমদের আহ্বানের কাজটি তখন সঙ্কীর্ণ পরিসরে চলবে। কারণ যখন ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য মুসলিম ভূমিসমূহতে কোন রাষ্ট্র বা কর্তৃত্ব না থাকে তখন সেটি দারুল কুফর হয়ে যায়। তখন মুনকার সংঘটনের বিষয়টি একটি রীতিতে পরিণত হয় এবং সেকারণে সংস্কার সাধনের আংশিক কাজটি অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত হয়ে যায়। আমূল পরিবর্তনের কর্মকান্ড তখন শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা হয়ে যায়-যা কুফর ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ইসলামী ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করবে। [খিলাফত অনুপস্থিত থাকা অবস্থায়] মুসলিম ভূমির বাইরে অমুসলিমদের দাওয়া করাকে বুঝায় তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেয়া। অনৈসলামী চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং মুসলিম ভূমির বাইরে অবস্থানরত মুসলমানদের প্রচেষ্টাসমূহকে একীভূতকরণের দ্বারা মুসলিম ভূমিতে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

- ইসলামের দাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত যে কোন বইয়ে দাওয়াতের মৌলিক নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত। এগুলো নিম্নরূপ:

১. খিলাফতের জন্য কাজ করা এখন ফরযে আইন (প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয)। এর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ ও কর্মতৎপরতা সৃষ্টি করা একান্ত কর্তব্য।

২. একাজটি দলগতভাবে হতে হবে এবং ব্যক্তিগতভাবে করবার কোন সুযোগ নেই।

৩. এই দলের একজন আমীর থাকবেন যিনি শরীয়া প্রদত্ত ক্ষমতায় বলীয়ান - যার আওতার মধ্যে তাকে মান্য করা হবে।

৪. এই দলে পুরুষ ও নারী উভয়ই থাকবে, কেননা দাওয়াত বহন করার ব্যাপারে উভয়ই দায়িত্বশীল।

৫. এই দলের সদস্যদের বন্ধনের ভিত্তি হবে ইসলামী আক্বীদা ও চিন্তা।

৬. দলটিকে তার কর্মকান্ডের জন্য অবশ্যই ইসলামী চিন্তা, নিয়ম কানুন ও মতামতকে গ্রহণ করবে এবং তাদের আনুগত্য থাকবে আদর্শের প্রতি, কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়।

৭. দলটি অবশ্যই রাজনৈতিক হবে, কারণ এর কাজ হল রাজনৈতিক - যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতায় যাবে।

৮. দলটির কাজ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক; সহিংস (Violent) কোন কর্মকান্ডের সাথে এর সম্পৃক্ততা থাকবে না। কারণ ইসলামের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনমত তৈরি করে জনগনের সহায়তায় ক্ষমতায় আসাই এ দলের কাজ।

৯. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার সাথে কোনরকম ক্ষমতার অংশীদার হওয়া এ দলের জন্য নিষিদ্ধ।

১০. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার উপর যে কোন ধরনের নির্ভরশীলতা এ দলের জন্য নিষিদ্ধ। কুফর ব্যবস্থা থেকে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য বা নির্ভরশীলতা অবশ্যই বর্জনীয়।

- একইভাবে, ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন একটি বইতে দাওয়াত বহন করার পদ্ধতি বিষয়ে আহকামে শরীয়াহ আলোচিত হওয়া উচিত, যেমন:

১. বাস্তব মূলনীতির (Practical Principal) অনুসরণ - দাওয়াতের কাজ অন্তসারশূন্য হবে না, বরং সুচিন্তিত হবে। আর এই চিন্তাও কেবলমাত্র অনুমাননির্ভর হবে না, বরং তা আসবে বাস্তব উপলদ্ধি থেকে। এই চিন্তার সাথে কাজ যুক্ত করে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হতে হবে। এই লক্ষ্য, কর্মকান্ড ও চিন্তা সবই ইসলাম থেকে উৎসারিত হতে হবে। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল ইসলামিক আক্বীদার ভিত্তিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটা দাওয়াত বহনকারীকে ঈমানের পরিবেশে রাখে, তাকে উদ্দীপনা দেয় এবং নিয়ন্ত্রনে রাখে।

২. পদ্ধতি ও উপকরণের পার্থক্য সুস্পষ্ট হতে হবে। তরীকাহ বা পদ্ধতি হল শরীয়াহর আহকাম-যা ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ঊসলুব বা উপকরণ হল মুবাহ-যা পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুসারে দাওয়াত বহনকারী গ্রহণ করতে পারে।

৩. আহকামে শরীয়ার মতই রাজনৈতিক বাস্তবতার জ্ঞান অপরিহার্য। এর কারণ হল হুকুম শরীয়াহ প্রয়োগ করতে হলে হুকুমে শরীয়াহ ও এর বাস্তবতা বা মানাত (যে বাস্তবতার জন্য হুকুমটি এসেছে) সর্ম্পকে জ্ঞান থাকা দরকার। কেউ যদি শরীয়াহর হুকুম জানে কিন্তু মানাত না জানে, তাহলে সে তা প্রয়োগে ব্যর্থ হবে। এবং আমরা যদি তা বাস্তবায়ন করতে যাই, তবে আমরা ভুল করে ফেলব কারণ আমরা এ হুকুমের বাস্তবতা হতে কোনো পৃথক বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করে ফেলব। যারা বর্তমান ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চায় তাদেরকে অবশ্যই কেবলমাত্র আভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখতে হবে।

