বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশিয়া

১. ভুমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশ নামে সুপরিচিত এই দক্ষিণ এশিয়া বরাবরই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। সংখ্যায় বিপুল এ অঞ্চলের অধিবাসীরা বিশেষ ধরণের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আর ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চল দূর্গম পাহাড়বেষ্টিত। যেজন্য অতীতের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পথেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করা যেত। কখনো সফলতা, কখনো ব্যর্থতা ইত্যাদি মিলিয়ে বিভিন্ন সময় শীর্ষস্থানীয় দিগ্বিজয়ীরা এসব পথেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে এবং এ অঞ্চলসীমায় নিজ নিজ ক্ষমতার পরিধি বিস্তারের চেষ্টা করেছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই একসময় মোঘলদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার লাভ ঘটে। তবে নিকট অতীতে ভৌগলিক এই সীমাবদ্ধতা থেকে অনেকেই শিক্ষা নিয়েছে এবং এককভাবে কারো পক্ষে পুরো উপমহাদেশের কর্তৃত্ব ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলশ্রুতিতে, উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছে একাধিক অংশে এবং একক কোন ব্যবস্থায় এটা আর পরিচালিত হচ্ছেনা।

২. সাম্প্রতিক পরিস্থিতি (বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আমেরিকার আবির্ভাব ঘটে। সে নতুন উদ্যম, হিংস্রতা ও গোটা পৃথিবীর সম্পদ লুটপাটের সর্বগ্রাসী লোভ নিয়ে নয়া উপনিবেশবাদ শুরু করে। অতি অল্প সময়ে আমেরিকা বৃটিশ সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করে এবং প্রায় প্রতিটি স্থানে তাদেরকে বিতাড়িত করে। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা শুধু ব্রিটিশদেরকেই নয় বরং সমান লক্ষ্যে অগ্রসর অন্যসব শক্তিগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। এটাই হচ্ছে গত শতাব্দীর সব আঞ্চলিক ও দেশীয় রাজনীতির পেছনে কার্যকর অপ্রকাশ্য কারণ। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বে নিজের ভিত তৈরী করে এবং এই ভিতকে আরো মজবুত ও স্থায়ী করার লক্ষ্যে সুগভীর পরিকল্পনার জাল বিস্তার করে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি মার্কিন নীতি মূলত মধ্য এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ, চীন নিয়ন্ত্রণ নীতি (Policy of Containing China) এবং ইসলামিক আন্দোলন দমনের ভিত্তিতে আবর্তিত, যা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়া

ভূ-কৌশলগত দিক থেকে মধ্য এশিয়া মূলত রাশিয়ার বর্ধিত অংশ, যা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। মধ্য এশিয়ার সাথে রাশিয়ার কোন প্রকৃতিগত স্বাভাবিক সীমানা নেই, নেই কোন সাগর-মহাসাগর ইত্যাদি। একই কথা চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, চীন মধ্যএশিয়াকে তার পেছনের দরজা মনে করে। যেহেতু মধ্য এশিয়ার বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম, সেহেতু চীন ও পূর্ব তুর্কমেনিস্তানে অবস্থানরত মুসলিমদের উপর মধ্য এশিয়ার মুসলিমদের প্রভাব সম্পর্কে চীন খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত। এই কৌশলগত গুরুত্বের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়াকে নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা সাজায়। এই পরিকল্পনার একদিকে রয়েছে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা আর আরেকদিকে রয়েছে চীনকে অবরোধ করে রাখা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর চীনের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাকে খর্ব করা।

অধিকন্তু, মধ্য এশিয়া এবং বিশেষ করে কাস্পিয়ান সাগর তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল। এছাড়াও এই অঞ্চলে স্বর্ণসহ বহু মূল্যবান ধাতব পদার্থের খনি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতই এই অঞ্চল পৃথিবীর খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের দিক থেকে অন্যতম ধনী অঞ্চল। এই বিশাল সম্পদের প্রতি মার্কিন বিশালকায় পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলো আকৃষ্ট এবং বিনিয়োগের নামে কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে প্রবেশ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতই এই অঞ্চলের দুর্ভোগের জন্য ঔপনিবেশবাদীরাই দায়ী আর এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঔপনিবেশবাদীরা।

২০০৪ সালে পারভেজ মোশার্র‌ফ আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন একটি ধারণা উপস্থাপন করে। তার প্রদত্ত ধারণাটি হচ্ছে - পাকিস্তান তিনটি অঞ্চলের বাণিজ্য ও জ্বালানী পাইপলাইনের মধ্যে সংযোগ রাস্তা হতে পারে। এই তিনটি অঞ্চল হচ্ছে: মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া (ভারত) এবং পশ্চিম এশিয়া (তথা মধ্যপ্রাচ্য)। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে পাকিস্তান এই তিন অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত বলে এর সুযোগ নিতে চায়। এজন্য পাকিস্তান আরব সাগরের উপকূল জুড়ে আফগানিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত অসংখ্য বিশালাকার সমুদ্র বন্দর তৈরী করেছে এবং এই সমুদ্র বন্দরগুলো আমেরিকার অনুকরণে মহাসড়ক দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত।

মার্কিন সিনেটের সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত কমিটিতে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়েল এ সম্পর্কে ২৭শে মার্চ, ২০০৪ সালে বিস্তারিত বিবরণ দেয় এভাবে, “বাণিজ্য ও সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে আনা গেলে ককেশাস, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চল সমূহের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা এতদ অঞ্চলে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হব। ... পাকিস্তান এই বিষয়টি নিরীক্ষা করছে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সমুদ্র বন্দরগুলো ঢেলে সাজিয়েছে... আর আমরা আফগানিস্তানে আমাদের সহযোগী, সৌদী ও জাপানিদের সহায়তায় মহাসড়ক তৈরি অব্যাহত রাখব”।

মার্কিন কূটনীতি এই অঞ্চলে (সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক) জোট প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই সম্ভাব্য জোট পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে শুরু হয়ে কাবুল হয়ে তেহরান পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে পাকিস্তানকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কৌশলগত মিত্রতার মানচিত্র নতুন করে সাজানো সম্ভব। ইসলামাবাদে অবস্থিত কিছু রাজনৈতিক সূত্র ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে নতুন জোট তৈরি হওয়ার ভবিষ্যৎবাণী করছে। পরিকল্পিত এই জোট বিদ্যমান ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মিত্রতার তুলনায় ব্যাপকতর। এরকম আলোচনাও আছে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপিয়ান ন্যাটোর অনুকরণে এই অঞ্চলেও একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ন্যাটো তৈরী করার স্বপ্ন দেখছে মার্কিনরা। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত বন্ধু রাষ্ট্রের পাশাপাশি এতে আরো অংশ নিবে ওয়াশিংটনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও আজারবাইজান। এই আঞ্চলিক জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্বালানী পাইপলাইনসমূহের নিরাপত্তা বিধান ও সামরিক সুরক্ষা প্রদান করা এবং চীনা বা রাশিয়ান প্রভাব প্রতিহত করা।

৪. আমেরিকা এবং চীন

চীন তার সুবিশাল জনসংখ্যা ও সুবিস্তৃত ভূমির জন্য সবসময়ই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং একই সাথে ভয়েরও কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথমদিকে বৃটেনই এ অঞ্চলকে নিজেদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাজার হিসেবে উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। চীনকে তারা কোন হুমকি হিসেবে দেখেনি বরং এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাই তারা চেয়েছিলো যাতে করে দূরপ্রাচ্যে তাদের বাকী উপনিবেশগুলো নিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক ছিলো মূলতঃ বন্ধুত্বসূলভ। আমেরিকা ও জাপানের মধ্যে অস্থিতিশীল সম্পর্ক এবং চীনের প্রতি জাপানের আক্রমণাত্মক অবস্থা, আমেরিকা ও চীনকে নিকটতর করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন পার্ল হারবার আক্রান্ত হয়েছিলো, চীন তখন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর চীনের ব্যবস্থা যখন কমিউনিজমে রূপান্তরিত হলো তারপর থেকে তারা অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের সীমানার বাইরের বিষয় নিয়ে খুব কমই মাথা ঘামিয়েছে। এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে উত্তর ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ার কিছু বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা এবং ভারতের সাথে সামান্য বিরোধ। চীনের এই আচরণ রাশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তারের উচ্চাভিলাষের সাথে কোন ক্রমেই তুলনীয় নয়। ফলে, মতাদর্শগতভাবে পুঁজিবাদের বিরোধী হওয়ার কথা বাদ দিলে, এটা ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন প্রত্যক্ষ হুমকি ছিল না। বরং সময় সময় বিভিন্ন বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চীনকে ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, কমিউনিজমকে বাদ দেয়ার পর থেকে নিজের সীমানার বাইরেও চীন দৃষ্টি দিতে শুরু করেছে। চীন যখন নিজেকে ক্ষমতাধর এক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করে গড়ে তুলছিলো, আমেরিকার তখন এটাকে সহ্য করা এবং পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া উপায় ছিল না। বর্তমানে চীনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র এশিয়া এমনকি সমগ্র বিশ্বে স্বীয় প্রভাব বিস্তারের পথে অন্যতম হুমকি মনে করে। “সাধারণভবে ধারণা করা যায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের স্বরূপ কেমন হবে তার উপর একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতি বহুলাংশে নির্ভর করবে”।
 
মেডিলিন অলব্রাইট (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) ২০০০ সালে প্রদত্ত “U.S. , China & India in the 21st Century” শীর্ষক এক ভাষণে এশিয়া ও ইউরোপে বাজার হারানোর ভয়ে চীনকে ডব্লিও. টি.ও.ভূক্ত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বার বার তাগিদ দেন। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, চীনের অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ থামানোর জন্য এই চুক্তিই একমাত্র পথ, কেননা তখন চীনকে W.T.O এর কঠিন বিধিমালা মেনে চলতে হবে। তিনি তার বক্তব্যে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেন যা চীনের উপর চাপ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। যেমন:

· পরমাণু প্রযুক্তি-সমৃদ্ধিকরণ নিষেধাজ্ঞা

· তাইওয়ান প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষিণ চীন সাগরে সহযোগীতা

· তিব্বতের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং দালাইলামার সাথে সংলাপ শুরু করা

· কোরিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

· মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন

এখানে মূল বিষয় হলো, আমেরিকা চীনের ক্রমাগত একটি পরাশক্তি হয়ে উঠার সম্ভাবনার ভয়ে ভীত এবং সেজন্যই সে বিভিন্ন উপায় উপকরণ ব্যবহার করে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, যাতে চীনকে নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেই ব্যস্ত রাখা যায়।

এর পাশাপাশি, আমেরিকা আরেকটি কৌশলও চালিয়ে যাচ্ছে। তা হলো, চীনের চারপাশ ঘিরে যে রাষ্ট্রগুলো আছে, সেগুলোকে আরো শক্তিশালী করা কিংবা আমেরিকার প্রভাবাধীনে আনা অথবা যথেষ্ট পরিমাণে অস্থিতিশীল রাখা যাদেরকে দিয়ে চারপাশ থেকে চীনকে অবরুদ্ধ করে রাখা যাবে। ফলশ্রুতিতে, চীন নিজের সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তারের কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেনা এবং চীন নিজেকে নিজের সীমানার মাঝেই আবদ্ধ রাখবে। উত্তর দিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়া রয়েছে, অতএব ওইদিক নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। পূর্বদিকে রয়েছে জাপান, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্দোচীন, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া। পশ্চিমদিকে (যেটাকে সচরাচর ‘চীনের পিছনের দরজা’ বলে অভিহিত করা হয়) রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্য এশিয়া, বিশেষ করে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। ‘এশিয়ান ন্যাটো’ তৈরি করার যে পরিকল্পনা নিয়ে কথা চলছে, তা হবে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত এবং এতে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের পাশাপাশি কাজাখস্তান ও আজারবাইজানকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। চীনের চতুর্দিকের দেশগুলিকে আমেরিকা বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের বাধ্য করছে যাতে তারা চীনের দিকে সর্বদা কঠোর দৃষ্টি রাখে। চীন এই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হবার কোন চেষ্টা করছে না। চীনের প্রতি বার্মার আনুগত্য এই অবরোধ প্রাচীর অতিক্রম করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও অবরোধ পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। মায়ানমারের মাধ্যমে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আমেরিকা বার্মার সামরিক জান্তার উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে এবং অং সান সু কীকে গণতন্ত্র (!) প্রতিষ্ঠায় ইন্ধন দিচ্ছে।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমেরিকা ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হুমকি ছাড়াও, সে তার সীমানা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায় ইসলামের ক্রম উত্থানে চিন্তিত। এ ক্ষেত্রে চীনের দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে তার সীমানার অভ্যন্তরস্থ মুসলিমরা বিশেষ করে পূর্ব তুর্কমেনিস্তানের মুসলিমরা এ অঞ্চলে ইসলামের এই উত্থানে প্রভাবিত হতে পারে। বিষয়টির আরো জটিলতা হচ্ছে আমেরিকাও পূর্ব তুর্কমেনিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দিচ্ছে। চীন এখন বাধ্য হচ্ছে ‘সাংহাই-৬ সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলন’ এ অংশ নিতে, এটা জানা সত্বেও যে এটা আমেরিকার তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