৪. কেউ কেউ ভাবতে পারেন, খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কেবলমাত্র ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালালেই হবে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। বরং প্রথমে সাধারণ জনগনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। দাওয়াত যখন চিন্তা বিকাশের স্তর থেকে গনসংযোগের পর্যায়ে যাবে এবং সফলভাবে জনগনের সাথে সংযোগ স্থাপনে সমর্থ হবে ও সাধারণ সচেতনতা থেকে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরি হবে তখন দলটি ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বশীল লোকদের কাছে নুসরাহ চাইবে।

৫. শরীয়াহ একাধিক কুতলাহ বা দল অনুমোদন করে। তবে শর্ত হল তারা অবশ্যই ইসলামী আক্বীদা ও শরীয়ার ভিত্তিতে গঠিত হবে।

৬. যদি একের অধিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থেকে থাকে তবে, তাদের প্রত্যেককেই শরীয়াহ হুকুমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যেন তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যগুলো আদাব আল ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যের নিয়মানুযায়ীই হয়ে থাকে। কোন বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হলেই একজন মুসলিম অপর মুসলিমকে কুফর বা সীমালঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করবে - এ বিষয়টি অনুমোদিত নয়। কোন মতামতের পক্ষে দূর্বল বা শক্তিশালী দলীল বা দলীলের সাথে সাদৃশ্যতা (শুবহাত আদ দলীল) থাকলে এটি একটি আইনসঙ্গত মতামত। এ ধরনের মতামত অবলম্বনকারীদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করা যাবে না। দূর্বল দলীল বা দলীলের সাদৃশ্যতার ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, আপনার মতামত ভুল বা দূর্বল এবং তার সাথে উত্তম নসীহত সহকারে প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারি। যদি কোন মতামতের শরীয়াহভিত্তিক দলিল না থাকে অথবা সাদৃশ্য না থাকে তাহলে সে মতামতটি অনৈসলামিক (কুফরী মতামত) হবে। সেক্ষেত্রে এই মতামতের বিরুদ্ধাচরণ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না এবং এ মতাবলম্বীদের এ ব্যাপারে সাবধান করে দেয়া উচিত (যদিও সবসময় কুফরী মতামত অবলম্বনকারীরা কাফের নয়)।

৭. যেসব শাসক ইসলামী শরীয়াকে পরিত্যাগ করে এবং চাপ প্রয়োগ না করা সত্ত্বেও অন্য আইন দিয়ে শাসন করে, তাদের অধিকাংশই কাফির-যদিও তারা সালাত আদায় করে, রোজা পালন করে, হজ্জব্রত পালন করে এবং মুসলিম বলে দাবি করে। এর কারণ হচ্ছে তারা ইসলামী আইন না নিয়ে কুফরী আইনকে গ্রহণ করেছে। যদি তারা বিশ্বাস করে যে ইসলামী শরীয়াহ হল সর্বশ্রেষ্ঠ আইন এবং তারা সাময়িকভাবে খেয়ালের বশবর্তী হয়ে তা পরিত্যাগ করে তবে সে জালিম হবে, কিন্তু কাফের হবে না। সে কারণে একজন দাওয়াত বহনকারী কখনওই এ ধরনের শাসককে মেনে নেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন না, সমর্থন ব্যক্ত করতে পারবেন না, এমনকি তার ব্যাপারে নীরবতা পালনও করতে পারবে না। কারণ এ ব্যাপারে যে প্রসিদ্ধ হাদীসটি রয়েছে, তা হল:

"তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।" (মুসলিম, তিরমিযী)

- ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন কোন বই দাওয়াতী কাজে রাসুলুল্লাহ (সা) এর অনুসরণ করার ব্যাখ্যায় নিম্ন লিখিত কিছু ইস্যু তুলে ধরবে:

১. রাসূলুল্লাহ (সা) কাফেরদেরকে ইসলামে প্রবেশ করবার জন্য আহ্বান জানাতেন। আর আমরা এখন অধিকাংশক্ষেত্রে মুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাই।

২. রাসুলুল্লাহ (সা) এমন এক সময়ে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন যখন পুরো শরীয়াহ অবতীর্ণ হয়নি। এখন আমাদের সামনে সম্পূর্ণ শরীয়াহ রয়েছে। তার মানে রাসূল (সা) অবতীর্ণ না হওয়ার কারণে অনেক হুকুম মক্কায় পালন করতে পারেননি। কিন্তু আমাদেরকে এগুলো মেনে চলতে হবে। আবার কিছু আইন তিনি মেনে চলেছেন যেগুলো পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে। সে কারণে সেই রহিত আইনসমূহ আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়। যেমন: মক্কায় জিহাদ আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু এটা এখন বৈধ (রক্ষণাত্নক জিহাদ আজকে আমাদের উপর ফরয এবং এটা রাষ্ট্র না থাকলেও করা যাবে। কেননা এই ধরনের জিহাদের সাথে রাষ্ট্র বা খিলাফত থাকার বিষয়টি বিজড়িত নয়) মক্কায় কেবলমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতের কাজ করা ফরয ছিল, কিন্তু সাহাবাদের জন্য এটা মানদুব ছিল, যেহেতু তখন তারা তাঁর প্রতি কেবল নারীদের বাইয়াতের অনুরূপ বাইয়াতে আবদ্ধ ছিলেন। এ অবস্থা চলতে থাকে যতদিন না দ্বিতীয় আকাবার শপথে আওস ও খাযরায গোত্র বায়াত প্রদান করে। এর পর থেকে শুধুমাত্র রাসূল (সা)ই নয়, বরং সাহাবীদের উপরও দাওয়াতের কাজ করা ফরয হয়ে যায়। আর যা রহিত হয়েছে তা হল মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করবার ফরযিয়্যাত।