৫. আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়া

ভারতের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্ব
ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজমুকুটে একটি উজ্জ্বল মুক্তা যা শতাব্দীকাল ধরে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। এতদসত্ত্বেও এখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক আন্দোলনের প্রভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানোভাবের ছোঁয়া লাগে। এটা ব্রিটিশদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের মতোই ব্যাপক সমস্যায় ফেলে দিয়েছিলো, এমনকি এখানে বরং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা আরো বেশী প্রাণবন্ত ছিল। তথাপি, বৃটেন ধূর্ততার সাথে এ অঞ্চলের স্বাধীনতা এবং দেশ-বিভাগ সৃষ্টি করে ঠিকই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এ সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে পশ্চিম পাকিস্তানের হাত ধরে আমেরিকার আগমন ঘটে, এটা সম্ভব হয়েছিল আইয়ুব খানের আমেরিকা প্রীতির কারণে। যদিও পরবর্তীতে ভারতের কাছে (এবং বৃটেনের কাছে) ১৯৭১ সালে তাদেরকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে হারাতে হয়।

ইঙ্গ-মার্কিন বিরোধের অংশ হিসেবেই আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক ছিল তিক্ত (কিসিঞ্জার ভারতকে “বাস্টার্ড” বলেছিল)। নিক্সন-কিসিঞ্জার শাসনকালে আমেরিকা এ সম্পর্ক উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ দেয়নি। ঐ সময় ভারত আমেরিকার কাছে খুব বেশী গুরুত্ব পায়নি, কেননা তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে গাঁট বেধে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে থেকে। এর পাশাপাশি ভারত হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এর সোশালিজম সংস্করণের প্রতি বন্ধুপ্রতিম, যা ছিল আমেরিকা কর্তৃক ভারতকে অপছন্দ করার আরেকটি কারণ। ভারতের প্রতি পাকিস্তানের বৈরি মনোভাবকে আমেরিকা ঔদাসিন্যের দৃষ্টি নিয়েই দেখতো, মাঝে মাঝে উৎসাহ দিত।

ঐ সময়গুলোতো ভারত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে নিজেকে সামলাতেই বেশী ব্যস্ত ছিলো। বাইরের প্রতি তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিলো মূলত নীচের বিষয়গুলোতে:

· নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকা এসব ছিলো ভারতেরই উপরাষ্ট্রের মতো। এখানে সবকিছু ভারতের নির্দেশনা মতোই চলতো এবং ভারতের জন্য এগুলো তেমন কোন সমস্যা ছিল না।

· বাংলাদেশ - সবসময়ই ভারতের জন্য একটা সম্ভাব্য হুমকি (মুসলিম, ভারত-বিরোধী এবং পাকিস্তান-মার্কিন পন্থী)। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ভারতের জন্য বিপদজনক কারণ বাংলাদেশ ভারতের শরীরের মধ্যে এবং ভারতকে ‘সেভেন সির্স্টা‌স’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

· চীন - সীমান্ত সংঘাত চলছেই এবং ১৯৬২ সালে সংঘটিত হয়েছে চীন-ভারত যুদ্ধ। এছাড়াও, আরেকটি সত্য হচ্ছে ভারত চীনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, যেখানে পাকিস্তান রাশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করেছিল।

· পাকিস্তান - যাদের সাথে মূল বিরোধ হচ্ছে ইসলামী ভূ-খন্ড কাশ্মীর নিয়ে। এই উভয়মুখী সমস্যার মিল রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাঈল সমস্যার সাথে। অর্থাৎ ইসরাঈলের অস্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ছুরি বসানোর মত কিন্তু প্রকারান্তরে তা ঐ অঞ্চলে ইসলামী চেতনাকেই আরো উজ্জীবিত করেছে। এসবের ফলশ্রুতিতে কাশ্মীরে পাকিস্তান ও আমেরিকার সহায়তায় জিহাদী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা পুরো উপমহাদেশেই প্রভাব বিস্তার করেছে যদিও তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভারত।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও চীনের উত্থানের মাধ্যমে উপরোক্ত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টি করার আমেরিকার পুরোনো কৌশলগুলো চীনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ শুরু হয় যেহেতু চীন এখন একটা নতুন টার্গেট। এ অবস্থায়, প্রতি পদক্ষেপেই মার্কিনীরা ভারতকে সাথী হিসাবে পেতে আগ্রহী যেহেতু ভারত ঐতিহ্যগতভাবে চীন বিরোধী। কংগ্রেসম্যান হেনরী হাইড মন্তব্য করেছেন, “ভারতের সাথে আরো নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে চীনের উত্থানকে ঠেকানো যায়” (Proceedings of the House of Representatives to Pass House Resolution, “The United States and India Nuclear Cooperation Promotion Act”, July 2006) । কংগ্রেসম্যান ওনা রহরাবেচার বলেছেন, "আমি এদিকে দৃষ্টি দিতে চাই যে, ভারত বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীন হবার পরবর্তী সময়গুলোতে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক ছিলো খুবই খারাপ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারতের অবস্থান ছিলো রাশিয়ার পক্ষে। তা হোক, কিন্তু এখন তো স্নায়ু যুদ্ধ শেষ। এখন আমাদের উচিত ঐ সময় আমরা যা হারিয়েছি তা পুনরুদ্ধার করা"। তাছাড়া, চীনকে সামাল দিতে ভারত অধিকতর সক্ষম একটি শক্তি যেহেতু সে আকৃতি ও জনসংখ্যার দিক থেকে চীনের কাছাকাছি এবং দুই দেশ পাশাপাশি অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্রেরই এককভাবে এই যোগ্যতা নেই।

অতএব, কার্যত আমেরিকা চায় দক্ষিণ এশিয়া বিশেষতঃ ভারতকে এ অঞ্চলে একটি আঞ্চলিক মহাশক্তি বানিয়ে তাদেরকে চীনের উত্থান দমনের শক্তিশালী হাতিয়াররূপে ব্যাহার করা। আমেরিকা স্বয়ং একাজে মাঠে নেমে পড়েছে। ভারতের সাথে পরমাণু প্রযুক্তি বিনিময়ের সাম্প্রতিক চুক্তি একটা উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত যে এ পরিকল্পনা সফল করতে আমেরিকা কতটুকু এগিয়ে গেছে। কংগ্রেসম্যান গ্রে একারম্যান বলেছেন, “একবিংশ শতাব্দীতে ভারত নীতি তৈরীর এখনই সময়, যা ভারতকে বিশ্বের একটি অন্যতম ও দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে গড়ে উঠার বিষয়কে সমর্থন করবে ও উৎসাহ দিবে, যাতে করে আগামী দশকগুলোতে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক আরো সুসংহত হয়”।

একটি শক্তিশালী ভারত গঠনের লক্ষ্যে মার্কিনীরা চায় এর চারপাশের দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে। চীনের চারদিকে অস্থিরতা তৈরী করার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে মার্কিনীরা ভারতকে স্থিতিশীলতার আবরণে ঢেকে দিতে চাইছে। ভারতকে এভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিলে তা অবশ্যই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উপর নানামুখী প্রভাব ফেলবে। মার্কিন পরিকল্পনায় ভারত হচ্ছে মূল বিবেচ্য আর ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে যেয়ে মার্কিনীরা এর প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পূর্ণ শঠতার সাথে খেলছে এবং তাদেরকে মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করছে। এ ব্যাপারে মার্কিনীরা চরম স্বার্থপর। মার্কিনীদের স্বার্থপরতার খোলামেলা প্রকাশ ঘটেছে কংগ্রেসম্যান জি. একারম্যান -এর কথায়, "সময় এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেয়ার, বিষয়টিকে এখন আর হালকাভাবে নেয়া যাবেনা। পাকিস্তানের মতই ভারতও বেশ কিছু জটিল প্রতিবেশী দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিবেশি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন করে চলেছে; চীন পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক আচরণ করছে... ভারত যদি ঐ দেশগুলোর প্রতিবেশী না হত, আমরা এরই মধ্যে সেগুলোকে আক্রমণ করতাম... আপনি পাকিস্তান, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে কি বলবেন? আপনি হয়তো তাদেরকে বলতে পারেন তোমরা যদি ভারতের মতো থাকতে চাও, তাহলে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of mass destruction) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন কর। এগুলোকে উচ্চমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি কর না, এগুলোকে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিও না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কর, ভারতের মত প্রকৃত গণতন্ত্র... গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে কাজ কর এবং কখনো আমাদের বিপক্ষে যেওনা।" অবশ্য চীনের বিপক্ষে পাকিস্তানের ভূমিকাকে খাট করে দেখা ঠিক হবে না। আমেরিকা মনে করে শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করে চীনের মোকাবেলায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যাবে। এজন্য মার্কিনীরা সার্কের মত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতিকে উৎসাহ দেয়।

পাকিস্তান ও ইসলামী আন্দোলন
পাকিস্তান নিউক্লিয়ার ক্লাবে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় মার্কিনীদের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে তা সমভাবে ভারতের উপরেও সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যা মার্কিনীরা চায় না, আর এজন্যই তারা উভয় দেশের ব্যাপারেই চুপচাপ। অবশ্য কাশ্মিরের ঘটনাবলীতে এই অঞ্চলের সমস্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধুমায়িত অসন্তোষ এবং তাদের পরমাণু অস্ত্রের কাছাকাছি থাকাটা মার্কিনীদের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ক্রিশ্চিনা রোকা উল্লেখ করেছে, “দক্ষিণ এশিয়ায় উদারতা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে প্রধানত কাশ্মিরকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা”।

অতএব, আমেরিকা কর্তৃক আফগানিস্তানে নয়া ক্রুসেডের অন্যতম কারণ ছিল কাশ্মিরের মুসলমানদের সমর্থনকারী ইসলামী আন্দোলনগুলোকে দমন করা। মার্কিনীরা মোশাররফকে বাধ্য করেছিল কাশ্মিরী জনগণের স্বশাসনের অধিকারের প্রতি পাকিস্তানের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাহার করতে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর ভাষায়, “শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসাবে মোশাররফ অনেক দুর এগিয়ে গেছেন... তিনি বুঝতে পেরেছেন যে সন্ত্রাসবাদ, সীমিত যুদ্ধ কিংবা পারমানবিক হুমকি দিয়ে ভারতকে কাশ্মির থেকে হটানো যাবেনা... পাকিস্তান যতক্ষণ পর্যন্ত কাশ্মিরী গ্রুপগুলোর সাথে যুক্ত থাকবে, ততক্ষণ সন্ত্রাসবাদের মদদ দেয়ার অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে না”।

মোশাররফ তার মার্কিন প্রভুর নির্দেশে এবং ভারতের প্রিয়ভাজন হতে গিয়ে পাকিস্তানে অবস্থিত ইসলামিক ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। এছাড়া তাকে বাধ্য করা হয়েছে ভারতের সাথে সমঝোতায় আসতে এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো সমাধান করতে। আর এ সমাধানের শুরু হয়েছে কাশ্মিরের উপর হিন্দুদের অধিকার স্বীকার করে নেয়ার মধ্য দিয়ে। আর এটিকে বলা হয়েছিল দু'দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এসব কিছুই শেষ পর্যন্ত ভারতকে ঘিরে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথকে প্রশস্ত করেছে।

আমেরিকা ও বাংলাদেশ

প্রেক্ষিত: ভারত
একথা পূর্বেই বলা হয়েছে যে ভারতের জন্য বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সোজা কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশে রয়েছে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এবং এই জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ভারতবিরোধী। বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে ভারতের পেটের ভিতরে। বাংলাদেশ তার সীমান্তের ৮০ ভাগই ভারতের সাথে ভাগাভাগি করে। বাংলাদেশ তার অবস্থানগত কারণে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টারস্‌, যারা ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদের মূল যোগানদার) মূল ভারতীয় ভূখন্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আসার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বাংলাদেশের উপর দিয়ে যাওয়া।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত মিত্রতার ফলে ভারত আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ‘স্থিতিশীলতার পরিকল্পনা’র (stabilization plan) উপর যুক্তিভিত্তিক আস্থা ও প্রত্যয় স্থাপন এবং সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া ভারতের পক্ষে খুবই কঠিন। যার ফলে বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করা ভারতের জন্য প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশে পরিপূর্ণ স্থিতিশীলতা ভারতের স্বার্থের অনুকুলে নয়। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে ভারতের বঞ্চিত সেভেন সিস্টারস এর রাজ্যগুলোর মধ্যে স্বাধীন হবার বাসনা তীব্রতর হবে। স্বাধীনতার সংগ্রামে তারা স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করবে। তাই ভারত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, যা মাঝে মাঝে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্র্কিনী পরিকল্পনা ওলট পালট করে দেয়। ভারতের এই আচরণ অনেকটা প্রতিবেশীদের প্রতি ইসরাঈলের আচরণের মতই।