৩. কাজের প্রকারভেদের দিক থেকে মক্কার হুকুমসমূহ অধিকাংশক্ষেত্রে ব্যক্তির সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল এবং মদীনার হুকুমসমূহ শাসকের (খলীফা) দায়িত্বের সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল। কিছু কিছু নির্দেশ আছে যা কেবলমাত্র শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তির বা দলের ক্ষেত্রে নয়; যেমন: হুদুদ বাস্তবায়ন, জিহাদ ঘোষণা করা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন করা। আবার কিছু কাজ আছে যা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তি দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর যেখানেই থাকুক, যেমন: ইবাদত (উপাসনা), আখলাক (নৈতিকতা), মাতউমাত (খাদ্য), মালবুসাত (পোশাক পরিচ্ছদ) এবং মু'আমালাত (লেনদেন)। আবার কিছু হুকুম রয়েছে যা ব্যক্তি ও শাসক উভযই সম্পাদন করে থাকে, যেমন: মসজিদ নির্মাণ করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা, অসৎ কাজে নিষেধ করা ও দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াতী কাজ করা।
 
- খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবার মত কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন কোন দাওয়াত বহনকারী অগ্রসর হয় তখন একটি ইস্যুর সম্মুখীন হয়, তা হল: এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি (দশ, বিশ বা ত্রিশ বছর)? নাকি নেই? এটা থেকে আবার দু'টি ইস্যুর জন্ম হয়। প্রথমত: এই কাজের প্রকৃতি অনুসারে (শরীয়াহ ও আক্বীদার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) এক, দুই বা তিন দশকের মধ্যে কি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব? কারণ কুতলাহ বা দল যথেচ্ছভাবে কাজ করতে পারে না, বরং কাজের প্রকৃতি অনুসারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একটি পূর্বনির্ধারিত সময়কালের মধ্যে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অন্যথায়, বুঝতে হবে কুতলাহ আন্তরিক নয় এবং কোন নির্দেশনা ছাড়াই চলছে। দ্বিতীয়ত: যদি দলটি ব্যর্থ হয় এবং সঙ্গত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে এটা থেকে কি তার পরিকল্পনা ভুল এ সিদ্ধান্তে আসবে এবং তার গৃহীত নীতি কি সংশোধনের উদ্দেশ্যে পর্যালোচনা করবে? অথবা তারা কি এ সিদ্ধান্তে পৌছবে যে, দলটি আল্লাহর প্রতি আন্তরিক নয় এবং একারণে আল্লাহ তাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিজয়ী করতে চাচ্ছেন না? এই বই এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করবে।
  
- 'ইসলামের দাওয়াত' বইটি কিছু প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করবে, কিছু সন্দেহ দূর করবে এবং কিছু বিষয়ে সঠিক ধারণা তুলে ধরবে। যেমন:

১. অনেকে নিম্নের আয়াতটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকে,

'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।' (সূরা মায়েদা-১০৫)

সুতরাং এই আয়াত থেকে অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, মুসলিমগন কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দাওয়াত বহন না করলেও চলবে।

২. নিম্নের হাদীসটিকেও অনেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে:

'এটা ঠিক নয় যে, একজন মু'মিন নিজেকে অপমানিত করবে। এবং (তা হচ্ছে) এমন দূর্ভোগের মধ্যে নিজেকে ঠেলে দেবে - যা বহনে সে অক্ষম।'

এ হাদীস থেকে অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, এমন কোন কাজ করা যাবে না যা তাকে কারাভোগ, কর্মস্থল থেকে পদচ্যুতি এবং অত্যাচারী শাসকের রোষানলে পড়তে হয়। সেক্ষেত্রে যদি তাকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত থেকে অত্যাচারী শাসককে মেনে নিতে হয় তারপরেও।

৩. অনেকে হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রা) বর্ণিত রাসূল (সা) হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে, 'আমি বললাম: যদি মুসলিমদের কোন জামায়াত বা ইমাম না থাকে তাহলে কী হবে? তখন তিনি (সা) বললেন, “অতপর তুমি এসমস্ত দল গুলিকে পরিত্যাগ করবে, যদিও বা তোমাকে কোন গাছের গুড়ি কামড়ে থাকতে হয় যতক্ষন না তোমার মৃত্যু এসে যায়।

লোকেরা এটা থেকে ধারণা করে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয়। বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

৪. আবার কেউ কেউ নিচের বিখ্যাত হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে

'তোমাদের কাছে এমন একটি দিন বা বছর আসবে না যা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্ব পর্যন্ত আরও বেশী মন্দ হতে থাকবে না।' সুতরাং, এটা সেইসব লোকদের নিরাশ, হতাশ ও কর্মবিমুখ করে।

৫. আবার অনেকে বলেন যে, পরিবর্তনের দায়িত্ব ইমাম মাহদীর এবং এর জন্য আমরা দায়িত্বশীল নই। ফলে তারা এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে।