প্রেক্ষিত: চীন
চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে পৌঁছার স্বল্পতম দূরত্বের পথ হচ্ছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে, তাই চীনের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। যদিও দক্ষিণ চীন সাগরের উপর চীনের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত, ভারত মহাসাগরের উপর তার কোন কর্তৃত্ব নেই। চট্টগ্রাম বন্দর চীনের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিলে চীনের এই সমস্যার একটি সমাধান হত। তবে চীন মায়ানমারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরী করছে। যেহেতু মায়ানমারের সরকার চীনের অনুগত, তাই এই গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে আংশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। চীনের এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার মন্ত্রণা দিয়ে আসছে। পরিকল্পিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরে মার্কিন যুদ্ধ বিমানবাহী রণতরী এসে ভিড়তে পারবে এবং একে তারা একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে পুরো ভারত মহাসাগর মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ সহজতর হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ‘শান্তি ও স্থিতি’ বজায় রাখার অর্থ হচ্ছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইসলামিক চরিত্র ও উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করা এবং পরিশেষে 'মডারেট ইসলামিক গণতন্ত্রের' লেবাস ধারণ করা (ক্রিস্টিনা রোকা)। বর্তমানে দু'টি দেশেই সামরিক শাসন (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় এই দুই দেশের ভবিষ্যত নির্ধারিত হবে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশে বর্তমান সামরিক শাসন প্রয়োজনীয় কিন্তু তা একটি স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান।

৬. উপসংহার

উপরোক্ত বিষয়গুলোই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। চীনের উত্থান এবং ইসলামী জাগরণ এই অঞ্চলকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এর ভিত্তিতেই (Criteria) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব ঘটনা বিশ্লেষণ করে এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পরিকল্পনা করে। ডিসেম্বর ২০০৪ সালে জাতীয় গোয়েন্দা কাউন্সিল (National Intelligence Council) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে চীনের উত্থান এবং ২০২০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য শক্তিশালী খিলাফতের আবির্ভাবের মোকাবেলায় মার্কিন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ কারণে বুশ ও তার সহযোগীদের মুখ থেকে বারে বারে সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে, “একটি ব্যাপক ও মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সাম্রাজ্য যার বিস্তৃতি স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ... এটি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বৈধ সরকারের প্রতি চরম হুমকি”।


কায়সার শাহনেওয়াজ
জানুয়ারী ২০০৮

বিশ্বের তেল কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেন ও জার্মানীর বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখার দ্বন্দ্ব তাদেরকে তাদের কয়লাভিত্তিক বৃহদাকার যুদ্ধযানগুলোর জন্য বিকল্প জ্বালানী উৎসের অনুসন্ধানের দিকে ঠেলে দেয়। আর ঐ সমসাময়িক সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে তেলক্ষেত্রগুলোর আবিষ্কার ও নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন নতুন ধারার ভোগের সমাজব্যবস্থা ও বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যের ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করে।

স্বাভাবিকভাবেই জীবাশ্ম জ্বালানি অপ্রতুল এবং এটা একসময় শেষ হয়ে যাবে। বিংশ শতাব্দী জুড়ে অধিকাংশ তেলক্ষেত্রগুলোর অধিকাংশ অনাবিষ্কৃত থাকায় তেলের বিষয়টি খুব একটা আলোচনায় আসেনি। পরবর্তিতে জঙ্গি বিমান, ট্যাঙ্ক, অটোমোবাইল ইত্যাদির আবিষ্কার এ জ্বালানীর উপর সবার নির্ভরশীলতা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যদি একসময় তেল শেষ হয়ে যায় তাহলে এসব যন্ত্রপাতি ও প্রযু্ক্তি একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।

১৯৭০ সালে প্রথম 'পিক অয়েল' থিওরী আবির্ভূত হয়। এর মাধ্যমে দেখানো হয় তেলের সেই পরিমান যে পরিমান উত্তোলন হলে পৃথিবীর মোট তেলের অর্ধেক উত্তোলন করা হবে।

বিশ্বের তেল মজুদের পরিমা (২০০৬)

বিশ্ব
১.১৩ ট্রিলিয়ন
সৌদি আরব
২৬০ বিলিয়ন
কানাডা
১৭৯ বিলিয়ন
ইরান
১৩৬ বিলিয়ন
ইরাক
১১৫ বিলিয়ন
কুয়েত
৯৯ বিলিয়ন
সংযুক্ত আরব আমিরাত
৯৭ বিলিয়ন
ভেনিজুয়েলা
৮০ বিলিয়ন
রাশিয়া
৬০ বিলিয়ন
লিবিয়া
৪১ বিলিয়ন
নাইজেরিয়া
৩৬ বিলিয়ন
ইউ.এস.এ
২১ বিলিয়ন

বিপি বিশ্বের জ্বালানীর পরিসংখ্যাগত পর্যালোচনা ২০০৭

ভবিষ্যতে কতটুকু তেল উৎপাদন করা যাবে তা নিরূপনের জন্য তিনটি উপাত্ত খুব দরকার। প্রথমে দরকার হল, এ পর্যন্ত সর্বমোট কত ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হয়েছে- যাকে সর্বমোট উৎপাদন বলা হয়। দ্বিতীয়ত দরকার হল, বিভিন্ন কোম্পানীগুলো একটি তেলক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করবার আগে কতটুকু তেল উত্তোলন করতে সমর্থ্য হবে। সবশেষে দরকার হল, একটি বিশেষজ্ঞ দল অনাবিষ্কৃত ও উত্তোলনযোগ্য তেলের পরিমাণ সম্পর্কে গবেষণা ভিত্তিক তথ্য প্রদান করবে। এই তিনটি উপাত্ত থেকে পরিষ্কার বুঝা যাবে কয়েক দশক পর থেকে এই খনিটি পরিত্যক্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত ঠিক কতটুকু তেল উত্তোলন করা সম্ভবপর হবে- একে সর্বমোট উত্তোলন বলে।