- এই বইটি এর ভূমিকাতে যেসব ইস্যু তুলে ধরেছে এইরকমের সব বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে আলোকপাত করেছে। যদি এতে কোন ঘাটতি থাকে তবে মনে রাখতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই নিখুঁত হতে পারেন। সম্ভবত দ্বিতীয় মুদ্রণে আমরা আল্লাহর কৃপায় আরও সামগ্রিক ও নিঁখুত করবার প্রয়াস নেব। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে এই প্রার্থনা করছি যে, তিনি এ বই থেকে মুসলিমদের উপকৃত করবেন এবং এর লেখককে অনেক উত্তম প্রতিদান দিবেন।

সালাম ও দরুদ পেশ করছি নবী মুহম্মদ (সা), তাঁর পরিবারবর্গ, শেষ দিবসের পূর্ব পর্যন্ত আগত তাঁর অনুসারীদের প্রতি এবং সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার।

Please note that this is a draft translation. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.

শনিবার, ৫ মে, ২০১২

ইসলামী রাষ্ট্র - ইসলামী খিলাফতের পূনঃপ্রতিষ্ঠায় বাধা

[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রবাহিনী ইসলামী খিলাফতের সকল ভূখন্ড দখল করে নিয়েছিল। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চিরতরে ইসলামী খিলাফত ধ্বংস করে দেয়া এবং এটি নিশ্চিত করা যেন আর কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র মাথা তুলে দাড়াতে না পারে। ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করে দেয়ার পর তারা নিশ্চিত করল যাতে পূনরায় এর কোন ভূখন্ডে যাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। ইসলামী রাষ্ট্র যাতে আর কখনোই প্রত্যাবর্তিত হতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য তারা বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল এবং এ লক্ষ্যে তারা এখনো কাজ করে যাচ্ছে।

একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলিম ভূখন্ড অধিকারের প্রথম দিন থেকেই অবিশ্বাসী ঔপনিবেশিক শক্তি মুসলিম বিশ্বে তাদের মুঠি শক্ত করছিল। ১৯১৮ সালে তারা উসমানী খিলাফতের অন্তর্গত বেশ কিছূ ভূখন্ড দখল করে নিয়েছিল এবং ১৯২২ সাল নাগাদ সেসব স্থানে সামরিক আইন বলবৎ করেছিল। তারা বাধ্যতামূলক শাসন বা স্বায়ত্ত্ব শাসনের মাধ্যমে তাদের দখলদারিত্ব শক্ত করার দিকে মনযোগ দিয়েছিল। অবশেষে এল ১৯২৪ সাল। এ বছর শত্রুপক্ষ বিশেষত বৃটেন, ইসলামী রাষ্ট্রের পুনর্জাগরণের পক্ষে যে কোন প্রকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আন্দোলন দমন করতে বহু পদক্ষেপ নিয়েছিল।

এ বছর মুস্তাফা কামাল ঔপনিবেশিক অবিশ্বাসী শক্তির চাপে উসমানী খিলাফত ব্যবস্থা অবলুপ্ত করে তুরস্ককে একটি ‘গণতান্ত্রিক’ প্রজাতান্ত্রিক (রিপাবলিক) রাষ্ট্রে পরিণত করল। এভাবে সে খিলাফত ধ্বংস করল এবং খিলাফত পুনরাবির্ভাবের অবশিষ্ট ক্ষীণ আশাটিও তিরোহিত হয়ে গেল। একই বছর আল হুসাইন বিন আলীকে হিজাজ থেকে বহিষ্কার করা হল এবং যেহেতু তিনি খিলাফতের প্রতি লক্ষ্য করছিলেন, ফলে তাকে সাইপ্রাসে বন্দী করা হল। একই বছর বৃটিশরা তাদের ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে নিয়ে কায়রোতে অনুষ্ঠিতব্য খিলাফাহ কনফারেন্সের আয়োজন স্থগিত করে এ প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিল। আবার ঐ একই বছর বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে দানা বেঁধে ওঠা খিলাফাহ আন্দোলন দমন করতে সচেষ্ট হল। তারা এ আন্দোলনের লক্ষ্যচ্যূত হওয়া নিশ্চিত করল এবং আন্দোলনটিকে জাতীয়তাবাদী ও গোত্রীয় আন্দোলনে পরিণত করল। ঐ একই বছর ঔপনিবেশিক অবিশ্বাসীদের চাপে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমগণ রাষ্ট্র থেকে দ্বীন পৃথক করার আহ্বান সম্বলিত কিছু প্রবন্ধ রচনা করল। তারা এসব প্রবন্ধে দাবী করল ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনা বা বিচারকার্যের জন্য কোন মূলনীতি নেই, এতে এরূপ কোন শিক্ষাও নেই এবং ইসলাম শুধুমাত্র একটি থিওলজিকাল ধর্ম। এ বছর ও তার পরবর্তী বছর, কিছু কূট-তার্কিক আরব রাষ্ট্রগুলোতে দুটি বিষয়ে ক্রমাগত বিতর্কের অবতারণা করে সকলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করল। এ দুটি বিষয় হচ্ছে, দুটি লীগের মধ্যে কোনটি উত্তম ‘আরব লীগ’ না ‘ইসলামী লীগ’? পত্রপত্রিকা ম্যগাজিন সমূহ এই বিষয়ের প্রতিই সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে লাগল যদিও বা এ দুটি লীগের ধারণার বিপজ্জনক কুফল ছিল এবং এরা উভয়ের অস্তিত্বই ইসলামী রাষ্ট্র পুন:প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছিল মূর্তিমান প্রতিবন্ধতা। অবিশ্বাসী ঔপনিবেশিকরা প্রকৃত বিষয় অর্থাৎ ইসলামী খিলাফত থেকে নজর সরাবার জন্যই এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছিল। এই পদক্ষেপ সমূহ মুসলিম ভূখন্ডের জনগণের মনোযোগ খিলাফত ও ইসলামী রাষ্ট্র হতে অন্যত্র সরাবার জন্যই নেয়া হয়েছিল।