সর্বোচ্চ কি পরিমাণ তেল উৎপাদিত হবে তা বুঝার জন্য এ পর্যন্ত উৎপাদিত তেল আবিষ্কৃত তেলের পরিমাণকে ছাড়িয়ে গেল কিনা সেদিকে তাকাতে হবে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল এ পর্যন্ত তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের দিক থেকে ১৯৬০ এর দশক ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ের সর্ববৃহৎ তেলক্ষেত্রটি ১৯৮৫ সালে মেক্সিকোতে আবিষ্কৃত হয় আর ১৯৫০ এর দশকে আবিষ্কৃত তেলক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রায় শেষের দিকে। অথচ পৃথিবীতে এখন যে পরিমান তেল উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় চারগুন ব্যবহার হয়। ফলে তেল কোম্পানিগুলো নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু যাই মিলছে তা আবার ছোট ছোট এবং উৎপাদনও খুবই যৎসামান্য। নতুন নতুন তেল ক্ষেত্রর আবিষ্কার নিম্নগামী হওয়ায় এবং তেলের উত্তোলন অব্যাহত থাকায় কালোসোনার বর্তমান মজুদও নিঃশেষ হবার দিকেই এগুচ্ছে।

কোন কোন অতি উৎসাহী ভবিষ্যতদ্রষ্টা বলেন যে, ২০৬০ সাল পর্যন্ত তেলের সর্বোচ্চ (পিক) উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হল, বর্তমান সময় থেকে ২০১২ সালের মধ্যেই তেলের উৎপাদন সর্বোচ্চ (পিক) পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে।

আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাতে পারি যারা ইতোমধ্যে তেল উৎপাদনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে অথবা অতি শীঘ্রই যাবে। তেল উৎপাদনের দিক থেকে প্রথম সাতটি দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে হয় তাদের উৎপাদন নিম্নমুখী অথবা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে, নরওয়ে ২০০১ সালে এবং ব্রিটেন ১৯৯৮ সালে সর্বোচ্চ উৎপাদনে পৌঁছে গেছে। রাশিয়া, মেক্সিকো ও চায়না ২০০৮ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। সৌদি আরব ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানই কেবল এ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।
বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের পরিমা (ব্যারেল প্রতিদিন ২০০৭)

বিশ্ব
৮৫ মিলিয়ন

ইউ.এস.এ
২০.৬ মিলিয়ন
২৪%
চীন
৭.৮ মিলিয়ন
৯.৩%
রাশিয়া
২.৬ মিলিয়ন
৩.২%
জার্মানী
২.৩ মিলিয়ন
২.৮%
ফ্রান্স
১.৯ মিলিয়ন
২.৩%
ইউকে
১.৬ মিলিয়ন
২%
স্পেন
১.৬ মিলিয়ন
২%

বিপি বিশ্বের জ্বালানীর পরিসংখ্যাগত পর্যালোচনা ২০০৭
এছাড়াও আরও অনেক কারণ থাকতে পারে যেগুলো দ্রুত তেল উৎপাদনের শেষপ্রান্তে পৌঁছানোর জন্য দায়ী। সেকারণে বড় বড় তেল কোম্পানীগুলোর (যেমন: শেল) জন্য তেলের মজুদ সম্পর্কে করা অতিরঞ্জিত বক্তব্য মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্তমান মজুদকে সামনে নিয়ে এসে তেল উৎপাদনকারী দেশের সংগঠনগুলো তেল ঘাটতিকে ঢাকবার চেষ্টা করছে। তেল উৎপাদনকারী কোম্পানী যেমন ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কার নয় বরং পুরনো ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল উত্তোলন চুক্তির ভিত্তিতে মজুদ সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের পেছনে বিনিয়োগ বরাবরই কমছে। সৌদি আরবের অধিকাংশ ক্ষেত্রসমূহে চালানো বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানে তেল প্রাপ্তির নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, ভারত, চীন ও অন্যান্য এশিয়ান দেশসমূহের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে তেল ও গ্যাস ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।

এ কারণসমূহ 'তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে'- এ ধরণের প্রচারণাকে মূল ধারায় নিয়ে এসেছে এবং এটি এখন বিশ্বশক্তিসমূহের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এর আড়ালে আরও কিছু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি লুকিয়ে আছে।

পশ্চিমাদের অতিরিক্ত তেল খরচার উপযুক্ত অজুহাত হল তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। সীমিত মজুদের তেল সম্পদের প্রতি অন্যান্য জাতিরাষ্ট্রসমূহের চাহিদা তৈরি হোক এটা পশ্চিমারা চায় না। পশ্চিমারা মোট তেল উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগ করলেও প্রায় অর্ধেক তারা ভোগ করে। তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ই তেল সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ-তেলের প্রাকৃতিক মজুদ নয়।

যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৮ ভাগ তেল উৎপাদন করলেও প্রায় ২৫ ভাগ তেল খরচ করে। তাদের এ বিশাল খরচ বহন করা অসম্ভব। কারণ মাত্র কয়েকটি বিশাল তেলক্ষেত্রের উপরই তাদের তেলের সিংহভাগ চাহিদা পূরণের দায়ভার বর্তায়। পুরো পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার তেলক্ষেত্র থাকলেও মাত্র ১১৬ টি ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১০০০০০ ব্যারেল উৎপাদিত হয়-যা পুরো বিশ্বের উৎপাদনের শতকরা ৫০ ভাগ। এদের হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ছাড়া বাকীগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে সিঁকি শতাব্দীরও আগে। যেগুলো এখন প্রায় ফুরিয়ে যাবার পথে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় ক্ষেত্রসমূহের মধ্যে সৌদি আরবের ঘাওয়ার, কুয়েতের বারগান, মেক্সিকোর কেণ্টারেল এবং রাশিয়ার সামোতলর-এখন উৎপাদনের দিক থেকে নিম্নমুখী। এসব বৃহৎক্ষেত্রসমূহের নিম্নমুখী উৎপাদন একটি বড় ঘটনা। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য ছোট ছোট ক্ষেত্রসমূহের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে। তবে এর মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান সুদূর পরাহত। যেহেতু মার্কিন তেল খরচ বেড়েই চলেছে সেহেতু সীমিত মজুদের এ জ্বালানীশক্তিকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েই চলবে। একারণে ইরাকের মত মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশও এ কালো সোনার জন্য মার্কিনীদের রাহুগ্রাসের শিকার হতে পারে।