তাদের দখলদারিত্ব ছাড়াও ঔপনিবেশিক শক্তি তুর্কী তরুণদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের শ্লোগান ছড়িয়ে দিতে শুরু করল। তারা দাবী করল তুরস্কের উপর বিদেশীদের (অ-তুর্কীয়)  বিষয়গুলো বোঝার মত চেপে আছে। এটিই হচ্ছে উপযুক্ত সময় যখন তুরস্কের উচিৎ ঐ সব লোকদের ভার নিজেদের উপর ছেড়ে দেয়া। রাজনৈতিক দলগুলোও তুর্কী জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করতে লাগল এবং অ-তুর্কী রাষ্ট্র গুলো থেকে তুরস্কের স্বাধীনতা দাবী করল। অবিশ্বাসীরা একই ধরণের ধারণা আরব তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিল এবং তাদের মাঝে আরব জাতীয়তাবাদ উস্কে দিল। তারা তুরস্ককে একটি দখলদার বাহিনী হিসাবে আখ্যা দিয়ে আরবদের তাদের হাত থেকে মুক্ত হবার দাবী তুলল। অনুরূপভাবে রাজনৈতিক দলগুলোও আরবদের মাঝে ঐক্য ও আরব স্বাধীনতার দাবীতে সোচ্চার হল।  তারা শীঘ্রই ইসলামী ধ্যান ধারণায় যে শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল সেখানে স্থান করে নিল। ফলত: তুর্কীরা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে তাদের স্বাধীনতা লাভ করল এবং আরবরা জাতীয়তাবাদী ভৌগলিক অবস্থানের ভিত্তিতে স্বায়ত্ত শাসনের জন্য কাজ করতে লাগল। জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের ধারণা খুব দ্রুত সমগ্র মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এবং তারা একসময় এ বিষয়গুলো নিয়ে গর্ব করতে শুরু করল।

ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এখানেই থেমে থাকেনি। বরং তারা ইসলাম ও ইসলামী শাসন সম্পর্কেও ভ্রান্তিমূলক ধারণা ছড়িয়ে দিতে শুরু করল। তারা খিলাফত কে পোপ ও যাজকীয় শাসন হিসাবে চিহ্ণিত করতে লাগল। এটি এমন এক অবস্থায় পৌঁছাল যখন মুসলিমরা খিলাফত ধারণাটি প্রকাশ করতে বা শব্দটি উচ্চারণ করতেই বিব্রতবোধ করতে লাগল। এসময় মুসলিমদের মাঝে অধিকাংশেরই একটি ধারণা জন্মাল যে খিলাফত শব্দটির উচ্চারণ একটি পশ্চাৎপদ বিষয় ও কূপমন্ডুকতা। কাজেই এটি কোন শিক্ষিত মানুষের উচ্চারণ করা শোভা পায়না।

এমনই তীব্র এক জাতীয়তাবাদী অনুভূতির মাঝে অবিশ্বাসীরা (কাফিররা) ইসলামী রাষ্ট্রকে অকার্যকর করেছিল। এটিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করে স্থানীয় অধিবাসীদের এ বিভক্তি জোরদার করার ব্যাপারে উৎসাহিত করছিল। উসমানী খিলাফত রাষ্ট্র ছোট ছোট কতগুলো রাষ্ট্রে পরিণত হল। এরা হচ্ছে তুরস্ক, মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, পূর্ব জর্দান, হিজাজ, নজদ এবং ইয়েমেন। এ সকল অঞ্চলের ষড়যন্ত্রকারী কিংবা সদিচ্ছা সম্পন্ন উভয় রাজনীতিবিদগণ প্রতিটি রাষ্ট্রে তাদের স্বাধীনতা দাবী করে কনফারেন্স করতে লাগল। এগুলো ছিল অবিশ্বাসীদের নির্ধারন করে দেয়া পরস্পর বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতার দাবী। এরই ভিত্তিতে তুরস্ক, ইরাক, মিশর, সিরিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য একটি জাতীয় মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পরবর্তীতে একটি স্বাধীন পরিচয় প্রাপ্ত হয়। এটি ছিল অবিশ্বাসীদের সৃষ্ট মুসলিম বিশ্বে প্রবেশের একটি রাজনৈতিক সেতুমুখ। এর মাধ্যমে অবিশ্বাসী ঔপনিবেশিকরা তাদের অর্থাৎ ফ্রান্স, বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে মুসলিমদের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে দিতে সক্ষম হল। এটি আজো খিলাফত পূন:প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বিশাল প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। এই ভৌগলিক অবস্থান ও সাধারণ দৃশ্যপট এ জন্য সৃষ্টি করা হয় যেন মুসলিমরা কখনোই নিজেদের প্রকৃতার্থে স্বাধীন করতে না পারে।

অবিশ্বাসীরা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ এবং সরকারী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হল। তারা তাদের প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থায় পশ্চিমা আইন চালু করল। তারা তাদের সংস্কৃতি ও জীবন সম্পর্কিত ধারনা ছড়িয়ে দিতে লাগল এবং প্রবলভাবে জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করতে লাগল। ফলে মুসলিমরা পশ্চিমা জীবন পদ্ধতি গ্রহণ করল এবং তা অনুসরণ করতে লাগল। তারা তাদের এ প্রচেষ্টায় সফল হল। তারা মিশরকে সালতানাতে পরিণত করল এবং সংসদীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করল। তারা ইরাকেও একটি সংসদীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করল। সিরিয়া ও লেবাননকে প্রজাতন্ত্র (রিপাবলিক) এবং পূর্ব জর্দানকে একটি আমিরাত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল এবং ফিলিস্তিনকে বাধ্যতামূলক এমন এক শাসনের অধীনস্থ করা হল যা পরবর্তীতে একটি ইহুদী সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট অংশ পূর্ব জর্দানের সাথে যুক্ত করে একটি সংসদীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হল। হিজাজ এবং ইয়েমেনে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা হল এবং তুরস্কে রাষ্ট্রপতি শাসিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা হল। আফগানিস্তানে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল। ঔপনিবেশিক কাফিররা (অবিশ্বাসীরা) ইরানে তার সাম্রাজ্য ব্যবস্থা বজায় রাখতে উৎসাহিত করল এবং ভারতে তাদের ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখল। পরবর্তীতে ভারত ভেঙ্গে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঔপনিবেশিক অবিশ্বাসীরা মুসলিমদের উপর তাদের ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে সক্ষম হল এবং এর মাধ্যমে খিলাফত পূণঃপ্রতিষ্ঠার ধারণাটি ধীরে ধীরে জনগণের মন থেকে মুছে ফেলা হল।

এছাড়াও, প্রতিটি স্থানীয় সম্প্রদায়কে অবিশ্বাসীদের ব্যবস্থা আকড়ে ধরতে উৎসাহিত করা হল। তারা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র সমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কাজ করতে লাগল। এভাবে একজন ইরাকী মিশরে এসে হয়ে গেল একজন বিদেশী। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জনকদের চাইতে এসকল ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের শাসকবৃন্দ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষায় বেশী আগ্রহী হয়ে উঠল। তারা হয়ে গেল ঔপনিবেশিক কাফিরদের প্রতিনিধি, তাদের দেয়া ব্যবস্থার দেখাশোনা করা ও তা সংরক্ষণ করাই হয়ে উঠল তাদের প্রধান কাজ।

ঔপনিবেশিক কাফির শক্তি মুসলিম ভূখন্ডগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে পশ্চিমা আইন কানুন প্রয়োগ করতে লাগল। অতীতে তারা এসকল আইন মুসলিম বিশ্বে তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে করা চেষ্টা করেছিল। অবিশ্বাসীরা ১৯শ শতকের প্রথমভাগে পশ্চিমা আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা নিয়েছিল। তারা মিশরের জনগণকে ফরাসী দেওয়ানী আইন প্রয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল, যাতে করে তারা শরীয়াহ আইনকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে। এ বিষয়ে সফল হবার পর তারা ১৮৮৩ সালে মিশরে ফরাসী বিচার ব্যবস্থা চালু করতে শুরু করল। পুরনো ফরাসী দেওয়ানী আইনগুলো অনুবাদ করে কার্যকর করা হল। এটি হল মিশরের নতুন ব্যবস্থা যা আদালত থেকে শরীয়াহকে প্রতিস্থাপিত করল। উসমানী খিলাফত রাষ্ট্রে ১৮৫৬ সালে পশ্চিমা আইন প্রবেশ করবার লক্ষ্যে একই ধরণের একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। অবশ্য এ কাজটি মিশরের মত সহজে হলনা, কারণ খিলাফত ব্যবস্থার ভিত্তি তখনো উসমানী রাষ্ট্রগুলোতে ছিল।