তেল সম্পদের স্বল্পতার জন্য নয় বরং পশ্চিমা বিশ্বের তেলের অতিরঞ্জিত ব্যবহারই তেল ফুরিয়ে যাবার প্রধান কারণ।

সোমবার, ২ এপ্রিল, ২০১২

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস

বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও তার সম্ভাব্য বাধাসমূহ আলোচনা করাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিচারে এই প্রবন্ধে চারটি সময়কালকে (Period) আলাদা আলাদা ভাবে ভাগ করা হয়েছে।

১.    প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে ব্রিটিশদের আসার আগপর্যন্ত সময় কাল। (?....১৭৫৭)
২.    ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক আন্দোলন (১৭৫৭-১৯৪৭)
৩.    পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক সংগ্রাম। (১৯৪৮-১৯৭১)
৪.    বাংলাদেশ আমল ( ১৯৭১-২০০৭)

Pre-historical period এর আলোচনায় যাওয়ার আগে এই অঞ্চলের ভৌগলিক ও সাধারণ মানুষের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ঠ্যর একটি পর্যালোচনা প্রয়োজন। যে ভূখন্ডটাকে আজকে আমরা বাংলাদেশ বলি, গত ২ হাজার বছর বা তার অধিক কাল সময় ধরে এই অঞ্চলটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। এই অংশের আদি নাম ছিলো রাঢ় বা বঙ্গ। বঙ্গের মানুষের নৃতাত্বিক পরিচয় হলো জাতিগতভাবে এর দ্রাবিড় বা অনার্য। এই অনার্যরা হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখন্ডে বাস করে আসছে এবং এরাই এখানকার আদিবাসী। পরবর্তীতে ভারতীয় উপমাহাদেশে আর্যদের আগমনের (মূলতঃ পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে) ফলে বৃহত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধরণ দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। আর্যরাই প্রথম এসে প্রতিষ্ঠানিক অর্থে হিন্দু ধর্মের প্রবর্তন ঘটায় ও জাতিভেদ প্রথার (Caste) প্রচলন করে। ভারতীয় উপমহাদেশে সেই থেকে ব্রাহ্মন্যবাদের শুরু। ব্রাহ্মনরা ধর্মীয়ভাবে ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার সাথে সাথে তারা উপমহাদেশের অনার্যদের উপর অত্যাচার ও শোষণ শুরু করে। দক্ষিণ ভারত ও বঙ্গে যেহেতু অধিক সংখ্যক দ্রাবিড় বা অনার্য জনগোষ্ঠীর বাস ছিলো- সেকারণে এই দুই অঞ্চলের মানুষের সাথে আর্যদের দীর্ঘ মেয়াদী লড়াই ও সংগ্রাম শুরু হয়। বঙ্গের দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই লড়াকু ও সংগ্রামী জাতি হিসাবে পরিচিত ছিলো। আর্যদের এই জাতিভেদ প্রথা ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বঙ্গের এই অংশের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে এবং রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে। যে কারণে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ব্রাহ্মন্যবাদের প্রসার ঘটানো সম্ভব হলেও বঙ্গে আর্যরা কখনোই তাদের ঘাঁটি স্থাপন করতে পারেনি। এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে যখন এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে তখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে ছিলো এই কারনে যে, ইসলাম এই সকল মানুষদেরকে আর্যদের আধিপত্য ও শোষণ থেকে মুক্ত করে (emancipation from all kinds of oppression) এক নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছিলো। যে হারে ও গতিতে এই অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে ঐতিহাসিকদের কাছে তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। বলা হয়ে থাকে আরব পেনুনসুল্যার (উপদ্বীপ) বাইরে পৃথিবীর আর কোথাও এত বেশী সংখ্যক মানুষ এত অল্প সময়ের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেনি। বঙ্গের এই অংশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিলো।

ইসলামকে তারা দেখেছে জাতিভেদ প্রথা ও শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সহায়ক এক শক্তিশালী মতাদর্শ হিসাবে। যেই মতাদর্শ তাদেরকে মুক্ত করেছে অসাম্য ও ভেদাভেদ থেকে এবং পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার সাথে। এর পরবর্তী ১১শ বছরে যতবারই বিদেশী শাসন ও দেশী শোষণের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মুসলমান বা অমুসলিমরা লড়াই করেছে, তার বেশীভাগ সময়েই তাদেরকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শ। বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়েই অত্যাচারী ব্রাহ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিজয়ের শুভ সূচনা হয়েছিলো। ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে রক্তপাতহীনভাবে বাংলা দখল করা ও লক্ষণ সেনের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। অল্প কিছু সাহসী মানুষের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর সংগ্রামী চেতনা যে অত্যাচারী শাসকদের মসনদ তছনছ করে দিতে পারে তা পরবর্তীতে বাংলার ইতিহাসে বহুবার প্রমানিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের আমল পর্যন্ত এমনকি দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন আমলেও বহুবার এখানকার জনগণ অত্যাচারী মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে। দুঃখ জনক হলেও সত্যি মুসলমানদের এই রাজনৈতিক ইতিহাস চেপে রাখা হয়েছে প্রচলিত ইতিহাসের বই সমুহে। এমন কি অনেক সূফী সাধকের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকেও ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলো হযরত শাহ জালাল (রহ.), যিনি কিনা মূলত এক অত্যাচারী হিন্দু রাজার বিরুদ্ধে জিহাদের কাফেলায় শরীক হয়েই এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। সূফীদের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র তাদের আধ্যাত্মবাদের বিষয়টিকে পরবর্তীতে আমলে নিয়ে আসা হয়েছে মূলত ইসলামের রাজনৈতিক সংগ্রামের শক্তিকে দুর্বল করার জন্য।

ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতা হারানোর পর, বাংলা সহ সারা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে এক তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিলো। একটি সংখ্যালঘিষ্ট জাতি হিসাবে মুসলমানরা প্রায় ৮০০ বছর ভারত শাসন করেছে এবং ভারতের ইতিহাসের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় এই সময়কালে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশী উন্নত ছিলো। যে কারণে সূদুর ইউরোপ থেকে পুর্তুগীজ, ফরাসী ও ইংরেজরা একের পর এক ভারতে এসেছে সম্পদ লুন্ঠন ও দেশ দখলের উদ্দেশ্য নিয়ে। মুসলমানদের শাসনের সময়েই ভারত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসাবে অবস্থান করেছে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই মুসলমানেরা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ফকির বিদ্রোহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীরের আন্দোলন সব পর্যায়েই এই অঞ্চলে মানুষ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করেছে এবং বহু অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ১৯২০-২১ এর খিলাফত আন্দোলন এর ইতিহাসও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। মহাত্মা গান্ধীও এক পর্যায়ে খিলাফত আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। একদিকে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ও মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলন যুগপৎভাবে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের দুটি প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলো। হাজার হাজার বাংলাদেশের আলেম সেই সময় জেল খেটেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ও অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যুবরণ করেছেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের হাত থেকে চলে গিয়ে আবার ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও কিছু ব্রিটিশভক্ত এলিট মুসলমানদের হাতে চলে যায়। যার ধারাবাহিকতায় মুসলমাদের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ভারতও বিভক্ত হয়ে যায় পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্রে।

পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরীতে সেই অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক অবদান ছিলো, ১৯৪৭ এ এখানকার ৯৫ শতাংশ মানুষই আন্তরিকভাবে পাকিস্তান চেয়েছিলো একটি সত্যিকার অর্থে ইসলামিক ব্যবস্থার মধ্যে বসবাসের আকাঙ্খা থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এলিট শ্রেণীর পাকিস্তানী শাসকরা যেহেতু ইসলামের নাম ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর ব্রিটিশদের মতো একই ধরণের ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছিলো, সে কারণে এই অঞ্চলের মানুষ তার প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলো এবং দুর্ভাগ্য হলো ৮০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম আন্দোলন আর সংগ্রামের নেতৃত্ব মুসলমানদের হাত থেকে সরে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষদের হাতে চলে যেতে শুরু করলো। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামে মাওলানা ভাসানীর এর বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব চলে গেলো ধর্মনিরপেক্ষদের হাতে। ধর্মীয় রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে প্রথম তৈরী হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ। পরবর্তী ১৫ বছরের (১৯৬০-১৯৭৫) এই অঞ্চলের আন্দোলন সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দান করেছে এই ধর্মনিরপেক্ষ অংশই। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরীতে আওয়ামী লীগের ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনের আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের মোটামুটি জানা, বিশেষ করে এই আন্দোলন পর্যায়ে আদর্শবাদী বামপন্থী সংগঠন সমূহ ব্যাপকভাবে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬ এর ৬ দফা দাবী, ৬৯ এর গণভ্যুত্থান ও ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই আন্দোলনের মূল বুদ্ধি কৌশল ও শক্তি যোগান দিয়েছে বামপন্থীরা, কিন্তু এর সুফল পুরোটাই ভোগ করেছে আওয়ামী লীগাররা।

স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস মূলতঃ আওয়ামী লীগ বিরোধিতার ইতিহাস, ১৯৭২-৭৭ সালে পর্যন্ত জাসদের অভ্যুদয় মূলতঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ইতিহাসে এক চমকপ্রদ অধ্যায়। সবচেয়ে নূণ্যতম সময়ে একটি একক শক্তিশালী বিরোধী দলের হিসাবে জাসদের আবির্ভাব আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এর জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক। এই সময়কালে রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে ছিলো। জাসদের প্রায় ৩০,০০০ কর্মী রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়। আওয়ামী লীগের প্রায় মারা যায় ১০,০০০ কর্মী। এছাড়া সর্বহারা পার্টিরও অসংখ্য কর্মী সরকারি পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর হাতে নিহত হয়।

৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনে, ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তির পাশা পাশি জাতিয়তাবাদী শক্তির আবির্ভাব ঘটে। ৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় যুগপৎ ভাবে এই দুই শক্তির অবস্থান আমরা লক্ষ্য করি। এর পাশাপাশি জামায়াতও কিছুটা আন্দোলনের দলে পরিনিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এই যে, ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ধর্ম নিরপেক্ষ ও জাতিয়তাবাদী শক্তির তুলনায় ইসলামি দলগুলির উপস্থিতি একবারেই সামান্য। শুধুমাত্র কয়েকটি ইসলামি ইস্যুতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদেরকে রাজপথের আন্দোলনে দেখা গেছে। যেমন তাসলিমা নাসরীন ইস্যু, বাবরী মসজিদ ইস্যু, আওয়ামী লীগের আমলে ব্রাহ্মন বাড়িয়া ইস্যু ইত্যাদি। ২০০০ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা আশা কারি এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। গত ৪ বছরে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, এই অঞ্চলের আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব আবার নতুন করে ধর্ম নিরপেক্ষদের হাত থেকে সরে গিয়ে ইসলামিকদের হাতে চলে আসার পক্রিয়া শুরু হয়েছে ইনশাআল্লাহ।

আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিনতি হিসাবে জেল জুলুমের পর্যায় এখন আমরা অতিক্রম করছি। এই পর্যায় কত দীর্ঘস্থায়ী হবে তা হিসাব করে বলা মুশকিল। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পর্যায়ে আল্লাহ্'কে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গের জন্যও আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ধারাবাহিকভাবে জেল-জুলুম হত্যার মধ্য দিয়ে খিলাফতের সংগ্রাম জনগেণের সংগ্রামে পরিনত হবে ইনশাআল্লাহ্। শুধু তত্ত্বীয় কারণে নয়, আত্মত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের কর্মীরা সমাজের মধ্যে তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। আন্দোলন গড়ে তোলা ও আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার এটাই একমাত্র পরীক্ষিত রাস্তা।

সর্বশেষে একথা মনে রাখা দরকার ঐতিহাসিকভাবে এ কথা প্রমাণিত যে, এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস, এবং আন্দোলন সংগ্রামের জন্য সাধারন মানুষ সবসময়ই প্রস্তুত। আপোষকামী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অরাজনৈতিক মানসিকতা যেনো আমাদের বিভ্রান্ত না করে। সমাজে পরগাছা মধ্যবিত্ত মানসিকতার অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের গুরুত্ব না দিয়ে সাধারন জনগণের রাজনৈতিক চাহিদা বা Pulse বোঝা ও সেই অনুযায়ী অন্দোলনকে চালিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর তা করতে পারলে ইনশাআল্লাহ ৮০০ বছর ধরে যেভাবে আমরা আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছি সেভাবে আবারও এই দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের হাতে নিয়ে এসে এই জমিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে পারব ইনশাআল্লাহ্। আমিন


ড. শেখ তৌফিক
নভেম্বর, ২০০৭