অবিশ্বাসীদের ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলে এবং তাদের দোসরদের সহযোগিতায় ফৌজদারী আইন ও নব্য অনৈসলামিক বিধি ও বানিজ্যিক আইন প্রবর্তন করতে সক্ষম হল। এটি করা হয়েছিল একটি ফতোয়ার মাধ্যমে যেখানে বলা হয়েছিল এধরনের কুফর আইন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আইন লিপিবদ্ধকরণের ধারণাটি শিকড় বিস্তার করতে শুরু করে এবং  আল মাজাল্লা Code আইন হিসাবে গ্রহণ করে। আল মাজাল্লা হচ্ছে ১৮৬৮ সালে জারিকৃত বিধি যা বহু মাজহাবের দুর্বল মতানুসারে আইন হিসাবে গৃহীত হয় যেখানে পারিপার্শ্বিকতা যুক্তিগ্রাহ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। আল মাজাল্লাকে আইন হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হল। আদালত ব্যবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হ’ল, ১. শরীয়াহ আদালত যেখানে শরীয়াহ আইন অনুসরণ করা হবে, এবং ২. দেওয়ানী আদালত যা প্রথমত পশ্চিমা আইন দ্বারা পরিচালিত হবে, যে পশ্চিমা আইনগুলো আবার একটি ফতোয়ার মাধ্যমে বৈধ করা হবে এবং দ্বিতীয়ত শরীয়াহ আইন, যেগুলো পশ্চিমা প্রক্রিয়ার অনুকরণে আইন হিসাবে গৃহীত হবে। এ সব পদক্ষেপ ছিল আইনের ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে সংবিধানের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের জন্য নতুন একটি সংবিধান রচনার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হল। এক্ষেত্রে ফরাসী সংবিধানকে উৎস হিসাবে গ্রহণ করা হল। এ প্রচেষ্টাটি নতুন আইন প্রবর্তনের পদক্ষেপ গুলোর সাথে জুড়ে দেয়া হল। ১৮৭৮ সালে এ পদক্ষেপ প্রায় সফল হতে চলেছিল কিন্তু মুসলিমদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তা স্থগিত হয়ে যায়। অবশ্য ঔপনিবেশিক অবিশ্বাসীদের অব্যহত প্রচেষ্টায় এবং তাদের সহযোগী ও তাদের সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হওয়া ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় তারা পূনরায় নতুন সংবিধান রচনার আন্দোলনটি শুরু করল এবং এবার তাতে সফল হল। ১৯০৮ সালে এ সংবিধান ও তার নতুন আইন বাস্তবায়িত হল। আরব ব-দ্বীপ ও আফগানিস্তান ছাড়া প্রতিটি মুসলিম ভূখন্ড সরাসরি পশ্চিমা আইন দ্বারা পরিচালিত হতে থাকল। এভাবে শরীয়াহ আইনকে বর্জন করা হল যার অর্থ হচ্ছে কুফর শাসন বলবৎ হল ও ইসলামী শাসন বর্জিত হল।

মুসলিমদের উপর কুফর শাসনকে শক্তিশালী করার পেছনে যে বিষয়টি কাজ করেছে তা হচ্ছে ঔপনিবেশিকদের চাতুর্যের সাথে গৃহীত ইসলামী রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার পদক্ষেপটি। তারা মুসলিমদের জন্য একটি নতুন শিক্ষা কার্যক্রম পরিকল্পনা করেছিল। এ শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচীর মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিটি শিক্ষার্থীকে এক একটি পশ্চিমা ব্যক্তিত্বে পরিণত করা। অর্থাৎ এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করা যার জীবনের প্রতি থাকবে পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী। এ কার্যক্রম এখন পর্যন্ত সকল মুসলিম ভূখন্ড এবং এমন কি তাদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও কার্যকর রয়েছে। যার ফলে আমরা বহু শিক্ষক পাই যারা এ শিক্ষা কার্যক্রমকে রক্ষা করতে ব্যস্ত। তারা প্রভাবশালী পদগুলো গ্রহণ করে এবং কাফিরদের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে। শিক্ষা নীতিটি মূলত দুটি মূলনীতির ভিত্তিতে তৈরী করা হয়েছিল।

প্রথম মূলনীতিটি হচ্ছে, শাসন কার্য থেকে দ্বীনকে পৃথক করে দেয়া যার পরিণতিতে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র থেকে দ্বীনকে পৃথক হবে। এ পদক্ষেপটি আরো একটি বিষয় নিশ্চিত করে, তা হচ্ছে তরুণ মুসলিমরা ভবিষ্যতে ইসলামী রাষ্ট্র পূন:প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করবেনা। কারণ এটি (ইসলামী রাষ্ট্র পূন:প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই), সে যে শিক্ষা লাভ করেছে তার মৌলিক বিষয়ের সাথেই সাংঘর্ষিক।

দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে ঔপনিবেশিক কাফিরদের ব্যক্তিত্বকে তরুণ মুসলিমদের জন্য অনুকরণীয় করা। এটি তাদের মনকে কুফর সংস্কৃতি ও তথ্য দ্বারা পূর্ণ করে রাখতে সহায়ক হবে। এ ধরণের পদক্ষেপ কাফিরদের প্রতি সম্মান জানাতে শেখাবে। এটি তাকে, ঔপনিবেশিক কাফির হওয়া সত্ত্বেও তাদের মহিমামন্ডিত করতে, অনুকরণ করতে ও বন্ধু হতে উদ্বুদ্ধ করবে। এটি তাদের মুসলিমদের অশ্রদ্ধা ও হেয় করতে শেখাবে এবং তাদের থেকে দুরে থাকতে সাহায্য করবে। এ ধরণের অনুভূতি তাদের পক্ষ থেকে কিছু শিখতে বা গ্রহণ করতে নিরূৎসাহিত করবে এবং স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী রাষ্ট্র পূন:প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে দুরে ঠেলে দেবে।

ঔপনিবেশিকরা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পরিকল্পিত ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে প্রণীত স্কুলের পাঠ্যসূচীই যথেষ্ট নয়। তারা আরো অগ্রসর হয়ে ঔপনিবেশিক মূলনীতির উপর ভিত্তি করে মিশনারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করল। এর সাথে যোগ হল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সমূহ যাদের প্রধান কাজ ছিল বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক ধারণা ছড়িয়ে দেয়া। ফলাফল স্বরূপ এধরণের শিক্ষা কেন্দ্রসমূহের শিক্ষার পরিবেশ উম্মাহকে এমন এক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলল যা তাদের ইসলামী রাষ্ট্র পূন:প্রতিষ্ঠার চিন্তা হতে দুরে সরিয়ে দিল এবং একাজে নিয়োজিত হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল।

জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথক করার ধারণাটি বুদ্ধিজীবিদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল। সমাজের বাকীদের নিকট এটিকে প্রচার করা হল এভাবে যে এটি হচ্ছে রাজনীতি কিংবা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজগুলো থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ। ফলাফল স্বরূপ কিছু বুদ্ধিজীবি দাবী করল যে মুসলিমদের অবনতির কারণ হচ্ছে দ্বীনের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা এবং জাতীয়তাবাদই হচ্ছে পূনর্জাগরণের একমাত্র পথ। অন্য একদল বুদ্ধিজীবির মতে মুসলিমদের অধ:পতনের জন্য তাদের নৈতিক অবক্ষয় দায়ী। প্রথম দলের ধারণা অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল গঠিত হল এবং দাবী করা হল তাদের ইসলামী ভিত্তি রয়েছে। এটি আসলে ছিল ঔপনিবেশিকদের একটি চাল মাত্র। অপরদিকে নৈতিকতার ভিত্তিতে বেশ কিছু দল গঠিত হ’ল যারা ধর্ম প্রচার করা ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা নিয়ে ব্যস্ত থাকল। এরা স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের নৈতিকতার উৎকর্ষতা নিয়ে কাজ করতে লাগল কিন্তু রাজনীতিতে জড়ানো থেকে বিরত থাকল। এ ধরণের দলগুলোই ইসলামী রাষ্ট্র পূণর্প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসাবে কার্যকর ভূমিকা রাখল। তারা মুসলিমদের মনকে অন্যত্র সরিয়ে দিল। এছাড়াও এ দলগুলো তৈরী করা হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভিত্তির উপর দাড় করিয়ে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।  এবং একারণেই তারা ইসলামী রাষ্ট্রের পূণ:প্রতিষ্ঠায় সবসময় বাঁধা সৃষ্টি করে এসেছে।

গৃহীত নতুন রাজনৈতিক কার্যক্রম রক্ষা করতে নতুন নতুন আইন পাশ করা হতে লাগল। কিছু আইন করা হল যার মাধ্যমে ইসলামী দল গঠন ও আন্দোলন নিষিদ্ধ করা হল। আর কিছু আইন ও উপধারা তৈরী করা হল যেখানে দলগুলোর উপর তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া হল এবং বলা হল তাদের দলের সদস্যপদ কোন বিশেষ ধর্মাবলম্বী বা গোত্রের জন্য সীমাবদ্ধ রাখতে পারবেনা। এর অর্থ হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র পূনর্জন্মের জন্য মুসলিম ভূখন্ডে ইসলামী দল গঠন আইনের পরিপন্থী। মুসলিমদের দাতব্য সংস্থা ও অনুরূপ সংগঠন ছাড়া আর কোন দল গঠনের অধিকার থাকল না। ইসলামের ভিত্তিতে রাজনীতি করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হল। কোন কোন আইন করে বলা হল ইসলামী দল গঠন হচ্ছে মারাত্মক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিধিমালার অধীনে মুসলিম বিশ্বে যে রাজনৈতিক কার্যক্রম গৃহীত হল তার মূল লক্ষ্য হল ইসলামী রাষ্ট্রের (খিলাফত) পূণর্গঠনকে প্রতিহত করা।

ঔপনিবেশিকরা এখানেই থেমে থাকল না। বরং তারা ইসলামী রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তা থেকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখার লক্ষ্যে মুসলিমদের ক্ষুদ্র ও গুরুত্বহীন বিষয়ে ব্যস্ত করে রাখল। তারা এমন ইসলামী কনফারেন্স আয়োজন করতে উৎসাহিত করতে লাগল যা প্রকৃত কাজ অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে ইসলামী জীবন যাপন করার আহ্বান থেকে মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখে। এধরণের কনফারেন্স মুসলিমদের হতাশা ও ইসলামী আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি নিরাপদ রাস্তা হিসাবে কাজ করতে লাগল। এসকল কনফারেন্সে সিদ্ধান্ত হবে, পত্র পত্রিকায় ছাপা হবে, রেডিও টিভিতে প্রচারিত হবে, কিন্তু কখনোই তা বাস্তবায়িত হবেনা।

লেখক ও বক্তাদের উৎসাহিত করা হল ইসলামী রাষ্ট্রকে (খিলাফত) একটি হুমকি হিসাবে জনসমক্ষে প্রচার করার জন্য। তারা এ ধারণা প্রচার করতে লাগল যে ইসলামে কোন বিচার ব্যবস্থা নেই। ভাড়া করা মুসলিমদের দিয়ে ঔপনিবেশিকদের এ সকল মতবাদ সম্বলিত বহু বই পুস্তক, প্রবন্ধ, রচনা লেখা হল। এর লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের আরো বিপথগামী করা এবং তাদের দ্বীন থেকে আরো দুরে সরিয়ে দেয়া এবং দ্বীন অনুযায়ী ইসলামী জীবন যাপন করার আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজ করা থেকে বিরত রাখা।

ইসলামী রাষ্ট্রকে (খিলাফত) ধ্বংস করার পর থেকে ঔপনিবেশিকরা ইসলামী রাষ্ট্র পূণর্গঠনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে এবং করছে। তারা পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করে দেয়ার পর এর পূন:প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার জন্য তাদের প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভূত করেছে।